এটি একটি লাইফ সাপোর্টের গল্প!

এটি একটি লাইফ সাপোর্টের গল্প!

666
0
SHARE

সৈয়দ ইকবাল

অভিনেতা সজল চিৎকার করছেন। একজনের উদ্দেশে এমন আচরণ তার। ‘আর একটিবার যদি তুই আসিস. তাহলে খবর আছে। এভাবে ব্ল্যাকমেইল করবি না’। কথাগুলো বলে যাচ্ছেন সজল। সজলের এমন আচরণে আশপাশে বেশ জটলা লেগে গেল। ঠিক কী কারণে সজলের এমন আচরণ অনেকেই বুঝে উঠতে পারছে না। মানুষের জটলাটা বাড়তেই লাগলো। খানিকবাদেই ‘কাট’ একটি শব্দ শোনা গেল। মুহূর্তেই সজলের একটু আগের চেহারা নেই। খুব হাশিখুশি ও প্রাণবন্ত দেখা গেল তাকে। পাশ থেকে কেউ একজন বলে উঠল- ‘ও এটা শুটিং হচ্ছিল’?

হ্যাঁ, পাঠক নগরীর একটি রাসৱায় সজলকে এমনিভাবে দেখা গেল শুটিং করতে। পরিচালক আবার দৃশ্যটি নেয়ার জন্য প্রসৱুতি নিচ্ছিলেন। এমন সময় রাসৱায় মানুষের ভিড়টা অনেক বেড়ে যায়। উৎসুক মানুষকে সামাল দিতে ভালোই বেগ পেতে হলো ইউনিটকে। যাই হোক পরিচালক মেজবাহ শিকদার দৃশ্যটি নিলেন। এরইমধ্যে কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এটি একটি খণ্ড নাটক। নাম ‘লাইফ সাপোর্ট’। জহির করিমের রচনায় নাটকটিতে অভিনয় করেছেন অভিনেতা সজল, লাক্স চ্যানেল আই তারকা নাদিয়া মিম, কোয়েল, লতা, আগুন প্রমুখ। নাটকের গল্পে প্রেম-ভালোবাসা এবং ব্ল্যাকমেইলের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। গল্পটা খুব চমৎকার। দর্শক গতানুগতিক প্রেমের নাটক বলতে যা দেখেন তা থেকে অনেক আলাদা গল্পের প্লট। দর্শকদের ভালো লাগবে বলে বিশ্বাস করি।’ পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার সময় তার সহকারী এসে জানালেন পরের দৃশ্যের প্রসৱুতি সম্পন্ন। যেটি নেয়া হবে শুটিং বাড়ির একটি আঙ্গিনায়। যেখানে পারফর্ম করবেন নাদিয়া মিম। তার একক দৃশ্য এটি। নাদিয়া মিমের কিছু ক্লোজ শট নেয়া হয়। কো-আর্টিস্টের ক্লোজ শট পরে নেয়া হবে। দৃশ্যটি নেয়ার সময় টেকনিক্যাল সমস্যা দেখা যায়। ওদিকে দৃশ্যে এক্সপ্রেসন দিয়ে যাচ্ছিল নাদিয়া। কিন্তু ক্যামেরার টেকনিক্যাল ফল্টের কারণে তা রোল নিচ্ছিল না। তাই চিত্রগ্রাহক নাদিয়াকে ইশারা দেন একটু থেমে যাওয়ার জন্য। এতে করে নাদিয়া কিছুটা বিরক্ত হয়ে যান। নাদিয়া ও চিত্রগ্রাহকের সঙ্গে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি হয়। যাই হোক শেষমেশ নেয়া হয় দৃশ্যটি।

