কিশোরীর হাতে সাইকেল এবং প্রেরণাদায়ী গল্পকথা!

কিশোরীর হাতে সাইকেল এবং প্রেরণাদায়ী গল্পকথা!

143
SHARE
Cycle

আনোয়ারুল আলম, নীলফামারী থেকে: ভাবুন তো একবার কথা নেই বার্তা নেই, আগাম কোনো ঘোষণাও নেই। হঠাৎ করে দেশের উত্তর জনপদের নীলফামারীতে এক ঝাঁক তারকাশিল্পীর আবির্ভাব ঘটলো। তাও আবার যেই সেই তারকা নয়। রবীন্দ্রসংগীত কন্যা রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, নন্দিত অভিনেতা, চিত্রশিল্পী, পরিচালক আফজাল হোসেন, নন্দিত কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, নন্দিত শিশু সাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগর, আমীরুল ইসলাম, বিজ্ঞাপন শিল্পের নন্দিত তারকা সানাউল আরেফিন, স্বর্ণকিশোরী ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ফারজানা ব্রাউনিয়া ও নারী উদ্যোক্তা কনা রেজার মতো গুণী তারকাদের আবির্ভাব যদি হঠাৎ করেই নীলফামারীতে ঘটে তাহলে কি কেউ প্রথম দফায় বিশ্বাস করতে চাইবে? সহজ উত্তর- না এটা বিশ্বাস যোগ্য হবে না। দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের এই গুণী ব্যক্তিরা নীলফামারীতে আসবেন এই সংবাদটা মুখে মুখে ছড়িয়ে দিলেও তো বাতাসের আগে রাষ্ট্র হয়ে যাবে। কিন্তু না, সংবাদটা মুখে মুখেও ছড়ায়নি। কারণ উদ্যোক্তারা চাননি ঘটনা খুব বেশি জানাজানি হয়ে যাক। তাহলে মানুষের ঢল থামানো যাবে না। অথচ হঠাৎই নীলফামারী শহরে এই গুণী ব্যক্তিদের আবির্ভাব ঘটলো। ঘটনা কী? হঠাৎ এত তারকার আবির্ভাব কেন? তবে শহরে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন দেখে বোঝা গেল কেন তারা হঠাৎ নীলফামারীতে এসেছেন। অনুষ্ঠান মঞ্চের কাছেই নীলফামারীর মানুষের আদরের ধন, দেশের কৃতী সন্তান সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের বাসভবন। মূলত: তাঁর আহŸানেই ছোটকাকু ক্লাবের পক্ষে এলাকার দরিদ্র ও মেধাবী মেয়েদের মাঝে সাইকেল বিতরণ করতে এসেছেন এই গুণীজনেরা। তারা সকলেই সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের অনেক আপনজন। একটি মহৎ কাজের শরীক হতে আপনজনের ডাকে সাড়া না দিয়ে কি থাকা যায়? থাকা যায় না। সেটাই প্রমাণিত হলো আরেকবার নীলফামারীতে। অনুষ্ঠানে দরিদ্র মেধাবী মেয়েদের মাঝে সাইকেল বিতরণ করা হবে। এটাও আরেক বিস্ময়। কারণ একদা উত্তর জনপদের অনগ্রসর এলাকা হিসেবে পরিচিত নীলফামারীর মেয়েরা সাইকেল চালাবে একথা কি কেউ ভেবেছিল? না ভাবেনি। কিন্তু এলাকার মানুষের প্রিয় নেতা আসাদুজ্জামান নূরের একান্তিক প্রচেষ্টায়, নেতৃত্বের গুণে গোটা জনপদে মানুষের জীবন মানের ক্ষেত্রে বিস্ময়কর এক পজিটিভ পরিবর্তন ঘটেছে। পুরুষের পাশাপাশি মেয়েরাও এগিয়ে এসেছে দেশগড়ার কাজে। আর তাই মেয়েদের সাইকেল চালাতে এখন আর কোনো বাধা নাই।

অনুষ্ঠান শুরু হলো এলাকার এক কিশোরীর বুদ্ধিদীপ্ত বক্তৃতার মাধ্যমে। যার কণ্ঠে সামনে এগিয়ে যাবার দীপ্ত শপথ। মঞ্চের সামনে, আশেপাশে দাঁড়িয়ে, চেয়ারে বসে হাজার খানেক দর্শক অনুষ্ঠান দেখছিল। সবার চোখে-মুখে আনন্দ আর বিস্ময়। আনন্দ এই জন্য যে পরিবারের মেয়েরা সাইকেল উপহার পাচ্ছে। পাশাপাশি বিস্ময় এই কারণে যে দেশের এত গুণী মানুষকে এক সঙ্গে সরাসরি সামনা সামনি দেখার সুযোগ হচ্ছে।

যে মেয়েরা সাইকেল উপহার পাবে তারা সকলেই খেলোয়াড়। একে একে তাদের উদ্দেশে বক্তৃতা করলেন স্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ গুণী জনেরা। গুণী সংগীত তারকা রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা তার ব্যক্তি জীবনে সাইকেল চালানো শেখার প্রেরণাদায়ী কিছু কথা শোনালেন। মেয়েদের উদ্দেশে তিনি বললেন ভবিষ্যৎ লক্ষ্য স্থির রেখে পাখির মতো উড়তে শেখ। ইমদাদুল হক মিলন বললেন, পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ পাওয়াই বড় কথা নয়। বড় কথা হলো মানুষের মতো মানুষ হওয়া। আফজাল হোসেন মেয়েদের উদ্দেশে বললেন, জীবনে কখনও অন্যায়ের কাছে মাথা নত করো না। ফরিদুর রেজা সাগর বললেন, আসাদুজ্জামান নূর শুধুমাত্র আপনাদের প্রিয়নেতা নন তিনি গোটা দেশের গর্ব। তিনি আমাদের অহংকার। মেয়েদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এই যে তোমরা সাইকেল উপহার পেলে এটাকে জীবন চলার পথের প্রেরণা হিসেবে মনে করবে এবং অবশ্যই প্রিয় নেতা, প্রিয় মানুষ আসাদুজ্জামান নূরের অবদানের কথা মনে রাখবে। এলাকার সৃজনশীল কাজে ভবিষতেও ছোটকাকু ক্লাব তৎপর থাকবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আমীরুল ইসলাম বলেন, নীলফামারীর মেয়েরা এখন সাইকেল চালায় এটা ভাবতেই অনেক আনন্দ হচ্ছে। কারণ সাইকেল তো শুধুমাত্র একটি বাহন নয়। সাইকেল মানেই গতি সঞ্চারী প্রেরণা। স্বর্ণকিশোরী নেটওয়ার্ক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ফারজানা ব্রাউনিয়া তার স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে অনুষ্ঠানের মূলপর্ব উপস্থাপনা করেন। প্রধান অতিথির ভাষণে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর অভিভ‚ত কণ্ঠে বলেন, যারা আজ নীলফামারীতে এসেছেন তারা সকলে আমার অনেক প্রিয় মানুষ। তারা আমার স্বজন, আত্মার আত্মীয়। ছোটকাকু ক্লাবের প্রশংসা করে তিনি বলেন, এলাকার গরিব মেধাবী মেয়েদের হাতে সাইকেল তুলে দিয়ে এই ক্লাব একটি মহৎ কাজে যুক্ত হলো।

Cycle-1ছিমছাম, গোছানো এই সুন্দর আয়োজনটিতে জেলা প্রশাসক খালিদ রহিম, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে পৌর মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি দেওয়ান কামাল আহমেদ, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মমতাজুল হক, উপজেলা চেয়ারম্যান আবুজার রহমান ও নীলফামারী জেলার পুলিশ সুপার জাকির হোসেনসহ অন্যা নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেন। অন্যান্যের মধ্যে আনন্দ আলোর সম্পাদক রেজানুর রহমানও অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনা শেষে প্রধান অতিথি সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের নেতৃত্বে অতিথিরা ছোটকাকু ক্লাবের পক্ষ থেকে ২০ জন দরিদ্র ও মেধাবী কিশোরীর হাতে সাইকেল তুলে দেন। ২০ জন কিশোরীর নাম, পুর্ণিমা রায়, তপসী রায়, মুন্নী আকতার, অনিমা রায়, উর্মিলা রায়, ময়না আকতার, মরিয়ম আকতার, শতরুপা রায়, সোভা রায়, সোমা আকতার, হাসনা, মিষ্টি আকতার, রানী আকতার, মালা আকতার, স্বপনা, সুরভী মনিষা ও সুরাইয়া। দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের হাতে ছোটকাকু ক্লাবের পক্ষ থেকে সাইকেল উপহার পেয়ে কিশোরীরা বেশ খুশি। পুর্ণিমা রায়ের মন্তব্য, এইমাত্র যা ঘটলো তা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। দেশের এত গুণী ব্যক্তি আমাদের সামনে উপস্থিত। স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। শোভা রায় বললÑ মাননীয় মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরের অনুপ্রেরণায় আমরা এলাকার কিশোর-কিশোরীরা লেখাপড়া, খেলাধুলাসহ ভালো কাজে উৎসাহ পাচ্ছি। আপনারা সকলে তার জন্য আশীর্বাদ করবেন।

একসময় অনুষ্ঠান শেষ হলো। কিন্তু আনন্দের রেশ লেগেই আছে। ২০ কিশোরী সাইকেল উপহার পেয়ে খুশিতে আত্মহারা। হাসনা জানাল এখন থেকে তার স্কুলে যেতে সমস্যা হবে না। সাইকেলে চেপে হাওয়ার বেগে প্রতিদিন স্কুলের পথে ছুটবে সে। স্বপনা বললÑ সাইকেল পেয়ে মনে হচ্ছে এবার আমি সামনের সব বাধা দূর করতে পারব। গুণী শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার সাইকেল বিষয়ক গল্প তাকে অনেক অনুপ্রাণিত করেছে। স্বপনার মন্তব্যÑ মেয়েদের কাছে একটা সাইকেল তো আসলে সাইকেল নয়। এগিয়ে যাবার প্রেরণা। এবার আমি এগিয়ে যাবই যাব….