Home প্রতিবেদন ঈদের মঞ্চ নাটক কেমন হলো রিজওয়ান?

ঈদের মঞ্চ নাটক কেমন হলো রিজওয়ান?

SHARE
Moncho

প্রথম কথা, উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের ক্ষেত্রে এটি একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন। পবিত্র ঈদ বাংলাদেশের মানুষের কাছে প্রধানধর্মীয় উৎসব। এই উৎসব উপলক্ষে নতুন সিনেমা মুক্তি পায়। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে নতুন নতুন টিভি নাটকের মেলা বসে। বেড়াতে যাবার ধুম লেগে যায়। আর তখন শুধুই ¤্রয়িমাণ, নিশ্চুপ থাকে নাটকপাড়া, নাটকের মিলনায়তন। অথচ ঈদেও নাটকপাড়া সরব হয়ে উঠতে পারে। সিনেমার মতো মঞ্চ নাটকের প্রতিও দর্শককে আগ্রহী করে তোলা যেতে পারে। এমন নান্দিনিক ভাবনারই বাস্তব প্রতিফলন ঘটলো এবার ঢাকার আধুনিক মঞ্চপাড়া-শিল্পকলা একাডেমিতে।

নাটবাঙলার আয়োজনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সহযেগিতায় ব্যতিক্রমী এই নাট্য আয়োজনের রূপকার ছিলেন বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব সৈয়দ জামিল আহমেদ। কাশ্মিরি বংশোদ্ভ‚ত মার্কিন কবি আগা শাহিদ আলী রচিত ‘রিজওয়ান’ নামের একটি নিরীক্ষাধর্মী নাটকের পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন জামিল আহমেদ। ১লা সেপ্টেম্বর শিল্পকলা একাডেমির পরীক্ষণ থিয়েটার হলে নাটকটির ১০ দিন ব্যাপি মঞ্চায়ন শুরু হয়। প্রতিদিন বিকেল ৪টা ও রাত ৮টায় নাটকটি দুইবার মঞ্চস্থ হয়েছে। পবিত্র ঈদের দিনেও যথারিতি দুটি শো হয়েছে। মঞ্চ নাটকের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের প্রতি দর্শকের ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। ঈদের দিনও দর্শক ভিড়ে মিলনায়তন পূর্ণ ছিল। দর্শকদের মধ্যে অধিকাংশরাই ছিলেন বিভিন্ন নাট্য সংগঠনের কর্মী। শুধু ঢাকা নয় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নাট্যকর্মীরা নাটকটি দেখার জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, রাজধানীর অভিজাত পাড়ার অনেক পরিবারকেও নাটকটির দর্শক হিসেবে দেখা গেছে। যারা সাধারণত মঞ্চ নাটকের প্রতি খুব একটা আগ্রহ দেখান না তারাও ঈদের ছুটিতে শিল্পকলার আঙ্গিনায় এসেছিলেন নাটকটি দেখার জন্য। মঞ্চ নাটকের ক্ষেত্রে এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের ব্যাপারে উদ্যোক্তাদের প্রতি সকল দর্শকই কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। সবারই অভিন্ন মন্তব্য ছিল এরকমÑ ঈদ উৎসবে নতুন সিনেমা মুক্তি পায়, টিভির জন্য নতুন নতুন নাটক বানানো হয়। কাজেই মঞ্চের জন্যও এমন নতুন নাটক চাই।

উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে একটি ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। ব্যাখ্যাটি এরকমÑ “ঈদ-উৎসবকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের নগরে-গ্রামে বিপুল সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্মিলনের সাড়া জাগে। এ দুটি উৎসবের সাংস্কৃতিক আলোড়ন বাংলাদেশের জনজীবনে একটি বলিষ্ঠ অর্থনৈতিক গতিশীলতাও তৈরি করে। বিশেষত, সাংস্কৃতিক বিনোদনের ক্ষেত্রে, নাগরিক ডিজিটাল কালচারাল-ইন্ডাস্ট্রির বিনোদন-বাজারে এসময় বিপুল অর্থলগ্নি ঘটে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশি মুসলমানের এ দুটি ধর্মীয় উৎসব কেবল মঞ্চনাট্যে অন্ধকার টেনে আনে। অথচ, এ সময়, এ উপলক্ষে, ঢাকায় আসা প্রবাসী পর্যটকসহ, ঢাকায় থেকে যাওয়া বিপুল জনগোষ্ঠী বিনোদনের খোঁজে বাণিজ্যিক সিনেমা হল, সিনেপ্লেক্সসহ নানা অভিজাত বিনোদন- কেন্দ্রকে রীতিমতো ‘হাউজফুল’ উপহার দেয়। তাই, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মূলধারার চর্চা ও গবেষণা সংগঠন ‘মনন’ ও তার নাট্যবিভাগ ‘নাটবাঙলা’ মনে করে, সাময়িক যানজটমুক্ত বিস্তৃত ঢাকার মানুষকে ‘উৎসব- কেন্দ্রিক’ মঞ্চনাট্য ধারার সঙ্গে যুক্ত করে নেবার সবচেয়ে কার্যকর সময় এই ঈদ-উৎসব। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার- এই পরিচিত, আপ্ত শ্লোগানকে সত্যিকার তাৎপর্য দিতে, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক-সামাজিক উৎসবগুলোর বিশুদ্ধ সাংস্কৃতিক সহযোগী হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের মঞ্চনাট্য। ঈদের সময় অপরাপর বিনোদনকেন্দ্রগুলোর মতো ঢাকাসহ দেশের সকল ‘নাট্যমঞ্চ’ সুস্থ সাংস্কৃতিক আবাহনের ভরকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।”

