গেটআপ মেকআপ যে কারনে চরিত্রগুলো জনপ্রিয়!

গেটআপ মেকআপ যে কারনে চরিত্রগুলো জনপ্রিয়!

18
0
SHARE
Mossarof-Korim

মেজবাহ আহমেদ
কথায় আছে কষ্ট করলেই কেস্ট মেলে। কোনো কাজে আন্তরিক ভাবে কেউ কষ্ট করেছেন অথচ তার ফল পাননি এমন ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না। কেউ কেউ আছেন ভালো কাজে জীবনের অনেক কিছুই ত্যাগ করেন। অভিনয় মাধ্যমের কথা যদি ধরি তাহলে অনেক ঘটনার উল্লেখ করা যাবে যে সব ঘটনায় দেশ-বিদেশের গুণী অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভিনয় জীবনের কষ্ট আর ত্যাগের চিত্রমালা অন্যের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে। পৃথিবী ব্যাপি নাটক, সিনেমাসহ শোবিজের সর্বত্র যে সব ‘কাজ’ ভালো হয়েছে, খ্যাতি অর্জন করেছে তার পিছনে হয় পরিচালক, না হয় অভিনেতা-অভিনেত্রী অথবা পুরো টিমের অসাধারণ ত্যাগের দৃষ্টান্ত জড়িয়ে আছে। আজকাল অবশ্য এরকম ত্যাগ ও কষ্টের দৃষ্টান্ত তেমন একটা চোখে পড়ে না। অথচ এই তো কয়েক বছর আগেও নাটক, সিনেমায় অভিনয়ের ক্ষেত্রে অভিনেতা-অভিনেত্রীরা যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে দ্বিধা করতেন না।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে চরিত্রের সঙ্গে নিজেকে মানান সই করে গড়ে তোলাই হলো আসল কাজ। নাটক, সিনেমায় নির্দিষ্ট চরিত্রের সময়কাল, সামাজিক অবস্থান সর্বোপরি বয়স বিবেচনায় ‘মেকআপ আর গেটআপ’ এই শব্দ দুটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে মাঝে মাঝেই অভিনেতা-অভিনেত্রীরা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়ে যান। ৩০/৩৫ বছরের অভিনেতা-অভিনেত্রীকে সাজতে হবে ৭০ বছরের কোনো চরিত্রে। কাজেই তার মাথার চুল, মুখের ভাঁজ রেখা সর্বোপরি কণ্ঠস্বরের পরিবর্তনসহ নানান বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়। আজকাল অনেকেই বিষয়টির প্রতি তেমন একটা নজর দেন না। ’৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের মানুষের চেহারা আজকের মতো এত প্রাণবন্ত, হাসি খুশি ছিল না। মাথার চুলের স্টাইল, জামার কলার, প্যান্টের ঝুল সবকিছুই আলাদা, অন্যরকম। সে কারণে ৭১ সালকে নাটক, সিনেমায় আনার ক্ষেত্রে পরিচালকসহ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের উচিত সময়টাকে সবিশেষ গুরুত্ব দেয়া। কিছুদিন কোনো এক টেলিভিশন চ্যানেলে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি টেলিফিল্মে দেখলাম মুক্তিযোদ্ধাদের ভ‚মিকায় যারা অভিনয় করছেন তাদের মাথার চুল বর্তমান সময়ের স্টাইলে কাটা। জামা-প্যান্টও বর্তমান সময়ের। মাথায় গামছা পেঁচিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হবার চেষ্টা করছেন। এটা বাস্তব সম্মত নয়। আমরা যখন রাজা বাদশাহদের নিয়ে নাটক, সিনেমা বানাই তখন তাদের পোশাক পরিচ্ছদের বেলায় টুপির কথাও ভাবি। সিংহাসন কেমন হবে তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই ভাবে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নাটক, সিনেমায়ও পরিচালকের প্রস্তুতির পাশাপাশি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রস্তুতিও বেশগুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কোনো কাহিনীতে যারা অভিনয় করবেন তাদের উচিত সেই সময়কে বিবেচনায় এনে চরিত্র ভাবনার রূপায়ণ করা।
প্রসঙ্গক্রমে দেশ বরেণ্য নাট্যব্যক্তিত্ব রাইসুল ইসলাম আসাদের কথা উল্লেখ করতে চাই। বিটিভি যুগের একটি ধারাবাহিক নাটকে অভিনয়ের জন্য পরিচালকের নির্দেশ অনুযায়ী মাথা ন্যাড়া করে ফেলেছিলেন। তার চরিত্রের নাম ছিল মধু পাগলা। ভাবা যায় একটি টিভি ধারাবাহিকের জন্য তিনি তার মাথা ন্যাড়া করেছেন। এটাই হলো ত্যাগের দৃষ্টান্ত। চরিত্রের প্রয়োজনে মাথা ন্যাড়া করায় মধু পাগলা চরিত্রটি সেই সময় দেশের টিভিব দর্শকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এখনও অনেকে প্রসঙ্গক্রমে মধু পাগলার কথা তোলেন। অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদের প্রশংসা করেন। এটা সম্ভব হয়েছে একটি চরিত্রের প্রতি অভিনেতার সর্বোচ্চ ত্যাগের কারণে।
