এক টুকরো সবুজ বন-মুকিত মজুমদার বাবু

এক টুকরো সবুজ বন-মুকিত মজুমদার বাবু

1561
SHARE

উদ্ভিদ উদ্যান। প্রজাতি সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রদর্শনের অনেক বড় জায়গা। কোনো বাগান একক উদ্ভিদ প্রজাতি নিয়ে, আবার কোনো বাগান বিশেষ অঞ্চলের উদ্ভিদকূল নিয়ে, আবার কোনো বাগান বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ নিয়ে গড়ে উঠেছে। প্রত্যেক উদ্যান যেন এক একটি জীবনৱ উদ্ভিদের সংগ্রহশালা। পৃথিবীর প্রাচীনতম বোটানিক্যাল গার্ডেন ইতালির পিসা বোটানিক্যাল গার্ডেন, যা ১৫৪৩ খ্রিস্টাব্দে পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠিত হয়। পৃথিবীতে প্রায় ১৫০ দেশে মোট ১,৮০০ বোটানিক্যাল গার্ডেন রয়েছে। প্রায় ৩০,৮৫৫ প্রজাতির গাছ ও বীজের সংগ্রহশালার কারণে ইংল্যান্ডের লন্ডনে অবস্থিত রয়েল কিউ বোটানিক্যাল গার্ডেন বিশ্বের বৃহত্তম বোটানিক্যাল গার্ডেন হিসেবে পরিচিত। ১৮৯৪ সালে বাংলাদেশের জামালপুরে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন উদ্ভিদ উদ্যান যার নাম ছিল ‘চৈতন্য নার্সারি’।

