Home শীর্ষ কাহিনি ডুব রহস্য!

ডুব রহস্য!

SHARE
dob

রেজানুর রহমান: ডুব নামে একটি নতুন ছবি বানিয়েছেন বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। ছবিটিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন বলিউড খ্যাত অভিনেতা ইরফান খান। তার সঙ্গে আরও আছেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচী, নুসরাত ইমরোজ তিশা, কলকাতার পার্নো মিত্রসহ অনেকে।

ফারুকীর ছবি মানেই নতুন কিছু। তার প্রায় সব ছবিতেই আছে প্রথা ভাঙার গল্প। নতুন কিছু করতে গেলে ফারুকী সাধারণত: মিডিয়ার সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেন। পত্র-পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দেন। নির্মিতব্য ছবির ব্যাপারে আপডেট তুলে ধরেন। কিন্তু তার নতুন ছবি ‘ডুব’ এর ব্যাপারে রহস্যজনকভাবে শুরু থেকেই এক ধরনের গোপনীয়তা রক্ষা করে চলছিলেন। ছবির কেন্দ্রীয় অভিনেতা ইরফান খান অভিনয়ের জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। ইরফান খান বলে কথা। প্রচার মাধ্যম তাকে নিয়ে আগ্রহ দেখালেও ফারুকী এক্ষেত্রে ছিলেন অনেকটাই নিষ্পৃহ। খুব কাছের মানুষ ছাড়া শ্যুটিং স্পটে মিডিয়া ছিল প্রায় নিষিদ্ধ। বিষয়টিকে দেশের মিডিয়া স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিল। অনেকেই ভেবেছিল নতুন ছবির ব্যাপারে ফারুকী বোধকরি এখনই কিছু বলতে চান না। সময় এলে নিশ্চয়ই বলবেন।

কিন্তু হঠাৎ ডুব সম্পর্কে অবাক করা খবরের বোম ফাটালো কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা। পত্রিকাটির ‘আনন্দ’ শীর্ষক বিনোদন পাতার পুরোটা জুড়ে ছাপা হলো ‘ডুব’ ছবি নিয়ে অবাক করা অনেক তথ্য। আনন্দবাজার-এর আনন্দই জানিয়ে দিল ফারুকী তার নতুন ছবি বানিয়েছেন বাংলাদেশের কিংবদনিৱ তুল্য কথাসাহিত্যিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের জীবনকে নিয়ে। সত্যি সত্যি অবাক করা তথ্যের বোম ফাটলো বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে। বাংলাদেশের গর্ব হুমায়ূন আহমেদের জীবন ভিত্তিক ছবি বানালেন ফারুকী। অথচ কাউকেই কিছু জানতে  দিলেন না। বরং ছবিটির ব্যাপারে চরম গোপনীয়তা রক্ষা করে চলেছেন। কেন এত লুকোছাপা?

আনন্দবাজারের খবরটি দেখার পর প্রকৃত তথ্য জানার জন্য আনন্দ আলোর পক্ষ থেকে প্রথমেই মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাকে পাওয়া  যায়নি। নির্ভরযোগ্য সূত্রের খবর আমাদের প্রিয় চিত্র পরিচালক দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

তবে কলকাতার আনন্দ বাজারের তথ্য অনুযায়ী ফারুকী একবারও স্বীকার করেননি ‘ডুব’ ছবিটি হুমায়ূন আহমেদের জীবন কাহিনি নিয়ে নির্মিত। বরং তিনি বারবার বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন। অথচ ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের অভিনেত্রী দেশ বরেণ্য অভিনয় শিল্পী ও নির্মাতা রোকেয়া প্রাচী ফারুকীর বক্তব্যের বিরোধিতা করেছেন। প্রাচী জোর দিয়েই বলেছেন ‘ডুব’ ছবিতে হুমায়ূন আহমেদের জীবন কাহিনিই গুরুত্ব পেয়েছে। কলকাতার আনন্দবাজারের তথ্যও সেরকম।

হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রে ইরফান কিন্তু এত লুকোছাপা কেন? এই শিরোনামে আনন্দবাজার লিখেছে-

এ বছরের মাঝামাঝি থেকে ‘বলিউডের ফোর্থ খান’ বলে পরিচিত ইরফানের বাংলাদেশের প্রথম সারির পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বাংলা ছবি করা নিয়ে উত্তাল ছিল দুই বাংলার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। এমনকী হতচকিত ছিল বলিউডও।

dob-1মুম্বাইয়ের বা হলিউডের তাবড় তাবড় পরিচালকরা যেখানে ইরফানের সঙ্গে মিটিং করার ডেট পান না, সেখানে কীসের মোহে ইরফান ঢাকায় গিয়ে বাংলা ছবি করছেন- এই প্রশ্ন আরব সাগর তীরে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছিল এপ্রিল মাস থেকে।

এত দিনে বোধ হয় আসল কারণটা সামনে এল। এবং খবরটা এতটাই চাঞ্চল্যকর যে কোনও মতে সেটা চেপে রাখা হয়েছিল দুই বাংলার সংবাদ মাধ্যমে।

হ্যাঁ, মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ডুব’ ছবিতে ইরফান খান অভিনয় করছেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রে। গল্পটাও নাকি অনুপ্রাণিত তাঁর জীবন থেকে। যদিও অভিনেতা থেকে পরিচালক কেউই এ ব্যাপারে ‘কনফার্ম’ করছেন না কিছুই।

শ্যুটিংয়ের আগে হুমায়ূন আহমেদের প্রচুর ভিডিও দেখেছিলেন ইরফান। সেগুলো দেখেই হোমওয়ার্ক করেছিলেন।

যা শোনা যাচ্ছে, হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রে ইরফান ছাড়াও তাঁর কন্যা শীলা আহমেদের চরিত্রে অভিনয় করেছেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশা। এবং হিমুর স্রষ্টার প্রথম পক্ষের স্ত্রী গুলতেকিনের ভূমিকায় রয়েছেন রোকেয়া প্রাচী।

অন্য দিকে ডিভোর্সের পর ২০০৫ য়ে হুমায়ূন আহমেদ বিয়ে করেন তাঁর কন্যার সমবয়সী মেহের আফরোজ শাওন-কে। শাওনের চরিত্রে অভিনয় করছেন টালিগঞ্জের পার্নো মিত্র।

কিন্তু কেনই বা এত রাখঢাক ছবিটা নিয়ে? কেনই বা হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রে ইরফান অভিনয় করছেন তা জানা সত্ত্বেও এত দিন সেটা মিডিয়া থেকে লুকিয়ে রাখা হলো?

যা খবর, তার প্রধান কারণ গল্পটা স্পর্শকাতর। হুমায়ূন আহমেদের কন্যা শীলা আহমেদ এবং শাওন- দু’জনই নাকি ছিলেন ছোটবেলার বন্ধু। নিজের মেয়ের বন্ধুকে হুমায়ূন আহমেদের ‘নিকাহ’ করা নিয়ে সে সময় তোলপাড় হয় গোটা বাংলাদেশ।

এমনকী শোনা যায়, নিউইয়র্কে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পরেও শাওনের প্রতি যথেষ্ট আক্রমণাত্মক ছিলেন হুমায়ূনের প্রথম পক্ষের পরিবার। কোনও মতে শ্যুটিংয়ের সময় যাতে ঝামেলা না হয়, সে জন্যই এত রাখঢাক।

পুরো ব্যাপার নিয়ে কী বলছেন পরিচালক মোস্তফা ফারুকী?

‘‘আমি চাইছি দর্শক ছবিটা দেখুক আগে। আমি নিজেও হুমায়ূন আহমেদের বিরাট ফ্যান। ওঁর ‘অরা’তেই বাংলাদেশে আমাদের সবার বড় হওয়া। এটুকুই বলব, আমি একটা পরিবারের গল্প বলছি, কয়েকজন মানুষের ভালোলাগা, দুঃখ, ক্ষোভ, হিংসা- এই আবেগগুলো ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি। সেটা কার জীবন অবলম্বনে, সেটার বিচার ছবি দেখার পরে হলেই বেটার,’’ বলছেন ফারুকী।

অন্যদিকে হুমায়ূন আহমেদের কন্যা শীলা আহমেদ এই ব্যাপারে কিছুই জানেন না।

‘‘আমি বাংলাদেশের মেনস্ট্রিম মিডিয়াতে এ রকম কোনও খবর দেখিনি। আমি সত্যি কিছু জানি না। তবে ফারুকীর ছবিতে যদি লেখা থাকে ‘এটা হুমায়ূন আহমেদের জীবন অবলম্বনে’ তা হলে অবশ্যই ওর আমাদের কাছ থেকে পারমিশন নেয়া উচিত ছিল। কিন্তু ও যদি কয়েকটা ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ছবিটা বানায়, সে ব্যাপারে আমার কিছু বলার নেই। তবে ফারুকী যে বাবাকে, বাবার লেখাকে অসম্ভব ভালোবাসে সেটা আমি জানি। এখন ছবিটা দেখেই যা বলার বলব,’’ বললেন হুমায়ূন কন্যা শীলা আহমেদ।

অন্য দিকে হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী, মেহের আফরোজ শাওনও যথেষ্ট আশ্চর্য হলেন কলকাতা থেকে আনন্দ ফেল্র-এর কাছে খবরটা পেয়ে। তিনিও এর আগে জানতেন না ইরফান খান তাঁর স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করছেন।

“আমি আপনার কাছেই প্রথম শুনলাম এ রকম একটা ছবি হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের ওপর। আমার কোনও ধারণাই নেই। পরিচালক কি কোনও দিন হুমায়ূন আহমেদকে মিট করেছিলেন? আমার মনে হয় না। আমি একজনের ওপর ছবি করছি, তার পরিবারের সঙ্গে কথা না-বলে, এটা আমার কাছে যথেষ্ট বিরক্তিকর। খুব খারাপ লাগছে,” সাফ জবাব হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনের।

আরও খবর, ছবির শ্যুটিংয়ের আগে হুমায়ূন আহমেদের প্রচুর ভিডিয়ো দেখেছিলেন ইরফান খান। সেগুলো দেখেই হুমায়ূন আহমেদের কথাবার্তা বলার ধরন- এ সব নিয়ে হোমওয়ার্ক করেছিলেন।

প্রসঙ্গত এই ছবিটা একসঙ্গে প্রযোজনা করছে বাংলাদেশের জাজ মাল্টিমিডিয়া, অশোক ধানুকার এসকে মুভিজ এবং ইরফান খান স্বয়ং। ছবির গোটা শ্যুটিংটা হয়েছে  বাংলাদেশের বিভিন্ন লোকেশনে যেমন গুলশান, রাঙামাটি, বান্দরবান এবং বনানী।

‘‘কার জীবনের গল্প সেটা সত্যি জানি না। তবে শুধু বাংলা শিখবেন বলে ইরফান পনেরো দিন বাংলা টিউটর রেখেছিলেন মুম্বাইতে। ইরফানের ইনভল্‌ভমেন্টটা অবাক করার মতো,’’ এসকে মুভিজের তরফে বলেছেন হিমাংশু ধানুকা। অন্য দিকে বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশাও ছবিটা নিয়ে অসম্ভব উত্তেজিত।

‘‘আমাদের পরিচালক যখন গল্পটা বলেছিলেন তখন সেটা কার জীবন থেকে ইন্সপায়ার্ড সেটা জানা সম্ভব ছিল না। অভিনেত্রী হিসেবে আমি জানতেও চাইনি।

তবে চরিত্রটা আমাদের কাছে অসম্ভব চ্যালেঞ্জিং ছিল। একজন মানুষ যার মনের ভিতরে ঝড় চলছে কিন্তু বাইরে থেকে দেখে বুঝতে পারা যাচ্ছে না, এটাই ছিল চরিত্র। আর ইরফান ভাইয়ের সঙ্গে অভিনয় করাটা আমার জীবনের একটা মেমোরেবল এক্সপেরিয়েন্স,’’ বলেন তিশা।

সেটার বিচার ছবি দেখার পরে হলেই বেটার

আমি চাইছি দর্শক ছবিটা দেখুক আগে। আমি নিজেও হুমায়ূন আহমেদের বিরাট ফ্যান। ওঁর ‘অরা’তেই বাংলাদেশে আমাদের সবার বড় হওয়া। এটুকুই বলব, আমি একটা পরিবারের গল্প বলছি, কয়েকজন মানুষের ভালোলাগা, দুঃখ, ক্ষোভ, হিংসা- এই আবেগগুলো ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছি। সেটা কার জীবন অবলম্বনে, সেটার বিচার ছবি দেখার পরে হলেই বেটার,’’ বলছেন ফারুকী।