কারও যদি হুমায়ূনের জীবন কাহিনী মনে হয় সেটা তার ব্যাপার

কারও যদি হুমায়ূনের জীবন কাহিনী মনে হয় সেটা তার ব্যাপার

230
SHARE
doob-poster

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী

যে মাসে নন্দিত কথাসাহিত্যিক, নির্মাণের মহান কারিগর হুমায়ূন আহমেদের জন্ম সেই মাসেই তার জীবন কাহিনী ভিত্তিক একটি সিনেমা বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৫টি দেশে একই সঙ্গে মুক্তি পাচ্ছে। এটি বাংলাদেশের সিনেমার জন্য একটি অনন্য ঘটনা। আমাদের সিনেমার এগিয়ে যাবার গল্প তো বটেই। ছবিটির নাম ডুব। বিশিষ্ট নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর নতুন এই ছবিটি মুক্তির আগেই এটি হুমায়ূন আহমেদের জীবনের বায়োপিক কি না তা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। এ নিয়ে আনন্দ আলোর একটি সংখ্যায় কাভার স্টোরিও প্রকাশ পায়। ডুব কী হুমায়ূন আহমেদের জীবনের গল্প? এই প্রশ্নের সাফ জবাব দিয়েছেন গুণী নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।

ডুব এর জন্ম নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। আমি বিষয়টি পরিষ্কার করতে চাই। আমি যে এই ছবিটা বানাব সিদ্ধান্তটা নেই সুদূর সিউলে বসে। সেখানে আমার টেলিভিশন’ ছবির পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ চলছিল। সেখান থেকে ফেসবুকে বাংলাদেশের কিছু ‘খবরা খবর’ দেখছিলাম। ফলোও করছিলাম। একটা ঘটনা অথবা খবর যাই বলি না কেন আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। ঘটনাটা হচ্ছে যে… হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর খবর আমি সিউলে বসে পাই। আমরা বড় হয়েছি হুমায়ূন আহমেদের অরার থেকে। আমাদের কালের শুধু নয় আমার ধারণা স্বাধীন বাংলাদেশের বড় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হুমায়ূন আহমেদ। যেহেতু আমরা তার ফ্যান ফলে আমাদের মাঝে একটা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় তার মৃত্যুর পর। আমি এবং হুমায়ূন আহমেদ একই সময়ে কাজ করেছি। কিন্তু আমার সঙ্গে উনার কোনোদিন শারীরিক ভাবে দেখা হয়নি। দেখা করার কোনো প্রয়োজনও বোধ করিনি। কিন্তু একটা জিনিস আমি সব সময় জানতাম যে, উনার গল্পের বিষয় বস্তু আমাদের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। পার্ট অব আওয়ার লাইফ। ফলে তার মৃত্যু আমাকে ভীষণ রকমের নাড়া দেয়। এতটা নাড়া দিবে আমি সেটা আগে কখনও বুঝতে পারিনি। আমার স্পষ্ট মনে আছেÑ সিউলে বৃষ্টি হচ্ছিল… প্রচÐ বৃষ্টি। তখন সিউলে বসে আমরা আমাদের প্রিয় লেখকের মৃত্যু সংবাদ পাই। আমি পাবলিক প্লেসে আমার আবেগ দেখাতে খুব বেশি পছন্দ করি না। অথচ কী এক আচমকা… বোধকরি বৃষ্টির কারণে হবে, আমার চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে পানি পড়তে লাগল। আমি কেঁদে চলেছি…

আমরা সিউলের যেখানে ছিলাম সেখান থেকে বেড়িয়ে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে একটি জায়গায় গাড়ি চালিয়ে এলাম। এখানে আমি থাকি। তখন গাড়িতে বিটলস এর একটা গান বাজছিল। গানটা আমাকে দারুণভাবে আলোড়িত করে তুলল। প্রসঙ্গ ক্রমে বলে রাখি… সিউলে বসে হুমায়ূন আহমেদের বিভিন্ন খবর আমি পাচ্ছিলাম। ব্যস্ততার কারণে তার যেদিন মৃত্যু হয় সেদিন খবরটা ফলো করতে পারিনি। বেশ কয়েকদিন পর খবরটা আমার কাছে আসে। ততদিনে হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারদের মধ্যে এক ধরনের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে বলে অনেক খবর পেতে থাকি। ঘটনাগুলো ইতিহাসের সত্য। লুকানোর কোনো সুযোগ নাই। এগুলো ঘটেছে। এই বাংলাদেশেই হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে ঘটেছে। অধিকার নিয়ে টানা হ্যাঁচড়া। নাগরিক সমাজে বেড়ে ওঠা একজন মানুষ হিসেবে আমি এটা মেনে নিতে পারছিলাম না। ঘটনাটি আমার মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তাই বলে হুমায়ূন আহমেদের জীবনী নিয়ে কোনো কিছু নির্মাণ করার ইচ্ছে তখনও আমার সৃষ্টি হয়নি, এখনও সে রকমের কোনো ইচ্ছে নেই। কিন্তু তাঁর মৃত্যু ও পরবর্তী ঘটনা আমাকে একটা ছবি বানাতে প্রেরণা যুগিয়েছে। আমি তাড়না অনুভব করেছি। আমার সব ছবির গল্প জীবন থেকে নেয়া। আশে-পাশের গল্প থেকে নেয়া কিন্তু কোনোটাই বায়োপিক না। কোনোটাই কারও জীবনী গ্রন্থ না। ফলে এটাকে সত্য ভাবার কোনো কারণ নাই। আমি সত্য কিছু বানাতেও চাইনি। আমি মিথ্যা বানাতে চেয়েছি। কল্পনা…। সিনেমা মিথ্যা কথা বলে। কিন্তু এমন মিথ্যা কথা বলে যার মধ্য দিয়ে আপনি গভীর সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারবেন। আমি সেটাই করতে চেয়েছি।

এক সময় আমি গল্পটা লিখতে শুরু করলাম। নানান সময় নানা রকমের বদল ঘটেছে গল্পে। বাক বদল করেছে। নতুন মোড় নিয়েছে। এক সময় ভারতের ফিল্ম বাজার নামে একটি প্রতিষ্ঠানে গল্পটি পাঠাই। সেটা ওরা সিলেক্ট করে। পাÐলিপিটি দুবাইতে অ্যাওয়ার্ড পায়।

তারপর থেকেই আমি ছবিটি নিয়ে বসবাস করতে থাকলাম। কাহিনীতে আবার নানা ধরনের বাক বদল হয়েছে। এক সময় ছবির শুটিং শুরু করলাম। তারপরের ঘটনাতো একটি ইতিহাস…. শেষে একটা কথা বলি। আমার এই ছবি দেখে কেউ যেন সত্য প্রত্যাশা না করে। আমি কারও জীবনী নিয়ে ছবি বানাইনি। কিন্তু আমার ছবি দেখে যদি আমাদের আশে-পাশের কারও জীবনের কথা মনে হয়… যদি হুমায়ূন আহমেদের জীবনের কথাও মনে হয় সেটা যিনি দেখছেন তার ব্যাপার, ব্যাখ্যাটা তার, তার ব্যাখ্যা তার কাছেই থাকবে। তাতে আমার কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু আবারও বলি ডুব কারও জীবনীকে রিফ্লের্ক্ট করে না।

FARUKIবায়োপিক সম্বন্ধে আমি কয়েকটি কথা বলতে চাই। কারণ এ নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছে। এখনও হচ্ছে। বায়োপিক-এর কাছে আপনি কখনও সত্য খুঁজতে যাবেন না। কোনো বায়োপিকই সত্য নয়। সোস্যাল নেটওয়ার্ক নামে একটি ছবি হয়েছিল। মার্ক জুকার বাক এর ওপর ছবিটা বানানো হয়েছিল। ছবিটি দেখে এক বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন ছবিতে ব্যবহৃত একটি টি শার্ট ছাড়া আর কোনো কিছুই অথেনটিক নয়। সব মিথ্যা… ভুলে ভরা। বানোয়াট এবং উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে আমাকে খারাপ দেখানো হয়েছে। ছবিতে মিথ্যা কথার ছড়াছড়ি আছে। সেই ছবিটি পরবর্তীতে অস্কার পায়। চিত্রনাট্যের জন্য পুরস্কার পেয়েছিল। তাহলে তো ভাবুন তো… আমরা একটি ছবিতে বায়োপিক বলছি। যার বায়োপিক বলছি তিনি বলছেন সব মিথ্যা… কোনো কিছুই সত্য নয়। অথচ সেই ছবিকেই অস্কারের পÐিতরা বলছেন বেস্ট ফিল্ম। এটার কারণ কী? কারণ হচ্ছে শিল্প তথ্যের সত্য দাবি করে না। তথ্যের সত্যের সঙ্গে শিল্পের কোনো সম্পর্ক নাই। শিল্প তার নিজের সত্য তৈরি করতে চায়। এ কারণেই এটার নাম ফিকসন। আমাদের বোধকরি ভাবার সময় এসেছে বাস্তবের সত্য আর শিল্পের সত্য দুটি আলাদা ব্যাপার। ‘আমি মেডইন বাংলাদেশ’ বানিয়েছি একটি বাস্তব ঘটনা নিয়ে। এটা নিয়ে আনিসুল হক উপন্যাস লিখেছেন। উপন্যাস লেখার সময় উনিও হুবহু বাস্তব কাহিনীকে অনুসরণ করেননি। আমিও ছবি বানানোর সময় তাই করেছি। বাস্তব ঘটনা অনুসরণ করিনি। এটার নাম শিল্প। সংক্ষেপ এই হচ্ছে ডুব এর জন্ম রহস্য…