টিভি অনুষ্ঠান জরীপ এখনই সময় ঘুরে দাঁড়াবার

টিভি অনুষ্ঠান জরীপ এখনই সময় ঘুরে দাঁড়াবার

624
0
SHARE

 

রেজানুর রহমান ও সৈয়দ ইকবাল

আমাদের দেশে এতগুলো টেলিভিশন চ্যানেল। সংখ্যায় প্রায় ৩০টি। তারপরও অন্যদেশের টেলিভিশন চ্যানেলের প্রতিই অনেকের ঝোক বেশী। বিষয়টি কতটা সত্যি তা পর্যবেক্ষনের জন্য আমরা সম্প্রতি ১০০ জন দর্শকের মাঝে একটি জরীপ চালিয়েছি। ১০০ জনের মধ্যে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড় য়া তরুণ-তরুণীর পাশাপাশি গৃহিনী, চাকরিজীবিও ছিলেন। জরীপ পর্যবেক্ষনে বেশ হতাশাজনক চিত্রই পাওয়া গেছে। ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৭০ জনই বলেছেন দেশের টেলিভিশন অনুষ্ঠান দেখার ক্ষেত্রে তাদের আগ্রহ নাই। এজন্য মানসম্পন্ন অনুষ্ঠানের অভাব, যোগ্যতা সম্পন্ন নির্মাতার অভাব ও টিভি চ্যানেল মালিকদের পরিকল্পনার অদূরদর্শিতাকেই দায়ী করেছেন অনেকে।

জরীপ কার্যক্রমে আমাদের প্রথম প্রশ্ন ছিল- টেলিভিশনে কি অনুষ্ঠান দেখতে পছন্দ করেন। বিষয় হিসেবে ১০ ধরনের অনুষ্ঠান যথাক্রমে- নাটক, সিনেমা, টকশো, সংবাদ, খেলাধুলা, ধারাবাহিক নাটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, নাচ, গান ও রিয়েলিটি শো এর কথা উল্লেখ করা ছিল। ১০০ জনের মধ্যে ৪৪ জন টিভিতে নাটক দেখেন। সিনেমা দেখেন ২৪ জন, টকশো দেখেন ২৬ জন, সংবাদ দেখেন ২০ জন, খেলাধুলার অনুষ্ঠান দেখেন ২৮ জন, ধারাবাহিক নাটক দেখেন ১৮ জন, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখেন ১৮জন, নাচের অনুষ্ঠান দেখেন ১৭ জন, গানের অনুষ্ঠান দেখেন ১৪ জন, রিয়েলিটি শো দেখেন ২৪ জন।

নাটক, টেলিফিল্ম দেখার ক্ষেত্রে কোথাকার টিভি চ্যানেল আপনাকে টানে? এই প্রশ্নের উত্তরে ঢাকা অর্থাৎ বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলের কথা বলেছে ৬৬ জন, কলকাতার টিভি চ্যানেলে কথা বলেছেন ২৪ জন, অন্যান্য টিভি চ্যানেলের (বিদেশী) কথা বলেছেন ৬ জন।

সিনেমা দেখার ক্ষেত্রে কোথাকার টিভি চ্যানেল আপনাকে বেশী টানে? এই প্রশ্নের জবাবে ২০ জন বলেছেন ঢাকার কথা। ৪৪ জন বলেছেন, কলকাতার কথা। ৪২জন বলেছেন বিদেশী অন্যান্য টিভি চ্যানেলের কথা।

একটি অভিযোগ শোনা যায়- দেশীয় টেলিভিশনের দর্শক কমে গেছে? আপনি কি মনে করেন? এই প্রশ্নের জবাবে ৭০জন দর্শকই হ্যা সূচক মনৱব্য করেছেন।

দর্শক কমে যাবার কারণ কি বলে আপনার মনে হয়? এই প্রশ্নের জবাবে ৪০ জন দর্শক বলেছেন, মান সম্পন্ন অনুষ্ঠানের অভাবে দেশের টেলিভিশন চ্যানেল সমূহে দর্শক কমে যাচ্ছে। ২৬ জন দর্শক এজন্য যোগ্যতা সম্পন্ন নির্মাতার অভাবকে দায়ী করেছেন। ৩২ জন দর্শক বলেছেন চ্যানেল মালিকদের পরিকল্পনার অভাবে দেশের টিভি চ্যানেল গুলোতে দর্শক কমে যাচ্ছে।

TV-1একটি বিতর্ক আছে- অনুষ্ঠান দেখার জন্য বিজ্ঞাপন নাকি বিজ্ঞাপন দেখার জন্য অনুষ্ঠান? এ ব্যাপারে আপনার মনৱব্য কী? এই প্রশ্নের জবাবে অধিকাংশ দর্শকই অনুষ্ঠানের সময় অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট মাপের অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অনুষ্ঠান প্রচারের পরামর্শ দিয়েছেন। অনেকে পাশ্ববর্তী দেশের একাধিক বাংলা টিভি চ্যানেলের উদাহরণ টেনে বলেছেন, ওরা একটি অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার সাথে সাথেই অন্য আরেকটি নতুন অনুষ্ঠানে ঢুকে যায়। যার ফলে দর্শক বিরক্ত হয় না। নতুন অনুষ্ঠানটি দেখার ব্যাপারে আগ্রহী হয়। নতুন অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পর নিদিষ্ট সময়ের বিজ্ঞাপন বিরতি থাকে। এক্ষেত্রে দর্শক মোটেই বিরক্ত হয় না। কারণ দর্শক নিজেও মানসিক ভাবে তৈরি যে বিজ্ঞাপন প্রচার ছাড়া টিভি চ্যানেল গুলো টিকবে না।

জরীপের নির্ধারিত প্রশ্নমালার বাইরেও আমরা দর্শকদের কিছু প্রশ্ন করেছি। অধিকাংশ দর্শক দেশের টেলিভিশনের অনুষ্ঠানই দেখতে চান। কিন্তু তারা পছন্দের তেমন কোনো কিছুই পান না বলে অভিযোগ করলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানভীর বলেছেন, আমাদের টিভি চ্যানেল গুলো প্রায়ই একই ধারার অনুষ্ঠান প্রচার করে আসছে। সন্ধ্যায় প্রায় একই সময়ে সব টিভি চ্যানেলই সংবাদ প্রচার করে। রাতে প্রায় একই সময়ে টকশো অথবা গানের অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। দুপুরেও একই সময়ে অধিকাংশ টিভি চ্যানেলে খবর প্রচার হয়। বিকেলে সিনেমা দেখায় প্রতিটি চ্যানেল। এমনকি একই সময়ে নির্ধারিত কোনো পণ্যের বিরক্তিকর বিজ্ঞাপনও প্রচার হয় একাধিক টিভি চ্যানেলে। ফলে দর্শক বৈচিত্র্য খুঁজে পায় না। তার মতে, টিভি চ্যানেল গুলোর অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য দরকার।

বীরেন্দ্র নাথ বর্মন মানে একজন প্রকৌশলী মনৱব্য করলেন, আমাদের টিভি চ্যানেল গুলোতে বিজ্ঞাপনের বিড়ম্বনায় অনুষ্ঠান ঠিক মতো দেখা যায় না। বিজ্ঞাপনের সময়টা আরও কমানো উচিৎ। আবুল হাসান নামে তেজগাঁও কলেজের একজন ছাত্র আশঙ্কা প্রকাশ করে বললেন, পাশের দেশের অধিকাংশ বাংলা টিভি চ্যানেলে বিভিন্ন রিয়েলিটি শোতে আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের সুযোগ দিয়ে দর্শককে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। ইদানিং একটি টিভি চ্যানেলে প্রশ্নোত্তর ভিত্তিক একটি আলোচিত অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল, দর্শনীয় স্থান এমনকি ঐতিহ্যের কথাও তুলে ধরা হচ্ছে। এটা তারা করছে বাংলাদেশের দর্শককে টানার জন্য।

অথচ বাসৱবতা হলো আমাদের অধিকাংশ টিভি চ্যানেলে দর্শককে আকৃষ্ট করার মতো কোনো অনুষ্ঠান নাই।

TV-2মিজানুর রহমান নামে একজন ব্যবসায়ী বললেন, ‘সম্প্রতি আমি বাংলাদেশের সব টিভি চ্যানেল মিলিয়ে ৫টি আলোচিত অনুষ্ঠানের নাম জানতে চেয়েছিলাম। অনেকেই একটি দুটির বেশী অনুষ্ঠানের নাম বলতে পারেন নাই। অথচ তারা সকলেই পাশের দেশের একটি বাংলা টিভি চ্যানেলের ৫টিরও বেশী অনুষ্ঠানের নাম হর হর করে বলেছেন। সবিতা আকতার নামে একজন কলেজ ছাত্রী বললেন- আমাদের ছোট ছোট ছোট বাচ্চারা দেশের অনেক নামকরা মানুষকে চিনে না। কয়েকদিন আগে তিনি বাংলাদেশের সিনেমার জনপ্রিয় নায়ক শাকিব খান ও ভারতের (কলকাতা) নায়ক জিৎ এর ছবি পাশাপাশি রেখে তার এক ভাগ্নেকে প্রশ্ন করেছিলেন- এরা কারা বলোতো? ষষ্ঠ শ্রেণীতে অধ্যয়নরত ছাত্রটি জিৎকে চিনেছে। কিন্তু শাকিব খানকে চিনে নাই।

এই যদি হয় আমাদের শোবিজ, টিভি মাধ্যমের অবস্থা তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কি? এর উত্তর খোঁজার এখনই সময়।

মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি

আমীরুল ইসলাম

জেনারেল ম্যানেজার (অনুষ্ঠান) চ্যানেল আই

প্রশ্ন: বর্তমানে আমাদের টিভি মাধ্যমে অনুষ্ঠানের মান কেমন?

উত্তর: এই প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যা’ অথবা ‘না’ অর্থাৎ ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক দুই ভাবেই দেয়া যেতে পারে। প্রথমে নেতিবাচক অর্থেই বলি। হ্যা, অন্যান্য দেশের তুলনায় টিভি অনুষ্ঠানের মান আমাদের দেশে আহামরী কোনো অবস্থানে পৌছায় নাই। তুলনামূলক বিচারে আমাদের দেশের টেলিভিশন মাধ্যম হয়তো অনুষ্ঠানের দি দিয়ে আগায়নি। কিন্তু সংবাদ প্রচার, রিয়েলিটি শো, উন্নয়ন ও সামাজিক কমিটমেন্টের অনুষ্ঠান সহ অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে আমাদের দেশের টেলিভিশন মাধ্যমে অনেক এগিয়েছে। পজিটিভ অর্থে বলতে গেলে বয়সের তুলনায় আমাদের স্যাটেলাইট প্রচার মাধ্যম খুব একটা খারাপ করছে না।

প্রশ্ন: দর্শকদের কাছ থেকে প্রায়ই মনৱব্য শোনা যায় আমাদের টেলিভিশনগুলোতে ‘বিজ্ঞাপনের ফাঁকে অনুষ্ঠান, নাকি অনুষ্ঠানের ফাঁকে বিজ্ঞাপন এই নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নাই। আপনার মনৱব্য কী?

উত্তর: এটি এই সময়ের একটি গুরুত্বপুর্ন সমস্যা। বিজ্ঞাপন বেশী গুরুত্বপুর্ণ নাকি অনুষ্ঠান? আমরা অনুষ্ঠানকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকি। কারণ অনুষ্ঠান না থাকলে বিজ্ঞাপন দেখবে কে? তবে হ্যা এব্যাপারে একটি পরিস্কার ধারনা থাকা দরকার। একটা বিষয় খুব গুরুত্বপুর্ণ। তাহলো আমাদের দেশের টিভি দর্শক অসংখ্য বিদেশী টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ পান। এজন্য ডিশ ব্যবসায়ীদের কাছে নির্দিষ্ট হারে অর্থ প্রদান করতে হয়। অথচ দেশের টিভি চ্যানেল তারা দেখেন বিনে পয়সায়। একটি টিভি  চ্যানেল চালাতে অনেক অর্থের প্রয়োজন। সে কারনে কখনও কখনও বিজ্ঞাপনের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়। অথচ  দেশের প্রতিটি পরিবার দেশের টিভি অনুষ্ঠান দেখার জন্য যদি সামান্য পরিমান অর্থ প্রদানের আগ্রহ দেখাত তাহলে বিজ্ঞাপন আগে না অনুষ্ঠান আগে এই অস্থিরতা কেটে যেতো।

প্রশ্ন: বিদেশী টিভি চ্যানেলের অধিপত্য রোধে কি করা উচিৎ?

উত্তর: বর্তমান যুগটা বেশ প্রতিযোগিতা মূলক। প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে মেধাবী হতে হয়। কৌশল জানতে হয়। কেউ আপনার কাছে তখনই আধিপত্য বিসৱার করবে যখন আপনি প্রতিযোগিতায় মেধা প্রদর্শন করতে অক্ষম হবেন। আমাদের দেশে বিদেশী সিনেমা, বিদেশী টিভি চ্যানেল নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। আমি মনে করি এক্ষেত্রে দর্শকের মন-মানসিকতা টাই বেশ জরুরি। বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলে খুব কী খারাপ অনুষ্ঠান হয়? আমরা আসলে অনেকে দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দিতে জানি না। অথবা অনেকে মনে করি পাশের বাড়ির, বউটিই বেশ সুন্দর। এই মানসিকতার পরিবর্তন করা না গেলে কাজের কাজ কিছুই হবে না।

আর একটি কথা, চিরদিনই স্বদেশীয়ানার জয় হয়। আমরা বাঙালী, বাংলা আমার ভাষা- আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস চেতনার মধ্যে আমরা এগিয়ে চলেছি। আমাদের শিল্প-সাহিত্য, বিনোদন, সংস্কৃতি আমাদের মতো। আমরা আমাদের নিজস্বতা নিয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছি। নিউইয়র্ক, লন্ডন, সিডনি, টরেন্টোতে আমরা একটুকরো বাংলাদেশ গড়ে তুলেছি- আমাদের টেলিভিশন অনুষ্ঠানও ছয় ছয়টি মহাদেশের বাঙালী দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যাচ্ছে এটাই আমদের সাফল্য।

সরকারের সদিচ্ছাই যথেস্ট

আরিফ হাসান

ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, দেশ টিভি

প্রশ্ন: বর্তমানে দেশে টিভি অনুষ্ঠানের মান কেমন?

উত্তর: বর্তমানে আমাদের টিভি অনুষ্ঠানের মান অনেক ভাল। নতুন চ্যানেলের সংখ্যা যেমন বাড়ছে তার সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানও তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেই পরিমাণ শিল্পী তৈরি হচ্ছে না। শিল্পী, কলা-কুশলীদের মান বাড়ানো গেলে আমি আশাকরি অনুষ্ঠানের মান আরো অনেক ভাল হবে।

প্রশ্ন: দর্শকদের কাছ থেকে প্রায়ই মনৱব্য শোনা যায় আমাদের টেলিভিশনগুলোতে ‘বিজ্ঞাপনের ফাঁকে অনুষ্ঠান, নাকি অনুষ্ঠানের ফাঁকে বিজ্ঞাপন এই নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নাই। আপনার মনৱব্য কী?

উত্তর: অনুষ্ঠানের ফাঁকেই বিজ্ঞাপন চলে… চ্যানেলের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে অনুষ্ঠান/নাটক বানানোর খরচও বেড়ে গেছে, সে তুলনায় বিজ্ঞাপনের দর বাড়েনি। সে কারণেই চ্যানেল চালাতে গিয়ে আমরা বিপুল খরচের সম্মুখীন হচ্ছি। অনুষ্ঠান/নাটক বানানোর খরচ ও বিজ্ঞাপনের দর-এর একটি সুষম সমন্বয় করা গেলেই দর্শকেরা আরও কম বিজ্ঞাপনসহ অনুষ্ঠান দেখতে পারবে।

প্রশ্ন: দেশে বিদেশী চ্যানেলের আধিপত্য বন্ধে কী করা উচিৎ?

উত্তর: সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট।

অন্যথায় আমাদের টিভি চ্যানেল গুলো টিকবে না

তাশিক আহমেদ

সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট (অনুষ্ঠান ও সম্প্রচার), এটিএন বাংলা

প্রশ্ন: বর্তমানে আমাদের দেশে টিভি অনুষ্ঠানের মান কেমন বলে আপনার মনে হয়?

উত্তর: বর্তমান সময়ে টিভিতে ভালো মানের অনুষ্ঠান প্রচার করা খুবই দূরুহ। যেখানে ২৪ ঘন্টা অনুষ্ঠান প্রচার করতে হয় সেখানেও সব সময় ভালো মানের অনুষ্ঠান প্রচার করা অসম্ভব। প্রতিদিনের অনুষ্ঠান সূচীতে অনৱত দু’টি ভালো মানের অনুষ্ঠান থাকা দরকার। সার্বিক বিবেচনায় প্রত্যেকটি টেলিভিশন চ্যানেলই মোটামুটি ভালো মানের কিছু অনুষ্ঠান প্রচারের চেষ্টা করে থাকে।

প্রশ্ন: দর্শকদের কাছ থেকে প্রায়ই মনৱব্য শোনা যায় আমাদের টেলিভিশনগুলোতে ‘বিজ্ঞাপনের ফাঁকে অনুষ্ঠান, নাকি অনুষ্ঠানের ফাঁকে বিজ্ঞাপন এই নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নাই। আপনার মনৱব্য কী?

উত্তর: আমাদের দেশে বিজ্ঞাপনের মার্কেট অনুযায়ী টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা অনেক বেশি। ৩০টি টেলিভিশনকে চালানোর মতো বিজ্ঞাপনের বাজেট আমাদের দেশে নেই। ফলে বিজ্ঞাপনদাতারা বিজ্ঞাপনের মূল্য এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে যেখানে নির্ধারিত সময়ে অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন প্রচার করতে হচ্ছে। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় অনেকে নিয়ম নীতির মানতে পারছেন না।

প্রশ্ন: দেশে বিদেশী চ্যানেলের আধিপত্য বন্ধে কী করা উচিৎ?

জরুরি ভিত্তিতে জনপ্রিয় (সসৱা) টিভি চ্যানেল বিশেষন করে হিন্দি ও ইদানিং কালের কলকাতার বাংলা চ্যানেলগুলোকে হাই পে চ্যানেল হিসেবে বিবেচনায় আনলে ভালো হবে। এ কাজে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। ফলে সরকার ভালো রাজস্ব আদায় করতে পারবে। নইলে আমাদের নিজস্ব চ্যানেলগুলো সুস্থভাবে টিকে থাকতে পারবে না।

বেশী বিজ্ঞাপন চালালে বিজ্ঞাপনও কেউ দেখে না

শামীম শাহেদ

অনুষ্ঠান প্রধান, বাংলাভিশন

প্রশ্ন: বর্তমানে টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মান কেমন?

উত্তর: এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া খুব কঠিন। আমাদের দেশের টিভি চ্যানেলগুলোর মান সাধারন অর্থে বলতে গেলে খুব যে ভালো তা বলা যাবে না। কিন্তু অনেক ভালো ভালো অনুষ্ঠানও হয়।

তবে সাধারন অর্থে চ্যানেলগুলোকে দোষ দেওয়া যাবে না। কারন আমরা একটা ট্রাঞ্জেকশন পিরিয়ডের মধ্যদিয়ে যাচ্ছি। এই সময়গুলোতে এই রকম হয়। সব চ্যানেলের সব অনুষ্ঠান কখনোই কোনো দেশে ভালো হয় না। কিন্তু এখন আমরা বিশ জন ভালো নির্দেশকের নাম বলতে পারব, বিশ জন ভালো কলাকুশলির নাম বলতে পারব, বিশ জন ভালো নাট্যকারের নাম বলতে পারব, পঞ্চাশ জন ভালো অভিনেতার নাম বলতে পারব। এটা একটা বড় পাওয়া। একটু সময় দিয়ে আমাদের চ্যানেলগুলো ঠিক হয়ে যাবে।

প্রশ্ন: দর্শকদের কাছ থেকে প্রায়ই মনৱব্য শোনা যায় আমাদের টেলিভিশনগুলোতে ‘বিজ্ঞাপনের ফাঁকে অনুষ্ঠান, নাকি অনুষ্ঠানের ফাঁকে বিজ্ঞাপন এই নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নাই। আপনার মনৱব্য কী?

উত্তর: দেখুন আমাদের চ্যানেলগুলোর একমাত্র আয়ের উৎসব বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে টাকা উপার্জন হয় না। ফলে চ্যানেলের বিতরন ব্যবস্থা চেঞ্জ না হলে বিজ্ঞাপনের পরিমান কমবে না। একটু ব্যাখ্যা করে বলি বিষয়টা।

আজকে আমরা এখানে বসে বিদেশি যে চ্যানেলগুলো দেখি এবং মাসে মাসে তিন-চারশ করে টাকা দেই এই টাকার একটা নির্দিষ্ট ভাগ চলে যায় সেই চ্যানেলগুলোর অ্যাকাউন্টে। অথচ দেখেন আমাদের চ্যানেলের মালিকেরা একটা টাকাও পায় না। বরং আরও টাকা আমাদেরকে খরচ করতে হয় চ্যানেলটা যেন ভালো ভাবে দেখানো হয়। তাই ডিটিএইচ বা আইপি আসার আগ পর্যনৱ বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণা একটু সহ্য করতে হবে।

তবে চ্যানেলগুলো চাইলে এর মধ্যেও বিজ্ঞাপনের পরিমান কমানো যেতে পারে। এর জন্য দরকার প্রোগ্রাম প্ল্যানিং। বেশি বিজ্ঞাপন চালালে বিজ্ঞাপনও কেউ দেখে না।

প্রশ্ন: দেশে বিদেশী চানেলের আধিপত্য বন্ধে কী করা উচিৎ?

উত্তর: দেখুন একজন বাংলাদেশি পৃথিবীর যেকোনো জায়গাতেই থাকুক না কেন প্রথমে বাংলাদেশের চ্যানেল দেখতে চায়। না পেলে সহজলভ্য অন্য দেশের বাংলা চ্যানেলগুলো দেখার চেষ্টা করে। তাও না পেলে তখন অন্য চ্যানেল দেখে। ফলে এটা নিশ্চিনেৱ বলা যায়, দেখার উপযোগি কিছু থাকলে সবাই আমাদের চ্যানেল দেখবে। এর একটা জলজ্যানৱ প্রমান আমাদের ঈদের আয়োজনগুলো। তখন কিন্তু আমাদের টিআরপি অন্য যেকোনো বিদেশী চ্যানেলের চাইতে বেশি থাকে।

তাই এই কথা নিশ্চিনেৱ বলা যায় বিজ্ঞাপনের পরিমান কম দিয়ে ভালো অনুষ্ঠান দেখাতে পারলে আমাদের চ্যানেলগুলোই সবাই দেখবে। তবে কাজটা খুব কঠিন।

নেপাল বন্ধ করেছে অথচ আমরা পারছিনা কেন?

দেওয়ান শামসুর রকিব

অনুষ্ঠান প্রধান, আরটিভি

প্রশ্ন: বর্তমানে টিভি অনুষ্ঠানের মান কেমন?

উত্তর: মান সম্পন্ন অনুষ্ঠানের চেষ্টা সকলেই কম বেশী করে থাকে। প্রায় ৩০টির উপর চ্যানেল গুণগতমাণ বজায় না রাখতে পারলে আপনি টিকতে পারবেন না। আর তাই মান উন্নয়ণের জন্য সকলেই কাজ করছেন। আমাদের চ্যানেলের কথা বিশেষ ভাবে বলতে চাই, ভিন্নধর্মী অনুষ্ঠান পরিকল্পনা সারা বছর ধরেই করতে হচ্ছে। দর্শকের রুচি ও পছন্দের কথা বিবেচনা করে অনুষ্ঠান পরিকল্পনা থেকে এর বাসৱবায়ণে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। আপনি লক্ষ করে দেখবেন আরটিভিতে প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলো দর্শক নন্দিত হচ্ছে তার একটি কারণ চিনৱার বিচিত্রতা ও প্রমোশন পরিকল্পনা। কারণ অনুষ্ঠান নির্মাণ করলেই হবেনা, লোকে যেন দেখে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে প্রমোশনে।

প্রশ্ন: দর্শকদের কাছ থেকে প্রায়ই মনৱব্য শোনা যায় আমাদের টেলিভিশনগুলোতে ‘বিজ্ঞাপনের ফাঁকে অনুষ্ঠান, নাকি অনুষ্ঠানের ফাঁকে বিজ্ঞাপন এই নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নাই। আপনার মনৱব্য কী?

উত্তর: বিজ্ঞাপন চালাতে হবেই কারণ চ্যানেলের অধিকাংশ রেভেনিউ বিজ্ঞাপন নির্ভর। দর্শকদের কথা চিনৱা করে বিজ্ঞাপনকে সহনীয় পর্যায়ে আনার চেষ্টা চলছে। চলছে পরিকল্পনা- কিভাবে কম বিজ্ঞাপনে নাটক, অনুষ্ঠান ইত্যাদি প্রচার করা যায়। গত ঈদে দর্শকদের কথা ভেবেই বিরতিহীন ও স্বল্প বিরতির নাটক চালানোর পাশাপাশি একটি বড় বিজ্ঞাপন সংস্থাকে নেয়া হয়নি অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন চালাবনা বলেই। আমাদের পাশাপাশি অন্য টিভি চ্যানেলগুলো যদি এগিয়ে আসতো তাহলে বিজ্ঞাপন বিষয়ক অনেক পজেটিভ সিদ্ধানৱ নেয়া যেত। আরেকটি বিষয় আমাদের দেশে অবাধে বিদেশী চ্যানেল থাকায় বিশেষ করে পার্শ্ববর্তি দেশের চ্যানেলের কারণে এজেন্সিগুলো ঐসব চ্যানেল নির্ভর হয়ে পরছে। ফলে আমরা মানসম্পন্ন নাটক, অনুষ্ঠান প্রচার করেও বিজ্ঞাপন কমিয়ে রেট বাড়াবো তার সুযোগ খুব একটা পাচ্ছি না।

প্রশ্ন: দেশে বিদেশী চ্যানেলের আধিপত্য বন্ধে কী করা উচিৎ?

উত্তর: প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা। চ্যানেল মালিকদের এই বিষয়ে একমত হতে হবে। বিদেশী চ্যানেলের আধিপত্যে অলরেডি চ্যানেলগুলোতে ইনকাম কমে যাচ্ছে। পাশ্ববর্তি দেশে আমাদের চ্যানেল না দেখালে আমরা দেখাবো কেন? কদিন আগে তো নেপাল বন্ধ করেছে, আমরা পারছিনা কেন? শীঘ্রই এব্যাপারে সরকারী নীতিনির্ধারনীদেরকে বিষয়টি বোঝাতে হবে। আর এটা অবশ্যই চ্যানেল মালিকদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে। অন্যথায় চ্যানেলগুলো বড় ধরণের ঝুঁকির মধ্যে পরবে।