Home আরোও বিভাগ টিভি গাইড ছোট পর্দার বড় গল্প

ছোট পর্দার বড় গল্প

SHARE
Shat-Bhai-Chompa

সৈয়দ ইকবাল
ধরা যাক এই দেশে কোনো টেলিভিশন নাই, রেডিও নাই। অথবা রেডিও টেলিভিশন ছিল হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে, আর চলছে না। তখন অবস্থাটা কি হবে? সবাই কি স্বাভাবিক ভাবে ব্যাপারটা মেনে নিবে? বোধকরি না। একটা হৈ চৈ, হাহাকার শুরু হয়ে যাবে। সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড় শুরু হবে। ঘরে ঘরে অস্থিরতা দেখা দিবে। আবেগ উত্তেজনায় পাড়া মহল্লা থেকে হয়তো বিক্ষোভ মিছিলও বের হতে পারেÑ টিভি চ্যানেল বন্ধ কেন কর্তৃপক্ষের জবাব চাই। রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও তোলপাড় শুরু হয়ে যাবে। কেন বন্ধ হলো টেলিভিশন? তাও আবার সবগুলোই… রহস্য কি? আমার ধারণা এক দেড়ঘণ্টা এমন অবস্থা হলে গোটা দেশের পরিবেশ বদলে যাবে। দেশের মানুষ অস্থির হয়ে উঠবে।
তার মানে এটা প্রমাণিত টেলিভিশন অনুষ্ঠান এই দেশে প্রতিটি পরিবারের আড্ডা, বিনোদনের অংশ হয়ে উঠেছে। কথায় আছে দেশের মানুষ টেলিভিশন খায়, টেলিভিশন নিয়ে ঘুমায়, টেলিভিশন দেখেই নিজেদের জীবনের স্বপ্ন সাজায়। শেখ আব্দুল করিম নামে একজন ব্যাংকারের সঙ্গে কথা হলো। প্রসঙ্গ তুলতেই বললেন, কি বলেন ভাই টেলিভিশন ছাড়া এক মুহূর্ত চলা মুশকিল। আমার সকালটাই শুরু হয় টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখে। ফজরের নামাজ শেষ করে টেলিভিশন ছেড়ে দিয়ে দিনের কর্মসূচি সাজাই। টেলিভিশনে অনুষ্ঠান চলতে থাকে। কখনও দেখি আবার কখনও দেখি না। প্রায় সকালে চ্যানেল আই-এর ‘গানে গানে সকাল শুরু’ অনুষ্ঠানটা দেখি। অনুষ্ঠানে গান বাজে। গান শুনতে শুনতে প্রয়োজনীয় কাজ সারি। একদিনের কথা বলি। ভোরে উঠে নামাজ সেরে টেলিভিশন ছেড়ে দিয়েছি। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। গোটা সকাল আর বিদ্যুৎ আসে না। বাড়ির জেনারেটরও নষ্ট। শেষমেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখা হলো না। অফিসে যাওয়ার সময় বুঝলাম, কী যেন আজ দেখিনি… অফিসে মন বসাতে পারিনি।
ফাহমিদা আকতার নামে এক গৃহিণী বললেন, যে যাই বলুক টেলিভিশন অনুষ্ঠান না দেখে আমি একদÐও থাকতে পারি না। সকালে পরিবারের সকলে স্কুল কলেজ অথবা অফিসে চলে যায়। বাসায় আমি আর কাজের মেয়ে। কাজের মেয়ে তার কাজে ব্যস্ত থাকে। আমি ব্যস্ত থাকি টেলিভিশন নিয়ে। পছন্দের অনুষ্ঠান দেখে সময় কাটাই। টেলিভিশন চালু থাকলে মনে হয় কেউ একজন আমার সঙ্গে আছে। হাসছে খেলছে। কথা বলছে… কী বললেন হঠাৎ যদি দেখি টেলিভিশন নাই? বালাইষাট! টেলিভিশন থাকবে না কেন? টেলিভিশন না থাকলে তো আমি পাগল হয়ে যাব। ওহ! মাই গড! আমি একথা ভাবতেই পারছি না।
আসমা আকতার নামে একজন গৃহিণী বললেন একমজার ঘটনা। তার বাসায় কাজের মেয়ে নিয়োগ দেয়া হবে। মধ্যবয়স্ক এক নারী এলো সাক্ষাৎকার দিতে। আসমা আকতার তার সঙ্গে কথা বলে মোটামুটি খুশি। কথা ফাইনাল করতে যাবেন, হঠাৎ কাজের মেয়েটি তার কাছে একটা শর্ত দিল। মেম সাহেব আমার একটা কথা আছে। আসমা আকতার অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, কি কথা বলো? কাজের মেয়েটি সরাসরি বলল, আমাদের বাসায় টেলিভিশন কয়টা? বুঝতে না পেরে আসমা আকতার পাল্টা প্রশ্ন করলোÑ তোমার কথা বুঝলাম না। বুঝিয়ে বল। টেলিভিশন কয়টা মানে… একথার অর্থ কি? কাজের মেয়েটি এবার মৃদু হেসে বলল, মেম সাহেব আমি বলতে চাইছিলাম আপনাদের বাসায় টেলিভিশন কয়টা? আমি আবার ড্রয়িং রুমে সবার সঙ্গে বইস্যা টেলিভিশন দেখতে মজা পাই না। আমার জন্য আলাদা একটা টেলিভিশন লাগবে। বেশি বড় সাইজের না হলেও চলবে… তবে কালার টিভি হওয়া চাই… টেলিভিশনে অনুষ্ঠান না দেখলে আমি আবার কামে কাজে মন বসাইতে পারি না…
বুঝুন এবার টেলিভিশনের প্রভাব কতখানি? শুধু বাসাবাড়িতে নয় অফিস আদালতেও টেলিভিশন ছাড়া চলে না। প্রায় প্রতিটি অফিসে ঢুকলেই দেখবেন সুবিধা মতো জায়গায় দেওয়ালে ঝুলছে টেলিভিশন। আসা যাওয়ার পথে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখছেন। হঠাৎ হয়তো একজন টেলিভিশন সেটের সামনে দাঁড়িয়ে অন্য সবাইকে আসতে বললেন। ঘটনা কি? ঘটনা হলো, শহরে নতুন একটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। চার জনের মৃত্যু। প্রকাশ্য দিবালোকে বাসার ভেতরে ঢুকে খুন করে পালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। টেলিভিশনের স্ক্রলে যাচ্ছে খবরটা। মুহূর্তে অফিসের সবার কাছে খবরটা পৌঁছে গেল। আবার এমন হয়, বিদেশে বাংলাদেশের সাফল্যের খবর বেড়িয়েছে। স্ক্রলে দেখাচ্ছে খবরটা। তাই দেখে অফিসের সবাই উচ্ছ¡সিত। মোবাইলে ম্যাসেজ পাঠানো শুরু হলো। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো ফেসবুক চর্চাÑ গুডলাক বাংলাদেশ!
শুধু শহরের বাসা-বাড়ি, অফিস আদালত নয় গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও টেলিভিশন জনজীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। কুড়িগ্রাম জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে একটি গ্রামীণ বাজারের নাম করকের হাট। সকাল থেকে গভীর রাত অবধি এই হাটে বেচাকেনা চলে। প্রশ্ন উঠতে পারে গভীর রাতেও কি বেচাকেনার জন্য হাটে থাকে মানুষ? না, তা থাকে না। থাকে একটা বিশেষ আকর্ষণে। তাহলো টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখা। এই হাটে একশরও বেশি ছোট বড় টেলিভিশন সেট আছে। টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখার জন্য সাধারণ মানুষের এত আগ্রহ। বিশেষ করে ওই হাটের ৫টি হোটেলে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। মানুষ চা খায়, মিষ্টি খায়, কেউ আবার রাতের খাবার ভাত খেতে খেতে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখে। একটি হোটেলের মালিক জানালেন, কোনো কারণে একদিন ডিশ লাইনের অসুবিধা হয়েছিল। টিভির অনুষ্ঠান দেখা যাচ্ছিল না। মানুষজন অস্থির হয়ে উঠেছিল। বারবার আসে আর জিজ্ঞেস করেÑ ভাই আজ টিভি খুলবে না। আহ্হারে সিরিয়ালটাতো মিস করলাম…
সিরিয়াল মানে তারা কি বাংলাদেশের কোনো টিভি সিরিয়ালের কথা বলে? প্রশ্ন করতেই বয়স্ক দোকানদার একটু যেন বিরক্ত হলেন; না ভাই ওরা দেশের টেলিভিশন দেখতে চায় না। পাশের দেশের টেলিভিশনের ‘জগড়া বাঁধানো’ সিরিয়াল দেখার জন্য আসে। কতবার চেষ্টা করেছি বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল চালু রাখি। ওমা, অনেকেই প্রতিবাদ করে। বলে ভাই জি বাংলা দ্যান, সিনেমা লাগান… বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়ি বিদেশে যাই। না যায়াতো উপায় নাই। গ্রাহকের কথা মতো চ্যানেল চালু না রাখলে তো তারা চলে যাবে। আমার ব্যবসার ক্ষতি হবে।
কথায় কথায় অনেক অভিযোগ করলেন ওই দোকানদার। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, ভাই আপনি আমাকে একটা প্রশ্নের জবাব দেন তো… বাংলাদেশে ২০টারও বেশি টেলিভিশন চ্যানেল আছে। তারা কি দর্শকের পছন্দের কথা ভেবে অনুষ্ঠান বানায়। গ্রামগঞ্জের অধিকাংশ দর্শক পাশের দেশের টিভি অনুষ্ঠান দেখে, চ্যানেল মালিকরা কি এই খবর জানে না? আমি আমার হোটেলের টিভিতে বিদেশি অনুষ্ঠান চালাইতে চাই না। কিন্তু বাধ্য হয়ে চালাই…
আমরা আগেই বলেছি এই দেশের মানুষ, টেলিভিশন খায়, টেলিভিশন দেখেই ঘুমায়। টেলিভিশন না থাকলে তাদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ তারা টেলিভিশনে কি দেখে? তারা কি টেলিভিশনে বাংলাদেশকে দেখে? আমরা সংক্ষিপ্ত আকারে একটা সার্ভে করেছিলাম। ঢাকার একটি বস্তির ১৫টি পরিবারের খোঁজ নিয়ে দেখেছি (বেলা সাড়ে ৪টা থেকে সন্ধ্যে ৭টা) ১০টি পরিবারই টিভিতে সিনেমা দেখছে। তার মধ্যে ৭টি দেখছে পাশের দেশের হিন্দি সিনেমা আর ৩টি পরিবার দেখছে বাংলাদেশের সিনেমা। বাকি ৫টি পরিবারের একটিতে বাংলাদেশের একটি টেলিভিশন চ্যানেলে খেলা দেখাচ্ছে। অন্য ৪টিতে বিদেশি অনুষ্ঠান চলছে কিন্তু টিভির সামনে দর্শক নাই। বস্তির কয়েকজনের সঙ্গে কথা হলো। প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশে এত টিভি চ্যানেল থাকতে আপনারা বিদেশি টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখছেন কেন? প্রথমে কেউই কথা বলতে চাইল না। এক পর্যায়ে একজন বয়স্ক লোক সাহস করে এগিয়ে এলো। পরনে লুঙ্গি। ঘাড়ে ঝুলানো গামছা। প্রায় প্রতিবাদের সুরে বলল, ভাই বাংলাদেশের কোন টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখবো? আপনিই বইল্যা দেন তো… সব টিভির অনুষ্ঠান তো একই রকম। সন্ধ্যা হইতে না হইতেই সব টিভিতে সংবাদ দেখানো শুরু হয়। তারপর একটু রাইত হইলেই শুরু হয় ঝগড়ার অনুষ্ঠান। গভীর রাইতে অধিকাংশ টিভি চ্যানেলে একই সঙ্গে গানের অনুষ্ঠান শুরু হয়। আমরা তো ভাই খাইট্যা খাওয়া মানুষ। দিনে কাজ করি। রাইতে তো ঘুমাইতে হয়। কাজেই রাইত দুপুরের গানকে শুনবে? আপনি হয়তো ভাই নাটকের কথা বলতে পারেন। আমাদের দেশে টিভি নাটকও কি সেই ভাবে হয়? তাছাড়া নাটকের মাঝে যে হারে বিজ্ঞাপন দেখায় তাতে অনেক সময় নাটকের কাহিনী ভুলে যাই। ভাই, আমাদের এই কথাগুলো কি টিভি চ্যানেলের মালিকেরা ভাবে না? আমরা দেশের টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানই দেখতে চাই…
ranga sokalবস্তির বাইরে ঢাকা শহরের ৫০টি অগ্রসরমান পরিবারের খোঁজ নিয়েছি আমরা। এই পরিবারগুলোর অধিকাংশের ক্ষেত্রে বাসায় একাধিক টেলিভিশন সেট আছে। ড্রয়িংরুমে, একটা বেড রুমে, একটা আবার ছেলে অথবা মেয়ের রুমে আরেকটা। পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বয়োজ্যেষ্ঠরা বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল দেখে। বিশেষ করে খবরের ক্ষেত্রে দেশীয় টিভি চ্যানেলই তাদের ভরসা। আর রাতের নানামুখি টকশোও দেখে থাকেন তারা। কিন্তু পরিবারের তরুণ প্রজন্ম কিছুটা দ্বিধা বিভক্ত। বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলের প্রতি তাদের খুব একটা টান নেই। কারও কারও মন্তব্যÑ বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলের অধিকাংশ অনুষ্ঠান ব্যাকডেটেড। আধুনিকতার ছোঁয়া নাই। এ ধরনের দুই একটা অনুষ্ঠানের নাম বলতে বলা হলে সকলেই আমতা আমতা সুরে জানায়Ñ আমি ঠিক… বাংলাদেশের টিভি দেখি না।
