এই ভালোবাসার মাঝেই বেঁচে থাকতে চাই-নায়করাজ রাজ্জাক

এই ভালোবাসার মাঝেই বেঁচে থাকতে চাই-নায়করাজ রাজ্জাক

224
SHARE
Razzak

আমাদের মহানায়ক রাজ্জাককে ঘিরে আনন্দ আলো পরিবারের অনেক স্মৃতি জমা হয়ে আছে। তাই স্মৃতির ঝাঁপি খুলতেই যেন একটা হৈচৈ শুরু হয়ে গেল। এ বলে আমি আগে… ও বলে আমি আগে… সবাই কিছু বলতে চায়। অবশেষে বাছাই করা হলো একটি স্মৃতিময় লেখা। যা আনন্দ আলোয় ইতোমধ্যে প্রকাশ হয়েছে। লেখাটি পুনমুদ্রণ করা হলো। সঙ্গে থাকলো মহানায়কের একটি সাক্ষাৎকারও। এটিও আনন্দ আলোয় প্রকাশ হয়েছিল। আমাদের বিশ্বাস দুটি লেখাই পাঠকের কাছে নতুন মনে হবে।

-সম্পাদক

আনন্দ আলো: পেছনের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে কী?

নায়করাজ: (একটু ভেবে নিয়ে) হ্যাঁ অবশ্যই মনে পড়ে। সেই যে সংগ্রামমুখর দিনগুলো… ভোলা কী যায়? কিছুদিন আগে আমি বিরাট একটা ‘ফাড়া’ অতিক্রম করলাম। অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলাম। সবচেয়ে পীড়া দেয় বর্তমান ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অবস্থা। যে ইন্ডাস্ট্রি আমাকে আজকের রাজ্জাক বানিয়েছে তার বর্তমান অবস্থায় আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি!

আনন্দ আলো: আমরা সেই প্রসঙ্গে আসব। আপনার সংগ্রামমুখর দিনগুলোর কথা জানতে চাই। আপনার অভিনয় জীবনের শুরুর গল্প জানতে চাই, স্ট্রাগলের কথা জানতে চাই।

নায়করাজ: (আবার ভেবে নিলেন। তারপর মৃদু হেসে বললেন) ছোটবেলা থেকে আমি খুব জেদী ছিলাম। যা ভাবতাম তাই করতাম। যেটা ভালো মনে করেছি তাই করেছি। ১৯৬৪ সালে কলকাতায় একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছিল। সে কারণে আমার মন খুব খারাপ হয়ে যায়। মনের দুঃখে বোম্বে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু আমার গুরু পীযুষ বসু পরামর্শ দিলেন বোম্বে না গিয়ে তুই ঢাকায় যা। তাঁর কথামতোই ঢাকায় চলে আসি। পরিবারের কারও মত ছিল না। তবুও ঢাকায় চলে আসি। ঢাকায় তো এলাম। পরিচিত বলতে তেমন কেউ নাই। তিনটা বছর খুব স্ট্রাগল করেছি। সেসব দিনের কথা ভাবলে এখনো অবাক লাগে। কী সংগ্রামটাই না করেছি। জব্বার খানকে চিনতাম। সে এক কাহিনী। কলকাতায় আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল সাবিত্রী চ্যাটার্জির বাড়ি। আব্দুল জব্বার খান কলকাতায় গেলে সাবিত্রী চ্যাটার্জির বাড়িতে উঠতেন। একদিন আমি নাটকের রিহার্সেল দেবার জন্য কাছারি বাড়িতে যাচ্ছিলাম। পথে দেখি আমার মেজদা এক ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছেন। আমাকে সামনে পেয়ে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, এনাকে চিনিস? তোদের লাইনের লোক। আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে আছি। আমাদের লাইনের লোক মানে? উনি কি মঞ্চে কাজ করেন? নাকি চলচ্চিত্রে? মেজদা ভদ্রলোককে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, এনার নাম জব্বার খান। পাকিস্তানের বিখ্যাত ফিল্ম ডিরেক্টর। সালাম দিলাম। ব্যস পরিচয় এটুকুই। তিনি কমলাপুর এলাকায় থাকতেন। ঢাকায় এসে তাঁর সঙ্গে দেখা করলাম।

আনন্দ আলো: তার মানে আপনি একজন তরুণ, বিয়ে করেছেন। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাকে নিয়ে উঠলেন ঢাকায়?

নায়করাজ: হ্যাঁ তাই। আমি ঢাকায় ফুলবাড়িয়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমেছি বড় ছেলেকে কোলে নিয়ে স্ত্রীর হাত ধরে। সেখান থেকে যাই মিরপুর। তখন আমাদের একমাত্র ছেলে বাপ্পার বয়স মাত্র ৮ মাস। সেও আমাদের স্ট্রাগলের সঙ্গী। মিরপুরের পরিবেশ পছন্দ হলো না। চলে এলাম কমলাপুর এলাকায়। সেখানে একটা ছোট্ট বাসা ভাড়া নিলাম এবং একদিন সাহস করে জব্বার সাহেবের সাথে দেখা করলাম। কলকাতায় তাঁর সঙ্গে কীভাবে দেখা হয়েছিল সেসব কথা তাঁকে বললাম। তিনি চিনলেন আমাকে। সে সময় তিনি ‘উজালা’ নামে একটি ছবি করছিলেন। তাঁর অফিসে যেতে বললেন। একদিন তাঁর অফিসে গেলাম। কথায় কথায় বললেন, এক কাজ কর তুমি কামাল সাহেবের অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে কাজ কর। আমি একবাক্যে রাজি হয়ে গেলাম। আমি চলচ্চিত্রে অভিনয় করার জন্য ঢাকায় এসেছি। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি কেউ আমাকে অভিনয়ে নিবে না। কারণ কেউ তো আমার সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। এজন্য আমাকে আগে চলচ্চিত্রাঙ্গনে ঢুকতে হবে। এই ভেবে কামাল আহমেদ সাহেবের ফোর্থ অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে কাজ করতে শুরু করলাম। এর মধ্যে মজনু নামে একজন নাট্যকর্মীর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। তার সহায়তায় মঞ্চে নাটক করি আর চলচ্চিত্রে কামাল সাহেবের ফোর্থ অ্যাসিস্টেন্ট হিসেবে চলচ্চিত্র পাড়ায় যাওয়া আসা করি। এই আমার কাজ। কামাল সাহেব নতুন একটা ছবিতে হাত দিলেন। তার নাম ‘পরওয়ানা’। সেটাতেও আমি ফোর্থ অ্যাসিস্টেন্ট। চলচ্চিত্রপাড়ায় যাওয়া আসা করছি। বিভিন্ন জনের সঙ্গে পরিচয় হচ্ছে। কথায় কথায় তাদের জানাচ্ছি আমি মূলত অভিনেতা হতে চাই। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। সুভাষ দত্ত, ক্যাপ্টেন এহতেশাম এমনকি কামাল সাহেবের কাছেও নিজের ইচ্ছা ব্যক্ত করেছি। বলেছি আমি অভিনেতা হতে চাই। আমাকে একটা সুযোগ দিন। কামাল সাহেব পাত্তাই দিলেন না। আমার কথা হেসে উড়িয়ে দিলেন অ্যাই মিয়া কিসের অভিনয় করতে চাও। অ্যাসিস্টেন্টগিরি করো। তখনকার সময়ে শ্রদ্ধেয় রহমান সাহেব বেশ ব্যস্ত অভিনেতা। তিনি আমার ইচ্ছের কথা জানতেন। আমার চেহারাতো মাশাআল্লাহ ভালোই ছিল। স্টাইল করে চলি। উনি একদিন আমাকে সামনে পেয়ে রীতিমতো বকা দিলেন। উনি সিঁড়ি দিয়ে নামছিলেন আর আমি সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলাম। তাঁকে দেখে সালাম দিলাম। আমাকে দাঁড় করিয়ে বললেন অ্যাই, তুমি এভাবে ফিল্মের ‘ক্যান’ নিয়ে ঘুরে বেড়াও কেন? ওটা এভাবে বয়ে নিয়ে বেড়াবে না। ওটা ফেলে দাও। নাহলে তুমি জীবনে অভিনেতা হতে পারবে না। এই যে কামাল সাহেবের পিছনে ঘুরে বেড়াচ্ছ তিনিও কোনোদিন তোমাকে অভিনয়ের সুযোগ দিবে না। তোমার কাজ সিনেমার ক্যান নিয়ে ঘুরে বেড়ানো নয়। এটা ছাড়ো…

তাঁর কথা শুনে আমি সেদিন আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। চোখ ছলছল করছিল। নিরুপায় ভঙ্গিতে তাঁকে বললাম আমি আসলে কী করবো বুঝতে পারছি না… রহমান সাহেব আমার ঘাড়ে হাত দিয়ে বললেন, ফিল্মের অ্যাসিস্টেন্টগিরি ছাড়। অভিনয়ের চেষ্টা করো।

razzak
এমন সতী সাদ্ধী স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে নায়কের মায়া হতো। তাই কখনো সহকর্মী সুন্দরী নায়িকাদের দিকে তাকাতে পারতেন না।

বাসায় এসে আমার স্ত্রীকে সব কথা খুলে বললাম। আমার স্ত্রী ল²ী ভেবে নিয়ে বলল, দ্যাখো তোমার যা ভালো মনে হয় তাই করো।

এই ঘটনার কিছুদিন পর আমি কামাল সাহেবকে বললাম, ভাই আমি আর অ্যাসিস্টেন্টগিরি করবো না। আমি ফিল্মে অভিনয় করতে চাই। সৌভাগ্যক্রমে ‘আখেরি স্টেশন’ নামে একটি ছবিতে ছোট্ট একটা চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেলাম। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম যেতে হবে। ১৫ দিন থাকতে হবে সেখানে। সহকারী স্টেশন মাস্টারের চরিত্রে অভিনয় করবো। শবনম, রানী সরকার, শওকত আকবরসহ অনেকে এই ছবিতে অভিনয় করবেন। চলে গেলাম ‘আখেরি স্টেশন’-এ অভিনয় করতে।

আনন্দ আলো: আখেরি স্টেশনে আপনার অভিনয়টা মূলত কী ছিল? অভিনেতা হিসেবে পর্দায় কী করেছেন…

নায়করাজ: তেমন কিছু না। ছোট্ট পার্ট তো… স্টেশনের কাউন্টারে টিকিট বিক্রি করা… এই আর কী! চট্টগ্রাম থেকে ‘আখেরি স্টেশন’ শেষ করে এলাম। আর কোনো কাজ পাচ্ছি না। কী করবো ভাবছি! কলকাতা থেকে যে টাকা পয়সা নিয়ে এসেছি তা শেষ। সংসার কীভাবে চলবে? ঢাকায় থাকবো নাকি আবার কলকাতায় চলে যাব? প্রচÐ মানসিক সংকট শুরু হলো। কলকাতায় চিঠি লিখলেই টাকা আসবে। কিন্তু আমি পরিবারের কাউকেই আমার কষ্টের কথা জানাতে চাইলাম না। ঐ যে বললাম আমার মধ্যে প্রচÐ জেদ ছিল। হারবো না। একদিন ল²ীকে বললাম, কী করা যায় বলতো…

ল²ী বলল, না কলকাতায় ফিরে যাওয়া যাবে না। আমরা হারবো না। আমরা এখানেই স্ট্রাগল করবো। তুমি ভেঙে পড়ো না। আল্লাহ নিশ্চয়ই একদিন মুখ তুলে চাইবেন। চেষ্টা করতে থাকো। আমি তোমার সঙ্গে আছি… ইতোমধ্যে জহির রায়হানের সঙ্গে আমার কিছুটা পরিচয় হয়েছে। তখন ‘বাহানা’ নামে তিনি একটি ছবি করছিলেন। তার ক্যামেরাম্যান ইনাম সাহেব আমাকে চিনতেন। তাঁর সঙ্গে আমার বেশ ভালো সম্পর্ক হয়েছে। একদিন জহির সাহেবের কাছে আমার ইচ্ছের কথাটা জানালাম। তিনি সব শুনে তাঁর বাসায় একদিন যেতে বললেন। সাহস করে তাঁর কায়েতটুলির বাসায় একদিন হাজির হলাম। আমাকে তিনি কিছুক্ষণ দেখলেন। তারপর বললেন, আপনি এক সপ্তাহ পর অর্থাৎ নেক্সট সানডে ঘুম থেকে উঠে আবার আমার সঙ্গে দেখা করবেন। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে আপনি চুল কাটবেন না, দাড়ি কামাবেন না। বুঝতে পেরেছেন?

আমি ফিরে এসে নেক্সট সানডের জন্য অপেক্ষা করছি। চুল কাটি না। দাড়িও কামাই না। নির্ধারিত দিনে আবার জহির রায়হানের কায়েতটুলির বাসায় গেলাম। চা খেতে খেতে তিনি আমাকে দেখলেন। একসময় বললেন, আমার একটি উপন্যাস আছে নাম ‘হাজার বছর ধরে’। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি নেক্সট ছবি নির্মাণ করবো এই উপন্যাসকে নিয়েই। এই ছবিতে আমি আপনাকে নায়ক হিসেবে কাস্ট করবো।

জহির রায়হানের কথা শুনে আমিতো অবাক। মনে হলো আমি ভুল শুনছি নাতো? স্বপ্নেও ভাবিনি তিনি আমাকে তার ছবিতে নায়ক হিসেবে কাস্ট করবেন। ভেবেছিলাম ছোটখাটো কোন চরিত্রে হয়তো নিবেন ভেবেছেন। তাই ডেকেছেন। কিন্তু সরাসরি নায়ক। যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না। জহির রায়হান আমাকে আশ্বস্ত করলেন, যান প্রস্তুতি নিতে থাকেন। আপনি আমার নেক্সট ছবির নায়ক। অনেক আনন্দ নিয়ে বাসায় ফিরে আমার স্ত্রীকে সবকিছু খুলে বললাম। সে খুব আনন্দিত। আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, দ্যাখো… এভাবেই আমাদের দুখের দিন কেটে যাবে…

কিন্তু দুখের দিন তো যায় না। জহির রায়হানের পরবর্তী ছবির শুটিং শুরুর কোনো লক্ষণই পাওয়া যাচ্ছিল না। আমার তেমন কোনো কাজ নাই। সংসার চালাব কীভাবে? রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠেছি। ভাড়া বাসায় থাকি। তখনকার দিনে বাসা ভাড়া দিতে হতো মাসে ১০০ টাকা। অথচ কোনো আয় রোজগার নাই। একজনের সূত্রে খবর পেয়ে পাকিস্তান টেলিভিশনে খবর পাঠক হিসেবে আবেদন করার জন্য ডিআইটি বিল্ডিং-এ গেলাম। অডিশন দিলাম। অডিশনে পাসও করলাম। টিভি ভবন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলাম হঠাৎ দেখা জামান আলী খান সাহেবের সঙ্গে। তিনি অভিনেত্রী রেশমা ভাবীর স্বামী। বিভিন্ন ছবির শুটিং চলাকালে নাজমা ভাবীর সঙ্গে দেখা করার জন্য তিনি সেটে যেতেন। এভাবেই তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়। টিভি ভবনে আমাকে দেখে অবাক হয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, অ্যাই মিয়া আপনি এখানে কী করছেন?

বললাম, খবর পাঠক হিসেবে অডিশন দিতে এসেছিলাম। অডিশনে পাস করেছি… আমার কথা শুনে জামান ভাই রীতিমতো হৈচৈ শুরু করে দিলেন। বললেন, আপনি কেন খবর পাঠক হবেন? এই কাজ আপনার না। আপনি আসেন আমার সঙ্গে…

জামান ভাই আমাকে তাঁর রুমে নিয়ে বসালেন। চা খাওয়ালেন। বললেন, আপনি এত সুন্দর অভিনয় করেন। অভিনয়ের দিকেই থাকেন। খবর পাঠ করতে গিয়ে জীবনের ‘ট্রাক’ বদলাবেন না।

তাকে সংসারের পরিস্থিতি বুঝিয়ে বললাম। তিনি সান্ত¡না দিলেন। বললেন, সব ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা করবেন না। আপনার সঙ্গে আমার খুব তাড়াতাড়ি আবার যোগাযোগ হবে। এই ঘটনার তিনদিন পর আমি এফডিসিতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। জামান ভাই রেশমা ভাবীকে বাসায় নেয়ার জন্য এফডিসিতে গাড়ি নিয়ে এসেছেন। হঠাৎ আমাকে দেখে ব্যস্ত হয়ে বললেন, এই যে রাজ্জাক সাহেব ভালোই হলো আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। কাল আপনি টিভি ভবনে আসেন। ‘ঘরোয়া’ নামে আমরা একটি ধারাবাহিক টিভি নাটক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ঐ নাটকে আপনি অভিনয় করবেন। সপ্তাহে তিনদিন সময় দিতে হবে। প্রতি সপ্তাহে সম্মানী পাবেন ৬৫ টাকা। রাজি তো…!

আমি যেন নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সপ্তাহে ৬৫ টাকা। তার মানে মাসে ২৬০ টাকা। মনে হলো হ্যাঁ সৃষ্টিকর্তার রহমত হয়েছে। আমি যেন আমার ভবিষ্যৎ যাত্রার পথ খুঁজে পেলাম। টেলিভিশনে ‘ঘরোয়া’ নাটকে অভিনয় শুরু করে দিলাম। সপ্তাহে ৬৫ টাকা পাচ্ছি। সংসার চালানোর একটা পথ খুলে গেল। ইতোমধ্যে ফার্মগেটের দিকে বাসা শিফট করেছি। পয়সা বাঁচানোর জন্য ফার্মগেট থেকে হেঁটে নিউমার্কেটের কাছে ডিআইটি ভবনে যাই। আবার হেঁটেই বাসায় ফিরে আসি। ঘরোয়ায় অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্রাঙ্গনের প্রায় সবার সঙ্গেই যোগাযোগ রেখে চলেছি। যার সঙ্গেই দেখা হয় তাকেই বলি আমি সিনেমায় অভিনয় করতে চাই। একটা সুযোগ দিন। জহির রায়হানের সেই ছবিরও খবর পাচ্ছি না। ইতোমধ্যে দু’টি ছবিতে ট্যাক্সি ড্রাইভার আর পিয়নের ছোট্ট চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেলাম। অভিনয়ও করলাম। কিন্তু সেই অর্থে আমাকে কেউ ডাকছে না। আবার হতাশা গ্রাস করতে লাগল। কিন্তু ল²ী আমাকে সাহস দিয়েই চলেছে হতাশ হয়ো না। দেখো একদিন আমাদের সুদিন আসবেই।

বোধকরি এলো সেই সুদিন। ডিআইটিতে টিভি ভবনে ‘ঘরোয়া’ নাটকের শুটিং করছিলাম। সেখানে জহির রায়হানের ক্যামেরাম্যান জাকারিয়া সাহেবের সঙ্গে দেখা। আমাকে দেখে হন্তদন্ত হয়ে বললেন, রাজ্জাক সাহেব আপনার জন্য একটা খবর আছে। জহির রায়হান সাহেব আপনাকে খুঁজছেন। ডিআইটি থেকেই সরাসরি জহির রায়হান সাহেবের সঙ্গে দেখা করার জন্য গেলাম। আমাকে দেখে তিনি রীতিমতো হৈচৈ শুরু করে দিলেন এই যে রাজ্জাক সাহেব… আপনাকে আমি হন্যে হয়ে খুঁজছি। আপনাকে আমার দরকার। আপনাকে আমার নতুন ছবির হিরো করেছি। ছবির নাম ‘বেহুলা’। একথা বলতে বলতেই আমার হাতে ৫০০ টাকা ধরিয়ে দেয়া হলো। এটা হলো ছবির জন্য সাইনিং মানি। আমিতো অবাক। শুরু হলো আমার জীবনের আরেক অধ্যায়। ‘বেহুলার’ শুটিং চলছে। ‘ঘরোয়াতেও’ অভিনয় করে যাচ্ছি। ‘বেহুলার’ শুটিং শেষ হলো। হলে রিলিজ হলো। তারপরতো আরেক ইতিহাস…

আনন্দ আলো: সেই ইতিহাসটাই জানতে চাই…

নায়করাজ: ‘বেহুলা’ নিয়ে আমি খুব টেনশনে ছিলাম। কারণ জহির রায়হান আমাকে নায়ক হিসেবে পছন্দ করলেও প্রডিউসার প্রথমে পছন্দ করেন নাই। ছবিটা ছিল স্টার গ্রæপের। তারা নায়ক হিসেবে চেয়েছিল শওকত আকবর, হাসান ইমামসহ তখনকার দিনের যেকোনো পরিচিত অভিনেতাকে। একেবারে নতুন আনকোরা একজন অভিনেতা হিসেবে আমাকে তাদের পছন্দ হয়নি। কিন্তু জহির রায়হান তার সিদ্ধান্তে ছিলেন অটল। আমাকে দিয়ে তিনি প্রথমে একটি গানের দৃশ্যের শুটিং করলেন, নাচে মন ধিনা ধিনা… ‘বেহুলায়’ অসম্ভব জনপ্রিয় হয়ে ছিল এই গান। প্রডিউসারকে এই গানের চিত্রায়ণ দেখানোর পর পরিবেশ, পরিস্থিতি বদলে যায়। প্রডিউসার আমাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ‘বেহুলা’ রিলিজ হলো। সুপারহিট হলো। সারাদেশে হৈচৈ পড়ে গেল ছবিটি নিয়ে। অভিনেতা হিসেবে আমার প্রতি আগ্রহ দেখা দিল সবার। বলা যায় জহির রায়হানের ‘বেহুলাই’ আমাকে ছবির জগতে টিকে থাকার শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।

‘বেহুলার’ পর নতুন ছবির জন্য অপেক্ষা করছি। জহির রায়হান পরিবারেরই একটি ছবি ‘আগুন নিয়ে খেলা’র শুটিং শুরুর প্রস্তুতি চলছিল। এই ছবিতে আমাকে নেয়ার জন্য সুমিতা দেবীকে পরামর্শ দিলেন জহির রায়হান। কিন্তু সুমিতা দেবী রাজি হলেন না। তিনি জহির রায়হানকে মুখের উপর বলে দিলেন, ফোক ছবির নায়ক হিসেবে রাজ্জাক ভালো করলেও সামাজিক কাহিনীর ছবিতে হিরো হিসেবে তাকে মানাবে না। একথা আমার কানেও এলো। আমি খুব দুঃখ পেয়েছিলাম।

জহির রায়হানের নতুন ছবি ‘আনোয়ার’ শুটিং করার জন্য সিরাজগঞ্জে গেলাম। সেখানে শুটিং চলছে। হঠাৎ দেখি একদিন সুমিতা দেবী হাজির। তিনি মত পাল্টেছেন। ‘আগুন নিয়ে খেলা’য় আমাকে হিরো হিসেবে নিতে চান। আমি তাকে বললাম, আপনি তো আমাকে রিফিউজ করেছেন। তারপরও কেন আমাকে নেয়ার কথা ভাবছেন?

সুমিতা দেবী বললেন, বাদ দেন পেছনের কথা। আপনি রাজি হয়ে যান। সেদিন দেখেছি জহির রায়হানও তার ক্ষোভের বহিপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। সুমিতা দেবীর সামনেই আমাকে বললেন, রাজ্জাক সাহেব বুঝেশুনে এই ছবিতে সাইন করবেন। কারণ ওরা আপনাকে একদিন রিফিউজ করেছিল…

তো, যাইহোক ‘আগুন নিয়ে খেলায়’ অভিনয় করার জন্য রাজি হয়ে গেলাম। এক সঙ্গে দুই ছবির শুটিং শুরু হলো। ঢাকায় এফডিসিতে ‘আগুন নিয়ে খেলা’ আর সিরাজগঞ্জে ‘আনোয়ারা’। সিরাজগঞ্জে ‘আনোয়ার’ শুটিং করে ঢাকায় যাই। আবার ঢাকায় ‘আগুন নিয়ে খেলার’ শুটিং করে সিরাজগঞ্জে ফিরে আসি। ‘আগুন নিয়ে খেলার’ পর আমাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শুধু ফোক নয় সামাজিক কাহিনী নির্ভর ছবিতেও আমি অপরিহার্য হয়ে উঠলাম। কলেজের ছাত্র। গিটার নিয়ে গান করি। সাধারণ বাঙালি দর্শক যেন তাদের পাশের বাড়ির ছেলেটাকেই খুঁজে পেল।

আনন্দ আলো: চলচ্চিত্রে একজন নতুন অভিনেতা রাজ্জাক এই যে ক্রমান্বয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন… ব্যাপারটা কী সহজ ছিল?

নায়করাজ: না, মোটেই না। আমি তো অভিনেতা রাজ্জাকের স্ট্রাগলের কথাই এতক্ষণ বললাম। অভিনেতা হিসেবে তার এগিয়ে যাবার গল্পটা খুব সহজ সরল ছিল না। তখনকার দিনে আমাদেরকে প্রতিযোগিতা করতে হয়েছে উত্তম কুমারের সঙ্গে। কমপিটিশন করতে হয়েছে ওয়াহিদ মুরাদ, মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে। তখনকার দিনে বাংলা ছবি করার ব্যাপারে অনেকেরই আগ্রহ ছিল না। কারণ বাংলা ছবির দর্শক কম। সে কারণে বাঙালি পরিচালকদের অনেকেই উর্দু ছবি নির্মাণ শুরু করেছিলেন। এই সময় ‘রূপবান’, ‘বেহুলা’, ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘এতটুকু আশা’র মতো বাংলা ছবি দর্শককে আবার হলে ফিরিয়ে আনে। হয়তো অনেকে বলবেন আমি অহংকার করে বলছি। ঠিক তা নয়। ইতিহাস সাক্ষী। রাজ্জাককে কেন্দ্র করে তখনকার দিনে ছবি বানানো শুরু হলো। সেই সময়ের মানুষদের সঙ্গে এখন আমার দেখা হলেই তারা আমাকে বলেন, সিনেমা হলে আপনার নতুন ছবি দেখার জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করে টিকিট জোগাড় করতাম। এক ছবি যে কতবার দেখেছি… সত্যি আপনি আমাদের বাংলা সিনেমাকে অনেক জনপ্রিয় করেছেন।

আনন্দ আলো: তখনকার দিনে ছবির শুটিং-এর ক্ষেত্রে একটা নিয়ম মেনে চলা হতো। সকাল নয়টা মানে নয়টাই…

নায়করাজ: তখনকার দিনে ছবির শুটিং ছিল অনেকটা উপাসনার মতো। কাজের প্রতি দারুণ শ্রদ্ধা ছিল সবার। বাংলা ছবিকে যে কোনো মূল্যে জনপ্রিয় করতে হবে এ ব্যাপারে সবাই ছিলেন খুবই আন্তরিক। ‘বেহুলা’, ‘আনোয়ারা’, ‘আগুন নিয়ে খেলার’ মতো ছবি সুপারহিট হওয়ার পর সবাই আমাকে বেইজ করে ছবি নির্মাণ শুরু করেন। নায়িকা হিসেবে কবরী, সুচন্দা, আর সুজাতাকে দর্শক কাছে টেনে নিয়েছে। আমি নায়ক। কোনো ছবিতে কবরী, কোনো ছবিতে সুচন্দা অথবা সুজাতা নায়িকা। একটার পর একটা ছবি নির্মাণ শুরু হলো। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কখনো কখনো ১৮ ঘণ্টা এমনকি ২০ ঘণ্টাও শুটিং করেছি। কামাল আহমেদ, সুভাষ দত্ত, কাজী জহির, নারায়ণ ঘোষ মিতাসহ সকল পরিচালক নিজেরাই আমার সিডিউল ভাগাভাগি করে নিতেন। ১৯৬৮ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত একটানা ১৭ বছর আমি কখনো ২০ ঘণ্টা ছবির শুটিং করেছি। ৪ ঘণ্টা ঘুমাতাম। সবার মধ্যে ভালো কাজ করার তাড়না ছিল। সাধনা ছিল সবার মধ্যে। একটা গান রেকর্ডিং করতে ৩/৪ দিন সময় লাগত। আর এখন নাকি একঘণ্টায় গান রেকর্ডিং হয়। অবাক লাগে এসব কথা শুনে।

আনন্দ আলো: একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। এই যে আপনি বললেন, রাজ্জাক-কবরী, রাজ্জাক-সুচন্দা, রাজ্জাক-সুজাতা চলচ্চিত্রে জুটি গড়ে উঠলো। এটার পেছনে কী কাজ করেছে?

নায়করাজ: সুচন্দার সঙ্গে আমার প্রথম জুটি গড়ে ওঠে ‘বেহুলার’ মাধ্যমে। সুজাতার সঙ্গে আগুন নিয়ে খেলার মাধ্যমে। আর কবরীর সঙ্গে জুটি গড়ে ওঠে ‘ময়নামতির’ মাধ্যমে। পিওর রোমান্টিক ছবি কিন্তু ‘ময়নামতি’। এই ছবিতে কবরীর সঙ্গে আমার একটা রোমান্টিক জুটি গড়ে ওঠে। তখনকার দিনে উত্তম-সুচিত্রা জুটির একটা ক্রেজ ছিল। এর বিকল্প হিসেবে আমাদের দেশে রাজ্জাক-কবরী জুটিকে দর্শক আপন করে নেয়। কবরীর সঙ্গে তখন যতগুলো ছবি করেছি তার সবগুলোই ছিল সুপারহিট। আবির্ভাবের মতো একটা কঠিন ছবিকেও দর্শক লুফে নিয়েছে। তারপর এলো ‘নীল আকাশের নীচে’। দর্শক লুফে নেয়। রাজ্জাক-কবরী জুটির মূল আকর্ষণ ছিল বিশ্বস্ততা। দর্শক রাজ্জাককে ভাবতো পাশের বাড়ির প্রিয় ছেলেটি আর কবরীকে ভাবতো পাশের বাড়ির প্রিয় মেয়েটি। তরুণরা এক একজন নিজেদেরকে রাজ্জাক ভাবতে শুরু করে। আর তরুণীরা নিজেদেরকে কবরী ভাবতে শুরু করে। সে কারণে তাদের অভিনয় দেখার জন্য হলে ছুটে যায়। এমনিভাবে সুচন্দা আর সুজাতার সঙ্গেও জুটি গড়ে ওঠে আমার। শাবানার সঙ্গে তখনও আমার ছবি করা হয়ে উঠেনি। কারণ শাবানা তখন উর্দু ছবিতেই অভিনয় করতেন। ‘চকোরী’, ‘ছোট সাহেব’ এইসব ছবিতে অভিনয়ের জন্য ব্যস্ত ছিলেন। ‘পায়েল’ নামে একটি ছবি করার সময় একদিন শাবানা দুঃখ প্রকাশ করেন আমার কাছে। বাংলা ছবিতে তিনি সুযোগ পাচ্ছেন না। আমি যেন তাকে এ ব্যাপারে সহায়তা করি।

সুলতানা জামান তখন ‘ছদ্মবেশী’ নামে একটি ছবি করবেন। নায়ক যথারীতি আমি। নায়িকা হিসেবে কবরী অথবা অন্য কাউকে ভেবেছিলেন তাঁরা। আমিই এই ছবিতে শাবানাকে নেয়ার জন্য অনুরোধ করি। সুলতানা জামান প্রথমেই আপত্তি তোলেন। তিনি বলেন, শাবানা উর্দু ছবির নায়িকা। বাংলা ছবিতে তাঁকে মানাবে না… শেষ পর্যন্ত তিনি আমার কথার গুরুত্ব দিয়েছেন। যেহেতু আমি তখন ছবির নায়ক হিসেবে অপরিহার্য হয়ে উঠেছি। সে কারণে আমার কথা ফেলতে পারেননি। আমার সঙ্গে শাবানাকে ‘ছদ্মবেশী’ ছবিতে নেয়া হলো। ছবিটি সুপারহিট হয়েছিল। শাবানাও বাংলা ছবিতে অপরিহার্য হয়ে উঠলেন। রাজ্জাক-কবরী, রাজ্জাক-শাবানা… ববিতার সঙ্গে তখনও আমার জুটি গড়ে ওঠেনি। ‘সংসার’ নামে একটি ছবিতে ববিতা আমার মেয়ের ভ‚মিকায় অভিনয় করে। নায়িকা ছিলেন সুচন্দা। একদিন সেই ববিতার সঙ্গেও আমার জুটি গড়ে ওঠে। আমরা সবাই মিলে আমাদের বাংলা সিনেমাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য রীতিমতো এক যুদ্ধে নেমেছিলাম। আমরা এক পর্যায়ে সফলও হয়েছি।

আনন্দ আলো: জনপ্রিয়তার তুঙ্গে এখন আপনি। আপনার প্রেমে পড়েছিলেন অসংখ্য নারী। কীভাবে সামলেছেন।

নায়করাজ: সরাসরি একটা কথা বলি। আমার সকল প্রেম ছিল চলচ্চিত্রে অভিনয়কে ঘিরে। ছবিতে অভিনয়কে গুরুত্ব দিয়েই আমি সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতাম। তখনকার দিনে আমাকে নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। অনেক গালগল্প ছাপা হয়েছে। আমি এসবকে মোটেই গুরুত্ব দেইনি। কারণ আমি নিজের কাছে সবর্দাই সৎ ছিলাম। সহকর্মী নারী শিল্পীদের আমি বেশ শ্রদ্ধা করতাম। তবে হ্যাঁ ভক্তদের নিয়ে বিড়ম্বনা হয়েছে প্রচুর। বিশেষ করে মেয়ে ভক্তদের অল্পমধুর ভালোবাসা প্রায়শই সহ্য করতে হত। কখনও কখনও মনে হয়েছে মেয়ে ভক্তরা বোধকরি আমাকে ছিড়ে খাবে। বাসা থেকে যখন শুটিং স্পটে যাবার জন্য বের হতাম তখন দোয়া-দরুদ পড়ে নিতাম। যখন বাসায় ফিরতাম তখনও দোয়া দরুদ পড়তাম। একথা আবারও স্বীকার করছি আমার স্ত্রী ল²ী আমাকে অনেক ফ্রিডম দিয়েছিল। এমনও হয়েছে মেয়ে ভক্তরা আমাদের ড্রয়িং রুমে ঢুকে আমার ওয়াইফকে বের করে দিয়েছে। ছবির অ্যালবাম নিয়ে সে কী কাড়াকাড়ি। তখন ল²ী তাদের বলেছে যাই কর না কেন আমার লোকটাকে নিয়ে যেও না তোমরা। একবার কুমিল্লায় শুটিং করছি। ছবির নাম ‘দুইভাই’। পরিচালক জহির রায়হান। ছবিটা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। রমজানের ৭ তারিখ শুটিং শুরু হয়েছে। ঈদেই রিলিজ হবে। এজন্য বেশ টেনশন ছিল সবার মাঝে। কুমিল্লায় দীঘির পাড়ে শুটিং শুরু হলো। চারদিকে প্রচÐ ভিড়। দীঘির পাড় দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাব। সাইকেলে পা চালিয়ে দীঘির পাড়ের অর্ধেক অতিক্রম করেছি হঠাৎ কোত্থেকে যেন দশ/বারো জন তরুণী দৌড়ে এসে সাইকেলে ধাক্কা দিয়ে আমাকে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর আমাকে প্রায় চ্যাংদোলা করে পাশেই একটি ঘরে নিয়ে দরজা আটকে দিল। শুটিং ইউনিটে তখন বেশ উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন দৌড়ে গিয়ে ঘরের দরজায় টোকা মারতেই একজন তরুণী বেড়িয়ে এসে ভারিক্কী গলায় বলল ঝামেলা করবেন না। আমরা উনাকে বেশিক্ষণ আটকে রাখব না। তারপর ঘরের ভিতর আমাকে নিয়ে শুরু হলো নানা গবেষণা। কেউ আমার চুলে হাত দেয়। কেউ গাল টিপে দেখে। কেউ পাশে বসে আদর করতে চায়। এভাবে চলল প্রায় বিশ মিনিট। তারপর আমাকে ওরা ছেড়ে দিয়ে যাবার সময় বলল যান এবারের মতো ছেড়ে দিলাম…।

আরেকটি ঘটনা বলি। এফডিসিতে ‘দর্পচ‚র্ণ’ নামে একটি ছবির শুটিং হবে। মেকআপ নিচ্ছিলাম এফডিসির মেকআপ রুমে। হঠাৎ দেখি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ৪ জন মেয়ে আমার কাছে এলো। ওরা আমাকে দেখতে এসেছে। একথা সে কথা। আমি ওদের বললাম তোমাদের যদি অটোগ্রাফ লাগে তাহলে কাগজ দাও। ওরা কোনো আগ্রহ দেখাল না। তবে পরস্পরের মধ্যে ইশারায় কী যেন বলাবলি করল। মেকআপ রুমের আয়নায় আমি সব দেখতে পাচ্ছি। হঠাৎ দেখলাম ওরা চারজনই ওয়ান টু থ্রি… বলে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। শুরু হলো আমার গালে চুমু খাওয়ার প্রতিযোগিতা। মেকআপ ম্যান চিৎকার দিচ্ছে কে কোথায় আছেন দৌড়ে আসেন… নায়ককে তো মেরে ফেলল। এতক্ষণে তরুণীরা আমাকে ছেড়ে দিয়েছে এবং বীরদর্পে চলেও গেছে। আয়নায় তাকিয়ে দেখি মুখের মেকআপ নষ্ট হয়ে গেছে। সারা মুখে লিপস্টিকের দাগ… এরকমই ক্রেজ ছিল নায়ক রাজ্জাককে ঘিরে। সেজন্য আমার ছবি মানেই ছিল হিট ছবি…

আনন্দ আলো: আপনার জীবনে আপনার স্ত্রীর ভ‚মিকাটা আরেকবার জানতে চাই।

Razzak-Familyনায়করাজ: ল²ীর মতো একটা মেয়ে আমার জীবনসঙ্গী হয়েছে এটাকে আমি মনে করি আল্লাহর অশেষ মেহেরবানী। আমি অনেক ভাগ্যবান সে কারণে ল²ীর মতো এরকম ল²ী বউ পেয়েছি। আমার জীবনে ওর অবদান গায়ের চামড়া দিয়েও শোধ করা যাবে না। সংসার জীবনের শুরুর দিকে অসংখ্যবার আমি হতাশ হয়েছি। ঢাকা থেকে কলকাতায় ফিরে যেতে চেয়েছি। প্রতিবারই ল²ী আমাকে সাহস যুগিয়েছে। অর্থ কষ্টে থাকার পরও বলেছে তুমি ভেঙে পড়ো না। চেষ্টা চালিয়ে যাও। দেখবে আল্লাহ একদিন আমাদেরকে আলোর মুখ দেখাবেন। আমার কাছে ল²ীর কোনো দিনই কোনো ডিমান্ড ছিল না। আমরা যারা চলচ্চিত্রে অভিনয় করি বিশেষ  করে নায়ক-নায়িকার মধ্যে অনেকের ব্যক্তি জীবন বেশ ঝামেলার। যেমন উত্তর কুমারের ব্যক্তি জীবন ছিল অনেক সমস্যায় ভরা। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আমাদের সংসার জীবন আনন্দের সমুদ্রে পরিণত হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে মূলত আমার স্ত্রী ল²ীর কারণেই।

আনন্দ আলো: একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। চলচ্চিত্রের সেই সময় আর এই সময়ের তুলনা কীভাবে করবেন?

নায়করাজ: এই সময় বলতে চলচ্চিত্রে কিছু আছে নাকি? এই সময় নিয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এক সময় আমাদের একটা চলচ্চিত্র পরিবার ছিল। সুখে দুঃখে সবাই এক সঙ্গে থাকতাম। কাজের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা ছিল ঠিকই কিন্তু স্বার্থপরতার মনোভাব ছিল না কারও মধ্যে।

আনন্দ আলো: এ ব্যাপারে আপনার কোনো পরামর্শ আছে?

নায়করাজ: খুবই কঠিন প্রশ্ন। কারণ চলচ্চিত্রের বর্তমান সময়ে কোনো পরামর্শ দেয়ার যোগ্যতা বোধকরি আমার নাই। কারণ আমরা এখন পরস্পরকে শ্রদ্ধা করি না। সহকর্মী, বন্ধুদের খোঁজ রাখি না। চলচ্চিত্র এখন ব্যবসায় রূপ নিয়েছে। সে কারণে যার কোনো মূল্য নাই তাকে মূল্য দেয়া হচ্ছে। যোগ্য মানুষের কোনো মূল্যায়ন হচ্ছে না। এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার।

আনন্দ আলো: পরজন্মে বিশ্বাস করেন?

নায়করাজ: আমি মুসলমান। কাজেই পরজন্মে বিশ্বাস করি না। তবে এটা বিশ্বাস করি আমার মৃত্যুর পর অন্তত ৫০ বছর আমার কথা দেশের মানুষ মনে রাখবে, আমাকে ভালোবাসবে… ঐটাই হবে আমার পরজন্ম।

আনন্দ আলো: কিংবদন্তি অভিনেতা আপনি? কীভাবে নিজেকে মূল্যায়ন করবেন?

নায়করাজ: আমি ব্যক্তি রাজ্জাক মাঝে মাঝে নায়করাজ রাজ্জাকের কথা ভেবে অবাক হই। পৃথিবীর আর কোনো দেশে বোধকরি আমার মতো ভাগ্যবান অভিনেতা নাই। এক সময় ৭ কোটি মানুষ আমাকে চিনত। এখন দেশের ১৭ কোটি মানুষ আমাকে চিনে। আমাকে ভালোবাসে। আমি তো কোনো ভিআইপি নই অথচ এয়ারপোর্টসহ নানা জায়গায় আমি যে সম্মান পাই তা অতুলনীয়। মানুষের ভালোবাসা দেখে আমি মুগ্ধ। এই ভালোবাসার মাঝেই বেঁচে থাকতে চাই।

 

কেন শিরোনাম তাঁর নায়করাজ

Ñঅরুণ চৌধুরী

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে পত্র-পত্রিকায় লেখার কাজ শুরু করি। সংস্কৃতি সাংবাদিকতা প্রিয় বিষয়। স্বাভাবিকভাবে শীর্ষস্থানীয় সাপ্তাহিক চিত্রালীতে যাওয়া-আসা, আড্ডা। সফল সিনিয়র সাংবাদিক নরেশ ভুঁইয়া, হীরেন দে প্রমুখের টেবিলে চা খাই। সিঙ্গারা খাই। বন্ধুবর আব্দুর রহমানের সঙ্গে মাস্তি করি। আর একটা বিষয়ে ক্ষোভও প্রকাশ করে ফেলি মাঝেমধ্যে। সময়টা সত্তর দশকের শেষ ভাগ। ক্ষোভের কারণ, চিত্রালীর সম্পাদকের একটি ভ‚মিকা। আহমদ জামান চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। দারুণ গান লেখেন। লেখেন কবিতা। প্রচুর পড়াশোনা জানা এ মানুষটি নাকি এদেশের একজন সিনেমা অভিনেতার নামকরণ করেছেন ‘নায়করাজ’। এই নামের শোভা তো বাংলা সিনেমার উত্তম কুমারের সঙ্গে যায়। অন্য কেউ না। একদিন কথাটা বলেও ফেললাম জামান ভাইকে। উনি উত্তেজিত না হয়ে বললেন, আমার এ হিসেব সঠিক নাকি তোমাদের ক্ষুব্ধ হওয়াটা ঠিক সময়ই বলে দেবে।

সময়ই বলে দিয়েছে সব। নায়করাজ রাজ্জাকের সমতুল্য এই চল্লিশ বছরে আর একজনও জন্ম নেননি। পরবর্তীতে সাংবাদিকতার পাশাপাশি মূলধারা ছবির সহকারী পরিচালনার কাজে ঢুকে সরাসরি সান্নিধ্য পাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। মানুষ রাজ্জাককে দেখবার সুযোগ হয়েছে। বোঝা সম্ভব হয়েছে মানুষ রাজ্জাকও একজন রাজতুল্য ব্যক্তিত্ব।

অ্যাকশন ছবি, পোশাকী ছবি এবং রোমান্টিক ছবি সব বিষয়েই রাজা হয়ে উঠেছেন মানুষটি। এমন ক্ষণজন্মা পুরুষ যুগে যুগে আসেন না। হঠাৎ আসেন। যার উদাহরণ তিনি নিজে! ইউনিসেফ-এর শুভেচ্ছা দূত হিসেবেও সামাজিক দায়িত্ব পালন করেন তিনি!

 

নিটোল বন্ধুত্ব ছিল আমাদের

Ñসারাহ বেগম কবরী

কবরী রাজ্জাক সাহেবের সঙ্গে আমার সর্বশেষ কথা হয় একটি টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে। তিনি স্টুডিওতে ছিলেন। আমি টেলিফোনে কথা বলি। তিনি বলেছিলেন, অনেক দিন দুজনের দেখা হয় না। আমি তখন ‘চোখ যে মনের কথা বলে’ গানটি গাইলাম একবার। এইটাই তাঁর সঙ্গে আমার শেষ কথা বলা।

যদ্দুর মনে পড়ে, রাজ্জাকের সঙ্গে প্রথম কাজী মাজহারুল আনোয়ারের যোগাযোগ ছবিতে সাইন করেছিলাম। পরে সে ছবিটাতে অভিনয় করা হয়নি। তারপর কাজী জহিরের ময়নামতি চলচ্চিত্রেই মনে হয় প্রথম অভিনয় করি।

রাজ্জাকের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব ছিল। সম্পর্ক ছিল খুনসুটির। সরস ও নিটোল বন্ধুত্ব ছিল আমাদের। চট্টগ্রামে একবার খুব ঝগড়া হয় আমাদের। তারপর অনেক বছর আমরা একসঙ্গে কাজ করিনি। প্রায় ২০ বছর পর আমাদের সন্তান ছবিতে আবার একসঙ্গে কাজ করি।

আমরা তো সব সময় খুনসুটি করতেই থাকি। মানে তাঁর সঙ্গে আমার সব সময় একটা খোঁচাখুঁচি লেগেই থাকত। মতের অমিল হতো। এগুলো এখন মনে পড়ছে আর কী। তিনি বলতেন, ‘এই রাগ করেছেন নাকি?’ আমি বলতাম, ‘এই যাও চুপ, বেশি কথা বলবে না।’

এ বছরের শুরুর দিকে রাজ্জাক যখন অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন আমি তাঁকে দেখতে হাসপাতালে যাই। রাজ্জাকের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলি। রাজ্জাককে হাসপাতাল থেকে বাসায় আনার পর খুব করে বলেছিলেন একদিন বাসায় আসতে। কেন যেন যাওয়া হয়নি। আসলে তাঁর বাসায় যাতায়াতটা আমার একেবারেই ছিল না। একবার বোধ হয় গিয়েছিলাম। রোজ শুটিংয়েই তো দেখা হতো। তাই বাড়িতে যাওয়া-আসা ছিল না।

একবার তাঁর বাসায় গিয়েছিলাম। তখন তাঁর বাসা হলিক্রস স্কুলের ওই দিকে ছিল। ময়নামতি ছবির শুটিংয়ে সাভারে যাওয়ার আগে তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের তখন খুব একটা ভালো বন্ধুত্ব ছিল। তিনি হয়তো বলতেন, ‘ম্যাডাম আপনি ওই দিকে যাচ্ছেন, আমাকে একটু উঠিয়ে নিয়েন।’ আমিও বলতাম, ‘এই আপনি যাচ্ছেন, আমি একলা যাব? আমাকে একটু উঠিয়ে নিয়েন।’ আমাদের মধ্যে এ রকম একটা বিষয় ছিল। রাস্তাঘাটে দেখা হতো, শুটিংয়ে দেখা হতো। তাই তাঁর বাসায় যাওয়াটা একেবারেই হয়ে ওঠেনি।

রাজ্জাক সাহেব যে নেই, সেটা আমি এখনো ভাবতে পারছি না। আমি এখনো ভাবছি, হয়তো কেউ বলবে, ‘এই রাজ্জাকের সঙ্গে একটা প্রোগ্রাম আছে।’ আমি বলব, ‘রাজ্জাকের সঙ্গে কোনো প্রোগ্রাম করবই না।’

তাঁর সঙ্গে কাজ করতে গেলে আমার লাগালাগি হতো। ঝগড়া লাগত। আমি একটা কথা বললে তিনি উল্টোভাবে উত্তর দিতেন। তিনি একটা কথা বললে আমি মানতাম না। ওই বয়সে একটা ছেলে মানুষি ছিল। মানুষের অনুভূতি বিভিন্ন রকমের হয়। আমরা দুজনে আসলে মারামারি করি, কিলাকিলি করি। হ্যাঁ, আমি কিলাকিলির কথাই বলছি। তাঁর সঙ্গে মনের একটা টান আছে। ঝগড়া হয়েছে, ২০ বছর কথা বলি নাই। আবার যখন কাজ করতে গেছি, সে কথা ভুলেও গেছি। রাজ্জাকের চেয়ে আমি বয়সে ছোট, তা সত্তে¡ও আমাদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। এখন বুঝতে পারছি, দুজনেরই কাজের ক্ষেত্রে যে বন্ধন ছিল, তা-ই বোধ হয় কাজ করেছে, একটা শক্ত বন্ধন।

এর মানে এই না যে আমরা দুজন প্রেমিক-প্রেমিকা হিসেবে দুজনকে ভালোবাসি। সেটা ঠিক না। বিষয়টি হলো, কাজের ক্ষেত্রে নিরবধি আমরা চলেছি। বলে না যে, নদী বয়ে যায় নিজস্ব গতিতে। কাজের ক্ষেত্রে সেই নদীটা বেশি সঞ্চারিত হয়েছিল আমাদের মনে। ঝগড়া হলেও একজন আরেকজনকে উপেক্ষা করার কোনো উপায় ছিল না। এটাই হচ্ছে সত্যিকারের বন্ধুত্ব। বন্ধুত্বের বন্ধনটা কতটা গভীর ছিল, তা আজ বুঝতে পারছি। মনে হচ্ছে, আসলেই কি তা-ই? সত্যিই কি রাজ্জাক মারা গেছেন? আমাদের দুজনের মধ্যে নিয়মিত কথা, দেখা হয়তো ছিল না। তারপরও অনুভব করছি বন্ধুত্ব।

কত কথাই তো মনে হচ্ছে আজ। আমরা কখনোই রেস্তোরাঁয় গিয়ে একসঙ্গে খাইনি। আমার বাবা খুব ভালো রাঁধতেন। তো শুটিং শেষে রাজ্জাক আমাদের বাসায় আসতেন। আব্বা বলতেন, ‘বাবাজি একটু খেয়ে যাও।’ রাজ্জাক বলতেন, ‘ইশ্, কাকাবাবু আপনার হাতের রান্না যা মজা।’ তিনি প্রায়ই আমাদের ঢাকার বাসায় আসতেন।

রাজ্জাকের সঙ্গে আমার অলিখিতভাবে বা গোপনভাবে কোনো কিছু ছিল না। যে বন্ধুত্ব হয়েছে, তা আন্তরিকতায় পূর্ণ। স্বার্থ নানা রকম হয়। আমাদেরও স্বার্থ ছিল। কিন্তু সেই স্বার্থ নিষ্পেষিত করতে পারেনি বন্ধুত্বটা। আমাদের দুজনের বন্ধুত্বকে একজন একজনের প্রতি ভালোবাসা-শ্রদ্ধাকে কলুষিত করতে পারেনি, এটাই আজ মনে হচ্ছে।

 

ওর সঙ্গে অনেক দিনের স্মৃতি

Ñসৈয়দ হাসান ইমাম

ওর সঙ্গে আমার স্মৃতি অনেক দিনের। যখন সে প্রথম ঢাকায় এলো, তখন ইকবাল ফিল্মসে ও সহকারী পরিচালক হিসেবে জয়েন করল। জব্বার সাহেবের (আবদুল জব্বার খান) ভাইপো খোকার সঙ্গে রাজ্জাকের ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। আমি সে সময় ইকবাল ফিল্মসের উর্দু ছবি পরওয়ানায় অভিনয় করছিলাম। আমি নায়ক, নাসিমা খান নায়িকা। কামাল আহমেদ ছিলেন পরিচালক। তখন থেকেই আমাদের সম্পর্কের শুরু। এককথায় কি আর সে সব বলা যাবে?

 

তাঁর অহমিকা ছিল না

Ñসোহেল রানা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আজ যে অবস্থানে এসেছে, তাতে তাঁর অনেক বড় ভূমিকা আছে। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু হিসাব করলে আরও কিছুদিন হয়তো তিনি আমাদের মাঝে থাকতে পারতেন। ব্যক্তি হিসেবে তিনি খুবই ভালো মানুষ ছিলেন। বর্তমানে যাঁরা জনপ্রিয় তাঁদের মধ্যে যে অহমিকা দেখা যায়, তা রাজ্জাক সাহেবের মধ্যে ছিল না। আমার থেকে ৮ থেকে ১০ বছর আগে সিনেমায় এসেছেন। অভিনয় নিয়ে আমাদের প্রতিযোগিতা চলত। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল দুর্দান্ত।

 

জনগণের নায়ক ছিলেন

Ñমৌসুমী

তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা। মুক্তিযুদ্ধের আগে বাংলা ছবিকে এগিয়ে নিতে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তাতে সামনের সারিতে থেকে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের নায়কদের নায়ক ছিলেন, জনগণের নায়ক ছিলেন। আমরা যাঁরা অভিনয় করে এ পর্যায়ে এসেছি, তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে এসেছি। আগামী প্রজন্মে যাঁরা সিনেমাতে আসবেন, তাঁর অভাব অনুভব করবেন।

 

তিনি আমাদের মধ্যেই বিচরণ করছেন

Ñশাবনূর

তিনি আমাকে প্রচÐ আদর করতেন। ‘তুই’ করে বলতেন। তাঁর যেকোনো আয়োজনে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। ৭৫তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানের সময় ভেবেছিলেন, আমি দেশে নেই। আমি সেখানে উপস্থিত হয়ে তাঁকে চমকে দিয়েছিলাম। রাজ্জাক সাহেব মারা যাননি। তিনি আমাদের মধ্যেই বিচরণ করছেন। দেখা হলে আমাকে পরামর্শ দিতেন। তাঁর পরামর্শ আমি সারা জীবন মেনে চলব।

 

বাংলা চলচ্চিত্রের অস্থিরতা আরও ঘনীভূত হলো

Ñফেরদৌস

তিনি চলচ্চিত্রের রাজা ছিলেন নায়করাজ রাজ্জাক। কিছুদিন আগে ইউনাইটেড হাসপাতালে এসেছিলাম। এসে দেখি, তিনি এখানে। তাঁর সঙ্গে কথা হলো। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠানে দেখা হলো। তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে প্রথমে বিশ্বাস হয়নি। আগের মতোই গুজব ভেবেছি। বর্তমান সময়ে চলছে চলচ্চিত্র ঘিরে অস্থিরতা। তাঁর এই মৃত্যু তা যেন আরও ঘনীভূত করল।

 

মৃত্যু মেনে নিতে পারছি না

Ñঅপু বিশ্বাস

কোটি টাকার কাবিন দিয়ে আমি অপু বিশ্বাস হয়েছি। সে ছবিতে অভিনয়ের ব্যাপারে রাজ্জাক আংকেলের অবদান ছিল। আমার মা তাঁর অন্ধ ভক্ত। মা যখন জানতে পারেন, আংকেল এই ছবিতে অভিনয় করছেন, তখন বাবার অমতে গিয়েই আমাকে অভিনয় করতে অনুমতি দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, সন্তান আব্রামের কথা যখন প্রকাশ করি, তখন আমার সময়টা ভালো যাচ্ছিল না। রাজ্জাক আংকেল ফোন করে বলেছিলেন, ‘চিন্তা করবি না। আমি এখনো বেঁচে আছি।’ আমার বাবা মারা গেছেন। শ্বশুর আছেন। রাজ্জাক আংকেলও বাবার মতোই ছিলেন। আমি এ মৃত্যু মেনে নিতে পারছি না।

 

অভিভাবককে হারালাম

Ñমিশা সওদাগর

আমাদের চলচ্চিত্রে রাজ্জাক নিজেই একটা চলচ্চিত্র। তাঁর নামের মধ্যে যে ভার, সেটা বহন করা কঠিন একটা কাজ। তাঁকে নিয়ে মন্তব্য করার সাহস আমার কখনো হয়নি। তিনি নিজেই একজন ইনস্টিটিউট। তাঁর মৃত্যুতে আমাদের ইন্ডাস্ট্রির একটা বড় ক্ষতি হয়ে গেল। একজন অভিভাবককে হারালাম। এ ক্ষতি কখনো পূরণ হবে কি না জানি না।

 

রাজ্জাক বেশ খেয়ালি ছিলেন

Ñগাজী মাজহারুল আনোয়ার

সুভাষ দত্তের কাগজের নৌকা  সিনেমার অভিনয়ের ব্যাপারে কথা বলার জন্য গিয়েছিলেন রাজ্জাক। তখনই দেখা তাঁর সঙ্গে। সুভাষ দত্ত আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘ইনি রাজ্জাক, পশ্চিমবঙ্গ থেকে এসেছেন।’ তখন থেকেই পরিচয় ও সখ্য।

তারপর আমি প্রযোজনায় নামি। তখন রাজ্জাক ও কবরীকে নিয়ে আমি ‘যোগাযোগ’ নামে প্রথম ছবি করার উদ্যোগ নিই। কিন্তু পরে আর ছবিটি আমার করা হয়নি। এই নাম নিয়ে আরেকজন ছবিটি করেন। তাই পরের ছবি সমাধি নির্মাণের উদ্যোগ নিই। নায়ক চরিত্রের জন্য প্রস্তাব দিলাম রাজ্জাককে। তিনি বললেন, ‘আপনার ছবিটি এক টানে শেষ করে দেব।’ কথা রেখেছিলেন রাজ্জাক। টানা ২৮ দিন শুটিং করে শেষ করেছিলাম ‘সমাধি’।

তারপর থেকে রাজ্জাকের সঙ্গে কখনো বিচ্ছিন্নতা হয়নি। আমরা বন্ধু হয়ে যাই। আর সুসম্পর্কটা এমন ছিল যে আমার প্রথম ছবিতে কোনো সম্মানী নেননি। জোর করেও দিতে পারিনি। আমার পরের ছবি অনুরোধ-এর জন্য আবার তাঁকে নিলাম। এবার তাঁকে প্রায় দ্বিগুণ সম্মানী দিলাম। রাজ্জাক ওই সময় ১৮-২০ হাজার টাকা সম্মানী নিতেন। আমি দিলাম ৩০ হাজার। অনুরোধ সিনেমার জন্য মোটামুটি অনুরোধ করেই টাকা দিতে হয়েছে রাজ্জাককে।

তারপর আমার প্রযোজিত ১৮টি সিনেমার প্রতিটিতেই প্রধান অভিনেতা ছিলেন রাজ্জাক। ছবি নির্মাণ ও প্রযোজনা করতে গিয়েই তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে যায়।

তাঁর সঙ্গে শুধু চলচ্চিত্রের সম্পর্কই নয়, একটা পারিবারিক সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল আমার। সামনাসামনি আমরা বলতাম ‘আপনি’ করে, কিন্তু আচরণ করতাম ‘তুই’-এর মতো। সম্পর্কটা এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে আমার শুটিং আসার আগে রাজ্জাক আমার বাসায় ফোন করে আমার স্ত্রীকে জানিয়ে দিতেন দুপুরে তিনি কী খাবেন। শুটিং স্পটে এত খাবার দেখে তো আমি অবাক। জিজ্ঞেস করতেই মজা করে বলতেন, আমার বাসা থেকে এসেছে।

বেশ খেয়ালি ছিলেন রাজ্জাক। মন যখন যা চাইত, তা-ই করার চেষ্টা করতেন। যেমন একবার সিলেটে গিয়েছি শুটিং করতে। সঙ্গে রাজ্জাকসহ পুরো দল। হঠাৎ বললেন, ‘আজ শুটিং করব না, আজ পাখি মারব।’ তারপর সিলেটের একটা বিলে পাখি মারলেন পুরো বিকেল। আমরা পুরো ইউনিট বসা। কিন্তু পরের দিন খুব ভোরে উঠে আমার রুমের দরজায় নক করছেন আর বলছেন, ‘চা গরম, এই চা গরম।’ দরজা খুলে দেখি রাজ্জাক। তারপর বললেন, ‘চা খাইতে হবে না! শুটিং আছে তো।’ তারপর বললেন, ‘কালকের বাকি শুটিংটা করব বলেই তো এত ভোরে উঠলাম।’ এই ছিলেন আমাদের প্রিয় অভিনেতা মহানায়ক রাজ্জাক।