তোমরা আরণ্যক হয়ে যাও!

তোমরা আরণ্যক হয়ে যাও!

300
SHARE
Mamunur-Rashid

মামুনুর রশীদ

আমার জন্ম মামা বাড়িতে। গ্রামের নাম পাইকড়া, টাঙ্গাইলের কালিহাতি থানার অন্তর্গত। আমার বাবা সরকারি চাকরি করতেন। আমি বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান। আমার ছোটবেলার গ্রামের অনেক স্মৃতির মধ্যে একটা স্মৃতি সবসময় মনে পড়ে তা হলো ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি। তখন আমার বয়স মাত্র ৪ বছর। তখন আমার দাঁতে বেশ ব্যথা ছিল। মা আমাকে কোলে করে স্কুলের সামনে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে ছোট মামা শ্লোগান দিচ্ছিলেন, আমার স্পষ্ট মনে পড়ে- রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, নুরুল আমিনের কল্লা চাই। একেবারে টাঙ্গাইল শহর থেকে ৬ মাইল ভেতরে, তখন প্রত্যন্ত গ্রাম, সেখানে এই সেøাগান চলছিল। এই স্মৃতিটুকু আমার সবসময় মনে থাকবে।
হ ছোটবেলায় মামা বাড়ির স্মৃতিটাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি জাগ্রত। কারণ, আমার দাদার সঙ্গে বাবার সম্পর্কটা ভালো ছিল না। দাদি মারা যাবার পর, দাদা দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন। এরপরই বাবা মাকে নিয়ে মামা বাড়ি চলে আসেন। তবে আমরা যেতাম, মাঝে মাঝেই দাদা বাড়ি যেতাম। দাদা বাড়ি ছিল ঘাটাইল থানায়। বিশেষ করে শীতের সময় খুবই ভালো লাগতো। বাড়ি থেকে একমাইল দূরেই পাহাড়। তখন পাহাড় মানে তো দুর্গম জঙ্গল। সকাল বেলার সূর্যটা উঠতো পাহাড়ের ঠিক পেছন থেকে। বিকেল বেলা পাহাড়ের পথগুলোকে মেয়েদের সিঁথির মতো মনে হতো, খুবই ভালো লাগতো। আমার এক চাচা বিয়ে করেছিলেন পাশের গ্রামের এক সুন্দরীকে। বিয়ের পর এক ছেলে হলো এবং তার বছর দুই পর চাচা ব্রঙ্কাইটিসে মারা গেলেন। চাচীর বয়স খুবই অল্প। তাই সবাই মিলে তাকে অনুরোধ করলেন আমার আরেক চাচীকে বিয়ে করবার জন্য। এই প্রস্তাব শুনে চাচা দেশান্তরি হলেন। আমার এই স্মৃতি এখনো মনে পড়লে বেশ অন্যরকম আনন্দ পাই। পরে অবশ্য ফিরে এসেছিলেন তিনি। আর আমার চাচীরও বিয়ে হয়েছিল, তবে অন্য ছেলের সঙ্গে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো আমরা যখন দাদা বাড়ি যেতাম তখন ঐ চাচীকে নাইওরী আনা হতো। আর ঐ চাচীর দ্বিতীয় স্বামীও ব্যাপারটাকে কোনো খারাপ চোখে দেখতেন না।
হ আমার স্কুল জীবন শুরু হয়েছিল ময়মনসিংহের ফুলপুরে। টাঙ্গাইল থেকে দিনে একটি বাস যেত সকাল বেলায়। বাসটা যখন মধুপুর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেত তখন জানালা-টানালা সব বন্ধ করে দিতে হতো। কারণ, একদিকে বাঘ, হাতি এদের উপদ্রব, আর অন্যদিকে ডাকাতের উপদ্রব। প্রায় ১১/১২ মাইল রাস্তা। এখনতো সব ফাঁকা। আমরা যখন সঙ্গে যেতাম তখন দেখতাম প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই বন্দুক ছিল। দুটো কারণে, এক হচ্ছে শীতের সময় বন্য শুয়োরেরা আক্রমণ করতো, সেটা থেকে আত্মরক্ষার জন্য। আর দ্বিতীয় কারণ হলো- সবাই শিকারে বের হতো। আমরাও বের হতাম। সূর্য ওঠার আগেই চাচাদের সঙ্গে শিকারে যেতাম বন মোরগ মারার জন্য। এই শিকারে আমাদের গাইড হিসেবে থাকত মধুপুর বনের আদিবাসী মান্দীরা। এই স্মৃতিগুলো মাঝে মাঝেই মনে পড়ে।