শটটি নেয়া শেষ হলে শুটিং ইউনিট ইনডোর এ যায়। যেখানে দৃশ্যটি নেয়া হবে সজল আর নাদিয়া মিমের। তবে সেট তৈরির আগে কথা হয় সজল আর নাদিয়ার সঙ্গে। দুজনকে বেশ দারুণ লাগছিল। সদ্য বিবাহিত দম্পতির চরিত্রে অভিনয় করেছেন তারা দুজনে। তাই তো সদ্য নব দম্পতির বেশ ভূষায় তারা প্রসৱুত। শুটিং শুরুর আগ মুহূর্তে কথা হয় দুজনের সঙ্গে। কথা শুরুর আগে সজল নাদিয়াকে মজা করে বলে, ‘বউ বসো আমার পাশে। নতুন বিয়ে হয়েছে বলে জামাইয়ের কাছে বসতে লজ্জা পাচ্ছো?’ নাদিয়া সজলের এমন কথায় বলে ওঠে, ‘তাই না? ভালোই তো বলছেন। এটা কিন্তু অভিনয় ওকে?’ সজল তখন বললেন, ‘চরিত্রের মধ্যে থাকতে হয় বুঝছো।’ দুজনের খুনসুটি দেখে বেশ অন্যরকমই লাগলো। এরপর তারা কথা বলেন আনন্দ আলোর সঙ্গে। সজল বলেন, ‘আসলে চরিত্র এবং গল্প পছন্দ না হলে এখন নাটকে খুব একটা অভিনয় করা হয় না। একটা সময় কিছুটা গড়পরতা কাজ করলেও এখন তা মোটেই করছি না। কারণ চলচ্চিত্রে সময় দিতে হচ্ছে। সেইদিক থেকে বললে বলবো- এই নাটকের গল্পটা অসাধারণ। একটা থ্রিল থ্রিল ব্যাপার আছে। পুরো নাটকে প্রেমের সম্পর্ক ফুটে উঠলেও গল্পের শেষে গিয়ে একটা ধাঁধা আছে। যা দর্শক দেখে বেশ মজা পাবেন।’ সজলের কথা শেষ হতেই নাদিয়া বলেন, ‘সজল ভাইয়ার সঙ্গে অভিনয় আমি বেশ উপভোগ করি। উনি এত মজা করেন সেট-এ। তাছাড়া উনি একটি দৃশ্যের আগে বলে দেন উনি কি করবেন আর আমাকে কি করতে হবে। তাই এই নাটকে অভিনয় করে ভালোই লাগছে। গল্পটাও চমৎকার।

Location-1সজল আর নাদিয়ার দৃশ্য নেয়ার জন্য সেট প্রসৱুত। ড্রেসিং টেবিলের এক কোণায় বসে আছেন নাদিয়া। তাড়াহুড়া করে সেখানে প্রবেশ করেন সজল। বডি স্প্রে দিতে দিতে সজল নাদিয়ার উদ্দেশে কক্সবাজার যাওয়ার কথা বলেন। কিন্তু নাদিয়া স্বামীর সঙ্গে কক্সবাজার যেতে নারাজ। কারণ নাদিয়া জানেন তার সঙ্গে কক্সবাজার যাওয়া মানে অফিসের কাজ নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকবে সে। দৃশ্যটি নেয়ার জন্য দুবার টেক নেয়া হয়। এরপর নেয়া হয় ক্লোজ শট।

নাটকের সেটে উপস্থিত ছিলেন নাট্যকার জহির করিম। নাটকের নাম ‘লাইফ সাপোর্ট’ কেনো? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আসলে আমাদের সমাজে সম্পর্কের জায়গাগুলো কেমন জানি দিন দিন মুমূর্ষু হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে সব সম্পর্ক। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস, অসম্মানসহ নানাবিধ নেতিবাচক দিক চলে এসেছে। এটা হতে পারে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা কিংবা ব্যস্ততায় ছুটে চলা জীবনের জন্য। আমরা আজ কোথায় ছুটছি কেউ জানি না। কোন্‌দিকে সম্পর্কগুলো চলে যাচ্ছে, তাও খবর রাখি না। এই যেমন আমাদের অবস্থা ঠিক সেই সময়ে আমাদের সম্পর্কগুলো লাইফ সাপোর্টে-ই টিকে আছে বলে আমি মনে করি। ঠিক তেমন চিনৱা-ভাবনা থেকেই আমার এই গল্পের প্লটটা চিনৱা করা হয়েছে।’

তখন প্রকৃতিতে সন্ধ্যা নেমে আসে। বাসার ড্রয়িং রুমে একটি শটের প্রসৱুতি চলে। যেখানে অভিনয় করবেন নাদিয়া ও হামিদ। নাদিয়ার পরনে সাদা শাড়ি। হামিদ সিআইডির চরিত্রে অভিনয় করছেন। নাদিয়ার স্বামী সজলের খুন হওয়ার বিষয়ে কথাবার্তা বলতে আসে এই সিআইডি কর্মকর্তা। খুনের রহস্যের দ্বার খুলতে পারেন না তিনি। বেশ কিছু কথোপকথনে চলে তাদের দৃশ্যটি। আনন্দ আলো টিম তখন রওয়ানা দেয় তাদের গন্তব্যে। শুটিং বাড়ি থেকে বেড়িয়ে বাইরের খোলা জায়গায় যেতেই দেখা যায় বেশ কয়েকজনকে আড্ডা দিতে। যেখানে অভিনেতা সজল, নাট্যকার জহির করিমসহ অভিনয় শিল্পী কোয়েল, লতা, আগুনকে আড্ডা দিতে দেখা যায়। তারা প্রাণবন্ত এক আড্ডায় মেতে ছিলেন। যদিও তাদের সেই আড্ডায় লাইফ সাপোর্টের প্রয়োজন হয়নি। সত্যিই তাই। সত্যিকারের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে লাইফ সাপোর্ট লাগে না। তা এমনি এমনিই টিকে থাকে অনাদিকাল পর্যন্ত।