কার্তিকের নবান্নের দেশে-মুকিত মজুমদার বাবু

কার্তিকের নবান্নের দেশে-মুকিত মজুমদার বাবু

172
SHARE
POJ

বাংলাদেশ ধানের দেশ, গানের দেশ, পাখির দেশ, নদীর দেশ। এদেশের সমৃদ্ধির মূল উর্বরা মাটি। আর এই মাটি অকৃপণভাবে দান করেছে প্রকৃতির সম্ভার। সবুজের লীলাভূমি হিসেবে পরিচিতি তুলে ধরেছে বিশ্বের কাছে। সোনার বাংলা, রূপসী বাংলা কত নামেইনা অভিহিত করা হয়েছে রূপে রূপে অপরূপা এই স্বদেশ ভূমিকে। অনিন্দ্য সুন্দরের এই মুগ্ধতা ধরা পড়ে ঋতুবৈচিত্র্যে। প্রকৃতির সৌন্দর্যে ক্লান্ত হয় না চোখ। ষড়ঋতুর এ দেশে গ্রীষ্মের দাবদাহ, বর্ষার রিমিঝিমি গান, শরতের নির্মল স্বচ্ছ আকাশ, শীতের হাড় কাঁপানো হিমেল হাওয়া, বসন্তে প্রকৃতির সৌন্দর্যে উদাস বাউল মন আর হেমন্তের ফসলের সম্ভার এদেশকে ভরিয়ে তুলেছে উচ্ছাস, আনন্দ আর ভালোলাগার কাব্যকথায়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় তাই বলেছেনÑ

‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি…।’

মাঠে মাঠে প্রসবিনী সোনালি ধানের সোনারঙ ছড়িয়ে দেয় মানুষের মাঝে। বাতাসে মাথা দুলিয়ে ছন্দে ছন্দে নাচে। গাঁয়ের আঁকা-বাঁকা মেঠোপথ দিয়ে ধানের আঁটি মাথায় করে কিংবা গরুর গাড়িতে করে ধান নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় কৃষকের সুরেলা কণ্ঠের গানই বুঝিয়ে দেয় হেমন্ত আমাদের কত ভালোবাসার, কত আপন, কত কাছের ঋতু। হেমন্তের রূপে মুগ্ধ হয়েই কবি জীবনানন্দ দাশ লিখেছেনÑ ‘আবার আসিব ফিরে, ধানসিঁড়িটির তীরেÑ এই বাংলায়/হয়তো মানুষ নয়Ñ হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে/হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে/কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিবো এ কাঁঠাল-ছায়ায়…।’

কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস। ফসলের মন মাতানো ঘ্রাণ নিয়ে বাংলার প্রকৃতিতে এখন হেমন্তকাল। ঋতু পরিক্রমায় চতুর্থ ঋতু। এ ঋতুতে বাংলার প্রকৃতি সাজে এক ভিন্ন সাজে। হেমন্তের দিনে দেখতে দেখতে সূর্যের আলো মিলিয়ে গিয়ে নামে দিগন্ত ঘিরে ফেলা কুয়াশার জাল। হিমেল হাওয়া ছুঁয়ে যায় শরীর। নামে নির্জনতা। সকালের শিশির সিক্ত ভোরের দূর্বাঘাসে সূর্যের আলো পড়ে যে অপার্থিব শোভার সৃষ্টি হয় তা অন্যকোনো ঋতুতে দেখা যায় না। দিগন্ত বিস্তীর্ণ খেতের কাঁচা-পাকা ধান দেখে আনন্দে দিশেহারা হয়ে ওঠে কৃষকের মন। হেমন্ত ল²ী, হেমন্ত অন্নদাত্রী, হেমন্ত কল্যাণদাত্রীÑ আর তাইতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হেমন্তকে বর্ণনা করেছেনÑ ‘হায় হেমন্তল²ী, তোমার নয়ন কেন ঢাকা।/হিমের ঘন ঘোমটাখানি ধুমল রঙে আঁকা/সন্ধ্যাপ্রদীপ তোমার হাতে মলিন হেরি কুয়াশাতে/কণ্ঠে তোমার বাণী যেন করুণ বাষ্পে মাখা/ধরার আঁচল ভরে দিলে প্রচুর সোনার ধানে/দিগঙ্গনার অঙ্গন আজ পূর্ণ তোমার দানে/আপন দানের আড়ালেতে রইলে কেন আসন পেতে/আপনাকে এই কেমন তোমার গোপন করে রাখা \’

কৃষকের ঘরে নতুন ধান আসায় হেমন্তেই পালিত হয় নবান্ন উৎসব। প্রাচীনকাল থেকেই গ্রামের মানুষ ধান কাটাকে উপলক্ষ করে নবান্ন উৎসব পালন করে আসছে। এদেশের লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে নবান্নের পরিচয় আবহমান কাল থেকে। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যমতে নবান্ন উৎসবে নতুন ধানের চাল নতুন মাটির হাঁড়িতে রান্না করা হয়। নতুন ধানের চালের সঙ্গে গুড় এবং দুধ নবান্নের প্রধান উপাদান। এছাড়া সুস্বাদু পায়েস আর নতুন চালের গুঁড়ো দিয়ে বানানো হয় ক্ষীর, পিঠা-পুলিসহ মোয়া-মুড়কি। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কেউই বাদ যায় না নবান্নের নিমন্ত্রণে।

একদিকে আমন ধান কাটার ধুম পড়ে অন্যদিকে চলে রবিশস্য রোপণের প্রস্তুতি। ধীরে ধীরে মাষকলাই, মটরশুটির ঘন সবুজ কচি চারায় ছেয়ে যায় মাঠ। সরিষার হলুদ সাগরে গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে মৌমাছি। বিভিন্ন শাক-সবজি ও মশলা যেমনÑ গাজর, কপি, আলু ও পেঁয়াজ রসুনের চাষ করতে দেখা যায়। পতিত ভিটায় পড়ে থাকা মাচায় লাউ, সিম ও পুঁইয়ের কচি ডগা লকলকিয়ে বাড়তে থাকে। হেমন্তের হাত ধরেই আসতে থাকে হাড় কাঁপানো শীত।

‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে/অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের খেতে/মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার, চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ/তাহার আস্বাদ পেয়েছে অবসাদে পেকে ওঠে ধান।’ হেমন্ত অনুভবের ঋতু। ¤øান, ধূসর, অস্পষ্ট। তাকে যেভাবে অনুভব করা যায়, সেভাবে দেখা যায় না। শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষার মতো হেমন্ত তীব্র, প্রখর অথবা উন্মোচিত নয়। বসন্তের মতো তার বর্ণ, গন্ধ, গরিমা নেই। হেমন্ত মৌন, শীতল, বলা যায় অন্তর্মুখী।

লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন