কখনও কখনও গাছের সঙ্গেও কথা বলি

কখনও কখনও গাছের সঙ্গেও কথা বলি

35
SHARE
Major-Gn.-Abu-Sayed

মেজর জেনারেল আবু সাঈদ মো: মাসুদ

প্রকল্প পরিচালক, হাতিরঝিল প্রকল্প, প্রধান সমন্বয়ক পদ্মা বহুমুখী সেতু, পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প

 

আনন্দ আলো: হাতিরঝিল মানেই এখন আনন্দ আর উৎসবের স্বপ্নময় জগৎ। এর আইডিয়াটা কীভাবে এলো?

মেজর জেনারেল সাঈদ: এককথায় বলতে গেলে বলব এই আইডিয়াটা দেশের সকল মানুষেরই চিন্তার ফসল। যানজটসহ নানাবিধ সমস্যায় আক্রান্ত আমাদের প্রিয় রাজধানী শহরের মানুষ সবসময় একটা স্বস্তির জায়গা খুঁজতো। যেখানে সবুজের বিচরণ আছে। নির্মল বাতাস পাওয়া যাবে। কোলাহল থাকবে না এমন একটি জায়গা। শুক্রবারসহ ছুটির দিনে নগরবাসীর অনেকে বেড়ানোর ক্ষেত্রে ঝঞ্চাটবিহীন নিরিবিলি সুন্দর জায়গার খোঁজ করেন। এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাৎ বুয়েট থেকে প্রথমে হাতিরঝিলের আইডিয়াটা আসে। এই আইডিয়ায় কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, হোটেল সোনারগাঁও থেকে রামপুরা প্রগতি সরণি পর্যন্ত বেগুনবাড়ি ও হাতিরঝিল নামের দুটি খালকে খনন করার চিন্তা করা হয়। কারণ খাল দুটি খনন না করার ফলে বর্ষাকালে প্রতিবছর উভয় পাশের এলাকার বাসাবাড়ি জলমগ্ন হয়ে ওঠে। ফলে প্রতিবছরই এলাকাবাসী চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে বুয়েটে এ ব্যাপারে একটি স্টাডি করা হয়। স্টাডিতে দুটি খালেরই নাব্যতা দূর করার ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করে বলা হয় খাল দুটির যতœ নিলে বর্ষাকালে উভয় পাশের বাসাবাড়ি ও জনগণকে বর্ষাকালের জলমগ্ন অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দেওয়ার পাশাপাশি এটিকে দৃষ্টিনন্দন যাতায়াত ভ্রমণ এলাকা হিসেবেও গড়ে তোলা সম্ভব। বুয়েটের স্টাডির প্রেক্ষিতে সরকার এলাকাটির উন্নয়নে আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং একটি প্রকল্পের আওতায় তা বাস্তবায়নের গুরু দায়িত্ব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দেয়া হয়। বুয়েটের সহযোগিতায় দেশবরেন্য কনসালটেন্ট ও স্থপতিদের আন্তরিক অংশ গ্রহণের ফলে এতবড় একটা প্রজেক্ট আমরা সম্পন্ন করতে পেরেছি।

আনন্দ আলো: হাতিরঝিল এখন আর স্বপ্ন নয়। এটি বাস্তব। ভবিষ্যতে এই প্রকল্প নিয়ে আর কি কি পরিকল্পনা আছে।

মেজর জেনারেল সাঈদ: যে কেউ এলেই দেখতে পাবেন হাতির ঝিল কতটা দৃষ্টিনন্দন হয়ে উঠেছে। প্রকল্পের আওতায় সবুজ বেস্টনি গড়ে তোলা হয়েছে। সারি সারি সবুজ গাছপালার সমারোহ। ওয়ান ওয়ে গণপরিবহন ব্যবস্থার পাশাপাশি লেকে ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই প্রকল্প এলাকায় বেড়াতে এলে মানুষ অনেকগুলো সুবিধা পাচ্ছে। যেমনÑ নির্মল পরিবেশ, নির্বিঘœ যাতায়াত ব্যবস্থা, স্বচ্ছন্দ ভ্রমণ ও বিশ্রামের সুযোগ। এই প্রকল্পকে ঘিরে ভবিষ্যতে আরও অনেক পরিকল্পনা রয়েছে।

আনন্দ আলো: আমরা অনেকে বলি রাজধানী বাসী নিয়ম মানতে চায় না। কিন্তু হাতিরঝিলে তো সবাই নিয়ম মানছে। এটা কীভাবে সম্ভব হলো?

মেজর জেনারেল সাঈদ: (মৃদু হেসে) নিয়ম মানার মতো পরিবেশ সৃষ্টি করাও জরুরি। শুরু থেকেই হাতিরঝিল প্রকল্পে এই বিষয়টির প্রতিই জোর দেয়া হয়েছে। তাছাড়া প্রকল্পটির যাতায়াত ব্যবস্থা ওয়ান ওয়ে হওয়ায় নিয়ম মানার ক্ষেত্রে ঝঞ্চাট কম হচ্ছে। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন ৮.৮ কিলোমিটার পরিধির এই প্রকল্প এলাকা অনেকটা ঘড়ির কাটার মতো একদিকে চলে। মাঝে মাঝে বাইপাস সংযোগ দিয়ে যাতায়াত ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছন্দ করা হয়েছেÑ ফলে নিয়ম শৃৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না।

আনন্দ আলো: ঢাকা শহরে রাস্তায় ‘ফ্লাই ওভার’ নির্মাণের ক্ষেত্রেও আপনার কিছুটা ভ‚মিকা আছে। এ ব্যাপারে কিছু বলুন।

Major-Gn.-Abu-Sayed-1মেজর জেনারেল সাঈদ: এটা একটা বিশাল গল্প। ক্যান্টনমেন্টের ভিতর দিয়ে চলাচলের ক্ষেত্রে কিছু নিয়মকানুন মানতে হয়। মিরপুর-১০ ও ১১ এলাকায় যারা বাস করতেন তাদেরকে এয়ারপোর্টের দিকে যেতে হলে রাজধানীর বিজয় সরনি, মহাখালীসহ অনেক এলাকা ঘুরে যেতে হতো। এক্ষেত্রে তাদের অনেক সময় ব্যয় হতো। এই সমস্যা সমাধানের জন্য একটি মডেল দাঁড় করিয়ে তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধানের কাছে মডেলটি উপস্থাপন করি। মিরপুর থেকে সেনানিবাসের ভেতর দিয়ে একটা লিংক রোড ছিল। যেটা দিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে যাওয়া যেতো। কিন্তু নিরাপত্তার খাতিরে তারা এমপি চেকপোস্টে বাধাগ্রস্ত হতো। সে কারণে আমরা ভাবলাম উপরে যদি একটা ফ্লাইওভার করি তাহলে সহজে সেই ফ্লাইওভার দিয়ে মিরপুরের মানুষ এয়ারপোর্ট অভিমুখি এলাকায় সহজেই যাতায়াত করতে পারবে। তাদের জন্য অনেক দুর্ভোগ লাঘব হবে। সেনাবাহিনী প্রধান বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নিলেন। তিনিই আমাদেরকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিয়ে যান। প্রধানমন্ত্রী সবকিছু শুনে খুশি হলেন এবং ফ্লাইওভার নির্মাণের ব্যাপারে অনুমতি দিলেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ক্যান্টনমেন্টের সামনে বনানী স্টাফ রোডের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হলো। দিনে ৭০ বার ট্রেন যাওয়া আসা করে। ফলে প্রায় সর্বক্ষণই যানজট লেগে থাকে। যানজট দূর করার জন্য এই ফ্লাইওভারে রেল লাইনের উপরের অংশটুকুও যুক্ত হলো। এজন্য সেনানিবাসের ৭.৬ একর জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। আমরা সুন্দর করে ফ্লাইওভারটা তৈরি করলাম। নির্ধারিত সময়ের ৬ মাস আগেই এটি উদ্বোধন করা সম্ভব হয়েছে।

আনন্দ আলো: দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এইসব কাজের দায়িত্ব আপনি পেয়েছেন। এটাকে কীভাবে দেখেন?

মেজর জেনারেল সাঈদ: এক্ষেত্রে আমার মা-বাবার দোয়াকে আমি প্রথম গুরুত্ব দিতে চাই। তারপরে আমার সহকর্মী বিশেষ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা জানাতে চাই। কারণ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃপক্ষ আমার ওপর আস্থা রেখেছিল বলেই আমি এত জনগুরুত্বপূর্ণ কাজে নেতৃত্ব দেয়ার সাহস ও প্রেরণা পেয়েছি। সর্বোপরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করছি। আমার বিশ্বাস তিনি যে আমার প্রতি আস্থা রেখেছিলেন তার প্রতিদান বোধকরি দিতে পেরেছি। নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হয়। এখনো দিনের কাজ শেষে আমি প্রকল্প এলাকাগুলো ঘুরে দেখি। অতীত স্মৃতি বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। হাতিরঝিলে যখন হাঁটি, কখনো কখনো গাছের সঙ্গে, লেকের পানির সঙ্গে, লেকের পরিবেশের সঙ্গে আমি নিজে কথা বলি। কোথায় ছিলাম, এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছি এসব বিষয় আমাকে অনেক ভাবায়। মাঝে মাঝে আবেগতাড়িত হয়ে যাই।

আনন্দ আলো: এবার কিছু ব্যক্তিগত প্রশ্ন। আপনার নিজের বিনোদন কি?

মেজর জেনারেল সাঈদ: ক্যাডেট কলেজের ছাত্র ছিলাম আমি। সেখানে আমি গানবাজনা করতাম। তবলা বাজাতাম। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ের অনেক অনুষ্ঠানে আমি এখনো গান গাই। গান কিন্তু আমার একটা প্যাশন। পুরনো দিনের গান যেমন মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান আমার খুব পছন্দ। রাতের বেলা গান গেয়ে, গান শুনেই সকল ক্লান্তি দূর করি।

আনন্দ আলো: সিনেমা দেখেন?

মেজর জেনারেল সাঈদ: আগে দেখতাম। এখন সিনেমা দেখার মতো সময় পাই না। রাতে টিভিতে খেলা দেখি। ফুটবল, টেনিস খেলা আমার পছন্দ। নিজে খেলিও।

আনন্দ আলো: অনেকে বলে যার বন্ধু ভাগ্য ভালো সেই সবচেয়ে সুখি। আপনার বন্ধু ভাগ্য কেমন?

মেজর জেনারেল সাঈদ: আমার বন্ধু ভাগ্য খুব ভালো। যার সঙ্গে একবার পরিচয় হয় সেই আমার বন্ধু হয়ে যায়। কাউকে একবার ভালো লাগলে তাকে আর ভুলি না। আমার আজকের যা কিছু অর্জন তার অনেকটাই বন্ধুদের প্রেরণায় হয়েছে।

আনন্দ আলো: বন্ধুত্ব টিকে থাকে কীভাবে?

মেজর জেনারেল সাঈদ: স্বার্থহীন সম্পর্কই বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার মূলমন্ত্র। কি পেলাম, কি পেলাম না এই ভাবনায় বন্ধুত্ব টিকে না। তবে বন্ধুত্ব টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে কমিটমেন্ট রক্ষা করা জরুরি।

আনন্দ আলো: পরিবার আপনার কাছে কি?

মেজর জেনারেল সাঈদ: পরিবার আমার কাছে বিশাল একটা প্রেরণা। আমার স্ত্রী আমার কাজের বড় প্রেরণা। সে আমার প্রতিটি কাজের প্রথম উৎসাহদাতা। আমার অনেক আদরের দুটি সন্তান আছে। তারাও আমার প্রতিটি কাজে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে।

আনন্দ আলো: পরিবার টিকে থাকে কিসে?

মেজর জেনারেল সাঈদ: পরিবার টিকে থাকে… আমি বলব যে, ভালোবাসা, ভালোবাসা আর ভালোবাসার জোরেই পরিবার টিকে থাকে। যে পরিবারে পারস্পরিক ভালোবাসার বন্ধন যত গাঢ় সেই পরিবারে সাফল্য আসবেই।