এই আমি সেই আমি! -আনিসুর রহমান মিলন

এই আমি সেই আমি! -আনিসুর রহমান মিলন

1227
SHARE
Anisur-Rahman-Milon

তাঁর শুরুটা মঞ্চ দিয়ে। আর্তনাদ থিয়েটারে অভিনয়ে হাতেখড়ি। এরপর পা রাখেন টিভি পর্দায়। চ্যানেল আইতে প্রচারিত ‘রঙের মানুষ’ ধারাবাহিকে অভিনয় করে আলোচনায় আসেন তিনি। একে একে টিভি পর্দায় ‘জয়িতা’, ‘প্রজাপতিকাল’, ‘হাতকুরা’, ‘মধুময়রা’, ‘অতঃপর, ‘শুভাগমন’সহ অসংখ্য দর্শক নন্দিত নাটকে অভিনয় করে নির্মাতাদের আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন এই অভিনেতা। পাঠক, তিনি আনিসুর রহমান মিলন। বর্তমানে বড় পর্দায়ও একজন জনপ্রিয় অভিনেতা অর্থাৎ হিরো। ‘দেহরক্ষী’, ‘পোড়ামন’, ‘ব্লাকমেইল’ ও ‘লালচর’সহ তার অভিনীত নয়টি ছবি ইতিমধ্যে মুক্তি পেয়েছে এবং তা দর্শকনন্দিতও হয়েছে। হাতে রয়েছে প্রায় হাফ ডজন ছবি। মঞ্চে একরকম মিলন, টিভি পর্দায় আরেক রকম অভিনেতা এবং বড় পর্দায় একেবারেই নিজেকে বদলে নতুন এক অভিনেতা হিসেবে তার ভক্তরা তাকে আবিস্কার করেছে। একজন অভিনয়শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিনিয়ত ভাঙ্গছেন, গড়ছেন এবং নতুনভাবে নিজেকে হাজির করছেন। বড়পর্দা ও ছোটপর্দা- দু’জায়গাতেই সমানভাবে অভিনয় করছেন আনিসুর রহমান মিলন। ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময়ের পথচলা, নিজের ভালো লাগা এবং অভিনয়ের ক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিনিয়ত নতুনভাবে তুলে ধরা সহ নানা বিষয়ে আনন্দ আলো’র সঙ্গে কথা বলেছেন আনিসুর রহমান মিলন। উত্তরায় একটি শুটিং হাউজে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন সৈয়দ ইকবাল।

আনন্দ আলো: নতুন কি কাজ করলেন?

আনিসুর রহমান মিলন: ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এর প্রযোজনায় রায়হান খানের পরিচালনায় নির্মিত হচ্ছে চলচ্চিত্র ‘৩১ফার্ষ্ট নাইট’, বজলুর রাশেদ চৌধুরীর ‘বন্ধন’ ইফতেখার চৌধুরীর নতুন ছবি ‘বক্সসার’, আনিসুল হকের গল্প অবলম্বনে স্বপন আহমেদ এর নতুন ছবি ‘তবুও ভালবাসা’ ও দেবাশীষ বিশ্বাস এর ‘মন জ্বলে’ ছবিগুলোর শুটিং করছি। আর ছোটপর্দায় নিয়মিত কাজ করছি। ঈদের বেশ কয়েকটি নাটকে অভিনয় করছি এবার। এরমধ্যে ঈদের জন্য নির্মিত তপু খানের পরিচালনায় ‘গোপনে’ শিরোনামের একটি নাটকে অভিনয় করেছি। নাটকটিতে আমার বিপরীতে অভিনয় করেছেন চিত্রনায়িকা পূর্ণিমা। এছাড়াও চয়নিকা চৌধুরীর পরিচালনায় সিলেটে দুটি নাটকের শুটিং করেছি। ঈদে আরো কিছু কাজ করার কথা রয়েছে।

আনন্দ আলো: আপনি টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্র দু’জায়গাতেই সমানভাবে অভিনয় করছেন। দুই পর্দার মধ্যে পার্থক্যগুলো কেমন মনে হয়?

আনিসুর রহমান মিলন: পার্থক্য তো বেশি দেখি না। তবে পারফরমেন্সের ধরণ দুইক্ষেত্রে ভিন্ন। আমার অভিনীত ইফতেখার চৌধুরীর পরিচালনায় ‘দেহরক্ষী’ ছবিটি যখন রিলিজ হয় তখন বিভিন্ন চ্যানেলে আমার বারোটা ধারাবাহিক প্রচার চলতি ছিলো। তারপরও ‘দেহরক্ষী’র অভিনয়টা আলাদাভাবে নিয়েছেন দর্শক। কারণ বারোটা ধারাবাহিক নাটক ও চলচ্চিত্রের অভিনয়ে ভিন্নতা ছিল। ফিল্মের ক্যানভাস আসলে বড়। অনেক টিভি নাটকে নদী দেখাতে গিয়ে দীঘি দেখিয়েই বোঝানো হয় এটা নদী। কিন্তু ফিল্মে দীঘি দেখালে সেটা আর ফিল্ম থাকবেই না। রিয়েল জায়গাটা ফিল্মে লাগবে। এটাই দুটোর মধ্যে পার্থক্য। আরেকটা বিষয় হলো অভিনয়ে ভিন্নতা আনা। আমি একসময় মঞ্চে নিয়মিত কাজ করতাম। যখন টিভি নাটকে অভিনয় শুরু করি তখন কিন্তু মঞ্চের সেই অভিনয়টা টিভি মিডিয়ায় করলে চলতো না কিংবা দর্শক তা পছন্দ করতেন না। কেননা টেলিভিশন মিডিয়া ক্লোজ মিডিয়া এবং ইরেজ মিডিয়াও বটে। প্রতিনিয়ত বদলায়। তাই টিভি মিডিয়ায় নিজের অভিনীত চরিত্রের সঙ্গে প্রতিনিয়ত নিজেকে বদলাতে হয়েছে। আবার যখন বড় পর্দায় অভিনয় শুরু করলাম তখনও কিন্তু নিজেকে ভেঙ্গেছি। যেমন নাটকে কোনো চিৎকারের দৃশ্য থাকলে সেটা নাটকের পর্দা এবং ড্রয়িং রুমের ব্যাপ্তিকে মাথায় রেখে চিৎকার দিতে হয়। আবার চলচ্চিত্রে যখন চিৎকারের দৃশ্য আসে তখন সিনেমা হলের কথা চিনত্মা করেই অনেক জোরে সেই চিৎকারটা দিতে হয়। অর্থাৎ পরিমিত বিষয়টা কোথায় কেমন হবে সেটা একজন অভিনেতা হিসেবে মাথায় রাখতে হয়।

আনন্দ আলো: একসাথে ছোট ও বড়- দুই পর্দায় সাফল্য আসে না বলে অনেকে মনে করেন। সে ক্ষেত্রে আপনি দুই মাধ্যমেই কাজ করছেন। বিষয়টিকে কিভাবে দেখেন?

আনিসুর রহমান মিলন:  সাফল্য আসে না এটা যারা বলেন তাদের সাথে আমি একমত নই। ২০১২ তে আমার প্রথম ছবি ‘দেহরক্ষী’ মুক্তি পায়। আর শেষ ছবি ‘লালচর’ মুক্তি পায় এই বছরে। মাঝখানে তিন বছরে নয়টি ছবি মুক্তি পেয়েছে। পাশাপাশি টিভি পর্দায় সমানভাবে অভিনয় করে যাচ্ছি। কই দর্শক তো বিরক্ত হচ্ছে না। আমার ছবি মুক্তি পেলে হলে গিয়ে দর্শক ছবি দেখছেন। এটা কী সাফল্য নয়? আমি মনে করি পর্দাটা কোনো বিষয় নয়, মেধা এবং কাজের গুণটাই আসল কথা। ভাল কাজ করলে অবশ্যই সাফল্য আসবে। আমার আগেও অনেকে দুই পর্দাতে সমানতালে কাজ করে সফলতা পেয়েছেন। আবার অনেকেই পাননি। ঐযে আমি বললাম কোন পর্দায় কেমন লুক, অ্যাকশন, ডায়লগ কিংবা ড্রেসআপ করতে হবে সেটা জানা জরুরি। প্রপার জায়গায় প্রপার ট্রিটমেন্টটা লাগবে। তাহলেই দর্শক হতাশ হবে না।

আনন্দ আলো: যেহেতু দুই পর্দায় কাজ করছেন তাই শিডিউল মেইনটেইন করতে সমস্যা হয় না?

Anisur-Rahman-Milon-1আনিসুর রহমান মিলন: এই ব্যাপারটা আসলে নিজের কাছে। শিডিউল মেলাতে একটু ঝামেলায় পড়তে হয় বটে। কিন্তু তবুও চেষ্টা তো করতে হবে। চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের সময় বড় বড় শিডিউল থাকে। আর নাটকে ছোটছোট শিডিউল। মাসের ২০ দিন ফিল্মে। আর ১০ দিন নাটকের জন্য রাখি। এরমধ্যে দু’একদিন তো শুটিং মিস হয়। এভাবেই আপাতত চলছে।

আনন্দ আলো: বড় পর্দায় আপনার শুরুটা এন্টি হিরো হিসেবে। এরপর বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে আপনাকে দেখা গেছে। আপনি নিজে কোন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে আনন্দ পান?

আনিসুর রহমান মিলন: আমাদের দেশের ফিল্মে তিনটি শব্দ বেশ প্রচলিত ‘নায়ক’ ‘নায়িকা’ ও ভিলেন। পৃথিবীর কোথাও এ শব্দগুলো প্রচলিত না। নায়ক যে চরিত্রটা করবে সেটা সেন্ট্রাল ক্যারেক্টার। কিন্তু আরো অনেক ধরনের ক্যারেক্টারকে যে সেন্ট্রাল ক্যারেক্টার করা যায় সেই ধারণা বাংলাদেশে নেই। এখানে মূল চরিত্র করা মানে নায়ক হয়ে যাওয়া। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এমন ঘটনা সাধারনতঃ বিরল- যে কেউ এন্টি হিরো হিসেবে শুরু করে পরে আবার হিরোর ক্যারেক্টার করেছে এবং তার চাহিদা বেড়েছে। সেই পয়েন্ট অব ভিউ থেকে যদি বিচার করি দর্শক আমাকে সত্যি ভালোবাসেন। তবে যেহেতু এখানে আমি প্রতিষ্ঠিত হতে চাইছি তাই ‘চিত্রনায়ক’ শব্দটা নামের সঙ্গে যোগ করতে চাই। কারণ বাংলাদেশে এই কথাটাই প্রচলিত। এর সঙ্গে যোগ করতে চাই ‘অ্যাক্টর হিরো’। আরেকটা কথা না বললেই নয়- আমাদের এখানে পাঁচটি গান, কয়েকটি মারামারির দৃশ্য কিংবা আইটেম সং না থাকলে সেটাকে বাণিজ্যিক ফিল্ম বলা হয় না। পৃথিবীর কোথাও এমন কথা নেই। এক ছবি এক মিনিটেরও হতে পারে। বিজ্ঞাপনও কিন্তু সিনেমা। এখন কথা হচ্ছে কে কিভাবে কতোটা সময় নিয়ে গল্পটা বলছেন বা বলবেন। তবে টিভি মিডিয়া থেকে সবাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এসে যে ভালো করেছেন তা বলা যাবে না। সেটা হতে পারে নায়ক-নায়িকা কিংবা নির্মাতা। আমার মতে, যার যোগ্যতা আছে সে যেকোনো ভাবেই উঠে আসবে।

আনন্দ আলো: আজকের আনিসুর মিলনের অনেক জনপ্রিয়তা। একটা সময় ছিলো যখন এই জনপ্রিয়তা ছিলো না। কেউ চিনতোও না আপনাকে। তখনকার মিলন আর এখনকার মিলনের মধ্যে পার্থক্যটা কেমন চোখে পড়ে?

আনিসুর রহমান মিলন: (মুচকি হেসে) সময়ের সঙ্গে আসলে মানুষের অনেক কিছুই বদলায়। ছোটবেলা থেকে মঞ্চের মাধ্যমে আমার অভিনয়ের সঙ্গে বসবাস। অনেক স্ট্রাগল করেছি জীবনে। আমার গুরু দেশের নামকরা অভিনেতা শহীদুল আলম সাচ্চু। তিনি শিখিয়েছেন অনেক কিছু। এখনো নানান সময় নানান পরামর্শ দেন। তারুণ্যদীপ্ত একটা সময় কাটিয়েছি মঞ্চে। সেটা অনেক বড় ইতিহাস। হ্যাঁ, এটা ঠিক যখন মঞ্চে কাজ করি কিংবা টিভি মিডিয়ায় নতুন কাজ শুরু করি তখন আজকের মতো জনপ্রিয়তা ছিলো না। আজকের মিলন আর আগেকার মিলনের মধ্যে সবচেয়ে বড় যেই পার্থক্যটা আমি দেখতে পাই তা হলো কমিটমেন্টের। কথাটা শুনলে অনেকেই হয়তো আঁতকে উঠবেন। কিন্তু এটাই সত্যি। একসময় সকলের কথা রাখতে পারতাম কিন্তু এখন সেটা পারছি না। নিজের এই পার্থক্যটা আমার বেশ চোখে পড়ে। কতো মানুষের কতো আবদার আমাকে ঘিরে আমি তো সেটা রাখতে পারি না। এই বিষয়টাও খারাপ লাগে। তবে মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছি বেশ। এমনকি একসময় যেই সিদ্ধানত্মটা নিতে বেশ সময় লাগতো কিংবা দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকতাম সেটা এখন আর হয় না। দেখা গেছে, একসময় অনেক সিদ্ধানত্মই ভুল নিতাম। কিন্তু এখন চটজলদি একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধানত্ম নিতে পারি।

আনন্দ আলো: ইদানিং চলচ্চিত্র নির্মাণে মুন্সিয়ানা কেমন চোখে পড়ছে?

আনিসুর রহমান মিলন: নির্মাতাদের চিনত্মার ক্ষেত্রে বেশ পরিবর্তন এসেছে। নান্দনিক চিনত্মার প্রকাশ ঘটেছে। আট-দশ বছর আগে ইন্ডাস্ট্রিতে বিকৃত রুচির মানুষ ছিল যারা চলচ্চিত্রকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। এখন নতুন নির্মাতাদের রুচির পরিবর্তন হয়েছে। অনেক কিছু বদলে গেছে। গল্প ভাবনায় পরিবর্তন এসেছে। নির্মাণে নতুনত্ব এবং পরিচ্ছন্নতা এসেছে।

আনন্দ আলো: আপনার অভিনয়ে আসার ইচ্ছাটা কিভাবে হলো?

আনিসুর রহমান মিলন: আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমার এক চাচা দেশের বাইরে যান। আমিও তার সাথে এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে ভিতরে ঢুকতে দেয়নি বলে তখন রাগ করেছিলাম। বাসায় ফিরে জেদ করলাম বড় হয়ে বিমানবন্দরে কাজ করবো। যাতে আমি অবলীলায় বিমান বন্দরে ঢুকতে পারি। সেটা ইমোশনাল জায়গা থেকে ভেবেছিলাম। সময়ের সাথে সাথে সেই ইচ্ছেটা মরে গেছে। কিন্তু অভিনয়ের প্রতি যে আগ্রহ কৈশোরেই মনে ঢুকেছিলো সেটি আর পিছু ছাড়েনি। ক্লাস সিক্স থেকেই আমি মঞ্চ নাটক করি। তারপর পড়াশোনা শেষ করে চাকুরি করেছি। ব্রিটিশ কাউন্সিলে ডেমোক্রেসি ওয়াচের একটা প্রজেক্ট দেখতাম। পরে একটা ব্যাংকে চাকুরি করেছি। সেখানে মন কেন বসবে? আমি বুঝতে পারছিলাম এসব কর্পোরেট কাজ-কারবার আমার জন্য নয়। অভিনয়ই আমার জায়গা। অপেক্ষা ছিলো। পরিশ্রম ছিলো। একসময় সুযোগ এলো। তারপর থেকেই চলছি আজকের এই আমি….