দেশি পণ্য কিনে হও ধন্য

দেশি পণ্য কিনে হও ধন্য

779
SHARE
aRONG

রেজানুর রহমান

আগে ফ্যাশন বদলাতো যুগে যুগে। আর এখন ফ্যাশন বদলায় প্রতি মাসে। প্রতিদিনই ফ্যাশন বদলায় একথা বললেও বোধকরি ভুল বলা হবে না। বরং শেষের কথাটাই ঠিক। আগে ফ্যাশন বদলাতো এক যুগ পর। সে জন্য আমরা  বলি অমুক যুগের ফ্যাশন। প্যান্টের ক্ষেত্রে বেলবটম আর জুতার ক্ষেত্রে হাই হিল এমনই একটা ফ্যাশন ছিল ৮০’র দশকে। চুলের কাটিংয়েও পরিবর্তন এসেছিল ৮০ ও ৯০ এর দশকে। সেই সময়ের ছায়াছবি দেখলেই বোঝা যায় কোন ফ্যাশনের প্রতি সবার আগ্রহ ছিল। তখনকার দিনে মূলত: ছায়াছবির নায়ক-নায়িকার পরনের আধুনিক পোশকেই ফ্যাশন হিসেবে গুরুত্ব পেত। নায়করাজ রাজ্জাকের মাথার চুলের স্টাইল অনুকরণ করতো অনেকে। নায়করাজের শার্টের কলার, প্যান্টের কাটিং অনেকে পছন্দ করতেন। দর্জি বাড়ি গিয়ে বলতেন রাজ্জাক কাটিং-এর কথা। ববিতার পরনের হাতাকাটা বøাউজ এক সময় এদেশের নারীর মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একটি ছবিতে ববিতার খোপার বিশেষ স্টাইল পরবর্তীতে অনেক নারীর ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ায়। তখনকার দিনে অবশ্য পাড়া মহল্লায় এত বিউটি পার্লার ছিল না। অগ্রসরমান নারীরা নিজেরাই নিজেদের ফ্যাশন বেছে নিতেন। এক্ষেত্রে পত্র-পত্রিকার ভ‚মিকা ছিল বেশ। বিশেষ করে বিভিন্ন পত্রিকায় ঈদের বিশেষ আয়োজন  ফ্যাশন ক্যাটালগ দেখে নতুন ফ্যাশনের প্রতি আকৃষ্ট হতেন আমাদের দেশের নারীরা। একটা সময় ফ্যাশন বলতে বোঝাতো মহিলাদের বিষয়। পুরুষদের তেমন একটা আগ্রহ ছিল না। ঈদে নতুন পায়জামা আর পাঞ্জাবি হলেই চলতো পুরুষদের। নারীরা শাড়ির পাশাপাশি সালোয়ার কামিজের নতুন ফ্যাশন নিয়ে বেশ তৎপর থাকতো। দর্জি বাড়িই অনেকের ভরসা ছিল। আগে কাপড়ের দোকানে গিয়ে পছন্দ সই কাপড় কেন। তারপর দর্জির কাছে সেই কাপড় জমা দাও। দর্জি বানাতেন নতুন জামা কাপড়। এখনও দর্জিই কাপড় বানায়। কিন্তু দর্জির সঙ্গে ক্রেতার এখন আর কোনো সম্পর্ক নাই। এখন জামা কাপড় কেনা অনেক সহজ। পথের ধারে মন পছন্দের কোনো পোশাকের দোকানে ঢুকে গেলেই হলো। ঢুকলাম পুরনো পোশাক পরে। বের হবার সময় শরীরে শোভা পাচ্ছে নতুন পোশাক।

এমনটাই জাদুর জগতে বিচরণ করছে ফ্যাশন। হ্যাঁ, জাদুই তো। সকালে দেখি এক ধরনের ফ্যাশন বিকেলে অন্য ধরনের। হাতে যদি থাকে একটি স্মার্ট মোবাইল ফোন, আর সেই ফোনে যদি থাকে ইন্টারনেটের সুবিধা তাহলে তো কথাই নেই। পরিবর্তনের আধুনিক দুনিয়ায় সহজেই ঢুকে যাওয়া সম্ভব। একটা সময় ছিল ঈদ, পূজা পার্বণে নতুন কাপড় কেনার জন্য কাপড়ের দোকানে যেতে হতো রং পছন্দ করার জন্য। আর এখন আপনি হয়তো রান্নাঘরে রান্নার কাজে ব্যস্ত। হঠাৎ আপনার ফোনে মেসেজ এলো। মোবাইলে চোখ ফেলে আপনি তো অবাক। রংবেরংয়ের অনেক শাড়ির ছবি পাঠিয়েছেন আপনার স্বামী। কোনটা আপনার পছন্দ জানতে চান। চুলায় মুরগির মাংস অথবা মাছ রান্না করতে করতেই আপনি শাড়ি পছন্দ করে ফিরতি মেসেজ পাঠালেন। কিছুক্ষণ পরই আপনার কাছে চলে এলো নতুন শাড়ি অথবা সালোয়ার কামিজ। জাদুর মতোই ঘটে গেল সবকিছু।

হ্যাঁ ব্যাপারটা অনেকটাই জাদুর মতো। জাদুটা দেখাচ্ছে ইন্টারনেট অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতিই পৃথিবীব্যাপী ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকের ক্ষেত্রে এমনও হয় রাতে শুধু ঘুমানোর সময়টুকু ছাড়া দিন রাতের পুরো সময়টাই কাটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অর্থাৎ ফেসবুক, টুইটার, ভাইবারের আধুনিক জগতে। সে কারণে শুধু পোশাক নয়, আচার আচরণের পাশাপাশি খাদ্য সংস্কৃতিও পাল্টে যাচ্ছে। বদলে যাচ্ছে আশেপাশের পরিবেশও।

পোশাকের ক্ষেত্রে প্রায় প্রতিমাসেই ফ্যাশন বদলায়। তবে এই বদলের ধারা দৃশ্যমান হয় মূলত: ঈদ ও পহেলা বৈশাখের আনন্দ উৎসবে। এক সময় শুধু ঈদেই বোঝা যেতো কোন ফ্যাশন এবার ডমিনেট করবে। বর্তমানে ঈদ উৎসবের পাশাপাশি বাংলা নববর্ষের আনন্দ উৎসবও ফ্যাশন বদলের ধারায় যুক্ত হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাপক ভ‚মিকা পালন করছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সমূহ। তবে আমাদের দেশে ফ্যাশন বদলের ধারায় বুটিক বাটিক কেন্দ্রিক ফ্যাশন হাউস অর্থাৎ পোশাক প্রস্তুত ও বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভ‚মিকা অনেক বেশি। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিক চিন্তা ভাবনার কারণে উৎসবের পোশাক দর্জি বাড়ির ছোট্ট পরিসর থেকে বেড়িয়ে আলোঝলমল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গ্যালারিতে স্থান পায়। এখনকার প্রজন্ম অর্থাৎ ছেলে-মেয়েদের কাছে ‘দর্জিবাড়ি’ ব্যাপারটাই হয়তো অচেনা। অনেকের মাঝে হয়তো সেই ধারণাও কাজ করে না কাপড় বানাতে দর্জির ভূমিকা কতটুকু। কারণ তারা তো মার্কেটে ঢুকেই নির্ধারিত দোকান অথবা ফ্যাশন হাউস থেকে মন পছন্দের কাপড় কিনে নেয়। কাজেই তার কাছে দর্জির কোনো ভ‚মিকা থাকার কথা নয়।