তাহলে কি দেখে তারা? উত্তর একটাই বিদেশি টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখে। ফেসবুকের কল্যাণে মোবাইলে বিদেশি অনুষ্ঠান দেখে অধিকাংশ তরুণ। ফলে বাংলাদেশের তারকাদের চেয়ে বিদেশি অখ্যাত তারকাও তাদের কাছে অনেক জনপ্রিয়।
প্রসঙ্গটি তুলেছিলাম বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের কাছে। তিনি বললেন, তরুণদের দোষ দিয়ে লাভ নাই। সময় পাল্টে গেছে। সেই তুলনায় আমাদের টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর অনেকেই প্রকৃতপক্ষে তৈরি না হয়েই স্টেশন চালাচ্ছে। নাটকের কথাই যদি ধরি। রমনা পার্কের প্রেম এখন আর নাটকে চলে না। প্রেমের ধরন পাল্টেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে তরুণ-তরুণীরা খুব সহজেই পৃথিবীর খুটিনাটি জানতে পারছে। কাজেই তাদের জন্য টিভি অনুষ্ঠান বানাতে হলে অনুষ্ঠানের কনটেস্ট যেমন আধুনিক হতে হবে তেমনি নির্মাণ ভাবনাতেও সময়ের বিবেচনায় আধুনিক কারিগরি সহায়তাকে যুক্ত করা জরুরি। অথচ অধিকাংশ টেলিভিশন চ্যানেলের এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা নাই।
লেখার শুরুতে বলেছিলাম আমাদের দেশের মানুষ টেলিভিশন খায়, টেলিভিশন নিয়েই ঘুমায়, টেলিভিশনকে ঘিরেই কাটে তাদের দিনরাত্রি। কিন্তু তারা টেলিভিশনে আদৌ কি দেখে? আমার বাংলাদেশকে দেখে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে অনেকেই হয়তো বিব্রত বোধ করবেন। তার মানে আমাদের ২০/২২টি টেলিভিশন চ্যানেল কার্যকর থাকা সত্তে¡ও এক শ্রেণির দর্শক বিশেষ করে মহিলা দর্শক পাশের দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের রুচিহীন অনুষ্ঠানের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। চিত্রটা আমাদের সবার কাছে স্পষ্ট। তবুও কেন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না এটাই কোটি টাকার প্রশ্ন!
পে চ্যানেলের কথা উঠেছে। অর্থাৎ দর্শক অর্থের বিনিময়ে নির্ধারিত টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান দেখবে। বাংলাদেশের টিভি অনুষ্ঠানের মান বাড়ানোর জন্য পে চ্যানেলের ব্যবস্থা করা হবে। ধরা যাক একজন দর্শক দেশের ৫টি টিভি চ্যানেল সাবসক্রাইভ করেছে। কিন্তু এক সময় তিনি দেখতে পেলেন ৫টি টিভি চ্যানেলের ২টি ভালো অনুষ্ঠান করছে না। বন্ধু করে দিলেন দুটি চ্যানেল। এর ফলে চ্যানেলগুলোর ক্ষেত্রে ভালো অনুষ্ঠান বানানোর প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব বৃদ্ধি পাবে। সকলে দর্শকের পছন্দের কথা ভেবে অনুষ্ঠান নির্মাণে আগ্রহী হবে। আমাদের বিশ্বাস বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ক্ষেত্রে পে চ্যানেল ব্যবস্থা চালু করলে কাজের কাজ একটা হতেই পারে। এখানে কাজের কাজ বলতে বোঝানো হচ্ছে নিজেদের টিভি চ্যানেলে প্রতি দর্শকের আগ্রহ গড়ে তোলা।

সময়টা কিছুটা হলেও ইতিবাচক!