বাংলায় উদ্ভিদ উদ্যান আর ইংরেজিতে বোটানিক্যাল গার্ডেন। ইংরেজি নামটাই মানুষের কাছে বেশি পরিচিতি হয়ে উঠেছে। ১৯৬১ সালে ঢাকার মিরপুরে প্রায় ৮৪ হেক্টর জায়গার ওপর গড়ে ওঠে উদ্ভিদ উদ্যান। বর্তমানে এ বাগানে ১১৭ টি উদ্ভিদ পরিবারের ১,৬৪৮ প্রজাতির প্রায় ৫৬ হাজার উদ্ভিদ রয়েছে। শানৱ নিরিবিলি একখণ্ড বনভূমির পরিবেশ বিরাজ করছে ঢাকা বোটানিক্যাল গার্ডেনে। ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়বে কখনো উঁচু, কখনো নিচু, আবার কখনো সমতল জায়গায়। ছোট-বড়-মাঝারি জলাশয় নিয়ে আলাদা বৈশিষ্ট্য পেয়েছে উদ্যানটি। পরিকল্পিতভাবে গাছ রোপণ, পরিচর্যা ও সংরক্ষণের জন্য জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানকে মোট ৫৭টি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি ভাগে গাছ শনাক্ত করার জন্য রয়েছে নাম ফলক। বৈচিত্র্যে ভরপুর এ উদ্যানে বৃক্ষ প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে- গর্জন, তেলসুর, বট, কাঁঠালীচাঁপা, কদম, জারুল, জাম, কড়ই ইত্যাদি গাছ। ফলদ গাছের মধ্যে রয়েছে- কদবেল, কামরাঙা, কাউফল, পেয়ারা ইত্যাদি। এসব গাছের সঙ্গে শোভাবর্ধনকারী গাছ হিসেবে রয়েছে- গোলাপ, গাঁদা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, জিনিয়া ফুলের বাগান। বিভিন্ন বাঁশের প্রায় ২০টি প্রজাতি রয়েছে উদ্যানে। দক্ষিণ দিকে রয়েছে গোলাকার পদ্মপুকুর। গোলাপি পদ্ম, নীল পদ্ম, এলমান্ডা, মনোকরিয়া প্রভৃতি গাছ রয়েছে পদ্মপুকুরে। ভেষজ উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে সর্পগন্ধা, বাসক, হরীতকী, অর্জুন ইত্যাদি। বনজ, ফলদ ও ভেষজ গাছের চারা উৎপাদন ও সরবরাহের জন্য উদ্যানের ভেতরেই গড়ে তোলা হয়েছে পরিকল্পিত নার্সারি। দেশি উদ্ভিদের পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু দুর্লভ ও দৃষ্টিনন্দন বিদেশি উদ্ভিদ। এসব উদ্ভিদ এ দেশের পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত হয়ে নিয়মিত বংশ বৃদ্ধি করছে। এদের মধ্যে অন্যতম অ্যানথুরিয়াম, কর্পূর, র‌্যাবিট ফার্ন, ডাম্বিয়া, শ্বেতরঙ্গন, মুসান্ডা, আমাজন লিলি, শ্বেতচন্দন ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে নানা প্রজাতির ক্যাকটাস ও অর্কিড। ক্যাকটাস মূলত মরুভূমির উদ্ভিদ হলেও শোভাবর্ধনকারী হিসেবে এদের গুরুত্ব রয়েছে। ওল্ডম্যান, ফিসহুক, মোপালিয়া, গোল্ডেন ব্যারেল, হাওয়ার্থিয়া, পিকটোরিয়া ইত্যাদি বিভিন্ন আকারের ও বর্ণের ক্যাকটাস রয়েছে ক্যাকটাস সংগ্রহশালায়। রয়েছে ক্যাকটাস গ্রিনহাউস যেখানে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রা ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে গ্রাফটিং পদ্ধতিতে ক্যাকটাসের সংকরায়ন ও চারা উৎপাদন করা হয়। অর্কিড সংরক্ষণের জন্য রয়েছে অর্কিড সংগ্রহশালা। কিছু লতানো আবার কিছু গুল্মজাতীয় মোহনীয় সব অর্কিড প্রজাতি শোভা পাচ্ছে এসব সংগ্রহশালায়। এর সঙ্গে বিভিন্ন প্রানেৱ ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সাইকাস গাছ। জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে প্রায় ২৫৬ প্রজাতির ৩৫,০০০ বৃক্ষ, ৩১০ প্রজাতির ১০,০০০ গুল্ম ও ৩৮৬ প্রজাতির ১২০০০ বিরল বা লতাজাতীয় গাছ আছে। বাংলাদেশের দীর্ঘতম বৈলাম বৃক্ষের দেখা মেলে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে। আরো দেখা মেলে প্রাকৃতিক পরিবেশে বসবাসরত বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর। গাছ, বাঁশঝাড়, তৃণভূমি ও জলাশয়ে বাস করে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, উভচর, সরীসৃপ ও সৱন্যপায়ী প্রাণী। বন-বনানীহীন ঢাকা শহরের মাঝে এ ধরনের এক টুকরো সবুজ বনে বন্যপ্রাণী খুঁজে পেয়েছে নিরাপদ আশ্রয় ও খাদ্যের নিশ্চয়তা। তাই প্রতিনিয়ত কাঠঠোকরা, বসনৱ বাউরী, টুনটুনি, দোয়েল, পেঁচা, মুনিয়া, ঘুঘু ও কোকিলের কলকাললিতে মুখরিত জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান। হরহামেশাই দেখা যায় বাদুড়, কাঠবিড়ালীর মতো প্রাণীর। সবুজ ব্যাঙের মতো কিছু বিপন্ন উভচরের লাফালাফি দেখা যায় জলাশয়ের এখানে-সেখানে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই উদ্ভিদ উদ্যান দেশের বিপন্ন উদ্ভিদ গবেষণা ও সংরক্ষণে গবেষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। প্রকৃতিতে সংকটাপন্ন উদ্ভিদ সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ ও এসব উদ্ভিদ থেকে চারা উৎপাদন করে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করছেন তারা। গবেষণার পাশাপাশি হাজারো মানুষের চিত্তবিনোদনের অন্যতম স্থান হয়ে উঠেছে এ উদ্যান। প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শত শত প্রকৃতিপ্রেমী নগর জীবনের ক্লানিৱ মুছে ফেলে বুক ভরে নির্মল শ্বাস নিতে বসেন কোনো কাঁঠালীচাঁপার পাশে। তবে এ কথা সত্যি যে, অতিরিক্ত দর্শনার্থীর চাপে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা দুটোই ক্ষতিগ্রসৱ হচ্ছে। সাধারণ মানুষের অসচেতনতার কারণে প্রতিনিয়ত দূষিত হচ্ছে উদ্যানের জলাশয়। এখানে-সেখানে জমছে ময়লা আবর্জনার সৱূপ যা প্রাকৃতিক পরিবেশকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। উদ্যানের গুরুত্ব উপলব্ধি করে সবাইকে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করার মাধ্যমে রক্ষা করতে হবে নৈসর্গিক সৌন্দর্যমণ্ডিত জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যান।

লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন