একটা ইতিহাস বানায়া দিলাম!

একটা ইতিহাস বানায়া দিলাম!

736
SHARE

রেজানুর রহমান: গভীর রাত। হঠাৎ মোবাইল বেজে উঠলো। এতো রাতে মোবাইল বাজছে। তার মানে কোন দুঃসংবাদ? লাইট জ্বেলে ঘড়ি দেখলাম। রাত দুটো। মোবাইল রিসিভ করতেই প্রীতিভাজন হাবিবুল হুদা পিটুর গলা শুনলাম। পিটু চ্যানেল আই-এর জনসংযোগ কর্মকর্তা। বললেন, ভাই খবর শুনেছেন? অমঙ্গল আশঙ্কায় তড়িঘড়ি তাকেই পাল্টা প্রশ্ন করলাম- খবর? কিসের খবর? পিটুর গলা কাঁপছে। বললেন, আওলাদ ভাই নাকি মারা গেছেন! পিটুর কথা আমি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। তবুও কেন যেন মনে হলো ভুল শুনছি নাতো? পিটু কার কথা বললেন? আওলাদ হোসেনের কথা! তা কি করে হয়? কয়েকঘন্টা আগেও তো আমরা একসাথে ছিলাম। চ্যানেল আই-এর জন্মদিন উপলক্ষে আনন্দ আলোর সম্পাদকীয় কার্যালয়ে তার নেতৃত্বেই কেক কেটেছি। দারুণ হৈচৈ আর আনন্দ করেছেন সবাইকে নিয়ে। আনন্দ আলোয় তার আনন্দমুখর উপস্থিতি আমরা ছাড়া আর কেউ দেখেনি। কিন্তু চ্যানেল আই-এর জন্মদিন উপলক্ষে প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে পৃথিবীর কোটি কোটি দর্শক তাকে দেখেছেন। কী প্রাণবন্ত আর হাসিখুশী মানুষ। অতিথিরা চ্যানেল আইকে শুভেচ্ছা জানাতে আসছেন। চ্যানেল আই-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজসহ চ্যানেল আই-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ অতিথিদের ফুলের শুভেচ্ছা গ্রহণ করছেন। তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন আওলাদ হোসেন। তিনিও দারুণ ব্যস্ত। এটা ওটা বাড়িয়ে দিচ্ছেন। হাসিভরা মুখ। চেহারায় প্রশান্তির ছায়া। সেই মানুষ মারা গেছেন? বিশ্বাস হচ্ছিলো না। পিটুকে সে কথা বলতেই উত্তর দিলÐ আমি ল্যাব এইডে যাচ্ছি। আপনি যাবেন নাকি? বললামÐ যাব। শরীর কাঁপছে। আমার স্ত্রী মাহবুবা খবরটা শুনে বিছানায় নির্বাক বসে আছে। হাসপাতালে যাচ্ছি। প্রস্তুতি দেখে বললÐ তোমার মোবাইল ভালো করে দেখোতো। পিটুই কী ফোন করেছেন? এমনওতো হতে পারে ভুল নম্বরে ভুল করে কেউ ফোন দিয়েছে। হয়তো আওলাদই মারা গেছেন। সেটা আমাদের আওলাদ ভাই না। অন্য আওলাদ… মাহবুবাকে বললামÐ নম্বর ঠিকই আছে। আমি হাসপাতালে চললাম। সাংবাদিকতার প্রয়োজনে বহুবার গভীর রাতে ঢাকা শহর চষে বেড়িয়েছি। রাতের ঢাকা সত্যি এক অন্যরকম জগৎ। কিন্তু আজ রাতের ঢাকাকে খুবই বিষণœ মনে হচ্ছে। ল্যাব এইডে পৌঁছে দেখি খবর সত্যি। আওলাদ হোসেন মারা গেছেন। চ্যানেল আই-এর জন্মদিনের রিপোর্ট লেখার জন্য মানবজমিন অফিসে গিয়েছিলেন। রিপোর্ট লিখে তা জমা দিয়ে পুরনো ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ঝিগাতলায় বাসায় ফেরার পরই অসুস্থবোধ করেন এবং কাউকে কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়েই না ফেরার দেশে চলে যান। আওলাদ হোসেন নেই একথা এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না। কিন্তু এটাই নিয়তি। এটাই বাস্তবতা। যা মেনে নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে। অনেকে বলেন সাংবাদিকদের প্রকৃত বন্ধুর সংখ্যা খুবই কম। তাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত করেছেন আওলাদ। তিনি ছিলেন প্রকৃত সাংবাদিক। বিশেষ করে দেশের বিনোদন সাংবাদিকতাকে অনন্য উচ্চতায় দাঁড় করিয়েছেন। আমাদের দেশীয় চলচ্চিত্রের বিকাশমান ধারায় আওলাদ হোসেনের লেখনীর ভ‚মিকা অগ্রগণ্য। সত্যকে কখনোই আড়াল করতেন না। আমাদের সাংস্কৃতিক জগতে অন্যায়, অনিয়ম, অবিচার, অসঙ্গতির বিরুদ্ধে তার কলম ছিল সর্বদাই সোচ্চার। এ ধরনের বিশুদ্ধ মানুষের তো বন্ধু থাকার কথা নয়। কিন্তু আওলাদ হোসেনের বন্ধু শুভাকাঙ্খীর সংখ্যা অসংখ্য। শুক্রবার ছুটির দিনে এফডিসিতে তার নামাজে জানাজায় শত শত মানুষের মাঝে উলে­খযোগ্য সংখ্যক তারকার উপস্থিতি প্রমাণ করে আওলাদ তাদের কতটা আপন ছিলেন। দেশবরেণ্য চিত্রনায়িকা মৌসুমী আওলাদের জন্য কান্না থামাতে পারছিলেন না। তিনি শুধুই বলছিলেনÐ আমি আমার ভাইকে হারালাম। আমি আমার অভিভাবককে হারালাম। একথা শুধু মৌসুমীর নয়। একথা আমাদের সবার। আমরা যারা বিনোদন সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছি তাদের কাছে আওলাদ হোসেন ছিলেন একটি আদর্শের প্রতীক। আওলাদ হোসেন তার দীর্ঘ সাংবাদিকতার আয়নায় আমাদের সাংস্কৃতিক জগতের একটি বাস্তব ছবি রেখে গেছেন। বিশেষ করে আমাদের চলচ্চিত্রের বিকাশমান ধারায় এই আয়নার ভ‚মিকা অনেক। সবাইকে নিয়ে একসাথে থাকতে চাইতেন আওলাদ হোসেন। তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ দিয়ে লেখাটি শেষ করতে চাই। ১৭তম জন্মদিনে হাজার হাজার মানুষের হাস্যোজ্জ্বল উপস্থিতিতে চ্যানেল আই-এর তেজগাঁওস্থ কার্যালয় মুখর হয়ে উঠেছে। আনন্দের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য অধিকাংশরাই ছবি ও সেলফি তোলায় ব্যস্ত। দেশের একঝাঁক সাংবাদিককে কাছে পেয়ে একত্র করলেন আওলাদ হোসেন। যাদেরকে অন্যসময়ে একত্র করা সত্যি দুরূহ ছিল। সাংবাদিকদের সাথে যোগ দিলেন সবার প্রিয়মুখ ফরিদুর রেজা সাগর ও সুবর্ণা মুস্তাফা, আব্দুর রহমান এবং আমীরুল ইসলাম। আওলাদ হোসেনও দাঁড়ালেন সবার সাথে। ছবি তোলা শেষ। আওলাদ হোসেন হাসতে হাসতে বললেন, একটা ইতিহাস বানায়া দিলাম। আগামীতে এই ছবিই অনেক কথা বলবে! আওলাদ হোসেন এভাবেই প্রতিদিন বিনোদন সাংবাদিকতায় নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করতেন। আর তাই বিনোদন সাংবাদিকতার ইতিহাসে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।  আওলাদ  ভাই, না ফেরার দেশে ভালো থাকবেন সৃষ্টিকর্তার কাছে এটাই আমাদের সমবেত প্রার্থনা।