mustafa_kamal_syedমোস্তফা কামাল সৈয়দ, অনুষ্ঠান প্রধান, এনটিভি
আমাদের টেলিভিশন মিডিয়ার অনেক প্রসারতা লাভ করেছে। সেই একটিমাত্র টেলিভিশন বিটিভি থেকে আমাদের স্বপ্নের যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে দেশে প্রায় ৩০টির মতো টিভি চ্যানেল কার্যকর। এই দিক থেকে আমাদের টেলিভিশন মিডিয়া ব্যাপকতা লাভ করেছে। তবে একথা সত্য দর্শকের পছন্দমতো অনুষ্ঠান হচ্ছেনা। পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে আমাদের প্রতিযোগিতা। আমাদের দেশে তাদের টিভি চ্যানেলের অবাধ সম্প্রচার হওয়া এবং আমাদের চ্যানেল তাদের দেশে প্রচার না হওয়া সবকিছু মিলিয়ে আমাদের টিভি চ্যানেল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আর বর্তমানে ইউটিউবসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটা প্রভাব তো রয়েছেই। এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বেশ জনপ্রিয়। তাই যুগ উপযোগী চিন্তা ভাবনা এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টেলিভিশনকে দর্শকদের পেছনে দৌঁড়াতে হচ্ছে। তবে কিছুটা হলেও ইতিবাচক সময় যাচ্ছে। একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয় সেটা হলো নাটকে বিজ্ঞাপনের এতো বেশি আধিক্য থাকে যে, অনেক সময় মনে হয় নাটক দেখি নাকি বিজ্ঞাপন দেখি। তবে বিভিন্ন উৎসব পার্বণে বিরতিহীন নাটক সম্প্রচর করা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তাই এই বিষয়টা সামগ্রিকভাবে সারাবছরই করা উচিত। এতে করে দর্শক আরো চ্যানেল মুখী হবে।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে যারাই এখন নতুন নতুন টিভি চ্যানেল নিয়ে আসছেন তাদের উচিৎ বিষয়ভিত্তিক টিভি চ্যানেল করা। মিক্স চ্যানেল কিংবা নিউজ চ্যানেল না করে বিষয়ভিত্তিক বৈশিষ্ট নিয়ে টিভি চ্যানেল এলে দর্শকদের আলাদা নজর কাড়বে।
টেলিভিশন একটি পরিবারের অন্যতম সদস্যও বটে। একটি পরিবারে টেলিভিশন না থাকলে যেন কিছু একটা নেই। টেলিভিশন থাকবেই। আমাদের এই সময়ে আরো অনেক বেশি কার্যকর সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ডিটুএইচ কিংবা পে চ্যানেল হলে বিজ্ঞাপনের উপর নির্ভর না থেকেও শুধু গ্রাহকের টাকা দিয়েই একটি মানসম্পন্ন চ্যানেল দর্শকদের উপহার দেয়া সম্ভব। এতে করে আমাদের প্রতিযোগিতা আরো বাড়বে বলে আমি মনেকরি। আমাদের এনটিভি সবসময় দর্শকদের কথা মাথায় রেখেই অনুষ্ঠান নির্মাণ করে থাকে। নাটক, টেলিফিল্ম এবং অনুষ্ঠান নির্মাণে রুচিশীল অগ্রধিকার দেই। উৎসব পার্বণে আমাদের থাকে ভিন্ন সব আয়োজন। বিভিন্ন ইভেন্টের পাশাপাশি আমাদের বেশকিছু অনুষ্ঠান অনেক জনপ্রিয় হয়েছে। আমাদের ধারাবাহিক নাটকগুলো অনেক জনপ্রিয়। সম্প্রতি প্রচার শুরু হওয়া ‘আমাদের গল্পগুলো’ ধারাবাহিকটি বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এছাড়াও খÐ নাটকের মানও অনেক ভালো। শুভসন্ধ্যা, রঙ্গিন পাতা, ১৩নং বোর্ডিং, গø্যামার ওয়ার্ল্ড, স্বর্ণালী স্মৃতি, ক্রাইম ওয়াচসহ বেশকিছু অনুষ্ঠান বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।

টিকে থাকাটাই একটা যোগ্যতা

AMIRUL ISLAMআমীরুল ইসলাম, প্রোগ্রাম ম্যানেজার, চ্যানেল আই
বর্তমানে প্রায় ৩০টি টিভি চ্যানেল দেশে কার্যকর। এটা আমাদের দেশের জন্য অনেক বড় ব্যাপার। যারা ভালো প্রোগ্রাম করবে এবং দর্শকদের মাঝে জনপ্রিয়তা লাভ করবে তারাই আসলে টিকে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে এটা ঠিক যে, এখন টিভি চ্যানেলের বেশ জোয়ার দেখা দিয়েছে এবং একই সঙ্গে টিকে থাকার চ্যালেঞ্জও দেখা দিয়েছে। এখন এই চ্যালেঞ্জে টিকে থাকাটাই একটা যোগ্যতা। নতুন নতুন আইডিয়া আর ভিন্ন কিছু করার মধ্য দিয়ে বারবার নিজেদের প্রমাণ করতে হয়। আজকে চ্যানেল আই-এর এই অবস্থানে আসার পেছনের অক্লান্ত পরিশ্রম করা দু’জন মানুষ ফরিদুর রেজা সাগর ও শাইখ সিরাজ যাদেরকে টিভি চ্যানেলই বড় করেছে। তারা সেকথা মাথায় রেখেই চ্যানেল পরিচালনা করছেন।
বর্তমান সময়ে টিভি চ্যানেলে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে দর্শকদের টাকা চ্যানেল ওয়ালাদের কাছে না আসা। আমি বাসায় একটি পত্রিকা যখন রাখি তখন কিন্তু ঠিকই টাকা দেই। ওই টাকা পত্রিকার মালিকপায় টিভির বেলায়ও তো সেরকম হওয়া উচিত। দর্শক আমার টিভি চ্যানেল দেখছে। কাজেই আমিই তো টাকা পাব। কিন্তু দর্শকের দেয়া সেই টাকা কেন চ্যানেল মালিকের কাছে আসে না। এই টাকা যদি ঠিকই চ্যানেলের কাছে আসতো তাহলে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল আরো অনেক সমৃদ্ধ এবং আরো অনেক ভালো অনুষ্ঠান নির্মাণের প্রতিযোগিতায় আই যেতো। নানান প্রতিবন্ধকতা সত্বেও শুধু অনুষ্ঠান নির্মাণই নয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দায়বদ্ধতা থেকে অনেক অনুষ্ঠান নির্মাণ করে থাকে চ্যানেল আই। রবীন্দ্র মেলা, নজরুল মেলা, বিজয় মেলা, প্রকৃতি মেলা, রং তুলিতে মুক্তিযুদ্ধসহ আরো অনেক সাংস্কৃতিক দায়িত্ব পালন করে চ্যানেল আই। আর হৃদয়ে মাটি ও মানুষ স্বর্ণকিশোরী, প্রকৃতি ও জীবনসহ এই ধরনের অনুষ্ঠান তো রীতিমত সামাজিক আন্দোলন। আমাদের আয়োজনে হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ, লাক্স চ্যানেল আই সুপারস্টার, ভিট চ্যানেল আই টপ মডেল, ক্ষুধে গানরাজ, সেরা কণ্ঠসহ তারকা তৈরির ইভেন্টগুলো দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অঙ্গনে অনেক বড় দায়িত্ব পালন করে আসছে। সম্প্রতি আমাদের চ্যানেলের ‘সাত ভাই চম্পা’ মেগা ধারাবাহিক বাংলাদেশের টিভি নাটকে একটি ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। আর আমাদের ইমপ্রেস থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে শুধু সমৃদ্ধই নয়, বিশ্বদরবারেও দেশীয় চলচ্চিত্রকে তুলে ধরছে। আমরা আশাবাদি যুগের প্রয়োজনে আমাদের টেলিভিশন মাধ্যম অচিরেই শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।