তুষারের স্থাপত্য ভাবনা

তুষারের স্থাপত্য ভাবনা

918
SHARE

মোহাম্মদ তারেক: পৌষের এক সন্ধ্যায় আমরা গিয়েছিলাম ‘পার্পল ইন্টেরিয়রস’ নামের একটি কনসালটেন্সি ফার্মে। রুমে ঢুকেই দেখা হলো আর্কিটেক্ট ইয়াসির এ তুষারের সাথে। সে সময় তিনি গিটার হাতে নিয়ে একটি গানের কর্ড বাজাচ্ছিলেন। এরপর তুষার একে একে গেয়ে শোনান শিরোনামহীন ব্যান্ডের ‘একা’, ‘ক্যাফেটরিয়া’ ও ‘দ্বিতীয় জীবন’ গানগুলো। গানের কথা ও সুর তার নিজের। স্থপতির বাইরে তার আরেকটি বড় পরিচয় হচ্ছে তিনি শিরোনামহীন ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। একযুগ ধরে ব্যান্ডের লিড গিটারিস্ট, সং রাইটার, কম্পোজার হিসেবে কাজ করেছেন। নিজের প্রতিষ্ঠানের ব্যসত্মতার কারণে এখন আর ব্যান্ডের সাথে সেভাবে সময় দিতে পারছেন না। কিন্তু মিউজিকের সাথেই রয়েছেন। তাইতো নিজের বাড়ির একটি রুমে মিউজিক স্টুডিও বানিয়ে ফেলেছেন। অবসর পেলেই এখানে মিউজিক নিয়ে বসে যান স্থপতি তুষার। চার ভাই-বোনের মধ্যে তুষার সবার ছোট। তার গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালি। কিন্তু তার জন্ম বেড়ে ওঠা মগবাজারের টিএন্ডটি কলোনিতে। তুষারের বাবার নাম মো: ইসমাইল। তিনি টিএন্ডটির পরিচালক ছিলেন। মা আইনুন নাহার গৃহিণী। স্কুলজীবন থেকেই তুষার ছবি আঁকাআঁকি করতেন। গিটার বাজানো আর লেখালেখি ছিল তার পছন্দের বিষয়। তবে ছবি আঁকার ঝোঁকটা ছিল অনেক বেশি। 1
6final_roselynছোটবেলা থেকেই তার ইচ্ছে ছিল আর্কিটেক্ট হওয়ার। ড্রইংচর্চা করতে করতে আজকে তিনি হয়েছেন একজন সফল স্থপতি। পাশাপাশি তিনি একজন জনপ্রিয় গিটারিস্ট। নজরুল শিক্ষালয় থেকে এসএসসি পাস করেন ১৯৯৬ সালে। ১৯৯৮ সালে নটরডেম কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে। তার সহপাঠী বন্ধুদের মধ্যে আছেন স্থপতি সমীন ও আবদাল। প্রিয় শিক্ষকের তালিকায় আছেন স্থপতি নিজাম, খায়রুল ও আমিন স্যার। স্থপতি ইয়াসির এ তুষার বুয়েট থেকে ব্যাচেলর অব আর্কিটেকচার ডিগ্রি লাভ করেন ২০০৪ সালে। পাস করে বের হওয়ার পরই যোগ দেন স্থপতি রাশেদ ইকবালের ‘আর এস এ’ নামের একটি কনসালটেন্সি ফার্মে। সেখানে তিনি দুই বছর চাকরি করেন। তারপর ২০০৬ সালে নিজে গড়ে তোলেন ‘পার্পল ইন্টেরিয়রস’ নামের একটি কনসালটেন্সি ফার্ম। বর্তমানে তুষার এই ফার্মের কর্ণধার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মগবাজারে খুব সুন্দর একটি অফিস সাজিয়েছেন। তার প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞ স্থপতিসহ মোট ১৫ জন কর্মী কাজ করছেন। ইতিমধ্যে তুষার দেশের নামকরা ব্যাংক, হাসপাতাল, ইউনিভার্সিটি, ক্লাব, শোরুম, অফিস বিল্ডিং, কমার্শিয়াল টাওয়ার সহ অসংখ্য বিল্ডিংয়ের ডিজাইন ও ইন্টেরিয়র করেছেন। তার উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাংলাদেশ নেভীর ১৫ তলা হাজী মহসীন কমপ্লেক্স, বনানীর নৌ-সদর দপ্তরের বিএন লেডিস ক্লাব, মিরপুর-১৪ এর বিএন নোঙ্গর কমপ্লেক্স, মিরপুর-১২ এর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি, উত্তরার ডিবিএইচ- এর ব্রাঞ্চ অফিস, কুর্মিটোলার বাংলাদেশ এয়ারফোর্সের লাউঞ্জ, কাওরান বাজারের রবিনট্রেক্স কর্পোরেট অফিস, উত্তরার ভেনচুড়া প্রপার্টিজ লিমিটেডের ভেনচুড়া মিরাবেলী, ভেনচূড়া এল ভিরা, ভেনচুড়া থিয়েরা, ভেনটেজ এভেনস হোমস, মালিবাগের ভেনটেজ সানডিউ, বারিধারার উত্তরণ স্বর্ণলতা অ্যাপার্টমেন্ট, চট্টগ্রাম ও কাকরাইলের গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স অফিস, জিগাতলার বর্ডারগার্ড বাংলাদেশ হসপিটাল, বারিধারার উত্তরণ স্বর্ণসিরিশ, উত্তরার উত্তরণ এনজেলিক, ডেল্টা ব্রাক হাউজিং কর্পোরেট অফিসের ইন্টেরিয়র, সেন্ট্রাল রোডের এনা প্রপার্টিজের এনা গ্যালারিয়া অ্যাপার্টমেন্ট, মালিবাগের মালিবাগ স্কয়ার কমার্শিয়াল বিল্ডিং, প্রগতি স্মরণীর আনোয়ার ল্যান্ড মার্ক, আওলাদ হোসেন মার্কেটের র্যাংগস ভবনের ইন্টেরিয়র, মতিঝিলের মার্কেন্টাইল ব্যাংক হেড অফিসের ইন্টেরিয়র, সিলেটের মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ইন্টেরিয়র, মিরপুর ব্র্যাঞ্চের পূবালী ব্যাংকের ইন্টেরিয়র, নারায়ণগঞ্জ ব্রাঞ্চের পূবালী ব্যাংকের ইন্টেরিয়র, উত্তরার চৈতি গ্রুপ অফিসের ইন্টেরিয়র, মতিঝিলের স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক হেড অফিসের ইন্টেরিয়র, গুলশান-২ এর মেঘনা ইন্স্যুরেন্স হেড অফিসের ইন্টেরিয়র, গুলশান লিংক রোডের হুন্দাই অফিসের ইন্টেরিয়র, মগবাজারের এইউএন মাদরাস কমপ্লেক্স, গুলশানের মার্সিডিজ বেঞ্জ কার শো রুমের আউটলেট, কাজীপাড়া, উত্তরা ও এলিফেন্টে রোডের ভিনটেজ ডেভলপমেন্ট লিমিটেডের অ্যাপার্টমেন্ট, চিটাগং- এর কেএসআরএম লিমিটেডের ইন্টেরিয়রসহ অসংখ্য বিল্ডিংয়ের ডিজাইন ও ইন্টেরিয়র করেছেন। এছাড়া বর্তমানে বেশ কিছু নতুন প্রজেক্টের কাজ করছেন ইয়াসির এ তুষার। তুষার তার সব ধরনের কাজ স্থাপত্যনীতি ও রাজউকের নিয়ম মেনেই করেন। ২০০৯ সালে তিনি বিয়ে করেন। স্ত্রীর নাম সাদিয়া ইয়াসির। এই দম্পতি দুই কন্যা সনত্মানের জনক-জননী। স্থপতি তুষার বলেন, আমি চেষ্টা করি ক্লায়েন্টের চিনত্মার সঙ্গে যতটুকু সম্ভব মিলিয়ে ডিজাইন করে দেয়া। পর্যাপ্ত আলো বাতাসের সঞ্চালন হয় সেই বিষয়গুলো প্রাধান্য দিয়েই যতটুকু পারি ইন্টেরিয়র ডিজাইন করে থাকি। ইন্টেরিয়র ফার্নিচার এবং ফিকচার যেন অ্যাপার্টমেন্টের আয়তন অনুযায়ী হয় তা প্রাধান্য দেই। সে জন্য বেশির ভাগ সময়ই বাজারের ফার্নিচার থেকে আমরা কাস্টমাইজড ফার্নিচারের দিকে জোর দিয়ে থাকি। আমি মূলত মডার্ন ইন্টেরিয়রের ধারায় কাজ করি। এছাড়াও খুব অল্প পরিসরে ভিক্টোরিয়ান ইন্টেরিয়রও কাজ করা হয়। বাংলাদেশের আবহাওয়া, জলবায়ু, প্রকৃতিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিটি কাজে নজর দেন স্থপতি তুষার। এই স্থপতি তার কাজ সততা ও নিষ্ঠার সাথে করতে ভালোবাসেন। স্থাপত্য নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে স্থপতি তুষার বলেন, ইন্টেরিয়র ডিজাইন সম্পর্কে একটি মডার্ন কনস্পেট- এর ধারা তৈরি করার ইচ্ছে রয়েছে আমার। ইন্টেরিয়র, বিল্ডিং প্রজেক্টগুলোর বিল্ডিং মেটারিয়াল যাতে আরও আধুনিক এবং বিশ্বমানের করা যায় তা নিয়ে ভবিষ্যতে কাজ করতে চাই।