চলে গেলেন মহাশ্বেতা দেবী

চলে গেলেন মহাশ্বেতা দেবী

658
SHARE

রেজানুর রহমান

অনুজ লেখকের বইপড়ে অগ্রজ লেখকরা নাকি চিঠির মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান। এধরনের গল্প বহু শুনেছি। কিন্তু নিজের বেলায় এ ধরনের কোনো গল্প তৈরি করতে পারছিলাম না। আমার নতুন নতুন বই প্রকাশ হয়। বিক্রিও হয়। পাঠকের প্রতিক্রিয়া পাই। পরিচিত অগ্রজ লেখকদের কাছে বই পাঠাই। তারপর অধীর আগ্রহে বসে থাকি ভালো মন্দ কিছু একটা শোনার জন্য। কিন্তু প্রিয় কবি লেখকদের কাছ থেকে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া পাই না। আমি তখন অনেকটাই হতাশ। এই যে গল্প উপন্যাস লেখার চেষ্টা করছি। টিভি নাটক লিখছি। টিভি নাটক বানাচ্ছি। আদতে এসব হচ্ছে কী কিছু? আমার মনের ভেতর যখন এমনই টানাপোড়েন তখন হঠাৎ একদিন চিঠি পেলাম মহাশ্বেতা দেবীর। আমার প্রথম উপন্যাস ‘শূন্যে বসবাস’ পড়ে তিনি পাঁচ লাইনের একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। আমার দূর্ভাগ্য চিঠিখানা সংরক্ষণ করতে পারিনি। অনেকেরই হয়তো স্মরণে আছে। ৮০’র দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলন দমন করতে রাতের অন্ধকারে ছাত্র মিছিলে গুলী করা হয়। সেই রাতে হাজী মুহম্মদ মহসিন হলের পাশে ইউল্যাব স্কুল সংলগ্ন এলাকায় আততায়ীর গুলীতে মারা যান ছাত্রনেতা রাউফুন বসুনিয়া। ধারনা করা হয় পাশ্ববর্তী স্যার এফ রহমান হল থেকে তৎকালীন সরকার সমর্থন পুস্ট ছাত্র সমাজের অস্ত্রধারীরা এই গুলী করেছিল। তারই প্রতিক্রিয়া হিসেবে পরের দিন এফ রহমান হলের কয়েকটি ব্লকে আগুন দেওয়া হয়। আমি ছিলাম স্যার এফ রহমান হলের ডি ব্লকের বাসিন্দা। দিনের অলোয় দেখলাম আমার সামনেই পুড়ে যাচ্ছে আমার রুম। পুড়ে যাচ্ছে বইপত্র, সাটিফিকেট, প্রশংসাপত্র। মহাশ্বেতা দেবীর চিঠিখানিও পুড়ে যায় সেদিন। চিঠিখানির ভাষা ছিল অনেকটা এরকম- কল্যানীয়াষু, তোমার উপন্যাস শুন্যে বসবাস পড়লাম। ভালো লাগল। তোমার লেখার হাত চমৎকার…

ভারতীয় দূতাবাসের এক কর্মকর্তার মাধ্যমে আমি শূন্যে বসবাসের একটি কপি কলকাতায় মহাশ্বেতা দেবীর কাছে পাঠিয়েছিলাম। তিনি আমার বই পড়ে চিঠি পাঠাবেন এটা ছিল কল্পনারও বাইরে। সেই থেকে মহাশ্বেতা দেবী আমার অনেক প্রিয় লেখক। তাকে কোনো দিন সামনা সামনি দেখিনি। কিন্তু মনে হতো অনেক আপন। কারন ঐ একটাই তার হাতের লেখা আমি ছুঁয়ে দেখেছি।

মহাশ্বেতা দেবীর প্রতি শুধু আমার নয় এই দেশের অনেকেরই আলাদা টান আছে তার কারন তিনি আমাদের দেশে জন্মেছেন। ১৯২৬ সালের ১৪ জানুয়ারী আমাদের ঢাকায় তিনি জন্ম গ্রহন করেন। বাবা মনীশ ঘটক ছিলেন কল্লোল যুগের সাহিত্যিক। মা ধরিত্রী দেবীও ছিলেন একাধারে লেখিকা ও সমাজসেবী। আনৱর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক ছিলেন তার কাকা। ঢাকার লক্ষ্মীবাজার ও জিন্দাবাহার রোডে মহাশ্বেতা দেবীর শৈশব কেটেছে। স্কুলের পড়াশুনাও ঢাকায়। পাবনায় ছিল তাদের পৈত্রিক ভিটে। দেশ ভাগের সময় তারা কলকাতায় চলে যান। ২০০৯ সালে সর্বশেষ ঢাকায় অমর একুশে বইমেলায় অতিথি হয়ে এসেছিলেন মহাশ্বেতা দেবী।

মহাশ্বেতা দেবী শানিৱনিকেতন থেকে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্স নিয়ে বিএ পাস করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাস করেন। বিয়ে করেন আইপিটিএ আন্দোলনের পুরোধা নাট্যব্যক্তিত্ব বিজন ভট্টাচার্যকে। সনৱান কবি নবারুণ ভট্টাচার্য, যিনি ২০১৪ সালে মারা গেছেন।

কর্মজীবনের শুরুতে কিছুদিন বিজয়নগর কলেজে অধ্যাপনার পর সাংবাদিকতাও করেন মহাশ্বেতা দেবী। পরে লেখালেখি ও সমাজসেবাই হয়ে ওঠে তাঁর ধ্যানজ্ঞান। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, মধ্য প্রদেশ ও ছত্তিশগড়ের শবর, দলিত, লোধা, মুণ্ডা, সাঁওতাল ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণির নিপীড়িত নারীদের জন্য আজীবন কাজ করে গেছেন তিনি। তাঁর বেশির ভাগ লেখনীতেই ফুটে উঠেছে পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের দুঃখ-দুর্দশার কথা। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিখারের জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। একই সঙ্গে প্রগতিশলি ভাবধারার যেকোনো আন্দোলন-সংগ্রাম সামনের কাতারে থেকে অংশ নিয়েছেন বামপন্থী এই লেখিকা।

মহাশ্বেতা দেবীর লেখা শতাধিক উপন্যাসের মধ্যে হাজার চুরাশির মা, অগ্নিগর্ভা, অরণ্যের অধিকার, চোট্টি মুণ্ডা এবং তার জীবন, তিতুমীর, আঁধারমানিক, সাম্প্রতিক, কৃষ্ণা দ্বাদশী, গণেশ মহিমা, শালগিরার ডাকে, নীলছবি, বেনেবৌ, উনত্রিশ নম্বর ধারার আসামীসহ অনেকগুলো বাংলাদেশের পাঠকমহলেও বেশ আলোচিত। তাঁর লেখা উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে ‘রুদালি’র মতো বহু নন্দিত সিনেমাও। তাঁর উপন্যাস ইংরেজি, জার্মান, ফরাসিসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

মুণ্ডা বিদ্রোহের পটভূমি নিয়ে লেখা মহাশ্বেতা দেবীর উপন্যাস ‘অরণ্যের অধিকার’ ১৯৭৯ সালে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার পায়। সাহিত্যে অবদানের জন্য ভারত সরকার ২০০৬ সালে তাঁকে দেশটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নাগরিক পুরস্কার পদ্মবিভূষণে ভূষিত করে। এ ছাড়া পদ্মশ্রী পুরস্কার, র‌্যামন ম্যাগাসেসাই অ্যাওয়ার্ড, জ্ঞানপীঠ অ্যাওয়ার্ড, বঙ্গবিভূষণ, সার্ক সাহিত্য পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন প্রখ্যাত এই সাহিত্যিক।

‘হাজার চুরাশির মা’খ্যাত উপন্যাসের লেখক বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী মারা গেছেন। বাংলা ভাষাভাষি পাঠকের প্রিয় লেখক ছিলেন মহাশ্বেতা দেবী। তাঁর স্মৃতির প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।