হ ছোটবেলায় আরেকটা মজার স্মৃতি আছে। এলেঙ্গা বলে একটি জায়গা আছে। যেখানে জমিদার বাড়ি ছিল। ঐ গ্রামের স্কুলের একটা স্মৃতি মনে পড়ে। ঐ গ্রামের একদিকে নদী, অন্যদিকে জমিদার বাড়ি। কালীপূজার সময় তিনদিন ধরে ক্ষ্যামটা নাচ হতো। তাদের নাটমন্দির ছিল, সেখানে নাচ, যাত্রা হতো। পাঠা বলি হতো, আরো কত কি! সেখানে এত পালা-পার্বণ যে শুরু হতো দুর্গাপূজা থেকে আর শেষ হতো সরস্বতী পূজায়। এই জমিদার বাড়ির কারণেই আমার সৌভাগ্য হয়েছিল কৃষ্ণলীলা, রামলীলা দেখার। তারপর কথক ঠাকুর মহাভারতের গল্প বলতো, একটি মাত্র লাঠি নিয়ে। এই লাঠিটাই তরবারি হয়ে যাচ্ছে, রথের রশি হয়ে যাচ্ছে, চমৎকার ব্যাপার, তখন তো মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। ছোটবেলায় পূজা দেখার এই স্মৃতি আমার সবসময় মনে পড়ে।
হ স্কুল জীবনে আমার শিক্ষকদের নিয়ে অনেক স্মৃতি আছে। গ্রামের স্কুলে পড়ার সময়েই আমি সত্যিকার অর্থে কয়েকজন শিক্ষক পেয়েছিলাম- দক্ষিণারঞ্জন আইচ, আমরা দক্ষিণা স্যার বলতাম। এই রকম ডেডিকেটেড শিক্ষক আমি আর দেখিনি। তিনি অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের লোক ছিলো। তার পিঠে চাবুকের কালো দাগ ছিল। হেড স্যার ছিলেন নিত্যানন্দ স্যার। উনি প্রতিদিন টাঙ্গাইল শহর থেকে সাইকেলে করে আসতেন। কিন্তু কোনোদিন লেট করতে দেখিনি। ওয়ার্নিং বেলটা বাজলেই দেখা যেত তার সাইকেলের চাকাটা স্কুলে ঢুকত। প্রিয়নাথ স্যার গণিত করাতেন চমৎকার এবং কোনো অঙ্ক কেউ না বুঝলে উনি নিজেই ধরতে পারতেন যে, সে বোঝেনি। লতিফ স্যার ছিলেন হিরো। গ্রামের যেকোনো সমস্যায় উনি সবার আগে সেখানে উপস্থিত থাকতেন। আমার জীবনে হিরো বলতেই লতিফ স্যারের কথা মনে পড়ে। আরেকটা ব্যাপার মনে পড়ে তা হলো আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, স্কুলের ভেতরে ক্লাস সেভেনের কক্ষে একটা লোক আত্মহত্যা করেছিল। ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যার প্রথম চেহারাটা ওখানেই দেখি। এটা খুব খারাপ লেগেছিল।
হ আরেকটা স্মৃতির কথা না বললেই না তা হলো দেশ ভাগের সময় মানুষের দেশত্যাগের ঘটনা। মনে পড়ে তখন এক এক করে সবাই গেছে আমাদের ছায়া দি, অশোকা দি, আমার ক্লাসমেট অনিমা। তখন আমার খুব খারাপ লেগেছিল। মুসলমানরা বলতো- এই যে দ্যাখো, দেশটাকে নিজের ভাবতে পারলো না, সব সম্পত্তি পাচার করছে, মেয়েগুলোকে পাচার করছে। আসলে ওরা জমিদার ছিল, ওদের আগে থেকেই রাঁচিতে বাড়ি ছিল।
হ আমার আরেকটি ঘটনা সবসময় মনে পড়ে। ১৯৫৯ সালে, টাঙ্গাইল শহরেই সম্ভবত প্রথম ইলেক্ট্রিসিটি দেখি। তারও আগে সেটা ইলেক্ট্রিসিটি ছিল কি না জানি না, তখন আমার ৫/৬ বছর বয়স। সিরাজউদ্দৌলা দেখেছিলাম টাঙ্গাইল করনেশন ড্রামাটিক ক্লাবে। আমার শুধু এইটুকুই মনে আছে- পথহারা পাখি গানটা, আর লাইট ছিল কিন্তু কিসের লাইট মনে করতে পারছি না। আমি পথহারা পাখি গানটা শুনতে শুনতে মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
হ আমার স্মৃতির মধ্যে মেট্রিক পাসের ঘটনাটাও একটা। টাঙ্গাইলের বল্লা করনেশন হাইস্কুল থেকে মেট্রিক পাস করি। আমাদের সময় এক অদ্ভুত নিয়ম চালু হলো। ’৬২ সালে ক্লাস নাইনে চার সাবজেক্ট পরীক্ষা দিলাম আর ’৬৩ সালে দিলাম ক্লাস টেনের পরীক্ষা- এই দুটো মিলে এসএসসির রেজাল্ট হতো।
হ আমার নাটক লেখা নিয়ে একটি স্মৃতির কথা শেয়ার করি। ঢাকা কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আমার অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল না। পরে পলিটেকনিক-এ ভর্তি হলাম। একটা স্কলারশীপ পেয়ে গেলাম, তখনকার দিনে ৮৫০ টাকা। সেখানে আমার শিক্ষক ছিলেন রাকিবউদ্দিন সাহেব, শর্মিলী আহমেদের স্বামী। উনি তখন বিধায়ক ভট্টাচার্যের সঙ্গে কাজ করতেন কলকাতায়। এখানে তিনি মাটির পাহাড় নামে একটা ছবিও করেছিলেন। উনি সেটার এসিসটেন্ট ডিরেক্টর ছিলেন। উনি নাটক নিয়ে খুব ভাবতেন। আমি ভাবতাম যে- নাটক নিয়ে আবার ভাবার কী আছে। রামেন্দু দা’র বড়ভাই রণেন্দু স্যার, উনিও পলিটেকনিক-এর শিক্ষক ছিলেন। ওনারা সবাই নাট্যানুরাগী ছিলেন। ওখানে প্রচুর কালচারাল এ্যাকটিভিটি হতো। সেখানেই এক সময় আমি নবীনবরণ নিয়ে একটা নাটক লিখে ফেললাম। নাগরিক নাট্যাঙ্গনের আবুল কাশেম, উনি তখন ওখানে শিক্ষক হিসেবে জয়েন করেন। উনি পড়ে বললেন যে- ভালো হয়েছে। ওটা করার পর বেশ নাম হলো। এই যে নাটক লেখা, এটা কিন্তু আমার এসেছে একটা শ্রদ্ধার জায়গা থেকে। সেটা হলোÑ যখন যাত্রা বা থিয়েটার দেখতাম ছোটবেলায়। তখন আমি কিন্তু ভাবতাম যে, এই পুরো ব্যাপারটার পেছনে নিশ্চয়ই একজন মানুষ আছে যিনি এটা লিখেছেন। তার মানে উনি তো দারুণ ক্ষমতাবান! সেখান থেকেই আমি লেখার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ হই। তারপর থেকে নাটক নিয়ে পড়াশোনা করতে থাকি।
হ মঞ্চ শুরু নিয়ে আমার একটা স্মৃতি আছে। পলিটেকনিক-এর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে ভর্তি হতে গেলাম, কিন্তু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যার বললেন- কোনো পার্টটাইম স্টুডেন্টের কাজ না ইংরেজি পড়া…। তখন আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ভর্তি হলাম। ডিসকনটিনিউ করে পরে পাস করলাম। পড়ালেখাটা ততদিনে গৌণ বিষয় হয়ে গেছে। খুঁজতে লাগলাম, কোথাও নাটক করা যায় কি না। তখন শুনলাম আসকার ইবনে শাইখ মঞ্চনাটক করেন। ওনার পেছন পেছন ঘুরতে লাগলাম। উনি তখন নাটক লিখেন, ডিরেকশন দেন আমি তার এসিসটেন্ট হিসেবে কাজ শুরু করি।
হ আড্ডা নিয়ে বেশ স্মৃতি রয়েছে আমার। কিছু মানুষের মুখ কোনোদিনও ভুলবো না। নির্মলেন্দু গুণ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবুল হাসান, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এদের প্রত্যেকের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিন নিউমার্কেটের কর্নারে আড্ডা হতো। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের পেছনে পেছনেও তখন ঘুরেছি। প্রতিদিন তাদের সঙ্গে আড্ডা দেয়ার পর রাতে ‘ক্যাফে ডি তাজে’র ওখানে একটা গাঁজার আসর বসতো, সেখানেও বসা হতো। সেই সময় সিনেমার সঙ্গে একটা যোগাযোগ ঘটে যায়। সুজেয় শ্যাম, সমর দা, রাজা হোসেন খান, সামাদভাই, রোজী সামাদ, জহির রায়হান এদের সঙ্গেও যোগাযোগ হয়, আড্ডা হতো নিয়মিত। আজো মনে পড়ে সেই দিনগুলোর কথা। কত জীবন্ত ও প্রাণবন্ত ছিল সেইসব দিন!
হ আরণ্যক নাট্যদল গঠন নিয়ে স্মৃতির কথাও উল্লেখ করতে হয়। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে ১ ফেব্রæয়ারিতেই আরণ্যক নাট্যদল গঠন করি এবং ১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রæয়ারি ‘কবর’ নাটকটি আমার নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয়। সেখানে আলী যাকেরও অভিনয় করেছিল। আরণ্যক নাট্যদলের নামটি দিয়েছিল আবদুল্লাহ আল মামুন। টেলিভিশনে বসে তার সঙ্গে কথা হচ্ছিল- একটা নাটকের দল করবো, কী নাম দেয়া যায়? আবদুল্লাহ আল-মামুন বললেন- ‘নাগরিক’ তো আছেই, তোমরা আরণ্যক হয়ে যাও। ব্যস, তারপরই নাম দিলাম ‘আরণ্যক নাট্যদল’।