Charecterচরিত্রের প্রয়োজনে নিজেকে তৈরি করার আরও অনেক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন রাইসুল ইসলাম আসাদ। একবার দেখা গেল তিনি মাসের পর মাস মুখের দাড়ি কাটছেন না। ঘটনা কি? খোঁজ নিয়ে জানা গেল লালনের ওপর একটি সিনেমা বানাবেন তানভির মোকাম্মেল। রাইসুল ইসলাম আসাদ লালন চরিত্রে অভিনয় করবেন। সে কারণে মাসের পর মাস ধরে দাড়ি কাটছেন না। নিজেকে লালন হিসেবে তৈরি করার চেষ্টা করছেন। এটাই হলো ত্যাগের দৃষ্টান্ত।
আরও এক লালনের কথা বলি। ওপার বাংলার জনপ্রিয় চিত্র নায়ক প্রসেনজিৎ বহুল আলোচিত সিনেমা ‘মনের মানুষ’ এ লালনের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম-এর এই ছবিতে নিজেকে লালন হিসেবে গড়ে তোলার জন্য টানা এক বছর অন্য কোনো ছবিতে কাজ করেননি প্রসেনজিৎ। মুখে দাড়ি রাখা থেকে শুরু করে নানা ভাবে নিজেকে লালন হিসেবে তৈরি করার মানসিক সংগ্রাম করেছেন। যার ফলে ছবিতে প্রসেনজিৎকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছেন দর্শক। এটাই হলো ত্যাগের দৃষ্টান্ত। এই ছবির পরিচালক গৌতম ঘোষ ছবির চিত্রনাট্য তৈরি করতে সময় নিয়েছেন পাক্কা দুই বছর। এর মধ্যে অসংখ্যবার চিত্রনাট্য কাটাকুটি হয়েছে, সংশোধন বিয়োজন হয়েছে। সে কারণে গৌতম ঘোষের মনের মানুষ দর্শকেরও মনের মানুষ হয়ে উঠেছে। এই ছবির আরেকজন গুণী অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর কথাও বিশেষ ভাবে উল্লেখ করতে হবে। বিশ্বখ্যাতি চিত্রপরিচালক গৌতম ঘোষের ছবিতে চঞ্চল চৌধুরী অভিনয় করবেন। তার মধ্যে ব্যাপক মানসিক উত্তেজনা কাজ করছিল। কলকাতায় গেলেন শুটিং করতে। অনেকে তাকে সেই ভাবে চিনে না, জানেও না। তাই চঞ্চল তেমন একটা গুরুত্ব পাচ্ছিলেন না। নিজের ভেতরে জেদ তৈরি হলো। ছবির নির্ধারিত চরিত্রে নিজেকে তৈরি করার কঠিন মানসিক সংগ্রাম শুরু করলেন। শেষ পর্যন্ত উতরে গেছেন চঞ্চল চৌধুরী। ‘মনের মানুষ’ সিনেমায় দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন তিনি। প্রসেনজিৎ আর চঞ্চলের অভিনয় দৃশ্যে একবারও মনে হয়নি একজনের থেকে অন্যজন একটু আলাদা। বরং কখনও কখনও মনে হয়েছে চঞ্চল যেন একটু এগিয়ে আছেন। এটা কীভাবে সম্ভব? প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন চঞ্চল। তার মতে, মনের মানুষ এ অভিনয় করার সময় আমি আর অন্যকোনো কাজের কথা মাথায় রাখিনি। সর্বদা ছবিটির নির্ধারিত চরিত্রে নিজেকে তৈরি করার চেষ্টা করেছি।
শুধু কি মনের মানুষ, মনপুরা ছবিতে অভিনয়ের ক্ষেত্রে চঞ্চলের মানসিক প্রস্তুতি ছিল বিশেষ ভাবে উল্লেখ করার মতো। সর্বশেষ বহুল আলোচিত ‘আয়নাবাজি’ অভিনয়ের ক্ষেত্রে তার ডেডিকেশন অন্যের জন্য দৃষ্টান্ত হতে পারে। একই চলচ্চিত্রে একই অভিনেতা ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করছেন। এর জন্য সত্যি সত্যি মানসিক প্রস্তুতির পাশাপাশি ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতাও জরুরি। চঞ্চল সেটা করে দেখিয়েছেন। আয়নাবাজিতে অভিনয়ের সময় আর কোনো নাটক সিনেমায় অভিনয় করেননি। ডুবেছিলেন আয়নাবাজিতেই। এটাই হলো ত্যাগের দৃষ্টান্ত।
শুধু অভিনয় নয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ‘ত্যাগ’ করতে না জানলে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা যায় না। জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিমের কথা একটু বলি। শুরুর দিকে নাটকে অভিনয়ের জন্য তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। তার চেহারা নিয়ে অনেকে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন। এমনও দিন গেছে মোশাররফ নাটকের সেটে গিয়ে সারাদিন অপেক্ষা করেও অভিনয়ের সুযোগ পাননি। কিন্তু মোশাররফ একটুও হতাশ হননি। বরং জেদ পুষে রেখেছিলেন। অভিনয়ের প্রথম জীবনে অনেক কষ্ট করেছেন। অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তার স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য বর্তমান সময়ে শোবিজে ‘ত্যাগ’ স্বীকার করার মানসিকতা অনেকেরই নাই বললে চলে। অনেকে পাÐুলিপি ভালো করে পড়েনও না। ফলে দায়সারা অভিনয় করে চলে যান। কোনো কোনো অভিনেতা-অভিনেত্রী দিনে একাধিক নাটকের সেটে অভিনয় করেন। ফলে কাজের কাজ কিছুই হয় না।