জলনূপুরের গান-মুকিত মজুমদার বাবু

জলনূপুরের গান-মুকিত মজুমদার বাবু

36
0
SHARE
POJ

‘বৃষ্টি পড়ে টিনের চালে

রিমঝিমিয়ে তালে তালে

শুনি জলনূপুরের গান

এসো করি ¯œান…’

বৈষ্ণব পদাবলি থেকে মধ্যযুগের দৌলত কাজী, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল কে না এঁকেছেন বর্ষার ছবি! তবে কবি কালিদাসের কথা না বললেই নয়। মহাকবি তার ‘মেঘদূত’ মহাকাব্যে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বিরহ কাতর যক্ষ মেঘ’কে দূত করে কৈলাশে পাঠিয়েছিলেন তার প্রিয়ার কাছে। যক্ষের সে বিরহ বারতা মেঘদূত যেন সঞ্চারিত করে চলেছে প্রতিটি বিরহ কাতর বাঙালির চিত্তে, যুগ হতে যুগান্তরে। বর্ষার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে সাহিত্য সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে চলমান রয়েছে বর্ষা-সাহিত্য। সমৃদ্ধ হচ্ছে বাংলা সাহিত্য ভাÐার।

বর্ষা বিরহের ঋতু। বর্ষা মিলনের ঋতু। বর্ষাতেই পূর্ণতা পায় প্রকৃতি, ফিরে পায় যৌবনের স্বাদ। গ্রীষ্মের প্রচÐ দাবদাহ পেরিয়ে আসে বর্ষা। ঋতু পরিক্রমায় বাংলার প্রকৃতিতে দ্বিতীয় ঋতু।

বর্ষা মানেই চারদিক কুয়াশার মতো অস্পষ্টতা নিয়ে ঝুম বৃষ্টি। দিনে-দুপুরেও সৃষ্টি হয় রাতের আবহ। একটানা বৃষ্টির শো শো শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। পথ-ঘাট প্রায় ফাঁকা থাকে। জরুরি কোনো কাজ না থাকলে কেউ বাইরে বেরোয় না। আকাশভাঙা বারিধারায় কানায় কানায় ভরে ওঠে তলাফাটা নদ-নদী, পুকুর-নালা, হাওর-বাঁওড়সহ ছোট-বড় জলাশয়। বয়ে চলে ¯্রােতধারা। ফিরে পায় যৌবনের দুর্দমনীয় স্বাদ। গ্রীষ্মের খরতাপে পুড়ে খাক হয়ে যাওয়া মহীরুহ বৃষ্টির পানিতে ¯œান করে ফিরে পায় গাঢ় সবুজের ¯িœগ্ধতা, হয়ে ওঠে রূপ-মাধুর্যে অনন্যা লাবণ্যময়ী রূপসী।

ঝুম বৃষ্টিতে প্রায়ই দেখা যায় গাছের ডালে জুবুথুবু হয়ে বসে থাকা কাক। বৃষ্টিকে উপভোগ করে মনে-প্রাণে। ওর ভেতর কোনো তাড়া থাকে না। খাবার খোঁজার কোনো বেগ থাকে না। নীড়ে ফেরার কোনো উদ্বেগ থাকে না। মাছ ধরার আশায় ধ্যানী বকের মতো কাকও বৃষ্টিসুধায় মনের ক্ষুধা মেটায়। আসলে তাকে পেয়ে বসে বৃষ্টিবিলাসে।

এই দিনে মনে পড়ে ছোটবেলার কথা, ফেলে আসা দিনগুলোর কথাÑ বৃষ্টিবিলাসী মন ছিল আমার। বৃষ্টি নামলেই মহল্লার ছেলেরা মিলে দল বেঁধে বৃষ্টিতে ভিজতাম। কখনো কখনো ফুটবল খেলতাম কাদা-পানিতে মাখামাখি মাঠে গিয়ে। দৌড়াতে গিয়ে আছাড় খেয়ে সরাৎ করে চলে যেতাম চার পাঁচ হাত দূরে। কেটে যেত শরীরের কোনো কোনো জায়গায়। সেদিকে কোনো খেয়ালই থাকত না। মনে হতো কিচ্ছু হয়নি। আবার বলের পেছনে ছুটতাম। সে এক অন্যরকম অনুভূতি! মাঝে মাঝে একা একা বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগত। ঝুম বৃষ্টিতে কোনো নির্জন সবুজ ঘাসের মাঠে আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে ভালো লাগত। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো সুচের মতো মুখে-গায়ে এসে মিলিয়ে যেত। আকাশের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতাম সুতা বেয়ে বৃষ্টি নেমে আসার অলৌকিত দৃশ্য। ঠোঁটের ভেতর দিয়ে গালের ভেতর ভরে উঠত বৃষ্টির জল। মনের ভেতর বৃষ্টির ঢেউ এমনভাবে দোলা দিত যে মাঝে মাঝে একা একা গলা ছেড়ে চিৎকার করতাম।উচ্ছ¡সিত দেহ-মন অপূর্ব এক ভালোলাগায় ভরে উঠত। ছোটবেলার সেই ভালোলাগা বড় হয়ে অনেকবার অনুভব করার চেষ্টা করেছি। ছোটবেলার সে বৃষ্টিকাব্য কোনোভাবেই মেলেনি বড়বেলার জীবনকাব্যের সঙ্গে। বারবার খেই হারিয়ে ফেলেছি। যে দিনগুলো যায় তা আর কোনোদিন ফিরে আসে না! বর্ষাঘেরা এ দিনগুলোয় নিজের ভেতরটাকে রোমন্থন করে ফেরে মানুষ।

বর্ষা মানেই চারদিক আলোকিত করে চকচকে রোদ্দুরে ভেসে ওঠে পৃথিবী। পরক্ষণেই মেঘের কালো ছায়া সূর্যকে গিলে খেয়ে কাঁদতে শুরু করে স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে। এই রোদ, এই বৃষ্টি, ক্ষণে ক্ষণে মেঘের রঙ বদলানো ছদ্মবেশ, গুড়গুড় গর্জনে কেঁপে কেঁপে ওঠা ধরিত্রী, নামে অঝোর ধারায় বৃষ্টি… সবমিলে প্রকৃতির লুকোচুরি খেলার ঋতু হলো বর্ষা।

বর্ষায় অপূর্ণ প্রকৃতি ফিরে পেয়েছে পূর্ণতা। দিগন্ত বিস্তীর্ণ আউশ আর পাটের খেত যেন বাংলার প্রকৃতিকে করে তুলেছে চিত্রকরের পরিপাটি কোনো নিসর্গের ছবি। সে ছবিকে আরো উদ্ভাসিত করে তুলেছে কদম, কামিনী, কেয়া, টগর, জুঁই, পদ্ম, মালতী, পিত্তরাজ, কেয়া, রজনীগন্ধসহ আরও কয়েক প্রজাতির গুল্ম ও ফুলবতী বৃক্ষ।

ঋতুবৈচিত্র্যের সোনার বাংলায় বর্ষা আসে। সঙ্গে নিয়ে আসে অবিরল বারিধারা। প্রকৃতি সাজে রঙবাহারি সাজে। বর্ষার অপরূপ সাজ যেমন আছে তেমনি আছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের দানবীয় নৃত্য। অতিবৃষ্টি, বন্যা, ফসলহানি ও পাহাড় ধসের মতো প্রকৃতির অভিশাপে সর্বস্বান্ত হয়ে যায় মানুষ। তারপরও ঋতুবৈচিত্র্যে বর্ষা আসে প্রকৃতির এক অনন্য ঋতু হয়ে।

লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন