জন্মদিনে স্মৃতি কাতর এক আড্ডা-সুবর্না হক

জন্মদিনে স্মৃতি কাতর এক আড্ডা-সুবর্না হক

34
SHARE
Aly-Zaker-family

জন্মদিনের অনুষ্ঠান কতটা আনন্দমুখর ও ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠতে পারে তার প্রমাণ মিলল ৬ নভেম্বর চ্যানেল আই-এর একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। সেদিন ছিল আমাদের শোবিজের দুই আলোচিত তারকা পিতা-পুত্র আলী যাকের এবং ইরেশ যাকেরের শুভ জন্মদিন। চ্যানেল আই-এর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান তারকাকথন-এর সেদিনের পর্বটি পিতা-পুত্রের কর্মস্থল থেকেই সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। অনুষ্ঠানটিতে ছিল চমকের পর চমক। আলী যাকের ও ইরেশ যাকেরকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে আসেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, ফারুক হোসেন ও জিয়াউল হাসান কিসলু। এবং দেশের বিশিষ্ট বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান এশিয়াটিকের কর্মকর্তা ও কর্মীবৃন্দ সঙ্গে ছিলেন সারা যাকের এবং চ্যানেল আই-এর পক্ষে দিলরুবা সাথী। অনুষ্ঠানের শুরুতেই ফুলের শুভেচ্ছা নিয়ে হাজির হলেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার। আলী যাকের অভিভূত কণ্ঠে তাকে ‘বস’ বলে সম্মোধন করলেন। এরপর একে একে এলেন অন্যরা। অনুষ্ঠানটি জমজমাট এক আড্ডায় মুখর হয়ে উঠল। আলী যাকের সহ সকলে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। এক পর্যায়ে সেখানে উপস্থিত হন ইরেশ যাকের।

মামুনুর রশীদ: (উৎফুল্ল) আরে আজ ইরশেরও জন্মদিন নাকি?

সারা যাকের: একটা রাত… এখনও জন্ম হয়নি হবে…

আলী যাকের: তাহলে তো আমারও হয়নি… আমার জন্ম রাত দশটায়…

সাথী: তাহলে পুত্রের আগে, পিতার পরে…

আলী যাকের: হ্যাঁ। ও আমার চেয়ে দুই ঘণ্টার বড়… কিন্তু ওর আসার কথা ছিল অক্টোবরের শেষে… আমরা সেই আশায় ছিলাম। সারার জন্ম যেহেতু ২১ অক্টোবর.. ওরও অক্টোবরেই জন্ম হবে। কিন্তু সেটা হলো না। ডিলে করতে করতে করতে ৬ নভেম্বর ওর জন্ম হলো…

সারা যাকের: সে কালে কিন্তু সিজারিয়ানের সুবিধা ছিল না। ন্যাচারাল বার্থ হয়েছে। লোপা ও ফেরদৌসী আপার জন্মদিনও একই দিনে…

সাথী: জন্মদিনের তো অনেক স্মৃতি। ইরেশ যাকেরের জন্মদিনের স্মৃতি জানতে চাইÑ

ইরেশ যাকের: আমার কিছু মনে নাই। মাকে জিজ্ঞেস করেন।

মামুনুর রশীদ: ভালো বলেছে… মাকেই জিজ্ঞেস করো।

সারা যাকের: যেটা হয়েছিল যে… ও আমাদের ফ্যামিলির প্রথম সন্তান। ওকে নিয়ে সবার সেকি আগ্রহ আর হৈচৈ। সেটা আমাদের পরিবার, নাটকের দল সবখানেই দৃশ্যমান ছিল। যেনো পৃথিবীতে এই প্রথম কোনো শিশুর জন্ম হয়েছে…

মামুনুর রশীদ: উৎসব মুখর অবস্থা…

সারা যাকের: সবার মাঝে অনেক আনন্দ, অনেক উচ্ছ¡লতা…

সাথী: (ইরেশ যাকেরকে উদ্দেশ্য করে) আজ বাবাকে উইশ করেছেন কীভাবে?

ইরেশ: রাত বারোটায় বাবাকে জন্মদিনের ফুল উপহার দিয়েছি।

আলী যাকের: আমি তো এটা আশাই করিনি। আমি শুতে গেছি। তখন দেখি ও ফুল নিয়ে হাজির।

সাথী: (রামেন্দু মজুমদারকে উদ্দেশ্য করে) আলী যাকের সম্পর্কে আপনার কাছ থেকে কিছু শুনতে চাই।

রামেন্দু মজুমদার: সামনা সামনি বলা খুবই মুশকিল। যাই হোক, গত বছরও যাকেরের জন্মদিনে উপস্থিত ছিলাম। এর মধ্যে যাকের অসুস্থ ছিল। সবার শুভেচ্ছা ও করুনাময়ের আশীর্বাদে সে এখন অনেক সুস্থ। আমরা অপেক্ষায় আছি ও আবার মঞ্চে ফিরে আসবে। তার জন্য একটা নাটকও তৈরি হচ্ছে। ওর সঙ্গে ফেরদৌসী অভিনয় করবে। এছাড়াও যাকের অন্যান্য নাটকেও ফিরে আসবে। অন্য নাটক করবে এটা আমার প্রত্যাশা। এই আশায় আছি আমরা।

আলী যাকের: অবশ্যই চেষ্টা করব। মঞ্চই তো আমার প্রথম ভালোবাসা।

রামেন্দু মজুমদার: ঐটাই তো আমাদের মূল ভরসা। সেখানে আবার যাকেরের পূর্ণজন্ম হবে…

মামুনুর রশীদ: একটা নতুন নাটকে যাকেরের পূর্ণজন্ম হবে। আমরা সেটাও সেলিব্রেট করবো।

জিয়াউল হাসান কিসলু: গ্যালিলিও নাটকটা যদি আবার আনা যায়…

আলী যাকের: হ্যাঁ। সেটাই নামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। ডিউরেশন হবে এক ঘণ্টা ২০ মিনিট।

রামেন্দু মজুমদার: তবে আমি মনে করি পুরনো নাটকের পাশাপাশি নতুন নাটকও করা দরকার।

আলী যাকের: এক্ষেত্রে আমার কিছু সমস্যা আছে। যেমন ধরো স্ট্যামিনার পাশাপাশি সময় ও ধৈর্য্যরেও ব্যাপার। আসলে ইচ্ছেটাই আসল। ইচ্ছে থাকলে সেটাকে দমিয়ে রাখা ঠিক নয়।

মামুনুর রশীদ: গৌতম হালদার একটা নাটক করে, দেড় ঘণ্টার… চেয়ারে বসে…

আলী যাকের: গৌতম মানে কলকাতার নান্দিকারের গৌতম…

মামুনুর রশীদ: হ্যাঁ হ্যাঁ… চেয়ারে বসে দেড় ঘণ্টা অভিনয় করা…

সারা যাকের: (আলী যাকেরের উদ্দেশ্যে) সুতরাং তুমি আশাবাদী হতে পার।

আলী যাকের: গৌতম তো সুস্থ মানুষ। আমি তো…

মামুনুর রশীদ: কে বললো? ওর তো ক্যান্সার।

ইরেশ যাকের: আমি একটু কথা বলব। এখানে শুধুমাত্র মঞ্চ নিয়ে কথা হচ্ছে… টেলিভিশন নিয়েও কথা বলা দরকার। আমাদের যারা এখন কাজ করছে… তাদের ব্যাপারেও আলোচনা জরুরি।

আলী যাকের: নিশ্চয়ই… তোমরাও মঞ্চে আসো…

ইরেশ: আমরা যেটা পারি সেটার দিকেও তো নজর দিতে হবে।

আলী যাকের: (ইরেশকে থামিয়ে দিয়ে) ইরেশ তোমাকে একটা কথা বলি, একটা সংলাপ যখন বলবে মঞ্চে, তখন দেখবে দর্শকের মনের ভেতর সরাসরি হিট করছে। তখনকার ভালো লাগাটা সত্যি অসাধারণ। এখানে গ্যালিলিওর কথা উঠেছে। আমাদের অভিনয় দেখে মঞ্চের সামনে বসে দর্শক কাঁদছেন… এটা কীভাবে সম্ভব? এটা অন্য এক অনুভূতি…

ইরেশ: আমি মঞ্চের প্রতি আস্থা রেখেই বলছি মঞ্চ টিকে থাকবে। কিন্তু টিভি মিডিয়ার করুণ অবস্থা হবে। হয়তো অচিরেই মারা যাবে। না না হাসার কিছু নাই… আমাদের যে অবস্থা এখন তাতে অনেক কিছুই ভাববার প্রয়োজন আছে।

আলী যাকের: আস্তে আস্তে আমাদের টেলিভিশন জগতে বুদ্ধিমান লোকদের ইয়ে হবে… বাংলাদেশের প্রতিটি যুবক যুবতী মনে করে যে অভিনেতা বা অভিনেত্রী হয়েই গেছে। এটা ঠিক নয়। তবে এটা সত্য-ভালোরাই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে।

জিয়াউল হাসান কিসলু: মামুন ভাই আগে টিভির জন্য অনেক নাটক লিখতেন। এখন সেই দায়িত্বটা নিতে পারেন। তাহলে এই দিকে দর্শক আবার…

মামুনুর রশীদ: কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে টেলিভিশন চ্যানেলগুলো নাটকের জন্য এখন যে পরিমাণ পয়সা দেয় তা দিয়ে সাহস পাওয়া যায় না।

আলী যাকের: এক্ষেত্রে আমার একটা বক্তব্য আছে। প্রায়শই একটা কথা শুনি দর্শক এটা চায় না ওটা চায় না… ইত্যাদি। এগুলো সবই মিথ্যা কথা। মামুন একটা নাটক লিখলো। নির্দেশনা দিল। সেই নাটকে তথাকথিত ভালো অভিনেতা অভিনেত্রী না থাকলেও আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি সেই নাটকের দর্শক অনেক বেশি হবে। ভালো নাটক হলে দর্শক সেটা দেখবেই…

সাথী: ইরেশও বোধকরি সেই কথাটাই বলতে চেয়েছিলেন। মঞ্চের জায়গাটা ভীষণ রকমের সমৃদ্ধ ও পরিপূর্ণ। সেই তুলনায় টেলিভিশন একটু যেন পিছিয়ে আছে… এখানেও দিক নির্দেশনা দেবার মতো মানুষ দরকার। আমার বেশ ভালো লাগছে আলী যাকের একজন মুক্তিযোদ্ধা, মামুনুর রশীদও একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমরা তাদের সামনে বসে কথা বলছি…

আলী যাকের: (সাথীর কথা কেড়ে নিয়ে) মামুন না থাকলে কিন্তু আমার নাটকে আসা হতো না।

মামুনুর রশীদ: কলকাতায় বসেই ওর সঙ্গে কথা হয়েছিল… দেশ স্বাধীন হলে আমরা মঞ্চ নাটক করবো। তখন আমরা কলকাতার মঞ্চ নাটক দেখছি। অনেকের সঙ্গেই পরিচয় হয়েছে। নাটকের পোকা মাথায় ঢুকে গেছে…

জিয়াউল হাসান কিসলু: ঢাকায় ফিরে আপনারা যে নাটকটি দিয়ে মঞ্চের যাত্রা শুরু করেছিলেন তার নাম বোধকরি ‘কবর’ ছিল।

মামুনুর রশীদ: হ্যাঁ, কবর। এই নাটকের সেন্ট্রাল ক্যারেকটার, নেতা সেটা যাকের করেছিল। সুভাষ দত্ত দারোগার অভিনয় করেছিলেন। রামেন্দু দা এই নাটকের একটা রিভিউ লিখেছিলেন। অসাধারণ ছিল সেটা। সেখানে তিনি লিখেছিলেন মুনীর চৌধুরী তাঁর জীবদ্দশায় এমন একটি সুন্দর নাট্য প্রযোজনা দেখে যেতে পারলেন না।

এরপর আড্ডা চলতেই থাকে। এক পর্যায়ে ফুলের শুভেচ্ছা নিয়ে হাজির হন এশিয়াটিকের এক ঝাক নবীণ, প্রবীণ কর্মকর্তা কর্মচারী। শ্রদ্ধা-ভালোবাসার সঙ্গে মায়া-আর মমতায় জড়ানো জন্মদিনের এই আড্ডাটি অজান্তেই ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।