উদ্যোক্তাদের এই ধারণার সঙ্গে আমরাও একমত পোষণ করছি। উৎসব কেন্দ্রীক ব্যতিক্রমী আয়োজনের মাধ্যমে মঞ্চ নাটককে এভাবে উদ্ভাসিত করার একাধিক প্রয়াস শুরু হতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে একটা কথা থেকেই যায়। বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? নাট্যগুরু জামিল আহমেদ ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছেন বলেই মঞ্চ নাটক সংশ্লিষ্ট প্রায় সকলেই বিষয়টির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। মঞ্চ কর্মীরা দলে দলে নাটকটি দেখতে গেছেন। ধরা যাক, একজন উদীয়মান নবীন নাট্যকর্মী এ ধরনের একটি উদ্যোগ নিতে চান, ঈদেই শিল্পকলায় ১০ দিনের নাট্য আয়োজনে যুক্ত হতে চান কোনো নবীণ নাট্যদল। তার বা তাদের প্রতি আদৌ কি আমরা আগ্রহ দেখাব আমরা? দলে দলে দেখতে যাব কি তাদের নাটক? এক্ষেত্রে নানা ধরনের বিতর্ক হতে পারে। আমরা সে বিতর্কে মোটেই যেতে চাই না। মঞ্চ নাটকের ক্ষেত্রে একটি সুন্দর উদ্যোগ শুরু হলো। এটি যেন অব্যাহত থাকে সে ব্যাপারে সকলের আন্তরিকতায় জরুরি। ঢাকার শিল্পকলার মতো সারাদেশে বিশেষ করে জেলা শহরে ঈদ উৎসব সহ অন্যান্য উৎসবে এ ধরনের নান্দনিক উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে অবশ্য আর্থিক বিষয়টি খুবই জরুরি। জানা গেছে ঈদের মঞ্চ নাটক ‘রিজওয়ান’ মঞ্চায়ন বাবদ ২০ লাখেরও বেশি অর্থ খরচ হয়েছে। অর্থ ছিল বলেই এ ধরনের একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন সম্পন্ন করা গেছে। জেলায় জেলায় এ ধরনের আয়োজনেও অর্থনৈতিক ভিত্তি দরকার। নাট্যগুরু জামিল আহমেদের প্রতি আমাদের অগাধ শ্রদ্ধা জানাচ্ছি ‘রিজওয়ান’ এর মাধ্যমে আমাদের নাটক পাড়ায় নতুন ভাবনা ছড়িয়ে দেয়ার জন্য।

