Home আরোও বিভাগ ইভেন্ট এবারও জমেছিল লোকসঙ্গীত উৎসব

এবারও জমেছিল লোকসঙ্গীত উৎসব

SHARE
lok-songit

মোহাম্মদ তারেক: যেন একটি ছোট গল্প শেষ হইয়াও হইল না শেষ। মেরিল নিবেদিত সান ইভেন্টস আয়োজিত দ্বিতীয় বারের মতো ঢাকা আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত উৎসবের সমাপনী দিনে মধ্যরাতে যখন উৎসবের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয় তখনো যেন আনন্দের রেশ কাটছিল না আর্মি স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার হাজার সঙ্গীত প্রেমীর। অনেকে আফসোস করছিলেন- শেষ হয়ে গেল উৎসব? একটানা তিন দিন আসলেই একটা উৎসব আনন্দে সময় পার হয়েছে। শুধু লোকসঙ্গীতকে ঘিরে এত বড় আয়োজন উপমহাদেশে আর কোথাও হয়নি। বিদেশ থেকে আসা গুণী সঙ্গীত শিল্পীরা সান ইভেন্টসের এই আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনদিন ব্যাপী এই উৎসবের আয়োজক ছিল সান ইভেন্টস। মেরিল নিবেদিত উৎসবের সহযোগিতায় ছিল জিপি মিউজিক, ঢাকা ব্যাংক ও মাইক্রোসফট বাংলাদেশ। উৎসবে অর্থ দিয়ে টিকেট কিনতে হয়নি। অনলাইনে আগাম নাম নিবন্ধন করে দর্শক-শ্রোতারা বিনামূল্যে অনুষ্ঠানটি সরাসরি উপভোগ করেছেন। পুরো অনুষ্ঠানটির টেলিভিশন সম্প্রচারের দায়িত্বে ছিল মাছরাঙা টেলিভিশন।

গেল বছর প্রথম আসরে ৬টি দেশের প্রায় শতাধিক শিল্পী ও ব্যান্ড দল পারফর্ম করেছিল। আর এবারের উৎসবে গান পরিবেশন করেছে বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, কানাডা ও স্পেনের প্রায় ১২৫জন শিল্পী। সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১টা পর্যন্ত দর্শক উপভোগ করেন বাংলাদেশসহ বিশ্বের সেরা লোকসঙ্গীত শিল্পীদের পরিবেশনায় শেকড় সন্ধানী গানগুলো। এবার উৎসবে প্রতিদিনই দেশীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণ ছিল উল্লেখ করার মতো। উদ্বোধনী দিনের কথাই ধরা যাক। দৃষ্টিনন্দন বিশাল মঞ্চে ঢাকার পল্লবী ড্যান্স গ্রুপের শিল্পীদের নাচের মধ্য দিয়ে এ উৎসব শুরু হয়। এরপর মঞ্চে ওঠেন আবদুর রহমান বাউল। ‘বন্দে মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে’, ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম’সহ বেশ কিছু জনপ্রিয় লোক গান গেয়ে শ্রোতাদের মাতিয়ে রাখেন তিনি। এরপর মঞ্চে আসেন আয়োজকেরা। লোকসঙ্গীতের উৎসবে উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন স্কয়ার টয়লেট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আন ইভেন্টসের চেয়ারম্যান অঞ্জন চৌধুরী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুলহক, গ্রামীণফোনের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা ইয়াসির আযমান, ঢাকা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, মাইক্রোসফট বালাদেশের প্রধান সোনিয়া বশির কবির। স্বাগত বক্তব্যের পর মঞ্চে আসেন টুন টুন বাউল। তিনি গেয়ে শোনান, ‘বল স্বরূপ কোথায়’ ‘ঘরে ঘরে রূপের বাতি জ্বলছে’সহ বেশ কিছু গান। এরপর স্কটল্যান্ডের সাইমন থ্যাকার্সের সঙ্গে যুক্ত হন ভারতের রাজু দাস বাউল ও বাংলাদেশের ফরিদা ইয়াসমিন। রাজু দাস বাউল গেয়ে শোনান ‘পার করো আমারে’, ‘ভ্রমর কইও গিয়া’ গানগুলো। ফরিদা ইয়াসমিন পরিবেশন করেন ‘আর কি হবে মানবজনম’ ‘ধন্য ধন্য বলি তারে’ গানগুলো। এরপর মঞ্চে আসেন পাকিস্তানের শিল্পী জাভেদ বশির। তিনি গেয়ে শোনান ‘সাজনা তেরে বিনা, দামাদাম মাস্ত কালান্দার’সহ বেশ কয়েকটি গান। উৎসবের প্রথম দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ফোক সম্রাজ্ঞী মমতাজ। তিনি গেয়ে শোনান ভুইলো না মন তাহারে, ‘এই দেহ পুড়ে হৃদয় মসজিদে রবে’, ‘ঐ আকাশটা কাঁপছিল কেন’ সহ বেশ কিছু গান। তার গানের তালে তালে উপস্থিত দর্শক ভেসেছেন উম্মাদনায়। প্রথম দিনের শেষ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে মমতাজ মুগ্ধতা ছড়ান দর্শকদের মাঝে। দ্বিতীয় দিনে হেমনেৱর সন্ধ্যায় শুরু থেকেই বয়ে যায় লোক গানের সুর মূর্ছনায়। মরমি বানীতে আপ্লুত হয় দর্শক শ্রোতা। দেশ-বিদেশের খ্যাতিমান শিল্পীদের অন্যবদ্য পরিবেশনায় আলোড়িত হয় উৎসব প্রাঙ্গণ। জালালের বাঁশির সুরে হেমন্ত সন্ধ্যায় শুরু হয় দ্বিতীয় দিনের পরিবেশনা। বাঁশিতে ভেসে বেড়ায় ‘আমার সোনার ময়না পাখি’ গানের সুর। বাঁশির সুরের সাথে নজরুলের ঢোলের বাদনে শ্রোতাদের মননে ছড়ায় উচ্ছ্বাস। এই দলে আরও ছিল কক্সবাজারের ক্ষুদে বাউল জাহিদ। গেয়ে শোনায় চট্টগ্রামের লোক সঙ্গীত ‘মধু হই হই আরে বিষ খাওয়াইলা’। এ সময়ে দর্শকরা নেচে গেয়ে গলা মেলায় ক্ষুদে শিল্পীর সঙ্গে। গান শেষে জাহিদ পায় তুমুল করতালি। এরপর লতিফ সরকার পরিবেশন করেন ‘একি জালালের জালালি কৈতর, একদিন মাটির ভেতরে হবে ঘরসহ বেশ কয়েকটি গান। তৃতীয় পরিবেশনা করেন কানাডার দুই শিল্পী প্রসাদ ও তানজির আলম। এরপর মঞ্চে উঠে লোক গান নির্ভর ভারতের ব্যান্ড ইন্ডিয়ান ওশেন। দলটি গান গেয়ে মাতিয়ে রাখে শ্রোতাদের। ইন্ডিয়ান ওশেনের পরিবেশনের মুগ্ধতার রেশ না কাটতে মঞ্চে আসেন বাউল শফি মণ্ডল ও লাবিক কামাল গৌরব। নবীন ও প্রবীণের মিশ্র কণ্ঠে শোনা যায় জনপ্রিয় সব লোক গান। এরপর শুরু হয় স্পেনের মিউজিক্যাল গ্রুপ কারেন লুগো অ্যান্ডরিকার্ডো মোরোর পরিবেশনা। দলটি উপস্থাপন করে স্পেনের বিশেষ ধরনের আর্টফর্ম। এটি ফ্লামেঙ্কো নাচ হিসেবেও পরিচিত। সবশেষে পরিবেশনা নিয়ে হাজির হন দ্বিতীয় দিনের অন্যতম আকর্ষণ ভারতের কৈলাশখের। তিনি একের পর এক নিজের জনপ্রিয় গান গেয়ে জয় করে নেন শ্রোতাদের হৃদয়। তৃতীয় দিনে সঙ্গীত পরিবেশন করেন বাংলাদেশের সুনীল কর্মকার, ইসলাম উদ্দিন কিস্‌সাকার, বারী সিদ্দিকী ও তাপস এন্ড ফ্রেন্ডস, ভারতের নুরান সিস্টার্স, পবন দাস বাউল, যুক্তরাজ্যের সুশীলা রামান, স্যাম মিলস। পবন দাস বাউলের পরিবেশনার পর উৎসবের সমার্প্তি ঘোষণা করেন সান ইভেন্টসের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক অঞ্জন চৌধুরী। তিনি উৎসব সফল করার জন্য শিল্পীসহ সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে ধন্যবাদ জানান।