Home ভ্রমণ ঘুরে আসুন থিম পার্ক থেকে

ঘুরে আসুন থিম পার্ক থেকে

SHARE
Park

মামুনুর রহমান
আমাদের স্টাফরা সাড়ে দশটায় চলে আসে। আর পার্কের গেট খুলে দেয়া হয় ঠিক সাড়ে এগারোটায়। আর আমি আসি কাক ডাকা ভোরে। ছেলেবেলা থেকেই আমার অভ্যাস খুব ভোরে ঘুম থেকে জেগে হালকা ঘোরাঘুরি করা। তাই পার্কে চলে আসি। যেমন ধরুন রথ দেখাও হলো কলা বেচাও হলো। পার্কেই একটা রুম করেছি আমাদের পার্টনারদের বসার। সেখানেই আমার স্ত্রী বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসেন। ঠিক যেমনটা ধান খেতে কৃষকের জন্য কৃষাণী বউ খাবার নিয়ে যান। আমরা দুজন একসঙ্গে খাই। পার্কের অন্য স্টাফরাও তখন একে একে খাওয়া দাওয়া সেরে ফেলে। বিকেলের দিকে আমাদের পার্কে দর্শনার্থীদের ভিড়টা বাড়ে। তাই আমাদের দায়িত্বটাও তখন বেড়ে যায়। দরজাটা খুলে যখন বাচ্চাগুলো দৌড়ে পার্কের ভেতরে আসে আমার চোখ দুটো যেন পলক ফেলতেই চায় না। ওরা দৌড়ায় এদিক সেদিক। অভিভাবকগুলো বাচ্চাদের পেছন পেছন দেয় ছুট। মায়েরা বলতে থাকেন, এই থামো দৌঁড়াচ্ছো কেন? ওদিকে যেওনা। পড়ে যেতে পারো। ব্যথা পাবে। কথাগুলো শুনলে আমার শরীরে এক ধরনের শিহরণ খেলে যায়। জানেন, আমি খুব ছোটবেলায় শুধু টিভি আর সিনেমায় পার্ক দেখেছি। কখনো পার্কে যেতে পারিনি। আর রাইডে চড়াতো দূরের কথা। তবে গ্রামে থাকাকালীন চড়কিতে চড়েছিলাম অনেকবার। থিম পার্ক সৈয়দপুর নিয়ে জানতে চাইলে এভাবেই বেশ গুছিয়েই কথা গুলো বললেন আসাদ জাহান। যেন অনেক জমানো কথাগুলো বলার যুঁতসই সুযোগ পেয়ে গেছেন। নতুন প্রশ্নের আগেই বলা শুরু করেন।
ঢাকার ইট কাঠের ব্যস্ততাকে খানিক দূরে রেখে পারিবারিকভাবে আমরা সিদ্ধান্তে আসি সৈয়দপুরে কিছু একটা করতে। চেয়েছিলাম পারিবারিকভাবে পাওয়া এই জায়গাটিতে ফ্যাক্টরি বানাবো। কিন্তু সেই তো আবার ঢাকা পড়ে যাবে আকাশ। সবুজ দেখা হবে না। বিশুদ্ধ বাতাসে বুক ভরা নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হবে। আমার শ্যালক সুমন বলে উঠলো দুলাভাই আমরা অস্ট্রেলিয়ার লুনা পার্কের মতো একটা থিম পার্ক করতে পারি কি? সুমনের বলা কথাটা আমাদের দুই জামাইয়ের মনে ধরে। কেন যেন কোনো কিছু না ভেবেই আমরা রাজি হয়ে যাই। পারিবারিক জায়গায় পারিবারিক ব্যবসা। যার ভবিষ্যৎ অনেক সম্ভাবনাময়। তাছাড়া সৈয়দপুর শহরটি এখন অনেক সম্ভাবনাময় একটি শহর। দেশের ৮ম বাণিজ্যিক শহর। যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক আধুনিক। স্থানীয় মানুষজনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা বেশ সমৃদ্ধ। আরেকটি বিষয় আমাদের সিদ্ধান্তটাকে ধরে রাখতে সাহায্য করেছিল এই শহরটিকে আধুনিকতায় আরেকটু এগিয়ে নিতে বিনোদনের অভাব রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আমরা বিনোদনের প্রগাঢ় অভাব বোধ করেই সৈয়দপুরে থিম পার্ক স্থাপনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
যেভাবে যাবেন
দেশের যে কোনো স্থান থেকেই প্রথমে আপনাকে আসতে হবে উত্তরাঞ্চলের ছোট্ট শহর সৈয়দপুরে। বাস, ট্রেন ও আকাশপথ সুবিধামতো বেছে নিন আপনার প্রিয় যোগাযোগ মাধ্যমটিকে। ঢাকা থেকে সৈয়দপুরে যেতে চাইলে অসংখ্য এসি ও নন এসি কোচ রয়েছে যেগুলো ঝুঁট ঝামেলা ছাড়াই আপনাকে নিয়ে যাবে সৈয়দপুরে। ট্রেনে চড়েও যেতে পারেন সৈয়দপুরে। বিলাসবহুল সে ক্ষেত্রে নীল সাগর এক্সপ্রেস আপনার যাত্রাকে করে তুলবে আনন্দময়। যদি চান এক দৌড়ে চলে যাবেন। এতটা সময় ব্যয় করতে চান না। সেক্ষেত্রে সকাল, দুপুর, বিকেলের মধ্যে যে কোনো একটি সময় বেছে নিয়ে উড়ে আসুন সৈয়দপুরে। আপনাকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স, নোভো এয়ার, রিজেন্ট এয়ারওয়েস-এর ফ্লাইটগুলো।
