তবুও সামর্থ্য প্রমানের এটাই সুযোগ

তবুও সামর্থ্য প্রমানের এটাই সুযোগ

642
SHARE

মামুনুর রহমান

কোনো দলেরই ক্রিকেট নিয়ে আগাম কিছু মন্তব্য করা ঠিক নয়। সে যত বড় দলই হোক সব দিন সব খেলায় একই পারফরমেন্স দেখাবে এটাও নিশ্চিত করে বলা যায় না। মাঠের পরিবেশ, ক্রিকেট পিচের আচার আচরণ যে কোনো মুহূর্তে বদলে দিতে পারে সকল জল্পনা কল্পনা। আর সেটা যদি হয় টেস্ট ক্রিকেট তাহলে তো আগাম কিছু মন্তব্য করা মানেই অনেকটা অন্ধকারে ঢিল ছোড়া। লাগলেও লাগতে পারে। যেমন, ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ক্রিকেটের  কথাই যদি ধরি তাহলে শুরুর দিকে পরিস্থিতিটা কেমন ছিল? অস্ট্রেলিয়া ভারতে  টেস্ট খেলতে আসছে। ভারতীয় দলের অধিনায়ক বিরাট কোহলি এতটাই হাঁকডাক, হম্বি তম্বি শুরু করলেন যে, অস্ট্রেলিয়া এবার ভারতের বিপক্ষে দাঁড়াতেই পারবে না। বিরাট কোহলি তো বলেই ফেলেছিলেন এবার ভারত ৪টি টেস্টের সব কয়টিতেই জিতবে। অথচ হলো তার উল্টোটা। ভারত অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে প্রথম টেস্টে দাঁড়াতেই পারেনি। ভারতের মাঠে এসে ভারতকেই প্রথম টেস্টে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল।

বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে টেস্ট সিরিজ নিয়েও এমন একটা ধারণা অথবা প্রত্যাশা যাই বলি না কেন তা আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। অনেক বছর পর শ্রীলঙ্কায় টেস্ট খেলতে গেছে বালাদেশ ক্রিকেট দল। দেশের পত্র-পত্রিকা ও প্রচার মাধ্যমে এবার বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকেই শ্রীলঙ্কার চেয়ে ফেভারিট হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। ফেভারিট ভাবার পক্ষে যুক্তি ছিল এরকমÑ শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলে অভিজ্ঞ পুরনো খেলোয়াড়রা এবার খেলছেন না। অপেক্ষাকৃত নবীন ক্রিকেটাররাই এবার রয়েছেন শ্রীলঙ্কার দলে। অন্য দিকে বাংলাদেশের পক্ষে খেলবেন সাকিব, তামিম, মুশফিকুর রহীম ও মাহমুদুল্লাহর মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা। কাজেই অভিজ্ঞতার দিক দিয়ে বাংলাদেশ দলই তো সেরা।

কিন্তু ক্রিকেটে মাঠের পারফরমেন্সই হলো আসল। সে ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে বুঝতে না পারলেই বাধে বিপত্তি। যেমনটা ঘটেছিল আমাদের কাটার মাস্টার মুস্তাফিজুর রহমানের বেলায়। ওর যখন আবির্ভাব ঘটল তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার পরিচিত নাই। তার খেলা নিয়ে প্রতিপক্ষ দলের কারও কোনো ধারণাও নাই। সে কারণে এক মুস্তাফিজুর রহমানের কাছে পরাজিত হলো- পাকিস্তান, ভারত, নিউজিল্যান্ড। একই পরিস্থিতি এবার সৃষ্টি হয়েছে শ্রীলঙ্কার মধ্যে প্রথম টেস্ট খেলায়।

বাংলাদেশ ধরেই নিয়েছিল তারা ফেভারিক। মাঠে খেলোয়াড়দের বডি ল্যাঙ্গুয়েজেও এমনটা মনে হচ্ছিল। কিন্তু ঐ যে বলা হয়ে থাকে ক্রিকেট হলো মাঠের খেলা। মাঠের পারফরমেন্সই হলো আসল। একটু ভুল হলেই যে কোনো ছোট দল শক্তিধর বড় দলকে হারাতে পারে।

