Home আরোও বিভাগ সিনেমা গানই সিনেমার প্রাণ…ফাহমিদা নবী

গানই সিনেমার প্রাণ…ফাহমিদা নবী

SHARE
Fahmida-Nobi

সিনেমায় অন্তত একটা হলেও ভীষণ ভালো গান থাকা দরকার। আগের সিনেমার গানগুলো তাই মনে করিয়ে দেয় বারবার। গান সিনেমাকে প্রাণ দেয়। সিনেমার নাম ভুলে যায় দর্শক কিন্তু ভোলে না শুধু গান, কিন্তু বর্তমানে তেমন গান হচ্ছে না কেন?
প্রশ্নটা দর্শক শ্রোতা এবং সমালোচকদেরও।
গান শুনেই দর্শক হলমুখী হয়, স্বীকার করতেই হবে বিষয়টা। কাহিনি, চিত্রনাট্য, সংলাপ আরও বিষয়গুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে তখনই, যখন একটা গান প্রাণ ছুঁয়ে যায় দর্শকের মনে, গুন গুন করে যে গানের সঙ্গে মন মিশে যায়, সে সিনেমাই তো হলে গিয়ে দেখতে চান দর্শক। তাহলে তেমন করে গানের জন্য যথার্থ সময়, চিন্তা, মনন দিয়ে কেন গান তৈরি হচ্ছে না? কেন কোনও গান মানুষের মন ছুঁয়ে যায় না? তবে কেন আগের দিনের মতো দৃশ্যপট অনুযায়ী একটা রোমান্টিক গান নিয়ে ভাবনা-চিন্তা হচ্ছে না? নানান প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় আমাদের। আসুন উত্তর খুঁজি।
সময়টা খুব আগের নয়, এই তো ১০ অথবা ১৫ বছর হবে। মানুষ গান বলতে সিনেমার গানকেই বুঝতো। অর্থাৎ মন ভালো করা সিনেমাকে নিজের গল্প বলে মনে করতো, গান যখন ভালো লাগতো, তখন আরও প্রিয় হয়ে যায় সিনেমাটা। একটা সিনেমা তৈরি হওয়া মানেই চারপাশে বিরাট এক সাড়া ফেলা। কারণ, দারুণ কোনও মন-মাতানো প্রেমের গান শ্রোতার কানে পৌঁছেই গেছে। সে গান সবার মুখে মুখে ফেরে সবসময়। সারা দিন সিনেমার গান মনে বাজতে থাকতো। প্রাত্যহিক জীবনের ব্যস্ততায় খানিকটা বিনোদনের জন্যই তো সিনেমা হোক সেটা কঠিন বাস্তবতা কিংবা রোমান্টিকতায় ভরপুর। গানেরই প্রাধান্য থাকতো সেখানে খুব বেশি। প্রতিযোগিতার যুগে ভারসাম্য সমঝোতা জরুরি।
সিনেমার গানের প্রভাব বেশি আমাদের জীবনে বরাবরই, গান গুন গুন করতে করতে সিনেমার নাম পড়ে যেতো। আলোচনায় আড্ডায় তা নিয়ে চলতো বিশ্লেষণ। এখন তা হয় না কেন? কারণ একটাই, গানের প্রতি সঠিক বাস্তবায়ন, মান ধরে রাখার মতো কণ্ঠের ব্যবহার নেই একদম। সমালোচকের বা দর্শকের সরাসরি আবেগের বহিঃপ্রকাশ গানটা টানছে না কিসের যেন অভাব। কণ্ঠের ব্যবহারে আবেগে, উচ্চারণে সেই মমতা নেই। গানের কথা ভালো, সুরও ভালো কিন্তু সুর সংযোজনের প্রতি অবহেলা প্রধান কারণ হিসেবে অকপটে বলে দিচ্ছে দর্শক শ্রোতা। সরাসরি মন্তব্য। কষ্ট লাগে কথাগুলো যখন শুনতে হয়, তরুণরাও বলে আপনাদের বাবাদের সময়ের গানে স্পষ্টতার আবেগ ধারণ করতে পারি কিন্তু এখনকার গানে সেটার এত অভাব কেন?
এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া সহজ বা জানি, কিন্তু তবু কঠিন উত্তর দেয়া। কারণ, আমরা গান গাই তাই উত্তরের কাজটা প্রযোজক বা পরিচালকের জানা, কাকে দিয়ে গান গাওয়াবে, কার কণ্ঠে কোন গান মানাবে, তা দেখার বিষয়টা সম্পূর্ণ নির্ভর করে যারা ছবি বানায় এবং সুরকারের ইচ্ছার ওপর।
স্বর্ণযুগের সিনেমার গান যে গানগুলোকে বলছি সে সময়ের সব গান যুগ ধরে বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে তার মাধুরী, সে গানগুলো মানুষের মুখে মুখে থাকতে থাকতে একসময় তা কালোত্তীর্ণ হয়ে গছে। ৬০ দশক, ৭০ দশক, ৮০’র দশক এমনি ৯০ দশক পর্যন্ত অনেক গান এভাবেই আজও কালোত্তীর্ণ হয়ে আছে।
কিন্তু বাদসাদলো বিশ্বায়নের যুগে এসে, মানে ২০০০ সাল। যখন সিনেমা হলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল দর্শকদের। বিরাট এক শূন্যতা। শুরুর দিকে যদি বলি কয়েকটি ছবির গান তরুণদের কাছে পৌঁছে দিয়েছে নতুন করে, নতুনত্বের স্বাদে রেডিও এফএম-গুলো যখন বাংলাদেশ বেতারের পাশাপাশি চালু হলো, তখন খুব দায়বদ্ধতার সঙ্গে বাংলাদেশের সিনেমার গানগুলো বাজাতো, সে সময় হাতেগোনা কয়েকটি ছবির গান মানুষকে আবার হলমুখী করেছে তা স্বীকার করতেই হবে।
এখন অনেক সিনেমা তৈরি হচ্ছে কিন্তু গান তৈরিতে মনোযোগ নেই। আর বিপত্তিটা সেখানেই। মানুষ সিনেমা থেকে মনে রাখার মতো আর কিছু খুঁজে পাচ্ছে না। কাছাকাছি বা একই কাহিনি বা একই নায়ক-নায়িকা সব ছবিতেই থাকছে, তবে মনোমুগ্ধকর সেই গান নেই। কোনও কোনও সিনেমাতে তো গানও থাকে না আজকাল। সেক্ষেত্রে সে সিনেমাও দর্শককে টানছে না, দেখার পর তা মনে গেঁথে থাকছে না সেই সিনেমার কাহিনি। গানই মূলত দর্শককে হলমুখী করে এই ব্যস্ত জীবনে। যেখানে নানান রকম উপায় এখন হাতের মুঠোয়। সেখানে হলমুখী করার জন্য গানকে প্রাধান্য দিতেই হবে। বড় পর্দার প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরকাল আছেই, থাকবেই।
গান শোনার পর সিনেমা দেখার তৃষ্ণা যেন আরও বেড়ে যায়, তার জন্যই গানকে নিয়ে ভাবতে হবেই। তাই সিনেমায় অন্তত একটা হলেও ভীষণ ভালো গান থাকা দরকার। গানটাই ছবির প্রাণ মনে রাখাাঁ জরুরি। আশার কথা, ভালো ছবি আবার তৈরি হচ্ছে, এগিয়ে এসেছে তরুণরা, একটা ভালো গান বাড়িয়ে দেবে সিনেমার প্রাণ। মনে রাখতে হবে দায়বদ্ধতা উন্নত করে সংস্কৃতিকে মনে তো রাখতেই হয় চিরকাল।