আনন্দময় যত রাইড
ছোটদের কথা মাথায় রেখে শুরু হওয়া থিম পার্কটি এখন ভাবছে অন্য কথা। নতুন করে বড়দের জন্য ভাবছে প্রতিষ্ঠানটি। ছোটদের জন্য এখানে রয়েছে ঢাউস আলাদীন। ৩০ টাকার কুপন সংগ্রহ করে আলাদীন নামের রাইডটিতে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গড়িয়ে নিচে আসার ব্যাপারটা বেশ আনন্দদায়ক মনে হয় বাচ্চাদের কাছে। পার্কে বেড়াতে আসা সাড়ে ৫ বছরের ছোট্ট শিশু ইশমামকে প্রশ্ন করেছিলাম কোন রাইডটা প্রিয়। ব্যস্ত কণ্ঠে বলল আলাদীন আর বোট রাইডিং। বাচ্চাদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে তৈরি করা এসব রাইডে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা থাকছে শতভাগ। এখানে রয়েছে রেসিং রাইডার্স, এয়ার বেলুন, স্পিড বোট। রয়েছে বসার স্থান। পুকুরের পাড় ধরে রয়েছে হাঁটার স্থান। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই নতুন যোগ হবে সুইমিং পুল। রোলার বোস্টার ও ঢাউস অক্টোপাস রাইড। নিত্য নতুন বিনোদন সামগ্রী দিয়ে সাজাতে ব্যস্ত প্রতিষ্ঠানটি।
আগামীর স্বপ্ন
Park-3পার্কটি এখনো নির্মাণাধীন। তিনজন পারিবারিক শেয়ার হোল্ডারসহ পার্কের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ২০ জন স্টাফ কাজ করছেন। আগামী দুই বছরের মধ্যে আধুনিক ফুড জোন, কনফারেন্স সেন্টার, কমিউনিটি সেন্টার ও আকাশ সুইমিং পুল করার কথা মাথায় রেখে পাঁচতলা একটি আধুনিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছেন তারা। পার্কের আশে পাশে জমি কেনার কাজও চলছে ধীরে ধীরে। ভবিষ্যতে শুধু উত্তরাঞ্চলে নয় দেশের সব থেকে আকর্ষনীয় পার্ক গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন তারা।
প্রতিদিন দুপুর গড়ালেই হাজার খানেকের বেশি দর্শনার্থীর ভিড়ে মুখরিত হয়ে ওঠে পার্কটি। বিশেষ দিন গুলোকে লক্ষ্য রেখে আগের দিন রাতে ছোট্ট মিটিং সেরে নিরলস থাকছেন পার্কের কর্মকর্তা থেকে নিরাপত্তায় থাকা সুসজ্জিত একটি তরুণ দল। তাদেরই একজন জানালেন, আমাদের পার্কের বয়স নয় মাস হতে চলেছে। গত এপ্রিলের ১৪ তারিখ বর্ষবরণের দিন আমরা বুঝতে পেরেছি আমাদের পার্কের ভবিষ্যৎ অনেক অনেক সম্ভাবনাময়। ৫ হাজারের কিছু বেশি দর্শনার্থীÑ এদিন পার্কে প্রবেশ করেছিল। সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় রীতিমত মাইকিং করে আমরা দর্শনার্থীদের ফিরে যেতে অনুরোধ করেছিলাম।
মিশ্র প্রতিক্রিয়া
পার্কের প্রবেশ মূল্য রাখা হয়েছে ৩০ টাকা। আর ভেতরে থাকা রাইডগুলোতে রকম ভেদে রাখা হয়েছে ৩০ থেকে ৫০ টাকা। অনেকেই আক্ষেপ নিয়ে বলেছেন খুব অল্প সময়ের জন্য এই রাইডগুলোতে আনন্দের সুযোগ পায় বাচ্চারা। ভেতরে থাকা ১০টি রাইডে উঠতে চাইলে প্রতি বাচ্চার পেছনে পাঁচশত টাকার নিচে সম্ভব নয়। তাই অনেক দর্শনার্থী রাইডের কুপনের দাম কমানোর প্রস্তাব করলেন। প্রবেশ মূল্য ও রাইড সংক্রান্ত বিষয়টি নিয়ে আমরা জানতে চাই আসাদ জাহানের কাছে। তিনি জানান, বর্তমান সময়ে জিনিসের দাম ও পার্কের এসমস্ত রাইডের উচ্চমূল্য দুই বিবেচনা করে আমরা রাইডগুলোর টিকেট মূল্য নির্ধারণ করেছি। পার্কটির বর্তমান অবয়ব পর্যন্ত আসতে প্রায় আড়াই কোটি টাকা খরচ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সে দিক থেকে চিন্তা করলে রাইডগুলোর টিকেট মূল্য আরো বেশি হওয়া উচিত বলে জানান তিনি।