নন্দিত নাটরূপকার-নাট্যতাত্তি¡ক অধ্যাপক  ড. সৈয়দ জামিল আহমেদের পরিকল্পনা ও নির্দেশনা ‘রিজওয়ান’ মঞ্চায়নের ভিত্তিমূল। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী নাট্য-আঙ্গিক নিয়ে কাজ, এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা এবং নাগরিক- মঞ্চে দেশজরীতির নাট-প্রয়োগের পথিকৃৎ সৈয়দ জামিল আহমেদ। বাংলাদেশের মঞ্চে ১৯৭৯ সাল থেকে কাজ শুরু করে অল্প সময়ের ভিতর দেশি- বিদেশি নাট্যকৌশল আহরিত মেধাবী ও শ্রমশীল উদ্ভাবনী- চিন্তার প্রয়োগ ঘটিয়ে তিনি দেশের পথদেশনাদায়ী সৃজনশীল মঞ্চ ও আলোক পরিকল্পনাকার হয়ে ওঠেন। রবীন্দ্রনাথের অচলায়তন, রক্তকরবী এবং চিত্রাঙ্গদা; সেলিম আল দীনের কিত্তনখোলা, কেরামতমঙ্গল; মমতাজউদ্দীন আহমদের সাত ঘাটের কানাকড়ি; এস এম সোলায়মানের এই দেশে এই বেশে; শেক্সপিয়রের দি টেম্পেস্ট; বের্টোল্ড ব্রেখট-এর দি রাইজ এন্ড ফল অব দ্য সিটি অব মাহাগনি এবং দ্য মেজারস্ টেকেন; কলকাতায় ইউরিপিদিসের ইফিজিনিয়া ইন টরিস এবং গুড উমেন অব সিজুয়ান তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজ। সেলিম আল দীনের চাকা নাটকের ইংরেজিÑ অনূদিতরূপ ঞযব ডযববষ এবং হিন্দি ভাষারূপ পাহিয়ে, পালাগানের আঙ্গিকে কমলা রাণীর সাগর দীঘি, পদ্মাপুরাণের রূপান্তর বেহুলার ভাসান, সংযাত্রার আঙ্গিকে সং ভং চং দর্শক-সমালোচক- বোদ্ধামহলে দারুণ সমাদৃত হয়। মঞ্চে তাঁর বিপুল কাজের মধ্যে অনন্য হয়ে আছে মীর মশাররফ হোসেনের আখ্যান অবলম্বনে ছয় ঘণ্টার মহাকাব্যিক প্রয়োজনা বিষাদ সিন্ধু। রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য পরিষদ ও নৃত্যনাট্য শ্যামা অবলম্বনে দুঃসাহসী নিরীক্ষাধর্মী নাট্য শ্যামার উড়াল কলকাতায় মঞ্চস্থ হয় ২০১২ সালে। যা-এখনও, এ জাতীয় নির্মাণ সাফল্যের মাইলফলক। বাংলাদেশে একাডেমিক প্রয়োজনার বাইরে প্রায় দুই যুগ ধরে তিনি মঞ্চের প্রয়োজনায় সম্পৃক্ত হননি। ‘নাটবাঙলা নাট্যোৎসব’ পরিবেশনা রিজওয়ান এর মাধ্যমে এই নাটরূপকার দীর্ঘবিরতি শেষে ফিরছেন বাংলাদেশের দর্শকের মঞ্চে।

আবারও অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জামিল আহমেদের প্রতি। নাটকের অভিনেতা, অভিনেত্রী যথাক্রমেÑ তিতাস জিয়া, মহসিনা আক্তার, এনাম তারা সাকী, মিতালী দাশ, সোহেল রানা, সুশান্ত কুমার সরকার, সাজিদুর রহমান, আব্দুর রহিম খান, সাইফুল ইসলাম মÐল, অভি প্রামাণিক, কৌশিক বিশ্বাস, রাব্বী শেখ, আদনান অভি, তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী, ইভানা শারমীন মেঘলাকেও অভিনন্দন। মঞ্চ নাটকের একটি নতুন ভাবনার সঙ্গে তারা যুক্ত হতে পেরেছেন।

রিজওয়ান এর কাহিনী সংক্ষেপ অনেকটা এরকমÑ ধর্মান্ধতার কবলে ছিন্নভিন্ন কোনো এক ভ‚খÐের বিপর্যস্ত মানবতার কথা। নারী ও শিশুদের কথা। ‘রিজওয়ান-ফাতিমা’ নামের দুই ভাই- বোনের স্মৃতি-স্বপ্ন, বিয়োগ-বিচ্ছেদের কথা। ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন, যুদ্ধ ও সন্ত্রাস-মানবতাবিরোধী বিচিত্র নির্মমতার শিকার ঘর ও পরিবারহীন মানুষের জীবন ও সংগ্রামের কথা রিজওয়ান-এর আখ্যানভাষ্য। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অধিবাস্তব এক সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে চরিত্র ও ঘটনার ত্রিমাত্রিক প্রতীকী-সংযোগ ‘রিজওয়ান’-এর নাট্যভাষা। অস্থির-আশঙ্কাজনক ধর্মীয়-সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী সকল জাতিগোষ্ঠীর প্রতি প্রকৃত মানবিক আত্মত্যাগের সাংস্কৃতিক আহŸান-রিজওয়ান: এই দুনিয়ায় যদি কোনো জান্নাত থেকে থাকে, তবে সে-জান্নাত এই মাটিতে, এই মাটিতে, এই মাটিতে। ‘রিজওয়ান’ নাট্যের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘রিজওয়ান’-এর এই মানবিক মাটির ডাকই বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতিতে আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গীকার।

কেমন হলো রিজওয়ান? যদি এই প্রশ্ন কেউ করতে চান উত্তরে বলব- অসাধারণ, অনবদ্য। তবে একটু মিশ্র প্রতিক্রিয়াও আছে। নাটকটি দেখতে বসে যখন এর কাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছি তখন কেন যেন খেই হারিয়ে ফেলছিলাম। এটা কি শুধু  আমার বেলায় ঘটেছে? যাচাই করে দেখেছি অনেকের বেলায় এমনটা ঘটেছে। অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অনেকের অভিনয়েও অপরিপক্বতার ছাপ ছিল। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেনÑ সার্কাস নাট্যাভিনয়ের অংশ হতে পারে কী? তবে নাটকের কারিগরি উপস্থাপনা, আলো ও শব্দের ব্যবহার এক কথায় অসাধারণ। জয় হোক মঞ্চ নাটকের।

রেজানুর রহমান