ওরা প্রতিযোগিতায় নামলেও আমাদের কোন তাড়া নেই : গাজী শুভ্র

ওরা প্রতিযোগিতায় নামলেও আমাদের কোন তাড়া নেই : গাজী শুভ্র

858
0
SHARE

এদেশের একজন জনপ্রিয় বিজ্ঞাপন নির্মাতা গাজী শুভ্র। ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করে উচ্চশিক্ষা নিতে যান আমেরিকায়। তারপর দেশে এসে মিউজিক ভিডিও বানিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করলেও ধীরে ধীরে জড়িয়ে পরেন বিজ্ঞাপন নির্মাণ ধারায়। এরই মধ্যে প্রায় চারশ বিজ্ঞাপন নির্মাণ করেছেন তিনি। বিউটিফুল বাংলাদেশ, সানসিল্ক, ফেয়ার এন্ড লাভলী, গ্রামীণফোনসহ তার নির্মিত অসংখ্য বিজ্ঞাপনচিত্র জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এখন তার ইচ্ছে চলচ্চিত্র বানানো। সেই পথেই হাঁটছেন। এক বিকেলে আনন্দ আলোর সঙ্গে তিনি বলেছেন বিজ্ঞাপন নির্মাণ ও অন্যান্য প্রসঙ্গে অনেক কথা। লিখেছেন  মোহাম্মদ তারেক

আনন্দ আলো: বিজ্ঞাপন নির্মাণ কর্মকান্ডে আসার গল্পটা বলুন?

গাজী শুভ্র: ছোটবেলায় এরকম কোনো ইচ্ছে ছিল না। ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় ‘গোল্ডেন পপ কর্ন’ নামের একটি বিজ্ঞাপনে আমি নিজেই মডেল হয়েছিলাম। বিজ্ঞাপনটি নির্মাণ করেন নন্দিত নির্মাতা আফজাল হোসেন। এরপর অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময় ‘ক্লোজআপ টুথপেষ্ট’-এর আরেকটি বিজ্ঞাপনে মডেল হিসেবে কাজ করি। এশিয়াটিকের এ বিজ্ঞাপনটি নির্দেশনা দেন ভারতের নির্মাতা পিওস পাঞ্চোয়ানি। তারপর আবারও আফজাল হোসেন আমাকে উৎসাহিত করলেন আরো বিজ্ঞাপনে অভিনয় করার জন্য। সেই সময়ে আমি আরো দুইটা বিজ্ঞাপনে মডেল হই। যেমন ‘মেরিল পেট্রোলিয়াম জেলী’ এবং বিপাশার সাথে ‘জনি প্রিন্ট শাড়ি’। তখন আমার কাছে বিজ্ঞাপন নির্মাতা আফজাল হোসেনকে হিরো মনে হয়েছিল। সেই থেকে মনের ভেতরে ইচ্ছে জাগতে শুরু করলো। এক সময় বেশ কিছু গানের মিউজিক ভিডিও নির্মাণ করার পর এনটিভির রিয়েলিটি শো ক্লোজআপ ওয়ান-এর প্রথম পর্বে একটি মিউজিক ভিডিও নির্মাণের প্রস্তাব আসে। নোলক বাবুসহ ১১ জন শিল্পী ছিলেন। তাদের নিয়ে বাপ্পা মজুমদারের সুরে একটি মিউজিক ভিডিওর নির্দেশনা দেই। এরপর ইউনিলিভারের তৎকালীন মার্কেটিং প্রধান নওশাদ করিম সেই শিল্পীদের নিয়ে আমাকে ক্লোজআপ টুথপেস্টের একটি বিজ্ঞাপন নির্মাণের প্রস্তাব দেন। শুরু হয় আমার বিজ্ঞাপন নির্মাণের কাজ। তারপর আর আমাকে থেমে থাকতে হয়নি। একের পর এক কাজ করে যাচ্ছি।

