আবার শুরু ক্রিকেট আনন্দ

আবার শুরু ক্রিকেট আনন্দ

702
SHARE

পেসার রুবেল হোসেনের দুর্দান্ত এক স্পেলে ইংল্যান্ডকে পরাজিত করে গত বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশ। সেই ইংলিশ দল বাংলাদেশ সফরে এসেছে ৩টি ওয়ানডে ও দুটি টেস্ট খেলতে। অনেকটা কোমড় বেঁধেই ইংল্যান্ড বাংলাদেশ সফরে আসছে। বিশ্বকাপে পরাজিত হওয়ার ক্ষতটা তাদের এখনো পেড়াচ্ছে। সেই প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা তারা করবে এবার। কন্ডিশনও তাদের অনেকটা অনুকূলে। তবে বাংলাদেশ চায় বিশ্বকাপের পুনরাবৃত্তি। ইংলিশ ও অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটাররা গরমকে সহ্য করতে পারে না। অক্টোবরে বাংলাদেশের আবহাওয়া অতটা না শীত না গরম। এই কন্ডিশনে তারা ভালো করবে বলে আশা প্রকাশ করছে ইংল্যান্ড অলরাউন্ডার ব্রড।

ইংল্যান্ড দলের আরেক অলরাউন্ডার পাকিসৱান বংশোদ্ভূত মঈন আলী বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে পুরো সিরিজ জয় করা অতটা সহজ হবে না। কারণ ওই দলে বিশ্বমানের একঝাক তারকা ক্রিকেটার রয়েছে। অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের পাশাপাশি নতুন বেশ ক’জন ক্রিকেটার রয়েছে আমাদের টেস্ট দলে তাদের মধ্যে আছে হাসিম হামিদ, আদিল রশিদ ও জাফর আনসারী। এরা সবাই টেস্ট খেলবে। টেস্টে বাংলাদেশ একটু দর্বল তাই দুম্বটি টেস্ট জয়ে আমি একশ ভাগ আশাবাদী কিন্তু বাংলাদেশের ওয়ানডে দলটি ফাটাফাটি।

এবারের বাংলাদেশ দলে তরুপের তাস কাটার মাস্টার মোসৱাফিজ নেই। এ ছাড়া বাকি সব তারকা ক্রিকেটার একশত ভাগ ফিট। তারা মুখিয়ে আছে ইংলিশদের সঙ্গে ভালো খেলার জন্য। অভিজ্ঞও তারকা ক্রিকেরের পাশাপাশি এবার নতুন এক হার্ডহিটার ব্যাটসম্যানকে জাতীয় দলে সুযোগ দেয়া হয়েছে তার নাম মোসাদ্দেক হোসেন। আফগানিস্থান দলের সঙ্গে প্রস্তুতি ম্যাচে ৯৭ বলে ৭৬ রান করে তার জাত চিনিয়েছেন। আফগান ও ইংল্যান্ড দলের সঙ্গে মোসাদ্দেক জ্বলে উঠবেন বলে সবাই আশা করছেন।

পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে পা রাখছে ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল। দুটি টেস্ট ও তিনটি ওয়ানডে খেলতে বাংলাদেশ সফরে আসবে ইংলিশরা। ৪ অক্টোবর সফরের প্রথম অংশে ফতুল্লায় প্রস্তুতিমূলক ওয়ানডে ম্যাচ খেলবে ইংল্যান্ড। এরপর ৭ ও ৯ অক্টোবর সিরিজের প্রথম দুই ওয়ানডেতে বাংলাদেশের বিপক্ষে মাঠে নামবে তারা। এই ম্যাচ দুটি হবে মিরপুর শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। তৃতীয় ওয়ানডের ভেন্যু চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম। তারপর প্রথম টেস্টের আগে চট্টগ্রামের এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে দুই দিনের দুটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলবে ইংলিশরা। চট্টগ্রামেই সিরিজের প্রথম টেস্ট মাঠে গড়াবে ২০ অক্টোবর থেকে। সিরিজের শেষ ম্যাচ খেলতে দুই দল আবার ফিরবে ঢাকায় ২৮ অক্টোবর। মিরপুরে শেরএ বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে হবে দ্বিতীয় টেস্ট।

englend-team২০১০ সালের পর এবারই প্রথম পূর্ণশক্তি নিয়ে বাংলাদেশে সফরে আসছে ইংল্যান্ড। দুই দলের সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া- নিউজিল্যান্ড বিশ্বকাপে। বিশ্বকাপে ইংলিশদের হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে বাংলাদেশ। এবার হবে বাংলাদেশে তাদের তৃতীয় সফর।

এই সিরিজে তামিম ইকবালকে নিয়ে কিছুটা শংকা দেখা দিয়েছিল আর তামিম ইকবালকে নিয়ে শঙ্কা নতুন কিছু না। দলের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান তিনি। এই বাঁহাতির ইনজুরিতে জাতীয় দলের ম্যানেজমেন্টে অস্বসিৱ থাকাটা স্বাভাবিক। এবারও বাঁ হাতের আঙুলে চোট পাওয়ায় তামিমকে নিয়ে দুশ্চিনৱার অন্ত ছিল না। নেটে ও সেন্টার উইকেটে ব্যাটিং অনুশীলন করার পর সবাইকে যেন স্বসিৱর বার্তাই দেন এই ওপেনার। ক্যাচিং অনুশীলনের সময় তামিম আঙুলে ব্যথা পান জুলাই মাসের ২৭ তারিখ। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় সেখানে চিড় ধরার দুঃসংবাদ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ব্যাট বল ধরা হয়নি। ঈদ-বিরতির পর দুম্বটি সিরিজকে সামনে রেখে আবার পুরোমাত্রায়  বেশ কয়েকবার ইনডোরের নেটে ও সেন্টার উইকটে ব্যাটিং অনুশীলন করেন বাঁহাতি এই ওপেনার। দুশ্চিনৱার কালো মেঘ তাতে দূর আকাশে উড়ে যায় অনেকটা।

সেই কবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। এরপর থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাইরে টাইগাররা। ছয় মাসের আলসে সময় পেরিয়ে আবার তুমুল ব্যস্ত হয়ে পড়েন ক্রিকেটাররা। আফগানিসৱানের বিপক্ষে তিন ম্যাচ সিরিজ তারপর ইংল্যান্ড সিরিজ।

আসন্ন সিরিজকে সামনে রেখে বাংলাদেশের বিপক্ষে দল ঘোষণা করেছে ইংল্যান্ড এন্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি)। ইয়ন মরগান ও অয়ালেক্স হেলস আগেই সফরে আসতে অস্বীকৃত জানিয়েছেন। তারা বাদে দলে প্রায় সব তারকা ক্রিকেটার রেখেছে ইসিবি। বাংলাদেশ সফরের জন্য ওয়ানডে ও টেস্ট এ দুই ফরম্যাটের জন্য ওয়ানডে দলে ১৫ জন এবং টেস্ট ফরম্যাটে ১৭ জন ক্রিকেটারকে রাখা হয়েছে। টেস্ট দলে দীর্ঘ ১১ বছরপর ডাক পেয়েছেন গ্যারেথ বেটি। তবে দলে জায়গা পাননি বাংলাদেশ সফরে আসতে চাওয়া ক্রিস জর্দান এবং ইয়ান বেল। টেস্ট অধিনায়ক অলিস্টার কুক আসছেন এটা আগেই নিশ্চিত ছিল। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে সব সময় ভালো খেলা অলরাউন্ডার স্টুয়ার্ট ব্রডের বিশ্রামে যাওয়ার কথা থাকলেও তিনি আসছেন এ সফরে। দলে নতুন মুখ হিসেবে জায়গা পেয়েছেন তিনজন। তারা হলেন হাসিব হামিদ, বেন ডাকেট ও জাফর আনসারি। এই তিন জনই কাউন্টি ক্রিকেটে দুরন্ত পারফর্ম্যান্স করে নির্বাচকদের নজর কেড়েছেন।

ইংলান্ডের টেস্ট দল: অলিস্টার কুক (অধিনায়ক), মঈন আলী, জেমস অ্যান্ডারসন, হাসিব হামিদ, জো রুট, গ্যারি ব্যালান্স, বেন স্টোকস, জনি বেয়ারস্টো, ক্রিস ওকস, আদিল রশিদ, স্টুয়ার্ট ব্রড, জস বাটলার, স্টিভেন ফিন, মার্ক উড, গ্যারেথ বেটি, জাফর আনসারী, বেন ডাকেট।

ওয়ানডে দল: জেসন রয়, বেন ডাকেট, জেমস ভিন্স, স্যাম বিলিংস, জস বাটলার, বেন স্টোকস, মঈন আলী, ক্রিস ওকস, ডেভিড উইলি, আদিল রশিদ, মার্ক উড, জনি বেয়ারস্টো, লিয়াম ডসন, লিয়াম প্লাঙ্কেট, জ্যাক বল।

এদিকে বাংলাদেশ দলের প্রাণভ্রমরা কাটার মাস্টার মোসৱাফিজ না থাকায় দুশ্চিনৱার ভাজ পড়েছে কর্তৃপক্ষের কপালে। তবে ২৩ সেপ্টেম্বর পেশার হিরো তাসকিন ও অলরাউন্ডার আরাফাত সানি আইসিসির নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে। এখবর পাওয়ার পর বাংলাদেশ শিবিরে চলছে আনন্দের ঢেউ।

বোলিং অ্যাকশন নিষিদ্ধ হওয়ার পর কঠিন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাসকিন আহমেদ ও আরাফাত সানিকে। কখনো কখনো ভীষণ হতাশা ঘিরে ধরেছে দুজনকে। তবু হতোদ্যম হননি। নিজেদের শুদ্ধ করে তোলার প্রক্রিয়া চালিয়ে গেছেন সব সময়। দীর্ঘ প্রস্তুতির পর দুজন বোলিং অ্যাকশন পরীক্ষা দেন ৮ সেপ্টেম্বর। ২৩ সেপ্টেম্বর জানা গেছে সেই পরীক্ষার ফল উতরে গেছেন তাসকিন-সানি। দুজনের মনে এখন চাপমুক্তির আনন্দ।

তাসকিন আহমেদ: তামিম ইকবালই খবরটা দিলেন প্রথম। মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে এসে বাঁহাতি ওপেনারের মুখে রহস্যের হাসি। তামিম যখন কথা বলছিলেন, ড্রেসিংরুম থেকে ভেসে এল আনন্দের হুল্লোড়। মাশরাফি-সাকিবরা  োগান ধরেছেন ‘তাসকিন! তাসকিন!’ খানিক পর ড্রেসিংরুম থেকে বেরিয়ে এলেন তাসকিন। মুখে পরিচিত সেই হাসি। এই হাসি বিশাল চাপমুক্তির। ব্রিসবেন ন্যাশনাল ক্রিকেট সেন্টারের গবেষণাগারে ৮ সেপ্টেম্বর আরাফাত সানির সঙ্গে বোলিং অ্যাকশনের পরীক্ষা দিয়েছিলেন তাসকিন। এরপর গত দুই সপ্তাহ নির্ঘুম অপেক্ষা। অবশেষে শঙ্কার মেঘ কেটেছে। ২৩ সেপ্টেম্বর তাসকিনের বোলিং অ্যাকশনের বৈধতার ছাড়পত্র দিয়েছে আইসিসি।

সুসংবাদটা তামিমের কাছ থেকে প্রথম জেনে স্বাভাবিকভাবেই এই পেসারের মনে আনন্দের হিল্লোল, তিনি বলেছেন ‘ পরীক্ষার পর সত্যি বলতে এক দিনও ঘুমাতে পারিনি! আজ অনেক বড় দিন আমার জন্য। কদিন আগে ঈদ গেছে। ঈদের চেয়ে বেশি খুশির দিন মনে হচ্ছে এই সংবাদ।

বোলিং নিষেধাজ্ঞার দিনগুলো কতটা কঠিন ছিল, তাসকিনের চেয়ে ভালো বুঝবে না কেউ, আনন্দের মধ্যেও জীবনের কষ্টের সেই অভিজ্ঞতা মূর্ত হয়ে উঠছে তাঁর চোখে, তাসকিন বলেন, যেদিন নিষিদ্ধ হয়েছি, তারপর শুধু রাসৱাঘাটে নয়, ঘরেও নিজেকে অনেক ছোট মনে হয়েছে। সবাই অদ্ভুত অদ্ভুত সব প্রশ্ন করতো, যেগুলোর উত্তর দিতে খুব কষ্ট হতো।

এপ্রিল থেকেই তাসকিন শুরু করেন পুনবার্সন-প্রক্রিয়া। এই পাঁচ মাসে নিজেকে শুদ্ধ করে তোলার প্রক্রিয়ায় অনেকে সহায়তা করেছেন তাঁকে। তাসকিন ধন্যবাদ জানালেন সবাইকে, জাতীয় দলের কোচিং স্টাফদের সবাই খুব সহায়তা করেছেন। বিশেষ করে মাহবুবুল আলী জাকি আমার সঙ্গে পাঁচ মাস কাজ করেছেন। স্যারের কাছে ভীষণ কৃতজ্ঞ আমি।

আফগানিসৱান সিরিজের জন্য দল ঘোষণার সময় প্রধান নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন জানিয়েছিলেন, তাসকিনের বোলিং অ্যাকশন বৈধ হলে তিনিও ঢুকে পড়বেন স্কোয়াডে। সেটাই হয়েছে। এখন সিরিজটা স্মরণীয় করে রাখার প্রত্যয় তাঁর, আমার ভাগ্য ভালো, এই, ক মাসে কোনো সিরিজ মিস হয়নি। দলের অন্যতম সেরা বোলার মোসৱাফিজ নেই চেষ্টা করব ওর শূন্যতা পূরণের আর জয় তো সব সময়ই স্পেশাল। নিষেধাজ্ঞা কেটে যাওয়ায় এখন সিরিজটাও জিততে পারলে আমার জন্য সেটা অনেক স্পেশাল।

দলের সবাই উঠে গিয়েছেন টিম হোটেল। কিন্তু সুখবর শোনার পর তাসকিনকে কয়েক ঘণ্টার জন্য ছুটি দেয়া হয়েছে মোহাম্মদপুরে তাঁর জাকির হোসেন রোডের বাসা থেকে ঘুরে আসতে। অনুশীলন শেষে গাড়িতে উঠেই তাসকিনের আনন্দ চিৎকার: আমি আজ স্বাধীন!

taskin-sunny

আরাফাত সানি: বিশ্বকাপের পরপরই রুয়ান কালপাগের অধীনে শুরু হয়েছিল সানির বোলিং অ্যাকশন শুধরে নেয়ার প্রক্রিয়া।

পুনর্বাসনপ্রক্রিয়া চলার সময় অসুস্থ বাবাকে নিয়ে ছোটাছুটি করতে হয়েছে সানিকে। বাবা অবশ্য পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন গত মাসে। শোক কাটিয়ে না উঠতেই ক্যারিয়ারের বড় এক বাধা পেরোনোর পরীক্ষা। পরীক্ষা দিতে অস্ট্রেলিয়ায় উড়াল দেয়ার আগে অসুস্থ হয়ে পড়েন। গায়ে ভীষণ জ্বর নিয়েই উড়াল দেন ব্রিসবেনে। একের পর এক বৈতরণি পেরিয়ে সানির মুখে অবশেষে ধরা দিয়েছে বিজয়ের হাসি।

সানি আফগানিসৱান সিরিজের দলে নেই। প্রতিক্রিয়ায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিশ্বকাপের পর সবাইকে একই প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। হতাশা ঘিরে ধরেছিল। মনে হচ্ছিল বিরাট শাসিৱ ভোগ করছি। আমার চেষ্টা আর সবার দেয়ার আল্লাহর রহমতে আবার ফিরে আসতে পেরেছি। এটা আমার কাছে বিরাট আনন্দের খবর।

পুনর্বাসনপ্রক্রিয়া চলার সময় কোচ না থাকলেও প্রস্তুতিতে সানির ঘাটতি হয়নি। নিয়মিত নিজের বোলিং ভিডিও ফুটেজ পাঠিয়েছেন কালপাগেকে। সেই ভিডিও দেখে কোচ পরামর্শ দিয়েছেন। অ্যাকশন শুদ্ধ করে তোলার এই প্রক্রিয়ায় যাঁদের সহায়তা পেয়েছেন তাদের সবার প্রতি সানির কৃতজ্ঞতা, আমি আসলে অনেকটা একা একাই কাজ করেছি। রুয়ান কালপাগে বলেছিলেন, অনুশীলনে-ম্যাচে ভুল করতে পারো, ড্রিলে ভুল করা যাবে না। রুয়ানের প্রতি কৃতজ্ঞতা। সালাউদ্দিন ভাই, রাজ ভাইয়েরা আমাকে নানাভাবে অনুপ্রাণিত করেছে, পরামর্শ দিয়েছেন।