ভুলটা তাহলে কি? ভুলটা হলো প্রতিপক্ষকে সমান প্রতিদ্ব›দ্বী না ভাবা। হোক সে ছোট কিন্তু মাঠের পারফরমেন্সে হঠাৎ সে তো জ্বলে উঠতে পারে। সে জন্য মাঠে নেমে সবাইকেই শক্তিধর ভাবতে হবে।

এবার বোধকরি বাংলাদেশ ক্রিকেট দল শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলকে দুর্বল প্রতিদ্ব›দ্বী ভেবে মাঠে নেমেছিল। তা নাহলে একই টেস্টে এতগুলো ভুল হয় কি করে। আমাদের ধারণা ভুলগুলো অনেকটা এরকমÑ এক. যেহেতু শ্রীলঙ্কার দলে অভিজ্ঞ বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় নেই, কাজেই দুশ্চিন্তার কারণও নেই। দুই. শ্রীলঙ্কা দলের তরুন ক্রিকেটারদের সম্পর্কে ধারণা কম থাকা অথবা তাদেরকে গুরুত্বের মধ্যে না রাখা। তিন. আমাদের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের অনভিজ্ঞ ক্রিকেটীয় আচরণ।

টেস্ট ক্রিকেটে টচ ভাগ্যও বড় ব্যাপার। এবার গলে প্রথম টেস্টে টচে হেরে যায় বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কা টচ জিতে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্ত নেয়। গলের পিচ এবার ব্যাটিং সহায়ক হওয়ায় শ্রীলঙ্কার প্রায় সকল খেলোয়াড়ই রানের পাহাড় করে। তাদের তরুণ খেলোয়াড় মেন্ডিস-এর সঙ্গেই তাল মেলাতে পারেনি গোটা বাংলাদেশ। অথচ তাকে বাংলাদেশ দল বোধকরি প্রথম দিকে পাত্তাই দিতে চায়নি। অথচ মেন্ডিস একাই বাংলাদেশকে রানের পাহাড়ের নীচে ফেলে দিল। ধারণা করা হয়েছিল। শ্রীলঙ্কা হয়তো তাদের রানের পাহাড় ৬০০ এর উপরে উঠাবে। কিন্তু সেটা পারেনি। তবে রান হলো প্রায় ৫শ। গলের ব্যাটিং পিচ এ বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সদস্যদেরও তো রানের পাহাড় গড়ার কথা। তামিম ইকবাল ও সৌম্য সরকার তেমনটাই শুরু করেছিলেন। কিন্তু ঐ যে বললাম ক্রিকেটে সামান্য ভুলের অনেক বড় খেসারত দিতে হয়। আমাদের ক্রিকেটের রাজপুত্র তামিম ইকবাল এমনই একটা ভুল করে বসলেন। দৈনিক প্রথম আলোয় এব্যাপারে লেখা হয়েছেÑ ‘দিন শেষে দুর্দান্ত সূচনার মধ্যেও একটা অস্বস্তির কাঁটা যেন বিঁধছে মুশফিকদের মনে। সেই কাঁটার অস্তিত্বটা বোঝা গেল শেষ ঘণ্টায়। একেবারেই নির্দিষ্ট করে বললে শেষ ১০ ওভারে। চায়নাম্যান বোলার লক্ষণ সান্দাকানের বোলিংয়ে একটা রান নিয়ে স্ট্রাইক ধরে রাখতে বুদ্ধিভ্রম হলো তামিমের। অদ্ভুতুড়ে এক রানআউটের শিকার হলেন। ২৭ বল পর পিছিয়ে জোড়া পায়ে ডিফেন্স করতে গিয়ে অফ স্পিনার দিলরুয়ান পেরেরার এলবিডবøুর ফাঁদে পড়লেন মুমিনুল’। ৯ রানের মধ্যে ২ উইকেট নেই। তার পথ ধরে অন্যরাও হাঁটলেন সমান তালে। যার ফলে যা হবার তাই হলো। দলকে ভাবা হয়েছিল অভিজ্ঞতার দিক থেকে দুর্বল প্রতিপক্ষ সেই হয়ে গেল সচল প্রতিপক্ষ। ৫ম দিনে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল শোচনীয় পরাজয় বরণ করে মাথা নীচু করে মাঠ ছাড়ে। দলের সিনিয়র ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের পারফর্মেন্স ছিল ‘যাচ্ছে তাই’ ধরনের।

তবে হ্যাঁ এই টেস্টের অনেকগুলো অর্জন রয়েছে। প্রথম অর্জন দলীয় অধিনায়কের মানসিক দৃঢ়তা। সবাই যখন ব্যর্থতার ষোল কলা পূরণ করে একের পর এক তাকে ছেড়ে মাঠ থেকে চলে যাচ্ছিলেন তখনও তিনি ছিলেন, অনড়, অবিচল। অবশ্য তাকে সঙ্গ দিয়েছেন আমাদের ক্রিকেটের তরুন তুর্কী মেহেদী হাসান মিরাজ। দু’জনের যৌথ শ্রমে ফলঅন এড়াতে পেরেছে বাংলাদেশ দল।

গল টেস্টের এবারের ইতিহাস থেকে একটা শিক্ষা নিতে পারে বাংলাদেশ। তাহলো মাঠের খেলার কাউকেই সবল দুর্বল ভাবা ঠিক নয়। প্রতিপক্ষ সে যতই অনভিজ্ঞ হোক সেও তো আজ জ্বলে উঠতে পারে। কাজেই সাবধান।

 

ক্রিকেট পোস্টমর্টেম

শ্রীলঙ্কার প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের শোচনীয় হারের পর দেশের শীর্ষ দৈনিক প্রথম আলোর অনলাইনে তাৎক্ষণিকভাবে একটি রিপোর্ট প্রকাশ হয়। আনন্দ আলোর পাঠকদের জন্য এটি বোনাস হিসেবে প্রকাশ করা হলো।

শেষ পর্যন্ত বড় হারই সঙ্গী হলো বাংলাদেশের। বিনা উইকেটে গল টেস্টের পঞ্চম দিনের খেলা শুরু করে দেড় সেশনেই অলআউট মুশফিকুর রহিমের দল। ২৫৯ রানে হেরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই টেস্টের সিরিজে ১-০-তে পিছিয়ে গেল বাংলাদেশ। অথচ এই সিরিজ শুরুর আগে শ্রীলঙ্কা দলের অনভিজ্ঞতা নিয়ে এত আলোচনা হয়েছে, বাংলাদেশই যেন এই সিরিজের ফেবারিট!

জয়ের জন্য ৪৫৭ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শেষ পর্যন্ত ১৯৭ রানে গুটিয়ে গেল বাংলাদেশ। সর্বোচ্চ ৫৩ রান এসেছে সৌম্য সরকারের ব্যাট থেকে। মুশফিকুর রহিম ৩৪, লিটন দাস করেছেন ৩৫ রান। মেহেদী হাসান মিরাজ করেছেন ২৮ রান। ৫৯ রানে ৬ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের বিপক্ষে হন্তারকের মূল ভূমিকায় লঙ্কান অধিনায়ক রঙ্গনা হেরাথ।

লাঞ্চের পর মুশফিকুর রহিম আর লিটন দাসের লড়াইটা লাঞ্চের পর বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। বিরতির পর সানদাকানের করা ওভারের দ্বিতীয় বলেই আউট মুশফিকুর রহিম। লেগ স্টাম্পের বাইরে পড়া বলটি বাঁক খেয়ে আরও বাইরের দিকে যাওয়ার মুহূর্তে মুশফিক খোঁচা দিয়ে তা তুলে দিলেন উইকেটকিপার নিরোশান ডিকভেলার হাতে।

৩৪ রান করে ফিরেছেন মুশফিক। ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে লিটন দাসের সঙ্গে ৫৪ রান যোগ করেছিলেন। জুটিটা ভাঙতে আর ১৩ ওভার টিকল বাংলাদেশ।

লিটনও মুশফিক যাওয়ার পর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। ৩ ওভার পরেই রঙ্গনা হেরাথের ৩৬৩তম শিকার হলেন ৩৫ রান করে। লঙ্কান অধিনায়ক এই মুহূর্তে টেস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে সফল বাঁহাতি স্পিনারের আসনেও বসলেন। তাঁর আগে ৩৬২ উইকেট নিয়ে কীর্তিটি ছিল নিউজিল্যান্ডের বাঁহাতি স্পিনার ড্যানিয়েল ভেট্টোরির।

পঞ্চম দিনের প্রথম ঘণ্টাতেই ৫ উইকেট হারিয়ে বসা বাংলাদেশ ম্যাচের ভাগ্য সেখানেই নির্ধারণ করে দিয়েছে। দিনের সকালটা দুঃস্বপ্ন হয়েই এসেছিল বাংলাদেশের জন্য। ৬৭ রানের ওপেনিং জুটির পর মাত্র ৩৭ রানেই ৫ উইকেট হারিয়ে পরিণত হয় ধ্বংসস্তুপে। ৫৩ রানে সৌম্য সরকার আউট হওয়ার পর একে একে ফিরেছেন মুমিনুল হক, তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান ও মাহমুদউল্লাহ।

পতনের শুরুটা আসেলা গুনারতেœর করা দিনের দ্বিতীয় বলেই। আউট হলেন সৌম্য সরকার। বলটি মিডল স্টাম্পে পড়ে সৌম্যর অফ স্টাম্পে গিয়ে বেল ফেলে দিল। ৫৩ রানে ফিরেছেন সৌম্য। ৪৯ বলের ‘টি-টোয়েন্টি’সুলভ এই ইনিংসে সৌম্য মেরেছেন ৬টি চার ও ১টি ছয়।

সৌম্যর বিদায়ের পর মুমিনুল হককে সঙ্গে নিয়ে ১৩ রান যোগ করেন তামিম ইকবাল। কিন্তু জুটিটাকে বড় করতে পারেননি। মুমিনুল ফিরেছেন ১৫ বলে ৫ রান করে দিলরুয়ান পেরেরার বলে এলবিডবøু হয়ে। রিভিউ নিয়েছিলেন। কিন্তু বাঁচতে পারেননি। মুমিনুল আউট হওয়ার ১২ বল পরেই তামিমও শিকার পেরেরার। তাঁর বলে স্কিপে ক্যাচ নিয়েছেন গুনারতেœ। তামিম আউট হয়েছেন ১৯ রানে।

মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে ২১ রান যোগ করেছিলেন সাকিব আল হাসান (৮)। কিন্তু রঙ্গনা হেরাথের বলে লেগ ¯িøপে করুনারতেœর হাতে ধরা পড়েছেন সাকিব। হেরাথের এক বল পরেই এলবিডবøু  মাহমুদউল্লাহ। দিনের প্রথম ১৩ ওভারেই বাংলাদেশের আশার সমাধি।

অবশ্য বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার চেয়ে কিন্তু লঙ্কান বোলারদের কৃতিত্বটাই বেশি। দুর্দান্ত বোলিং করছেন তাঁরা। এমন বোলিং বাংলাদেশকে টিকতে দিল না গোটা দুটি সেশনও। তরুণ শ্রীলঙ্কাও ১৯৮ ওভার ব্যাটিং করেছে ১৬ উইকেট হারিয়ে। আর বাংলাদেশ ১৫৭ ওভার ব্যাটিং করতে পেরেছে ২০ উইকেট হারিয়ে।