এই দেশে ঈদ অথবা নববর্ষের উৎসবকে কেন্দ্র করেই মূলতঃ ফ্যাশন বদলায়। তবে সেই বদলের ধারায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা পালন করে সিজন অর্থাৎ সময়টা কেমন? যেমন এবার ঈদ পেয়েছে গরমকাল। স্বভাবতই গরমকে প্রাধান্য দিয়ে প্রায় সকল প্রতিষ্ঠান এবার ঈদের পোশাকের পসরা সাজিয়েছে। এই গরমে আরামদায়ক পোশাকের প্রতিই গুরুত্ব দিয়েছে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান। পাঞ্জাবি, শাড়ি, সালোয়ার, কামিজ, সব ক্ষেত্রেই গরমকালের উপযোগী পোশাক বেশি পাওয়া যাবে এবার। পোশাক প্রস্তুত ও বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলো গরমকালকে গুরুত্ব দিয়েই মূলতঃ এবার ঈদের পোশাকের পসরা সাজিয়েছে।

ঈদসহ প্রায় প্রতিটি উৎসব পার্বণে জুতা ও সুগন্ধি হয়ে ওঠে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রেও ঋতুর প্রভাব লক্ষণীয়। গরম আবহাওয়াকে মাথায় রেখেই এবার জুতা সেন্ডেলের পসরা সাজানো হয়েছে প্রতিটি মার্কেটে।

আনন্দ আলোসহ বিভিন্ন পত্রিকার ঈদ ফ্যাশন ক্যাটালগ ঈদের পোশাক নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রায় প্রতিটি পরিবারকে একটি ধারণা দেয়। অনেকে আছেন সময় থাকতে ঈদের কেনাকাটায় গুরুত্ব দেন না। পরে যখন দেখেন সময় তো গড়িয়ে যাচ্ছে… তখন তাড়াহুড়া করে ঈদের কেনাকাটা সারেন। ফলে ঈদের কেনাকাটা মনঃপূত হয় না। কাজেই সবার উচিত সময় থাকতেই ঈদের পোশাক ও প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে ফেলা।

পোশাক কেনার ক্ষেত্রে অবশ্যই দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব দিবেন। অনেকে আছেন দেশের ভালো জিনিস রেখে বিদেশের নি¤œমানের জিনিসের প্রতি বেশি মাত্রায় আগ্রহী হন। তাদের উদ্দেশে বিনীত পরামর্শÑ এই ঈদে আসুন না আমরা দেশীয় পণ্যকে গুরুত্ব দেই। দেশের পোশাক, দেশের শাড়ি, সালোয়ার কামিজ কেনার ক্ষেত্রে অধিক মনোযোগী হই।

আনন্দ আলোর এই ফ্যাশন অ্যালবাম প্রকাশের ক্ষেত্রে যারা সহযোগিতা করেছেন বিশেষ করে বিজ্ঞাপন প্রদান কারী সকল প্রতিষ্ঠানের প্রতি রইলো অশেষ শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। সেই সঙ্গে আনন্দ আলোর অগণিত পাঠকের প্রতিও আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা। বিশেষ অনুরোধ এবারের ঈদে দেশি পণ্যকে বিশেষ ভাবে গুরুত্ব দিন। অনেকে আছেন বিজ্ঞাপনের চাকচিক্যে পাশের বিদেশের নি¤œমানের পোশাকের প্রতি আকৃষ্ট হন। নিজের দেশের ভালো জিনিস ছেড়ে অন্যদেশের নি¤œমানের পণ্যের প্রতি অতিমাত্রায় উৎসাহী হয়ে ওঠেন। বিশেষ অনুরোধ, এবারের ঈদে দেশি পণ্য কিনুন। ‘দেশি পণ্য কিনে হও ধন্য’ এই ¯েøাগানকে গুরুত্ব দিয়ে আসুন সকলে ঈদ উৎসবকে রাঙিয়ে তুলি। সবার জন্য রইলো পবিত্র ঈদের শুভেচ্ছা।