Home মুখোমুখি উৎসব আয়োজনে নাটক

উৎসব আয়োজনে নাটক

SHARE

সৈয়দ ইকবাল

ঈদ উপলক্ষে বাংলাভিশনে নাট্য নির্মাতাদের নিয়ে আড্ডা ফরমেটে একটি অনুষ্ঠান প্রচার হয়েছে। চ্যানেলটির অনুষ্ঠান প্রধান শামীম শাহেদ ‘উৎসব আয়োজনে নাটক’ শিরোনামের অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নাট্যনির্মাতা গিয়াসউদ্দিন সেলিম, মাসুদ সেজান, অনিমেষ আইচ, কৌশিক শংকর দাস, সাগর জাহান, নাট্যকার বৃন্দাবন দাস, পান্থ শাহরিয়ার ও শফিকুর রহমান শানৱনু। অনুষ্ঠানে তারা উৎসব আয়োজনে টিভি নাটক নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি বর্তমান টিভি মিডিয়ার অবস্থা এবং দর্শক চাহিদা অনুযায়ী অনুষ্ঠানের বিষয়ে আলোচনা করেন। শুরুতে নিজেদের ব্যসৱতা নিয়ে কথা বলেন সবাই। কেউ ব্যসৱ সিরিয়াল লেখা নিয়ে আবার কেউবা ব্যসৱ খন্ডনাটকের শুটিং নিয়ে। আলোচনার এক পর্যায়ে প্রথম টেলিভিশন দেখা কিংবা তা নিয়ে ছেলেবেলার স্মৃতিচারণ করেন সকলে শুরুতেই শামীম শাহেদ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ছোটবেলায় আমাদের পাড়ায় প্রথম একজন লোক টেলিভিশন কিনে আনার সময় ছিনতাইকারী সেটি ছিনতাই করে নিয়ে যান। বেচারা টিভি সেটটি কিসিৱতে কিনেছিলেন। টিভি না দেখতে পেরেও তিনি সেটির কিসিৱ শোধ করেছেন। শামীম শাহেদের এমন কথায় সবাই হো হো করে হেসে ওঠেন। বৃন্দাবন  দাস টেলিভিশন নিয়ে স্মৃতিচারন করে বলেন, আমাদের বাড়িতে প্রথম সাদাকালো একটি টিভি আসে যেটির ছবি আসতো কিন্তু শব্দ ছিলোনা। তারপরও বাড়িতে ঐ নিঃশব্দ ছবি দেখার জন্য মানুষের উপচেপড়া ভিড় ছিলো। কৌশিক শংকর দাস খুব মজার একটি ঘটনা তুলে ধরেন। তিনি ছোটবেলায় সাদাকালো টিভি দেখে তাঁর মাকে প্রশ্ন করতেন সবাইকে খালি চোখে রঙ্গিন দেখা যায় কিন্তু টিভিতে এমন সাদাকালো দেখায় কেনো। বাড়ির সবাই তার এমন প্রশ্নে বেশ হাসাহাসি করতো। পান্থ শাহরিয়ার তার টিভি দেখা নিয়ে স্মৃতিচারণ করার সময় বলেন, আমাদের বাসায় একবার সোফা কেনা হয়েছিল, তখন আমি আব্বাকে বলেছিলাম এবার টিভি কিনলেই আমরা বড়লোক হয়ে যাবো। কারণ তখন বড়লোকদের বাসায়ই শুধু টিভি থাকতো। ১৯৭৬ সালে প্রথম টেলিভিশন  দেখার স্মৃতির কথা জানান গিয়াসউদ্দিন সেলিম। সেবছর বক্সার মোহাম্মদ আলীর একটি খেলা দেখার কী যে আপ্রান চেষ্টা ছিলো তাদের। এন্টেনায় থালা-বাসন  লাগিয়ে ঝিরঝির করা টিভিতে সেই খেলাটি তিনি দেখেছেন বলে জানান। সাগর জাহান টেলিভিশন দেখা নিয়ে একটু মজার বিষয় শেয়ার করেন। বিটিভিতে এক সময় স্পাইডারম্যান, ম্যাকগাইভার প্রচার হতো। তখন বাজারে বিভিন্ন চকোলেটের সাথে স্পাইডারম্যান ও ম্যাকগাইভারদের ষ্টিকার পাওয়া যেতো। আমার তখন ধারনা ছিলো এমন স্টিকার হাতে লাগালে আমিও তাদের মতো হতে পারবো। আর শফিকুর রহমান শানৱনু তার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, আমি এক ঘন্টা পড়লে মা আমাকে এক ঘন্টা টিভি দেখতে দিতেন এটাই আমার টিভি দেখার স্মৃতি। অনিমেষ আইচ ছেলেবেলায় বাড়িওয়ালার বাসায় টিভি দেখার স্মৃতিচারন করেন। আর মাসুদ সেজান ছেলেবেলায় বাড়ির সবাই মিলে একসাথে টিভি দেখার বিষয় উল্লেখ করেন।

আড্ডার এক পর্যায়ে শামীম শাহেদ এই সময়ে টিভি দেখার আকর্ষন প্রসঙ্গে বলেন, বিটিভির একক সময়ে মানুষের মাঝে টেলিভিশন দেখার যে প্রবনতা, আগ্রহ কিংবা আকর্ষণ ছিলো, তা কী এখন আছে? এমন প্রশ্নে প্রথমে পান্থ শাহরিয়ার বলেন, আগের চাইতে টিভি দেখার  আকর্ষণ সত্যিই কমেছে। সেটার অনেক কারন আছে। তবে আগে একটি মাত্র টিভি চ্যানেল ছিলো আর এখন অনেক টিভি চ্যানেল। তার উপর বিদেশী চ্যানেলের আধিপত্য তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে দর্শক ভাগ হয়ে গেছে। এখন প্রায় সব চ্যানেলেই একই ফরম্যাটের অনুষ্ঠান প্রচার হয়। ফলে দর্শক অনুষ্ঠানে নতুনত্ব পাচ্ছে না। অনুষ্ঠানে কোনো ভিন্নতা নেই।

সাগর জাহান পান্থ শাহরিয়ারের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। গিয়াসউদ্দিন সেলিম বলেন, খেলার চ্যানেল থেকে শুরু করে সব ধরনের টিভি চ্যানেলই আমি দেখি। আমার কাছে টেলিভিশন দেখার আকর্ষন আছে।

আড্ডায় প্রসঙ্গক্রমে শামীম শাহেদ ঈদ আয়োজনে টিভি দেখার কথা তোলেন। কৌশিক শংকর দাস বলেন, আমি ঈদে তালিকা করে টিভিতে নাটক দেখে থাকি। কোন চ্যানেলে কোন নাটক প্রচার হবে তা আগে জানার চেষ্টাকরি। কারন যেহেতু আমি এই সেক্টরে কাজ করছি তাই কে কি বানাচ্ছেন সেটা দেখি এবং নিজের বিনোদনের জন্যও দেখি। তবে নাটক কিংবা অনুষ্ঠানে আগের মতো মুগ্ধতা পাই না।

অনিমেষ আইচ বলেন, চ্যানেল গুলোতে অনেক নাটক প্রচার হয়। তা দেখার চেষ্টা করি। তবে অতি সন্ন্যাসিতে গাঁজন নষ্টের মতো আমাদের টিভি নাটকের অবস্থা। এতো এতো নাটকের ভীড়ে অনেক ভালো নাটক হারিয়ে যাচ্ছে।

বৃন্দাবন দাস বলেন, এই যে অনেক সময় বিভিন্ন টিভি চ্যানেল থেকে বলে দেয়া হয় অমুকের নাটক দেখে, তমুকের নাটক দেখে না। এমন ধরনের নাটক দর্শক দেখতে চায় না, ঐরকম হলে দেখবে এই সিদ্ধানৱগুলো আসলে কারা নিচ্ছেন? মাসুদ সেজান বৃন্দাবন দাসের কথার সঙ্গে মিল রেখে বলেন, গণমাধ্যমের একটা দায়িত্ব আছে। কেনা আর বেচা নয়। গণমানুষের জন্য সঠিক বিনোদন দেয়া গণমাধ্যমেরই কাজ।

গিয়াসউদ্দিন সেলিম বলেন, আমার অবজারভেশনে একটা জিনিস দেখেছি তাহলো ঈদের ৫/৬ দিনের টিভি অনুষ্ঠানমালায় প্রচারিত নাটক দর্শক দেখতে চায়। এমনকি যে সারাবছর টিভি দেখে না সেও ঈদের সময় টিভি দেখতে চায়। গত দুই বছর আগেও দেখেছি চ্যানেলের অনুষ্ঠান বিভাগ থেকে শুরু করে নির্মাতা ও নাট্যকারদের ভাবনায় নাটক নির্মাণ হতো। এবছর দেখলাম টেলিভিশনের নাটক অনেক ক্ষেত্রে চ্যানেলওলাদের হাতে নেই। এজেন্সির হাতে চলে গেছে। এজেন্সি এখন ডিসাইড করে দিচ্ছে কাকে দিয়ে নাটক বানাবে। আর্টিষ্ট কে কে থাকবে। এটা তারা করছেন কারণ বিজ্ঞাপনের বাজারটা তাদের হাতে। অথচ যে মানুষগুলো মঞ্চ করে শিল্পকে লালন করে যাচ্ছেন তার সিদ্ধানেৱর কিংবা ভাবনার কোনো মূল্য নেই। নাটক এখন বিজ্ঞাপনদাতাদের হাতে বন্দি।

গিয়াসউদ্দিন সেলিমের কথা শেষ হতেই শামীম শাহেদ বলেন, গত কয়েক বছরে আমি যদি শুধু বাংলাভিশনের কথা বলি তাহলে বলবো ভালোমানের নাটকগুলো বিভিন্ন এজেন্সি থেকেই এসেছে। ঈদে ৬/৭ দিন ধরে অনুষ্ঠান প্রচার হওয়া প্রসঙ্গে সাগর জাহান বলেন, ঈদে মানুষ বিনোদন চায়। তাই এভাবে অনুষ্ঠান প্রচার হতেই পারে। আমাদের নাটক দর্শক দেখে। অনেক ভালো ভালো প্রোডাকশন তৈরি হয়। এখন সেটা প্রপারলি দর্শককে দেখানোর দায়িত্ব টিভি চ্যানেলের।

পান্থ শাহরিয়ার বলেন, অনেক টিভি চ্যানেলই ঈদে নাটক মানে কমেডি নাটক চায়। এটা কেনো বুঝতে পারি না। কমেডি নাটক ছাড়া কি বিনোদন হয় না?