এক বিকেলে নদীর কাছে : মুকিত মজুমদার বাবু

এক বিকেলে নদীর কাছে : মুকিত মজুমদার বাবু

1049
0
SHARE

নদীর বুকে তখনো সূর্য খেলা করছে ঢেউয়ের সাথে। বিকেলের আবিররঙা মিষ্টি আলো ছড়িয়ে পরেছে চারদিকে। দূরের গ্রামগুলোয় ক্রমশঃ আঁধার নামছে। একটু পরেই ব্যাঙের মতো এক লাফে সূর্যটা ডুব দেবে নদীর জলে। নদীর কূলে বাঁশের সাথে রশি দিয়ে বাঁধা কয়েকটা নৌকা ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে নেচে যাচ্ছে। সাদা পাল তুলে ঝিরিঝিরি বাতাসে তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে একটা ডিঙি নৌকা। পাঁচ, ছয়জন বিদেশি যাত্রী মুগ্ধ হয়ে দেখছে নদীর অপার সৌন্দর্য। তবে হাতে বাওয়া নৌকার চেয়ে এখানেও যাত্রী পারাপারে এগিয়ে রয়েছে যন্ত্রচালিত নৌকা। তাদের চলাচলের ভড্ভড্ শব্দ কান ঝালাপালা করে তুলছে। সুন্দরের বুকে অসুন্দরের এই কালো ছায়া নদীর গায়ে ক্ষত সৃষ্টি করছে। ট্রলারের বিকট শব্দ এবং এর থেকে তেল নিঃসরণের ফলে জলজ প্রাণী নানামুখি সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। নদীর গায়ে আরো অনেক ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নদীর ভাঙনকূল থেকে ট্রাক ভরে মাটি তুলছে। আশপাশের অনেক ময়লা-আবর্জনা অসচেতনতার কারণে ফেলা হচ্ছে নদীর বুকে। ক’দিন পর অপরিকল্পিতভাবে বালুও তোলা শুরু হবে বলে জানান কয়েকজন মাঝি। অন্যান্য নদীর মতো এ নদীটি এখনো তার রূপ-যৌবন হারায়নি। যদিও লবণাক্ততার শেষ গ্রাসের তালিকায় নদীটির নাম উঠেছে। তবে তা বাড়াবাড়ি পর্যায়ের নয়। জেলেরা এখনো এ নদীতে মাছ শিকার করে। তার মধ্যে নানা প্রজাতির দেশি মাছের সাথে ইলিশও আছে। ঘাটে বরফ ছাড়া ছোট ছোট কয়েকটা ইলিশই তার প্রমাণ। নদীর ভেতর এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে চার, পাঁচটা জেলে নৌকা। আসন্ন সন্ধ্যার কারণে জেলেদের ব্য¯ত্মতা চোখে পরার মতো। যাত্রীদের ভেতরও ঘরে ফেরার তাড়া। তাড়া রয়েছে মাঝিদের ভেতরও। নদীর কূল দিয়ে এক কিশোর গরু-ছাগল নিয়ে ঘরে ফিরছে। মাথার উপর দিয়ে ঝাঁক বেঁধে নীড়ে ফিরছে ক্লাšত্ম পাখির দল। বয়োবৃদ্ধ এক ব্যক্তি জানান, এ নদী দিয়ে আগে স্টিমার, লঞ্চ চলাচল করত। জমজমাট ছিল নদীর পাশে গড়ে ওঠা স্থানীয় বাজারগুলো। আখের গুড় বোঝাই করে বড় বড় সওদাগরী নৌকা যেত এক জেলা থেকে আরেক জেলায়, এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে। প্রচন্ড ধারার এ নদী শহর-গঞ্জ, হাট-বাজার, স্কুল-কলেজ, ফসলি ক্ষেত, ফলের বাগান সবই খড়কুটোর মতো ভাসিয়ে নিয়ে যেত। এখনো নদীর তেজ আছে। তবে আগের মতো নয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী তার যৌবন হারিয়ে ফেলছে। শীর্ণ থেকে শীর্ণকায় হচ্ছে দিন দিন। এ সহস্র নদীর দেশে সরকারি হিসেবে নদী রয়েছে মাত্র ২৩০টি। চৈত্র-বৈশাখ মাসে এ নদীগুলো জলের অভাবে জীবন্মৃত হয়ে থাকে। তখন নদীর শরীরের ওপর দিয়ে চলাচল করে বাস-ট্রাক। কোথাওবা বাঁধ দিয়ে করা হয় ফসলের চাষ। দিন যতই যাচ্ছে নদীমাতৃক বাংলাদেশ হয়ে উঠছে নদীহীন। অথচ আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য নদীকে ঘিরে। নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে আমাদের সভ্যতা। নদী নিয়ে রচিত হয়েছে অসংখ্য গল্প, কবিতা, উপন্যাস, গান। “ও নদীরে, একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে বলো কোথায় তোমার  দেশ তোমার নেই কি চলার শেষ ও নদীরে…” কালজয়ী এ গানটি শোনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। আমাদের বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ করতে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে নদীর অবদান অনস্বীকার্য। গল্প-উপন্যাস, গান-কবিতাÐ কোথায় নেই নদীর কথা! সবখানেই নদীর উপাখ্যান। বাংলা সাহিত্যে নদী-জীবনকেন্দ্রিক যেসব উপন্যাস প্রাধান্য পেয়েছে তার মধ্যে অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি, সমরেশ বসুর গঙ্গা, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইছামতি এবং হুমায়ুন কবীরের নদী ও নারী অন্যতম। বাঙালির প্রতিটি ক্ষেত্র অর্থাৎ, শিল্প-সাহিত্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য, নগর-জনপদ গড়ে উঠতে নদী বড় ভূমিকা রেখেছে। অথচ সেই নদী আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দিন দিন। মুহূর্তে সূর্য হারিয়ে গিয়ে এখনি নামবে গাঢ় কালো অন্ধকার। বিদায়ী সূর্যের দিকে তাকিয়ে বার বার মনে হচ্ছে আমার জীবনকালে দেখা নদীগুলো চোখের সামনে কীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে! আমার সšত্মানের জীবনকালে নদী বলে বাংলাদেশে কোনো বহতা স্রোতস্বিনী থাকলেও আমার নাতি-নাতনীর জীবনকালে হয়তো নদী স্মৃতি হয়ে যাবে। অনেক দেরী হলেও নদী বাঁচানোর উদ্যোগটা আমাদের এখনই, এই মুহূর্তেই গ্রহণ করতে হবে। নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে, দেশের মানুষ বাঁচবে, সবুজ বাঁচবে। আমরা নদীর সাথে সবুজ হয়ে বাঁচতে চাই। লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন