ঘরে বাইরে

ঘরে বাইরে

518
SHARE

স্থান: শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তন। সবেমাত্র টেলিভিশন প্রোগ্রাম প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর নতুন কমিটির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। মঞ্চে ডাকা হলো সবাইকে। উদ্দেশ্য একসঙ্গে একটা গ্রুপ ছবি তোলা হবে। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ এবং মনোয়ার হোসেন পাঠান আগেই মঞ্চে বসা ছিলেন। কমিটির নির্বাচিত ২৭ জন সদস্য মঞ্চে উঠে আসার কথা। গোলবাধল তাদের সবার উপস্থিতি নিয়ে। নির্বাচিত ২৭ জন সদস্যের মধ্যে উপস্থিত আছেন মাত্র ১৯ জন। এই নিয়ে একজন সাধারণ সদস্য চিৎকার শুরু করে দিলেন। তার একটাই কথা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার দিনও যদি নির্বাচিত সদস্যরা উপস্থিত না থাকেন তাহলে তারা কি ভবিষ্যতে সংগঠনের কোনো কাজে আসবেন? তার যৌক্তিক মনৱব্যকে অনেকে সায় দিলেন। কেউ কেউ বললেন- টেলিভিশন প্রোগ্রাম প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশন হলো টেলিভিশন মিডিয়ার শেকড়। সেখানে নেতৃত্ব যারা দিবেন তাদের উচিত আরো আনৱরিক হওয়া। কথা ও কাজের সমন্বয় রাখা।

আমরাও সে কথাই বলতে চাই। টেলিভিশন মিডিয়ায় কিছুটা হলেও অস্থিরতা চলছে। বিশেষ করে পাশের দেশের বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল আমাদের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমতাবস্থায় কথা ও কাজের মধ্যে সমন্বয় না রাখলে কাজের কাজ কিছুই হবে না।

এই যে কথা ও কাজের মধ্যে সমন্বয়ের কথা বলা হচ্ছে সত্যি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা মোটেই কার্যকর হচ্ছে না। কিছুদিন আগে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে ডিরেক্টরস গিল্ড-এর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন উপলক্ষে শোবিজে একটা হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল। আড্ডা আলোচনায় শোবিজের নিয়মনীতি নিয়েও নানা কথা হয়েছে। অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন আমাদের শোবিজে কোনো নিয়ম নীতিমালা মানা হয় না। নয়টার গাড়ি কয়টায় আসবে? এমনই অবস্থা। কেউই নিয়মনীতি মানতে নারাজ। এতবড় একটা সেক্টর অথচ কেউ কারও প্রতি দায়বদ্ধ নয়। অথচ শোবিজের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি সংগঠনের সমন্বয়ে কয়েকবছর আগে একটি যৌথ চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছিল। এই চুক্তিনামায় কখন শুটিং শুরু হবে কখন শেষ হবে। কীভাবে আমাদের শোবিজ পরিচালিত হবে এ ব্যাপারে বিশদ ব্যাখ্যা আছে। চুক্তিনামা সম্পাদনের কয়েক মাস তা মানাও হয়েছিল। কিন্তু রহস্যজনক কারণে বিষয়টি উপেক্ষিত হতে থাকে। সংশ্লিষ্ট অনেকের মনৱব্য- যারা এই চুক্তিনামা সম্পাদন করেছেন মূলত তাদের অনেকের অসহযোগিতার কারণেই পরবর্তীতে এটি কার্যকর করা যায় নাই। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।

টেলিভিশন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষেরা আবার সংগঠিত হবার চেষ্টা করছেন। ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন। এটি শুভ লক্ষণ। কিন্তু আমরা কি সত্যি সত্যি ঐক্যবদ্ধ?

মুখে যা বলি কার্যক্ষেত্রেও কি তাই করি? যদি তাই হয় ডিরেক্টরস গিল্ড-এর এত চমৎকার একটি নির্বাচন হবার পর পরই কেন ডিরেক্টরসদের নামে আরেকটি ফোরাম গঠিত হলো। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এই ফোরামের মধ্যে যারা যুক্ত হয়েছেন তাদের কিছুদিন আগে ডিরেক্টরস গিল্ড-এর নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনে পরাজিত হয়ে তারাই নতুন সংগঠন দাঁড় করালেন। যদিও বলা হচ্ছে এটি তরুণ ডিরেক্টরদের একটি পৃথক জায়গা। এটি হবে একটি ক্লাব। ধরে নিলাম এটি তরুণ নির্মাতাদের একটি নতুন প্লাটফরম। এই মুহূর্তে এটি কি খুব জরুরি ছিল? অনেকে মনৱব্য করছেন ডিরেক্টরস গিল্ড-এর নির্বাচনে হেরে গিয়ে একটি পক্ষ নতুন সংগঠন দাঁড় করিয়েছেন। এই মনৱব্যের যৌক্তিকতা আছে। কারণ ডিরেক্টরস গিল্ড-এর নির্বাচনের আমেজও এখন পুরোপুরি কাটেনি। এমন সময়ে নতুন সংগঠন দাঁড় করানোর উদ্দেশ্য কী তা স্পষ্ট হওয়া দরকার।

এরকম আরো অনেক প্রশ্ন মাঝে মাঝে মনের ভেতর উঁকি দেয়। পাশের দেশ কলকাতার নাটক, সিনেমার সঙ্গে আমাদের এখন প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। অথচ একসময় আমরাই তাদের থেকে এগিয়ে ছিলাম। এই স্মৃতিতো এখনো মুছে যায়নি- বিটিভি আমলের ধারাবাহিক নাটক কলকাতার দর্শক হুমড়ি খেয়ে দেখত। এলুমিনিয়ামের পাতিল দিয়ে ডিশ এন্টেনা বানিয়ে তারা একসময় আমাদের টিভি নাটক দেখেছে। অথচ আমরা অনেকে এখন তাদের নাটক দেখার জন্য সন্ধ্যা থেকেই টিভি খুলে বসে থাকি। শুধু নাটক কেন? চলচ্চিত্রের অবস্থাও তো একই রকম। ওরা একসময় আমাদের চলচ্চিত্রের ব্যাপারেও অতি উৎসাহী ছিল। আর এখন আমরা ওদের জন্য ব্যতিব্যস্ত থাকি। আমাদের ফুটবল একসময় বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। আর এখন ডাকলেও ফুটবলের দর্শক পাওয়া যায় না। আমাদের গান একসময় ছিল অতি আদরের। অথচ এখন গানের ক্ষেত্রেও চলছে চরম অস্থিরতা।

তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কি? এই প্রশ্নের একটা সহজ উত্তর আছে। ভবিষ্যৎ আসলে গড়ে নিতে হয়। যারা সংকট দেখে পিছিয়ে যান তারা ভবিষ্যৎ গড়তে জানেন না। সংকট থাকবে। কিন্তু সংকট মোকাবিলার সাহস থাকতে হবে। এজন্যই আসে সংগঠনের প্রশ্ন। সংগঠন থাকলে সংকট মোকাবিলার সাহস এমনিতেই এসে যায়। এজন্যই বলা হয় দশে মিলে করি কাজ হারি জিতি নাহি লাজ।

আমাদের শোবিজের সংকটগুলো কি কি সেটা আমরা কমবেশি জানি। কিন্তু সংকট মোকাবিলার পথ কি জানি? একথাতো সত্য, সন্ধ্যার পর অনেক অগ্রসরমান পরিবারে পাশের দেশের টেলিভিশন চ্যানেল আদরনীয় হয়ে ওঠে। অথচ আমাদের এখন ২৭টি টেলিভিশন চ্যানেল। আমারটা না দেখে কেন অন্যের প্রতি এত আকর্ষণ? কি আছে ওদের টেলিভিশনে? ওরা কি কোনো জাদু দেখায়? নিশ্চয়ই না। ওরাও প্রোগ্রাম দেখায়। আমরাও প্রোগ্রাম দেখাই। আমরা কি ওদের থেকে পিছিয়ে আছি? এই প্রশ্নের উত্তর দরকার। এজন্য প্রয়োজন সংস্কৃতির প্রতিটি সেক্টরে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা। আগামী পাঁচ বছরে আমরা কোথায় যাব? কি কি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হবে? সব মিলিয়ে একটি পরিকল্পনা দরকার। একথাতো সত্য সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া প্রতিযোগিতায় টেকা যায় না।

কয়েকদিন আগে ভারতের একটি স্কুলের ছাত্র ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বরাবরে একটি চিঠি লিখেছিল। প্রধানমন্ত্রীকে আঙ্কেল সম্বোধন করে সে লিখেছে ‘রাজনৈতিক সভা সমাবেশের জন্য তার স্কুলের বাস নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ছাত্র-ছাত্রীদের পথে দাঁড় করিয়ে রাখা হচ্ছে। ফলে তাদের পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে…

ফলোআপ নিউজ হচ্ছে; ছেলেটির চিঠির প্রেক্ষিতে তার রাজ্যে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের জন্য স্কুল বাস ব্যবহার করা যাবে না এই মর্মে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক ঘটনা হতে পারে আমাদের জন্য।

০ রেজানুর রহমান

 

rezanur.alo@gmail.com