আনন্দ আলো: এযাবৎ কতগুলো টিভিসি নির্মাণ করেছেন।

গাজী শুভ্র: এখন পর্যন্ত প্রায় চারশ বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাণ করেছি। এর মধ্যে বিউটিফুল বাংলাদেশ, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী, বাংলাদেশ নৌবাহিনী, রবি থিম সং, ফেয়ার এন্ড লাভলী, গ্রামীণফোন, ওয়ারিদ, বাংলালিংক, সানসিল্ক, পেগাসাস মোটরবাইক, চাকা ওয়াশিং পাউডারসহ বেশ কিছু বিজ্ঞাপন দর্শক পছন্দ করেছে।

আনন্দ আলো: বর্তমানে নতুন আর কি কি কাজ করছেন?

গাজী শুভ্র: সম্প্রতি নির্মাণ করেছি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফিকে নিয়ে গুদরেজ হেয়ার কালারের একটি বিজ্ঞাপন। এছাড়া মার্কস গোল্ড দুধ ও মার্কস ডাইট দুধের বিজ্ঞাপনের কাজ করেছি। পাশাপাশি নজরুল সঙ্গীত শিল্পী সুস্মিতা আনিসের দুটি গানের মিউজিক ভিডিও তৈরি করেছি। বিমান বাহিনীর একটা বিজ্ঞাপন করার কথা হচ্ছে। এর আগে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটা বিজ্ঞাপন করেছিলাম। সেটা আবার নতুনভাবে করা হবে। বিউটিফুল বাংলাদেশ বিজ্ঞাপনটি আবার নির্মাণ করবো। এছাড়া মাশরাফিকে নিয়ে ‘কুল’-এর বিজ্ঞাপন করার কথা রয়েছে।

আনন্দ আলো: টিভি চ্যানেলগুলোতে দর্শক সবচেয়ে বেশি কী দেখে। নাটক, সিনেমা, গানের অনুষ্ঠান না বিজ্ঞাপন?

গাজী শুভ্র: এক সমীক্ষায় দেখা গেছে বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোতে মানুষ সবচেয়ে বেশি দেখে বিজ্ঞাপন। এর কারণও আছে। আমাদের দেশের বিজ্ঞাপনের মান সাধারণ টিভি অনুষ্ঠানের চেয়ে অনেক বেশি। এর বহুবিধ কারন আছে। আমরা যে বাজেটে একটি বিজ্ঞাপন নির্মাণ করি সেই বাজেটে বেশ কয়েকটি টিভি অনুষ্ঠান নির্মিত হয়। একটু লক্ষ্য করলে দেখবেন পার্শ্ববর্তী দেশের কয়েকটি বাংলা চ্যানেল যেভাবে আমাদের সঙ্গে তাদের অনুষ্ঠান ও নাটক নিয়ে আটঘাট বেধে প্রতিযোগিতায় নেমেছে অথচ এনিয়ে আমাদের কোন তাড়া নেই। শংকাও নেই।

আনন্দ আলো: অনুষ্ঠানের মধ্যে বিজ্ঞাপন শুরু হলে অনেক দর্শকই বিরক্ত হয়। ব্যাপারটিকে কিভাবে দেখছেন?

GAZI-SHOVRO-(1)গাজী শুভ্র: আমি বলবো বিজ্ঞাপনের কারনেই অনুষ্ঠানের মান বেড়েছে। নিত্যনতুন অনুষ্ঠান নির্মাণের অনুপ্রেরণা বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য সম্ভব হয়েছে। মিডিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য করছে বিজ্ঞাপনগুলো। পত্রিকা থেকে শুরু করে টিভি মিডিয়া, বিলবোর্ড সবক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনদাতারা ভালো বাজেট রাখছে। ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে বিজ্ঞাপনের বাজেট ছিল কয়েকশ কোটি টাকা। আর বর্তমানে এর বাজার প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। তবে হ্যা, কিছু বিজ্ঞাপন দর্শক উপভোগ করে। আর কিছু বিজ্ঞাপনে দর্শক বিরক্ত হয়।

আনন্দ আলো: দেশের ও বিদেশের বিজ্ঞাপনের মধ্যে পার্থক্য কী দেখেন?

গাজী শুভ্র: পার্থক্যতো অবশ্যই আছে। মূল পার্থক্য হচ্ছে বাজেটের। আমেরিকা বা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কথা চিন্তা করলে পার্থক্যটা খুঁজে পাব। ভারতের জনসংখ্যা আমাদের চেয়ে অনেকগুণ বেশি। সেই সাথে তাদের বাজারও বড়। আর আমাদের ১৬ কোটি মানুষ। কোম্পানীগুলো এই জনসংখ্যার কথা মাথায় রেখে একটি বিজ্ঞাপন নির্মাণের কাজ দেন। তাতে বাজেট থাকে কম। এই স্বল্প বাজেটের মধ্যেই তারা বিভিন্নভাবে পত্রিকা, টিভি ও বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপনটির প্রমোশন করেন। আর ভারতে এ কাজের বাজেট থাকে কয়েক গুণ বেশি। তাই তাদের প্রচারণা, কাজের মান সব কিছুতেই থাকে ভিন্নতা। তাই বাইরের সঙ্গে আমাদের তুলনা চলে না। আমাদের এখানে কোনো ইনষ্টিটিউট নেই। আমি প্রতিনিয়ত কখনো মেকআপম্যান, কখনো ডিওপির কাছ থেকে নিত্যনতুন জিনিস শিখছি। আমরা কাজ করতে করতে শিখছি। তাই বলবো বাজেট অনুযায়ী ভালোই হচ্ছে আমাদের বিজ্ঞাপন গুলো। আর এখন প্রচুর মানুষ এ পেশায় আসছে।

আনন্দ আলো: বিজ্ঞাপনতো একধরনের সিনেমা?

গাজী শুভ্র: বিজ্ঞাপনকে এক ধরনের সিনেমা বলতে পারেন। আমাদের এখানে বিজ্ঞাপনের ব্যাপ্তিটা খুব স্বল্প সময়ের। ৫/১০ সেকেন্ড থেকে ৬০ সেকেন্ড পর্যন্ত। বিজ্ঞাপন প্রচারের খরচও অনেক বেশি। তখন ক্লায়েন্ট চিন্তা করে বিজ্ঞাপনটি যদি ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে রাখা যায় তাহলে মিনিটে দুবার দেখানো সম্ভব। ৩০ সেকেন্ডে সিনেমা বা গল্প বলাটা খুবই মুশকিল।

আনন্দ আলো: শুটিংয়ের কোনো মজার স্মৃতি মনে পড়ছে?

গাজী শুভ্র: বিজ্ঞাপনের দৃশ্য ধারনে নানা ধরনের ঝামেলায় প্রায়ই পড়তে হয়। কারণ কাজগুলো অনেক দিন আগে থেকে না হঠাৎ করে আসে। তাই তাড়াহুড়া করে কাজ শুরু করতে হয়। যতদূর মনে পড়ে, একবার কক্সবাজারে একটি পণ্যের বিজ্ঞাপনের শুটিং চলছিল। স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী সমুদ্রের পাড়ে একটি মেলা দেখানো হবে। তাই রাত জেগে সেট বানিয়ে মেলার মতো সাজানো হলো। রাতে ঘুমানোর পর সকালে যখন দৃশ্য ধারনের জন্য যাবো, তখন দেখলাম সারারাত বৃষ্টি হয়েছে সব সেট নষ্ট হয়ে শুধু বাঁশগুলো রয়েছে। এভাবে অনেক সময় বিজ্ঞাপন নির্মাণের পর নির্মাতারা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

আনন্দ আলো: আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

গাজী শুভ্র: এবছরই চলচ্চিত্র নির্মাণের চিন্তাভাবনা করছি। আমার প্রথম ছবি হবে কমার্শিয়াল অর্থাৎ অবশ্যই বানিজ্যিক ধারার।