একটি গাছ ও খালিদ মাহমুদ মিঠু

একটি গাছ ও খালিদ মাহমুদ মিঠু

505
SHARE

মোসত্মফা কামাল সৈয়দ: দিনটি ছিল সোমবার, ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। এনটিভিতে আমি ও আমার দু’জন সহকর্মী নাটক প্রিভিউ করছি। সময় তখন দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। হঠাৎ করেই সহকর্মী পাভেল জানালো যে খালিদ মাহমুদ মিঠু মারা গেছেন। সংবাদটি এতটাই আকস্মিক যে কয়েক মুহুর্ত কেটে যাবার পর বুঝতে পারলাম মিঠু সত্যিই আর আমাদের মাঝে নেই। টেলিভিশনের স্ক্রলে ও ফেসবুকসহ অনলাইন সংবাদ মাধ্যমগুলোতে তখন মিঠুর মৃত্যু সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে। অবিশ্বাস্য এই দু:সংবাদটির বিসত্মারিত জানতে বন্ধুবর শাইখ সিরাজকে টেলিফোন করলাম। শাইখ জানালেন, মিঠু দুপুরে বাসায় ফেরার পথে কংক্রিটে ঘেরা একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ উপড়ে তাঁকে বহনকারী রিক্সার উপর পড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই মিঠু গুরুতর আহত হন। পরে নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রকৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ একটি গাছ শিল্পী খালিদ মাহমুদ মিঠুর প্রাণ অকালে কেড়ে নিলো !

খালিদ মাহমুদ মিঠু একাধারে চিত্রশিল্পী, লেখক, শিল্পনির্দেশক, চিত্রগ্রাহক, টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে ইতোমধ্যেই তিনি জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। আমি কখনোই ভাবতে পারিনি বহু গুণের অধিকারী এমন একজন সৃজনশীল মানুষের জীবনে করুণভাবে আকস্মিক যবনিকা নেমে আসবে।

নব্বই দশকের শুরুতে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। এর অনেক আগে থেকেই বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও নাট্যকার বেগম মমতাজ হোসেনের সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ পরিচয় ও যোগাযোগ। বিটিভি’র অত্যনত্ম জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘সকাল সন্ধ্যা’সহ আরও বহু সফল নাটকের নাট্যকার বেগম মমতাজ হোসেনেরই সুযোগ্য পুত্র খালিদ মাহমুদ মিঠু। বিটিভিতে কর্মরত অবস্থায় আমি খালিদ মাহমুদ মিঠুকে চিত্রগ্রাহক হিসেবে পাই। সাধারণ মেধার স্বাক্ষর রেখেই তিনি দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে কর্মরত ছিলেন। একসময় বিটিভি’র চাকরী ছেড়ে মিঠু ফ্রিল্যান্সার নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কর্মজীবনের শুরুর দিকেই তিনি ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আই’র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে এনটিভি’র জন্মলগ্ন থেকে বিভিন্ন বৈচিত্র্যপূর্ণ ও সৃজনশীল অনুষ্ঠান নির্মাণ করেছেন খালিদ মাহমুদ মিঠু। কর্মসূত্রে মিঠু’র সঙ্গে আমার পুনরায় যোগযোগ শুরু হয়। ২০০৭ সালে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের পর এনটিভি’র জন্য মিঠু সম্পূর্ণ বিনা পারিশ্রমিকে উদ্দীপনাধর্মী অনুষ্ঠান নির্মাণ করেন। সেই মহা বিপর্যয়ের সময় এনটিভি’র পাশে থেকে খালিদ মাহমুদ মিঠুর এই অবদান কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করছি।

আমি খুব কাছ থেকে মিঠুকে দেখেছি। তাঁর মধ্যে সহজাত বিনয়, শ্রদ্ধাবোধ ও কাজ করবার দৃঢ় প্রত্যয় ছিল। মানুষকে আপন করে নেবার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। মৃদুভাষী ও সদালাপী খালিদ মাহমুদ মিঠু’র স্নিগ্ধ অবয়ব ও হাসিমাখা মুখখানি আমার স্মৃতিতে চিরভাস্বর হয়ে রইল।

মৃত্যু অমোঘ ও অনিবার্য। তবে অসময়ে, মর্মানিত্মকভাবে মৃত্যু মেনে নিতে বড়ই কষ্ট হয়। আমাদের কাঁদিয়ে, দূর্ঘটনায় খালিদ মাহমুদ মিঠু চিরতরে চলে যাওয়াতে আমি গভীরভাবে বেদনাহত। অনেকগুলো দিন কেটে গেছে, মিঠুকে সামনাসামনি দেখিনি। আরও অনেকগুলো দিন কেটে যাবে। মিঠুকে আর কখনোই দেখতে পাবো না। কি কঠিন বাসত্মবতা!  গহীনে শব্দ ও জোনাকির আলোর মতই তাঁর স্মৃতি আমার হৃদয়ের গহীনে স্বগৌরবে ও স্বমহিমায় দীপ্যমান হয়ে থাকবে।

লেখক: অনুষ্ঠান প্রধান, এনটিভি