তারকার গোপন বিয়ে এবং লুকোচুরি গল্প

তারকার গোপন বিয়ে এবং লুকোচুরি গল্প

1964
SHARE
Shakib-apu

বিয়ে প্রতিটি মানুষের জীবনে সবচেয়ে মধুরতম সম্পর্কের নাম। একই সঙ্গে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও বটে। অথচ এই বিয়ে নিয়ে ঘটে কতই না লুকোচুরি খেলা। বিশেষ করে তারকাদের বেলায় বিয়ে নামক শব্দটি কখনও কখনও বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিয়ে করেও বলা হয় না বিয়ে করেছি। বরং বিয়ে নিয়ে শুরু হয় গোপনীয় খেলা। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের চলচ্চিত্রের সুপারস্টার শাকিব খান ও চিত্র নায়িকা অপু বিশ্বাসের বিয়ের খবর প্রকাশ হয়ে যাওয়ায় তারকাদের গোপন বিয়ে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এ নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন লিখেছেন আরিফ খান

দৃশ্যপট-১

সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত ঘটনা। যা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যায় মিডিয়া জগতে। পত্র-পত্রিকায়, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, কোথায় না ছিল এই ঝড়। যার রেশ পুরোপুরি কাটেনি এখনো। অন্তত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখনো তার রেশ রয়ে গেছে। এই ঝড় তোলা কাহিনীর নায়ক শাকিব খান। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এই সময়ের একমাত্র সুপারস্টার। যার আশেপাশে তো বটেই কাছা কাছিতে উচ্চারিত হয় না দ্বিতীয় কারও নাম। প্রায় এক যুগ ধরেই একাই বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন পুরো একটা ইন্ডাস্ট্রি যা এই দেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে অতীতে দেখা যায়নি বললেই চলে। রোমান্টিক আর অ্যাকশন দুই ধরনের ছবিতেই অপরিহার্য নায়ক হিসেবে এককভাবে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছেন শাকিব খান অনেকটা সময় ধরেই। এই অবস্থানে থেকেই যখন একঘেয়েমী উপস্থিতির কারণে দর্শক প্রিয়তা কমে যাচ্ছিল তখনই নতুন লুক নিয়ে শিকারি ছবিটির মাধ্যমে আবারো চলে আসেন আলোচনায় শীর্ষে। একই সঙ্গে পরিচিতি ও চাহিদা দুটোই অর্জন করেন ওপার বাংলাতেও। নতুন নতুন লুক নিয়ে ছবি করে যাচ্ছেন একের পর এক। যা ছবি মুক্তির আগেই আলোচনা তৈরি হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ঠিক এমনই সময়েই অনেকটা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতোই একটি টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে খবর এল তার বিয়ের ব্যাপারে। বিয়ের খবরটা নিয়ে আসেন তারই পর্দাজুটি অপু বিশ্বাস। যাকে বিয়ে করেছেন শাকিব। শুধু বিয়ে নয় সঙ্গে ৬ মাসের বাচ্চাও। আর এই বিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাও নয়। ঘটেছে নয় বছর আগে বলতে গেলে ক্যারিয়ারের শুরুতেই। শাকিব খান-এর মতো প্রবল জনপ্রিয় একজন তারকার বিয়ে করে নয় বছর গোপন রাখা সহজ কথা নয়। সহজ নয় বাচ্চার কথাও গোপন রাখা। কিন্তু সম্ভব হয়েছে সবই।

দৃশ্যপট-২

Shabnaz-Nayemতারকা মর্যাদায় একই মাপের না হলেও এমন দৃশ্যপটের অবতারনা করেছিলেন আরেক নায়কও। তিনি হচ্ছেন ইমন। প্রথমে মডেল এবং পরে ছোট পর্দায় অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পান। এরপর বড় পর্দায় নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। ঠিক সেই সময়েই তার বিয়ের কথা প্রকাশ করেছিল একটি শীর্ষস্থানীয় পাক্ষিক পত্রিকা। বিয়ের সমস্ত প্রমাণাদি সহই। ঘটনাটি বছর সাত/আট আগের। কিন্তু বিয়ের ব্যাপারটি তিনি স্বীকার করেননি। বরং একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক পত্রিকার সহযোগিতায় একটি কাউন্টার সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি বানোয়াট এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে উড়িয়ে দেন। ওই পাক্ষিক পত্রিকায় প্রমাণ স্বরূপ বিয়ের যে ছবি ছাপা হয়েছিল সেটা নিয়ে প্রশ্ন করলে ছবিগুলো একটি বিজ্ঞাপন চিত্রের স্টিল বলে চালিয়ে দেন। পরে বছর খানেক আগেই ওই দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমেই প্রকাশ করেন তার নয় বছরের বিবাহিত জীবন এবং তিনি দুই সন্তানের বাবা হওয়ার কথা। যা শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করে সেই পাক্ষিক পত্রিকার প্রকাশিত তথ্যের সত্যতা।

পিছনের দৃশ্যপট

omar-sani-mousumi-1এই দৃশ্যপট বর্তমান সময়ের। একটু পিছনে তাকালে দেখা যায় ঠিক আগের প্রজন্মের কিছু তারকাদের মধ্যেও বিয়ের ঘটনা গোপন করার প্রবণতা ছিল। সেই সময়ের জনপ্রিয় তারকা জুটি মৌসুমী-ওমর সানি’র প্রেমের ঘটনা হরহামেশাই পত্র-পত্রিকায় আসতো। শোনা যেত তাদের গোপন বিয়ের কথাও। কিন্তু এ বিষয়ে মুখ খুলতেন না তারা দু’জনের কেউই। কিন্তু হঠাৎ একটি পাঁচ তারকা হোটেলে বিয়ের কথা প্রকাশ করেন তারা। জাঁকজমক পূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে প্রকাশ্যে আসেন এই তারকা জুটি।

নায়ক ফেরদৌসও অনেকটা গোপনেই তার বিয়ের কাজটা সেরে ফেললেও দু/এক দিনের মধ্যেই তা প্রকাশ পেয়ে যায় এবং তিনি তা স্বীকার করেও নেন।

কেন এই গোপনীয়তা

একজন নায়ক বা নায়িকা তিনি হন সাধারণ মানুষের স্বপ্নের মানুষ। জনপ্রিয় নায়ক বা নায়িকাদের সাধারণ মানুষ তাদের স্বপ্নের পুরুষ বা নারী ভাবতেই পছন্দ করেন। কিন্তু সেই নায়ক বা নায়িকা যদি বিবাহিত হন তবে তাদেরকে স্বপ্নের পুরুষ বা নারী হিসেবে ভাবতে চান না সাধারণ মানুষ। এমনটাই ধারণা পোষণ করেন চলচ্চিত্রের কিছু মানুষ। ব্যাপারটা তারা ক্যারিয়ারের শুরুতেই ঢুকিয়ে দেন নায়ক-নায়িকাদের মাথায়। ফলে তারা এ ব্যাপারে দ্বিধাদ্ব›েদ্ব পরে যান। সে ক্ষেত্রে কেউ হয়তো চেষ্টা করেন যতদিন সম্ভব বিয়ে না করে থাকার অথবা বিয়ে করলেও তা গোপন রাখার। কিন্তু এমন দৃষ্টান্ত বা ঘটনা খুবই বিরল। আমাদের চলচ্চিত্র, কিংবা এই উপমহাদেশ অথবা সারাবিশ্বের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তা লক্ষ্য করলে দেখা যায় এটা শুধু একটা মীথ বা অপ্রচলিত সত্য। যা মুষ্টিমেয়ো কিছু তারকারা বহন করেন। এবং এটা তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেন কিছু লগ্নিকারক বা প্রযোজক।

বাস্তবতা কি বলে?

প্রথমেই তাকাই আমাদের নিজস্ব চলচ্চিত্র জগতে। যার যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৫৬ সালে ‘মুখ ও মুখোশ’ নামের একটি ছবির মাধ্যমে। এরপর কিছু সময়ের ব্যবধানে ষাট দশক থেকেই পুরোদমে শুরু হয় এদেশে চলচ্চিত্রের যাত্রা। তখন যে সব তারকা অভিনেতা-অভিনেত্রী এই শিশু চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন তাদের অধিকাংশ তারকাই ছিলেন বিবাহিত অথবা ক্যারিয়ারের শুরুতেই বিয়ে করেছেন। সুমিতা দেবী, খান আতাউর রহমান, আনোয়ার হোসেন, হাসান ইমাম, রওশন আরা, চিত্রা সিন্হা, সুলতানা জামানদের মতো খ্যাতিমান তারকাদের নাম বলা যায়। এই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথম সুপার স্টার এর তকমা যাঁর নামের পাশে যুক্ত হয় তিনি হলেন রহমান। যিনি ক্যারিয়ার শুরু করেন বিবাহিত নায়ক হিসেবেই। তাঁর সঙ্গে পর্দা জুটি হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন শবনম। তিনিও ক্যারিয়ারের শুরুতেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন জনপ্রিয় সুরকার ও সংগীতজ্ঞ রবিন ঘোষের সঙ্গে। দুর্ঘটনায় একটি পা হারানোর পরেও রহমান ও শবনম জুটি জনপ্রিয়তা ধরে রাখেন দীর্ঘ সময় ধরে। এরপরেই যে তারকা জুটির নাম বলা যায় তারা হলেন আজিম-সুজাতা। এই জুটির ছবি ‘রূপবান’ এর নাম বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সর্বাধিক ব্যবসা সফল ছবির ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এই জুটিই প্রথম তারকা জুটি যারা ব্যক্তিগত জীবনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তখন এই জুটির জনপ্রিয়তা বেশ তুঙ্গেই। কিন্তু ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে কোনো রাখ-ঢাক না করেই বেশ ঘটা করেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তাঁরা। তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় হোটেল শাহবাগ-এ আয়োজন করেন জাঁকজমক অনুষ্ঠানেরও। এই বিয়ের পর অনেকটা সময়ই তাদের তারকা দ্যুতির কমতি ছিল না।

তারপরেই বলতে হয় আরো দুটি নাম। যাঁরা আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের পথিকৃৎ, কিংবদন্তি রাজ্জাক এবং কবরী। রাজ্জাক যখন ক্যারিয়ার শুরু করেন তখন তিনি শুধু বিবাহিতই নন, ছিলেন এক সন্তানের জনকও। সেকথা জানান দিয়েই তিনি শুরু করেন তাঁর নায়ক জীবন। রোমান্টিক নায়ক হিসেবে সেই সময় তিনিই ছিলেন সবার শীর্ষে। তাঁর ছিল না কোনো বিকল্প। রোমান্টিক জুটি হিসেবে নির্ভর ছিলেন না কোনো একক নায়িকার উপর। যদিও রাজ্জাক-কবরী জুটির জনপ্রিয়তা ছিল প্রবল। কিন্তু পাশাপাশি সুচন্দা, সুজাতা, শাবানা, ববিতার মতো তারকার সঙ্গে জুটি গড়েও হয়েছেন প্রবল জনপ্রিয়। দর্শক প্রিয় হয়েছেন কবিতা এবং সুচরিতার সঙ্গেও জুটি বদ্ধ হয়ে। রোমান্টিক নায়ক থেকে অ্যাকশন হিরো এরপর কেন্দ্রীয় চরিত্র বা পরবর্তীতে পার্শ্বচরিত্রেও ধরে রেখেছেন নিজের জনপ্রিয়তা। জনপ্রিয় তারকা বা সুপারস্টার হিসেবেই শীর্ষেই নিজের আসন ধরে রেখেছেন কয়েক যুগ। এবং সেটা একজন বিবাহিত নায়ক হিসেবেই। খেতাব পেয়েছেন নায়করাজ-রাজ্জাক এর। রাজ্জাকের পরপরই যে নায়কের নাম আসে তিনি হলেন আলমগীর। তিনিও অন্যতম শীর্ষ নায়ক হিসেবে নিজের শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছেন রাজ্জাকের মতোই কয়েক যুগ এবং তিনিও ছিলেন ক্যারিয়ারের শুরুতেই বিবাহিত। এরপরের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ চলচ্চিত্রের ইতিহাসে প্রায় সব নায়কের নামই আসে এই তালিকায়। যারা বিবাহিত হয়েও ক্যারিয়ার গড়েন নিজেকে একটা শক্ত অবস্থান রেখেই নায়ক হিসেবে পাড়ি দিয়েছেন অনেকটা পথ। এই তালিকায় বুলবুল আহমেদ, সোহেল রানা, ফারুক, উজ্জল, জাফর ইকবাল, জসিম, ওয়াসিমের নাম উল্লেখযোগ্য। এই অভিনেতাদের অনেক পরে আসেন ইলিয়াস কাঞ্চন। তিনিও ক্যারিয়ারে শুরুতেই বিয়ে করেন। কিন্তু নায়ক হিসেবে গড়ে তোলেন শক্ত অবস্থান।

ব্যতিক্রম নন নায়িকারাও। বিবাহিত হয়েও রোমান্টিক নায়িকা হিসেবে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিলেন কবরী। বিশেষ করে রাজ্জাকের সঙ্গে জুটি হয়ে অভিনয় করেন একের পর এক ছবিতে যার প্রায় প্রতিটিই ব্যবসা সফল হয়। রাজ্জাক ছাড়াও বুলবুল আহমেদ ও ফারুকের সঙ্গেও জুটি হয়ে অভিনয় করেছেন অনেক ছবিতে যা ব্যবসা সফল হয়।

ক্যারিয়ারে শুরুতে বিবাহিত না হলেও ষাট ও সত্তর দশকের অসংখ্য ব্যবসা সফল ছবির নায়িকা শাবানা বিয়ে করেন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থেকেই। এবং বিয়ের পরেও প্রায় তিন দশক নিজের আসন ধরে রাখেন অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে থেকেই কিংবদন্তি হয়ে। জুটি গড়েন রাজ্জাক, আলমগীর, বুলবুল আহমেদ, ফারুক, জাফর ইকবাল, ওয়াসীম ও জসীমের সঙ্গে বেশ সাফল্যের সঙ্গেই। বিশেষ করে রাজ্জাক ও আলমগীরে সঙ্গে তার জুটির জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। কবরী এবং শাবানা শুধু বিবাহিতই নন তারা একাধিক সন্তানের মা হয়েও ক্যারিয়ার এগিয়ে নিয়ে যান সাফল্যের সঙ্গেই।

শাবানার পরেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেও বিয়ে করেন ববিতাও। এবং পরেও সমান দাপটেই নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যান প্রায় সব নায়কের সঙ্গে গড়ে তোলেন জুটি। তবে বেশি আলোচনায় আসেন রাজ্জাক ও জাফর ইকবালের সঙ্গে তাঁর ক্যারিয়ার জুটি গড়ে। ব্যক্তিগত জীবনে অনেক নায়কের সঙ্গেই তার প্রেম বা বিয়ের গুঞ্জন শোনা গেলেও একমাত্র জাফর ইকবালের সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্কের সত্যতা ছিল। যদিও বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়নি তাদের সম্পর্ক।

ববিতার বোন হিসেবে পরিচিতি ছিল চম্পার। ববিতার আগেই বিয়ে হয় তার। বিয়ের পর প্রথমে ছোট পর্দায় পরে চলচ্চিত্রে সফল ক্যারিয়ার গড়ে তোলেন চম্পা। ইলিয়াস কাঞ্চন এবং জাফর ইকবালের সঙ্গে জুটিবদ্ধ হন। কাজ করেন মান্নার সঙ্গেও। প্রায় দুই যুগের সফল ক্যারিয়ার তার।

পরের প্রজন্ম

এর পরবর্তী প্রজন্মের তালিকাও ব্যতিক্রম নয়। এফডিসির নতুন মুখের সন্ধানে কার্যক্রমের মাধ্যমে আসা মান্না-শেলী কাদের, সোহল চৌধুরী-দিতি, ক্যারিয়ারের শুরুতেই বিয়ের বন্ধনে জড়িয়ে যান। এরমধ্যে মান্না এবং দিতি নিজেদের অন্যতম শীর্ষ অবস্থানেই নিয়ে যেতে পেরেছেন। বিশেষ করে মান্না তার প্রজন্মে বলা যায় মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শীর্ষ অবস্থানেই ছিলেন।

Indiaনব্বই দশকের শুরুতেই একটি মাত্র ছবি ‘চাঁদনী’ দিয়েই ঝড় তোলেন শাবনাজ-নাঈম জুটি। অভিনয় করেন বেশ কয়েকটি ব্যবসা সফল ছবিতে। পরবর্তীতে ব্যক্তিগত জীবনে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যান তারা। এরপর বিয়ে। প্রেমের বিষয়টি অস্বীকার করলেও বিয়ে করেন সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েই। বিয়ের আগেই পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরতে অনেকটা স্বেচ্ছাতেই চলচ্চিত্র থেকে নিজেকে ক্রমশ: গুটিয়ে নিচ্ছেলেন নাঈম। তবে শাবনাজ বিয়ের পর ইলিয়াস কাঞ্চন, সালমান শাহ, বাপ্পারাজের সঙ্গে জুটি হয়ে বেশ কয়েকটি সফল ছবি করেন। পরে তিনিও স্বেচ্ছায় বিদায় নেন ছবির জগৎ থেকে।

এবং সালমান শাহ্

নায়ক রাজ রাজ্জাকের পর বিশাল ব্যবধানে হার্ট থ্রব নায়ক হিসেবে প্রথম ছবির মধ্যে দিয়েই নিজের আসন পোক্ত করে নেন সালমান শাহ্। নব্বই দশকের শুরুতেই শাবনাজ-নাঈমের পরেই সালমান শাহ্-মৌসুমী জুটির আবির্ভাব ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির মাধ্যমে। প্রথম ছবির ব্যবসায়িক সাফল্যে আর তাদের পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। বিশেষ করে সালমান শাহর কথা উল্লেখযোগ্য। প্রথমে মৌসুমী ও পরে শাবনূরের সঙ্গে জুটি হয়ে একের পর এক ব্যবসা সফল ছবি করে বনে যান হার্ট থ্রব তারকা। অথচ অসংখ্য তরুণীর হার্ট থ্রব এই ক্ষণজন্মা নায়কও ক্যারিয়ারের শুরুতেই ছিলেন বিবাহিত। এই বিবাহিত নায়কের জন্যই আত্মহত্যা করেছিলেন বেশ কয়েকজন তরুণী তার মৃত্যুর সংবাদে।

জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থেকেই বিয়ে করেন সফল পর্দাজুটি মৌসুমী ও ওমরসানি। তবে বিয়ের কথা গোপন রেখেছিলেন বেশ কিছুদিন। কিন্তু বিয়ের কথা প্রকাশের পর ক্যারিয়ারে সমস্যা হয়নি তাদের। ওমর সানি কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও মৌসুমীর ক্যারিয়ার এগিয়ে যায় অন্যতম শীর্ষ নায়িকা হিসেবেই। এখনো একটা শক্ত অবস্থান নিয়েই অভিনয় আর মডেলিং করে যাচ্ছেন নিয়মিত।

শুধু আমাদের চলচ্চিত্রে নয়, এই উপমহাদেশে এমনকি হলিউডে তথা বিশ্বচলচ্চিত্র মাধ্যমের কোথাও এমন নজির আছে বলে জানা নেই যে, বিয়ে করলে ক্যারিয়ারের ক্ষতি হয় বিধায় বিয়ের কথা গোপন রেখে ক্যারিয়ার এগিয়ে নিয়ে গেছে। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে তাকালেও একই চিত্র দেখা যায়। সেখানেও বিয়ে বা ব্যক্তিগত জীবনকে ক্যারিয়ারের প্রতিবন্ধক ভাবা হয়নি।

বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক খেতাব প্রাপ্ত উত্তম কুমার কত লক্ষ কোটি তরুণীর স্বপ্নের নায়ক এবং কত তরুণের আইডল ছিলেন তার কোনো হিসেবে নিকেশ মিলানো যাবে না। অথচ এই মহানায়কের ক্যারিয়ার শুরু বিবাহিত হয়েই। অমিতাভ বচ্চন বিয়ে করেন ক্যারিয়ারের শুরুতেই আরেক জনপ্রিয় নায়িকা জয়া ভাদুরীকে। সেই অমিতাভ প্রায় পাঁচ দশক ধরেই বিশ্বের অন্যতম বড় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির এক নম্বর আসনে অধিষ্ঠিত হয়েই ক্যারিয়ার পার করে দিলেন। শুধু অমিতাভ নন ভারতীয় চলচ্চিত্রে যুগ যুগ ধরে প্রায় সব পুরুষ তারকাই এমন দৃষ্টান্তের অধিকারী। বর্তমানে যে তিন খানের উপর গোটা ইন্ডাস্ট্রির অনেকটাই নির্ভর তাদের দু’জন আমীর খান ও শাহরুখ খান বিয়ে করেই ক্যারিয়ার শুরু করেন। হৃত্বিক রোশন বিয়ের পর ক্যারিয়ার শুরু করে প্রথম ছবিতেই ঝড় তোলেন ব্যবসায়িক সফলতায়। যার ধারাবাহিকতার কমতি নেই এখন পর্যন্ত।

তবে এই দৃষ্টান্তে বাংলাদেশের নায়িকাদের তুলনায় পিছিয়ে আছেন বলিউডের নায়িকারা। বাংলাদেশের প্রায় সব নায়িকার ক্যারিয়ার বিয়ের পরেও শক্ত অবস্থানে থাকলেও বলিউডের নায়িকাদের বিয়ের পর ক্যারিয়ার থেমে যাওয়ার ঘটনা বেশি।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি হলিউডেও বিয়েকে ক্যারিয়ারের অন্তরায় বা প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা যায়নি। এমন উদাহরণে আছে অসংখ্য নাম। অ্যানে হাথওয়ে- অ্যাডম শল ম্যান, রিজ উইয়ার স্পুন-জিম টথ, ডেভিড ব্যাকহাম- ভিক্টোরিয়া ব্যাকহাম। উইল স্মিথ-জেডা পিঙ্কেট স্মিথ, সারাহ জেসিকা পারকর-ম্যাথিউ ব্রডরিক, মেরিল স্ট্রীপ-ডন গামার, অ্যাস্টন কুচার-মিলা কুনিস, টম হ্যাংকস-রিটা উইলসন। হিউ জ্যাকম্যান- ডেবোরা লী ফারনেস, বেন স্টিলার-ক্রিস্টান ওইলর, সিনডি ক্সফার্ড-রানডে গ্যারবার এর নাম উল্লেখযোগ্য।

এক ছাদের নীচে দুই তারকা

বিয়ের পর তারকার ক্যারিয়ারে কোনো প্রভাব পরে না। এটার যেমন সত্যতা আছে তেমনি এক ছাদের নীচে দুই তারকার বসবাস সম্ভব না এটার বাস্তবতার উদারহরণও কম নয়। এই বাস্তবতা মেনেই হয়তো শাকিব খান তার স্ত্রী অপু বিশ্বাস আর অভিনয় করুক সেটা চাচ্ছেন না। নিজের বিয়ে নিয়ে কোনো এক সাক্ষাৎকারে শাকিব তার লাইফ পার্টনার হিসেবে একজন ঘরোয়া মেয়েকেই চেয়েছেন। যিনি তাকে তার সন্তানকে এবং তার সংসারকে গভীর মমতা আর ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখবেন। শাকিব নিশ্চয়ই তার এই চাওয়াটা মাথায় রেখেই অপু বিশ্বাসকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। হয়তো ব্যাপারটা নিয়ে অপুর সঙ্গে আলোচনাও করেছেন। এবং নিশ্চয়ই একটা সিদ্ধান্তে এসেই তারা বিয়ে পর্যন্ত এগিয়ে গেছেন। এরপর কি হয়েছিল, কি হয়েছে এবং সামনে কি হবে তা একান্তই এই দম্পতির সিদ্ধান্ত। এমন সিদ্ধান্ত নিয়েই হয়তো আমরা দেখেছি অনেক তারকা জুটিকে ব্যক্তিগত জীবনে এসে একজনকে স্যাক্রিফাইসের সিদ্ধান্তে আসতে। অমিতাভ বচ্চন এবং জয়া ভাদুরী যখন বিয়ে করেন তখন দু’জনই ছিলেন তুমুল জনপ্রিয় তারকা। বিয়ের পর সরে আসতে হয়েছে জয়া ভাদুরীকে। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থেকেই কাজল বিয়ে করেন অজয় দেবগনকে। স্যাক্রিফাইস করেন নিজের সফল ক্যারিয়ার। তবে সংসার জীবন থেকে খানিকটা সময় নিয়ে যখনই তিনি ছবি করেছেন সফলতা পেয়েছেন। অক্ষয় কুমারকে বিয়ে করে টুইঙ্কেল খান্নাকে বিসর্জন দিতে হয়েছে ক্যারিয়ার। এমন উদাহরণ আরো আছে বলিউডে। ঋষি কাপুর-নিতু সিং, রনধীর কাপুর-ববিতাসহ আরো অনেকেই আছেন এই তালিকায়। আবার ব্যতিক্রমও আছেন। ধর্মেন্দ্রকে বিয়ে করেও হেমা মালিনী এবং রাজেশ খান্নাকে বিয়ে করে ডিম্পল কাপাডিয়াও বেশ নিয়মিতই অভিনয় করে গেছেন। হয়তো এই ধারাবাহিকতায় ক্যারিয়ার এগিয়ে নিয়ে যাবেন হালের ক্রেজ কারিনা কাপুরও।

ভিন্ন চিত্র টিভি মাধ্যমে

Starচলচ্চিত্রে তারকা দম্পতির এক সঙ্গে ক্যারিয়ার গড়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত তেমন অর্থে না থাকলেও ছোট পর্দায় চিত্র একেবারেই ভিন্ন। সেই ষাট দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময়েও এমন তারকা জুটির সংখ্যা নেহায়েত কম নয় যারা ব্যক্তিগত জীবনে বিয়ের বন্ধনে আবন্ধ হয়েও ক্যারিয়ার এগিয়ে নিয়ে গেছেন সমান তালেই। এবং তারা সেটা করেছেন সংসার সন্তানকে যতটুকু সময় দেয়া দরকার সেটা করেই। হাসান ইমাম-লায়লা হাসান দম্পতি হলেন সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তাদের দাম্পত্য জীবনের অর্ধশত বছর পার করে দিলেন বেশ সফল্যের সঙ্গেই তাদের সংসার এবং ক্যারিয়ার ঠিক রেখেই। এমন দৃষ্টান্তে অনেক নাম আসবে সেই সময় থেকে এই সময় পর্যন্ত। আলী যাকের-সারা যাকের, ইনামুল হক-লাকী ইনাম, রহমত আলী-ওয়াহিদা মল্লিক জলি, তৌকীর-বিপাশা, জাহিদ-মৌ, কিংবা হালের অনেক তারকা জুটির নাম বলা যায় এই তালিকায়। যারা একই সঙ্গে সংসার ঠিক রেখে নিজ নিজ ক্যারিয়ার এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সফল ভাবে।

দর্শক যা বলেন

তারকাদের বিয়ে এবং ব্যক্তিগত জীবনে খুব বেশি নোংরামী না থাকলে এই নিয়ে মাথা ঘামান না দর্শকরা। বিভিন্ন বয়সের দর্শকের সঙ্গে কথা বলে এমনটা মতামতই পাওয়া গেছে বেশি। তারা বলেন, তারকারাও রক্তে মাংসে গড়া মানুষ। তাদেরও আবেগ আছে, আছে অনুভ‚তি। এক সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে বন্ধুত্ব হবে। সখ্যতা হবে, বিয়ে হবে। এটা অস্বাভাবিক না। তবে এর মাঝে সততা থাকাটাই জরুরি।

একটি সরকারি স্কুলের অবসর প্রাপ্ত শিক্ষিকা জেবুন্নেসা শরীফ বলেন, তিনি উত্তম কুমার এবং রাজ্জাকের মহা ভক্ত ছিলেন। তখন তিনি কৈশোর উত্তীর্ণ বয়সে। এই দুই তারকার এমন কোনো ছবি নেই যা তিনি দেখেন নাই। উত্তম-সুচিত্রা, রাজ্জাক-কবরী, এবং রাজ্জাক-শাবানার ছবি তিনি দেখতেনই। বলতে গেলে উত্তম কুমার এবং রাজ্জাক ছিলেন তার স্বপ্নপুরুষ। এখানে তারা বিবাহিত কি অবিবাহিত এটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না কখনোই। এই তারকারা নিজেদের এতটাই বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করতেন যে তখন তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে ভাবার অবকাশ থাকতো না। একই কথা বললেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম। তিনি ছিলেন সুচিত্রা সেন কবরী আর শাবানা’র ভক্ত। বিশেষ করে সুচিত্রা ছিলেন তার স্বপ্নের নায়িকা। জেবুন্নেসা শরীফের কথায় একমত পোষণ করে তিনিও বলেন, পর্দায় এসব তারকাদের বিশ্বাসযোগ্য অভিনয়ের কথা।

স্থাপত্য কলার ছাত্রী অরনী বলেন, আমি শাহরুখ খান ও হৃত্বিক রোশনের ফ্যান। তাদের সব ছবিই দেখি। তাদের ছবি দেখার জন্য কলকাতাতেও গেছি। কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কোনো মাথা ব্যথা নেই আমার। তবে হৃত্বিকের সঙ্গে সুজানার বিচ্ছেদটা কষ্ট দিয়েছে আমাকে। শাকিব খানের ভক্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অনুরূপ চ্যাটার্জী বলেন, আমি শাকিব খানকে খুব পছন্দ করি। তার নাচ, অভিনয় আমাকে মুগ্ধ করে। উনি পর্দায় কি দেখালেন সেটাই আমাদের কাছে মুখ্য। তিনি অপু বিশ্বাসকে বিয়ে করেছেন। তিনি ফুটফুটে একটি ছেলের বাবা এটা ভক্ত হিসেবে আমাদের ভালো লাগারই কথা। কিন্তু এই বিয়ে নিয়ে গোপনীয়তা, নাটকীয়তা আমার ভালো লাগেনি। যদিও এখন সবকিছু সুন্দর ভাবে সামলে নিয়ে আমাদের স্বস্তি দিয়েছেন। এখন আমাদের একটাই চাওয়া শাকিব যেন তার ক্যারিয়ারের মতোই সংসার জীবনকে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যান। অনেকটা একই সুরে কথা বলেছেন আরো বেশ কয়েকজন শাকিব ভক্ত।

তাহাদের কথা

বিয়ে কি তারকার ক্যারিয়ারে প্রভাব ফেলে এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে প্রথমেই নায়ক রাজ রাজ্জাক প্রশ্ন করেন, আজকের জামানায় স্টার কোথায়? আমি যদি সেই অর্থেই স্টার হই তাহলে পুরো ইন্ডাস্ট্রি আমার পিছনে যাবে। আমি ল্যাংড়া বা খোড়া হই, বিবাহিত হলাম না অবিবাহিত সেটা মুখ্য হয়ে দাঁড়াবে না। এখানে মুখ্য হবে আমার হিরোইজম। আমার সিনসিয়ারিটি। আমি সাধারণ হাইটের মানুষ। খুব উচ্চতা আমার নেই। চেহারাও আর আট দশটা বাঙালির মতোই সাধারণ। তারপরও স্টার হয়েছি সেরা কাজকে ভালোবেসে। আমাদের প্রেম ছিল নাটক আর সিনেমা, সংসার-বিয়ে যেখানে থাকার সেখানেই ছিল। কাজের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না। সন্তান সংসার ছিল সবার উপরে। কাজের জায়গায় কাজ।

এই উপমহাদেশে সবচেয়ে বড় তারকা ছিলেন উত্তম কুমার। প্রথম জীবনে তিনি কেরানির চাকির করতেন। এই অবস্থাতেই বিয়ে করেছেন। তারপরে এসেছেন সিনেমায়। সেখান থেকে তিনি যে অবস্থান তৈরি করেছিলেন মৃত্যুর ৩০ বছর পরেও সে শূন্যতা পূরণ হয়নি। তারাই প্রকৃত স্টার। স্টার ছিলেন রহমান। আমি স্টার হয়েছি। এবং সেটা আমার কাজ দিয়ে। যখন অভিনয় শুরু করি তখন এফডিসিতে ফ্লোর ছিল একটি পরে সেটা বারোতে গিয়ে দাঁড়ায়। সিনেমা হল ছিল ৩০০টি, পরে হয় ১২০০টি। এসব আমাদেরই স্টারিজমের ফসল। আজ এফডিসিতে কাজ হয় না। ফ্লোর বেশির ভাগ সময় থাকে ফাঁকা। সিনেমা হলও ক্রমশ কমে যাচ্ছে। কেন এমন হচ্ছে? আমি যখন ৩/৪দিনের জন্য আউটডোর শুটিং এ যেতাম পরিচালকদের মাথায় বাজ পড়তো। কি হবে এফডিসির কাজের? প্রায় প্রতিটি ফ্লোর আমার কোনো না কোনো ছবির কাজ চলছে। কি হবে এসব ছবির? মাত্র ৩/৪ দিনেই এই অবস্থা হত। এখনতো দেখি মাসের পর মাস বিদেশে থাকে শিল্পীরা। একজন, দুইজন নয় এক সঙ্গে দশ বারোজন নায়িকার সঙ্গে কাজ করেছি। সবার সঙ্গেই ছিল ভালো বন্ধুত্ব। আন্ডারস্টেডিং ছিল ভালো। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ছিল, সম্মান ছিল। তাই আমাদের কোনো সমস্যা হত না। আমাদের গডফাদার ছিল ফাদারের মতোই। গড ব্রাদার হয় নাই। আমাদের গডফাদার পিতৃস্নেহেই যতœ করে শিল্পী তৈরি করেছেন। ব্যক্তিগত আকর্ষণ ছিল না। আমরা কাজ করেছি জহির রায়হান, কাজি জহিরদের মতো পরিচালকের সঙ্গে। কাজেই আমাদের পথচলা ছিল সেরকমই। কাজই ছিল আমাদের প্রেম। তাই বিয়ে, সংসার সন্তান আর কাজের মধ্যে কোনো দ্ব›দ্ব থাকার সুযোগ তৈরি হয়নি।

Razzakশাকিব অপু প্রসঙ্গে রাজ্জাক বলেন, এফডিসিতে আমার রক্ত মিশে আছে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতি আমার দায়িত্ব অনেক। আদরের সুরে তিনি বলেন, সেখানে যদি আমার কখনো শাকিব-অপুর সঙ্গে দেখা হয় আমি ওদেরকে ডেকে মারবো। বিয়ে সন্তান নিয়ে এটা কেমন খেলা? অনেকটা পিতৃস্নেহেই কথাগুলো বলেন নায়ক রাজ রাজ্জাক।

এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কবরী বলেন, এসবের জন্য দায়ী সময় এবং বর্তমান সামাজিক ব্যবস্থা। আমাদের সময় তে রক্ষণশীলতা ছিল সেটা কি এখন আর কোনো ক্ষেত্রে আছে? রাজনীতি, সমাজনীতি, শিক্ষানীতি, অর্থনীতি, আচার-আচরণ কোথাও কি সৎ ব্যবস্থা আছে? সব জায়গায় আমরা একটা লুকোচুরি খেলছি। সিনেমা তো তার থেকে আলাদা নয়। সিনেমাতো এই রাষ্ট্র এই সমাজেরই অংশ। সুতরাং রাষ্ট্র বা সমাজে যা ঘটবে তার প্রভাবতো এখানেও পড়বে। আমাদের সময় আমরা যেভাবে কাজ করেছি আমাদের অগ্রজ যারা ছিলেন তাদের অনুসরণ করেছি বলেই আজ আমাদের অবস্থানটা অন্যরকম ভাবে গড়ে তুলতে পেরেছি। আমাদের সময় ছিলেন খান আতাউর রহমান, জহির রায়হান, কাজী জহির, নারায়ণ ঘোষ মিতার মতো পরিচালক। তাদের হাত ধরে আমরা চলেছি। তাই আমাদের স্কুলিংও ছিল সেরকম। এই স্কুলিং কি শাকিব-অপুরা পাচ্ছে? যদি পেত তাহলে এমন পরিণত বয়সে এসে তারা এমন কাজ করতো না। প্রেম বিয়ে অন্যায় কিছুতো না। সিম্পল একটা অ্যাকুয়েশন করেই তারা এগোতে পারতো। কিন্তু সেটা তারা করেনি বা করতে পারেনি। কারণ ওই একটাই। আমাদের সমাজ ব্যবস্থা। আমি বলবো শাকিব অপুর দোষ নেই। তারা সামাজিক অবক্ষয়ের প্রশ্রয়ের স্বীকার। আমি কবরী ১৩ বছর বয়সে ইন্ডাস্ট্রিতে এসেছি। সেই ছোট্ট একটা মেয়ে থেকে সাংসদ পর্যন্ত হয়েছি। এটা আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটা দৃষ্টান্ত। নতুন জেনারেশন যেন তাদের পথ চলায় এই ভাবনাটা মাথায় রাখে। চাইলেই সম্মানের সঙ্গেই অনেক দূর যাওয়া যায়।

এ প্রসঙ্গে অভিনেতা আলমগীর বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমি একটা কথাই বলবো। এটা যার যার একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। কে তার বিয়ের কথা প্রকাশ করবে বা কে গোপনে সংসার করবে এটা প্রত্যেকটা মানুষেরই নিজস্ব ব্যাপার। এটা নিয়ে এর বেশি কিছু বলার নেই।

নব্বই দশকে জনপ্রিয় অভিনেত্রী শাবনাজ বলেন, তারকা খ্যাতি যখন শীর্ষে তখন দু’জন তারকার প্রেম হলে সেটা গোপন করা হয়েই থাকে। এটা অনেকটা ওপেন সিক্রেটের মতোই। অনেকে জেনেও মুখটিপে হাসেন কিন্তু প্রকাশ্যে খুব বেশি কথা হতো না। কিন্তু বিয়ের পর সেটা গোপন করা। সন্তানের বাবা-মা হওয়ার পরেও সেটা প্রকাশ না করা সত্যিই অভাবনীয়। হয়তো ক্যারিয়ারের কথা ভেবে সবার সঙ্গে আলোচনা করে বছর দুই/এক গোপন রাখা যায়। কিন্তু নয় বছর গোপন রাখা এটা খুব একটা মেনে নেয়ার মতো না। আমার আর নাঈমের প্রেম পর্বটি গোপন থাকলেও আমরা বিয়েটা করি জানান দিয়েই। শুধু তাই নয় আমাদের বিয়ের সময় হাতে গোনা কয়েকজন কাছের আত্মীয়-স্বজন ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন প্রায় ১২ জন সাংবাদিক। সকালে বিয়ে হয়। সেই সময়ই সাংবাদিকদের উপস্থিতিতেই আমাদের বিয়ে হয়। রাতে হয় অনুষ্ঠান। খুব ঘরোয়া ভাবেই হয়। কারণ তার মাত্র দশ মাস আগে নাঈমের বাবা মারা যান। তাই তখন নাঈম চায়নি কোনো আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠান হোক। আর যদি ক্যারিয়ারের কথা বলেন তাহলে বলবো বিয়ের সিদ্ধান্তের আগেই নাঈম ছবি না করার সিদ্ধান্ত নেন পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরার জন্য। বিয়ের পর আমি বছর দুই অভিনয় করেছি। তখন আমার নায়ক ছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন, বাপ্পারাজ, সালমান শাহ্, মান্না, প্রত্যেকের সঙ্গেই দুই/তিনটি করে ছবি করেছি। ছবিগুলোও ব্যবসা সফলও হয়। এরপর নিজ ইচ্ছেতেই সরে আসি অভিনয় থেকে।

শেষ কথা

এই প্রতিবেদনটি কাউকে বড় করা বা কাউকে ছোট করার জন্য নয়। এখানে তারকাদের প্রেম-বিয়ে ক্যারিয়ার নিয়ে যা বলা হয়েছে তা নতুন কিছুও নয়। ক্যারিয়ারে প্রেম-বিয়ে কেন মুখ্য ভ‚মিকা রাখে না এটা তুলে ধরতেই উদাহরণগুলো টেনে আনা। নায়ক রাজ রাজ্জাকের কথায় একজন তারকার হিরোইজম আর সিনসিয়ারিটি যদি ঠিক থাকে সেটাই তাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

পূর্বসূরিদের মন্ত্রই যেন উত্তরসূরিদের পাথেয় হয় সেটাই একমাত্র চাওয়া।