Home সাক্ষাৎকার একজন গাড়িওয়ালার স্বপ্ন!

একজন গাড়িওয়ালার স্বপ্ন!

SHARE

একটি মাত্র চলচ্চিত্র নির্মাণ করেই আলোচনায় এসেছেন নির্মাতা আশরাফ শিশির। শুধু দেশে নয়, বিশ্বের ৭৫টি দেশের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে তাঁর নির্মিত ‘গাড়িওয়ালা’ সিনেমাটি প্রদর্শিত হয় এবং একাধিক পুরস্কার অর্জন করে। কিছুদিন আগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও অর্জন করে ছবিটি। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, গ্রীস, পর্তুগাল, কম্বোডিয়া, আরব আমিরাত, ভারত, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় বড় শহরে প্রদর্শিত হয়েছে ছবিটি, জিতে এনেছে পুরস্কার। আলোচিত এই নির্মাতা ‘আমরা একটি সিনেমা বানাবো’ নামে একটি নতুন ছবি নির্মাণ কাজে বর্তমানে ব্যস্ত রয়েছেন। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের প্রযোজনায় ছবিটির শুটিং শেষ হয়েছে বর্তমানে পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ চলছে। যদিও ‘গাড়িওয়ালা’ সিনেমার আগেই শুরু হয়েছিল ‘আমরা একটি সিনেমা বানাবো’ ছবিটির কাজ। তবে মাঝে ‘গাড়িওয়ালা’ সিনেমার কাজের জন্য প্রথম সিনেমাটির কাজ বন্ধ থাকে। তবে এখন সকল ব্যস্ততা নতুন সিনেমাটি নিয়েই। ‘গাড়িওয়ালা’ সিনেমার সফলতা, বিশ্বের বিভিন্ন উৎসবে যাওয়ার পর প্রতিক্রিয়া এবং নতুন সিনেমাটি নিয়ে আনন্দ আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন আশরাফ শিশির। লিখেছেন সৈয়দ ইকবাল।

আনন্দ আলো: বিশ্বের এতোগুলো উৎসবে ‘গাড়িওয়ালা’ প্রশংসিত হওয়া এবং সর্বশেষ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করা- সব মিলিয়ে আপনার অনুভূতির কথা জানতে চাই-

আশরাফ শিশির: অনুভূতি তো অসাধারণ। একজন নির্মাতার জন্য এটা অনেক বড় পাওয়া। আমার কাজের উৎসাহ-উদ্দীপনা এবং দায়িত্ববোধ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে এই পুরস্কার। এখানে কিছু কথা না বললেই নয়। ‘গাড়িওয়ালা’ সিনেমাটি বিশ্বের প্রায় ৭৫টি চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং বেশ কয়েকটি পুরস্কার অর্জন করে। বিশ্ব চলচ্চিত্র বোদ্ধারা সিনেমাটি দেখে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তাই প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে এতো অর্জন সত্যিই একজন নির্মাতার জন্য অনেক বড় ঘটনা। আমাদের এখানে চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে দর্শকদের একটা মাইন্ডসেট করে দেয়া হয়েছে। যেমন নির্দিষ্ট একটা ফরম্যাটে থাকলে সেটাকে সিনেমা বলা হচ্ছে, আর একটু জীবনমুখী গল্প কিংবা ইন্টাল্যাকচুয়াল টাইপের গল্প হলেই সেটাকে নাটক- টেলিফিল্ম বলা হচ্ছে। এই ধারনা সারা বিশ্বের কোথাও নেই। এক মিনিটের একটি ছবিও কিন্তু ছবি। বিষয়টা হচ্ছে গল্পটা কে কিভাবে বলছেন। আমাদের এখানে যারা চলচ্চিত্রের জায়গাটায় লিড দিচ্ছেন তাদের অনেকে দর্শকদের সামনে এক প্রকার চটুল গল্প দিয়ে তাদের বুঝিয়ে দিচ্ছেন এটাই হলো সিনেমা। পাঁচটা গান, একটা আইটেম সং ও মারামারি থাকলেই কেবল সেটা সিনেমা।  আর যা আছে সেগুলো কোনো সিনেমা নয়। তবে এখন আর সেই ধারনাটা নেই। কারন ইন্টারনেটের কল্যাণে সারা বিশ্বের নামিদামি চলচ্চিত্র দর্শক ঘরে বসে দেখছেন। ফলে আমাদের এখানে যে ফরম্যাটের ছবি নির্মিত হচ্ছে এবং দর্শকদের জন্য প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়ে আসছে তা আর দর্শক নিচ্ছে না। যার ফলে আমাদের বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে একটা খারাপ সময় যাচ্ছে বলা যায়। দর্শকের রুচির পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু তাদের রুচি অনুযায়ী সিনেমা তো নেতৃত্বে থাকা মানুষগুলোর অনেকে বানাতে পারছেন না। ফলে দর্শক ঠিকই ইউটিউবে বসে সেই ধরনের সিনেমা দেখছেন। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের কিছু তরুণ বিশ্বের বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবের মাধ্যমে জীবনমুখী, অফট্র্যাক কিংবা আর্ট ফিল্ম যাই বলি না কেন সেই ধরনের ছবিগুলো প্রদর্শন করার চেষ্টা করছেন। সেই দিক থেকে দর্শকের যে মাইন্ডসেটের কথা বলেছিলাম সেটাও ভাঙ্গতে শুরু করেছে।

আনন্দ আলো: ‘গাড়িওয়ালা’ সিনেমাটির গল্প কিভাবে নির্বাচন করলেন?

আশরাফ শিশির: লেখালেখি করি অনেক আগে থেকেই। আমার লেখালেখির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে জীবনকে কাছ থেকে দেখা। নিজের চোখে দেখা, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও আশেপাশের ঘটনা নিয়ে লিখে থাকি। তেমনিভাবে আমার শৈশবে পাবনায় বেড়ে ওঠার সময় দু’জন শিশুকে দেখেছিলাম বেয়ারিং দিয়ে গাড়ি বানিয়ে চলতে-ফিরতে। ঐ সময় অনেক দূরের গ্রাম থেকে সেই বেয়ারিং-এর গাড়িতে করে ভোর রাতে শাপলা ফুল, কলমিশাক কিংবা যেকোনো তরকারি বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে দেখেছি অনেক শিশুকে। কাউকে কাউকে দেখেছি পানির কলসিও সেই গাড়িতে করে নিয়ে যেতে। এই বিষয়টি আমার মনে খুব দাগ কেটেছিল। বিষয়টি আমার সবসময় মনে পড়ে। আমার একটি বই বের হয়েছিল ২০১১ সালে। ছোট গল্পের এই বইটিতে একটি মানবিক গল্প লিখি যার নাম ছিল ‘গাড়িওয়ালা’। পরবর্তীতে সিনেমার গল্পের জন্য এইগল্পে কিছু যোগ-বিয়োগ করা হয়েছিল। ২০১২ সালে সিনেমা তৈরির জন্য সরকারী অনুদানে সিনেমাটির স্ক্রিপ্ট জমা দেই। তারপর তো সব কিছুই ইতিহাস।

আনন্দ আলো: ‘আমরা একটি সিনেমা বানাবো’র কী খবর?

আশরাফ শিশির: ২০০৯ সালে আমার ক্যারিয়ারের প্রথম সিনেমা ‘আমরা একটি সিনেমা বানাবো’ নির্মাণে হাত দেই। বেশকিছু শুটিংয়ের পর ‘গাড়িওয়ালা’র কাজে হাত দিয়েছিলাম। ফলে বন্ধ থাকে ‘আমরা একটি সিনেমা বানাবো’র কাজ। তবে ‘গাড়িওয়ালা’র পর এই ছবিটির কাজ শেষ করেছি। এই ছবিটি এখন পোস্ট প্রোডাকশনের কাজ চলছে। ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যানারে ছবিটি মুক্তি পাবে। একটি লোক একটি পিঁপড়া মারার মধ্যদিয়ে ছবিটির গল্প শুরু হয়। যে লোক জীবনে কোনো কিছুই হত্যা করেনি, সে ভুলে একটি পিঁপড়া মেরে ফেলে। সেই পিঁপড়া মারার পাপের প্রায়শ্চিত্য করতে গিয়ে শেষমেষ সে একটি খুনও করে। অনেকটা রূপক অর্থে গল্পটি বললেও অন্তর্নিহিতভাবে দেশের চলমান পরিস্থিতির গল্প রয়েছে।