আরণ্যকের ৪৫ বছর জেগে উঠেছে নাটক পাড়া

আরণ্যকের ৪৫ বছর জেগে উঠেছে নাটক পাড়া

615
SHARE
rarang

রেজানুর রহমান: ইদানিং শিল্পকলায় গেলেই মন ভালো হয়ে যায়। অবশ্য মন ভালো হয়ে যাবার মতো কারণও আছে। শিল্পকলায় প্রতিদিনই প্রাণের মেলা জমে। বিকেল হতে না হতেই সেগুন বাগিচায় শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে আসতে থাকেন বিনোদন পিয়াসী মানুষজন। কেউ একা, কেউ বন্ধুসহ আবার কেউ পারিবারিকভাবে দল বেঁধে আসেন শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে। শিল্পকলায় ছোট-বড় মিলিয়ে মঞ্চ নাটকের হল রয়েছে তিনটা। প্রতিদিনই তিন হলেই বিভিন্ন নাট্যগ্রæপের নাটক দেখতে হাজির হচ্ছেন নগরবাসী। দেশের অগ্রগণ্য নাট্য সংগঠক আরণ্যক-এর ৪৫ বছর উপলক্ষে আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসবের আনন্দমুখর আয়োজন শিল্পকলা একাডেমির পরিবেশই পাল্টে দিয়েছিল। ৭ দিনব্যাপী এই নাট্য উৎসবে আরণ্যকের আলোচিত কয়েকটি নাট্য প্রযোজনার পাশাপাশি ভারত, ইরান, নরওয়ে ও হংকং-এর বিভিন্ন নাট্যগ্রæপের নাটক মঞ্চস্থ হয়। ফলে শিল্পকলায় অক্টোবরের শেষ সপ্তাহটি ছিল অন্যরকম আনন্দ উৎসবে ভরপুর। আমরা অনেকে কথায় কথায় বলি মঞ্চ নাটকে দর্শক হয় না। এ ব্যাপারে দর্শকের তেমন আগ্রহ নেই। অথচ আরণ্যকের এবারের নাট্য উৎসবে এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। ৭ দিনে শিল্পকলার ৩টি হলেই দেশি-বিদেশি সব নাটকেই দর্শকের উপস্থিতি ছিল বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। যানজট ও পথের দূরত্বকে অনেকে মঞ্চ নাটকের শত্রæ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু আরণ্যকের নাট্য উৎসবে শত্রæর মুখে যেন ছাই পড়েছিল। আর তাই যানজট ও পথের দূরত্ব কোনো বাধা হয়নি। মিরপুর, সাভার, যাত্রাবাড়ী, পুরনো ঢাকা, গুলশান, বনানী, রামপুরা, উত্তরা, টঙ্গী এমনকি নারায়ণগঞ্জ থেকেও প্রতিদিন পারিবারিকভাবে আরণ্যকের নাট্য উৎসবে যোগ দিয়েছেন দর্শক। পরিবেশ, পরিস্থিতি দেখে শুধু আরণ্যকের কর্মীরাই নন মঞ্চ পাড়ার প্রতিটি কর্মীই আবেগে আপ্লুত। সবার অভিন্ন মন্তব্যÑ হ্যাঁ আবার জমবে নাটকের মেলা।

Mocho-1সত্যি সত্যি আরণ্যকের নাট্য উৎসব জাগিয়ে তুলেছে নগরীর নাট্যাঙ্গনকে। অবশ্য সাংগঠনিক দৃঢ়তা, মঞ্চ নাটকের প্রতি দলীয় কমিটমেন্টসহ নানা কারণে আরণ্যক দেশের মঞ্চ কর্মীদের কাছে ভরসার স্থল। পাশাপাশি অনুপ্রেরণার উৎসও বটে। দেশের অগ্রগণ্য এই নাট্য সংগঠনের কর্মীরা শুধু মঞ্চে নয়, টেলিভিশন নাটক, সিনেমাসহ সংস্কৃতির সকল শাখায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছেন। সে কারণে আরণ্যক-এর প্রতি দর্শকের যেমন একটা ভালোবাসা ও আস্থার জায়গা তৈরি হয়েছে তেমনি মঞ্চ কর্মীদেরও অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছে। অহংকারের সাথে বলা যায়, আরণ্যকই দেশের একমাত্র নাট্য সংগঠন যে সংগঠন শুরু থেকে অদ্যাবধি মঞ্চ নাটকের সঙ্গেই আছে। ৪৫ বছরে অসংখ্য কর্মী সংগঠনে যুক্ত হয়েছেন আবার পেশাগত কারণে চলেও গেছেন। কিন্তু সংগঠনকে ভুলে যাননি। নাট্য সংগঠন হিসেবে আরণ্যকেরই আছে নিজস্ব নাট্যকার, নাট্য নির্দেশক, আলো পরিকল্পক, কস্টিউম ডিজাইনার।

৪৫ বছর উপলক্ষে আন্তর্জাতিক এই নাট্য উৎসবে আরণ্যক একটি প্রেরণাদায়ী শ্লোগান নির্ধারণ করেছিল। ‘পুষ্প ও মঙ্গল আন্তর্জাতিক নাট্যোৎসব ২০১৭’ শীর্ষক এই নাট্য উৎসবের ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়Ñ ‘আরণ্যকের ৪৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে পুষ্প ও মঙ্গল উৎসব। পুষ্প বনে এত ফুল ফোটে বলেই এত সুন্দর এই পৃথিবী। জীবনে পুষ্প যেমন অমূল্য, তেমনি শিল্পেও তা অপরিহার্য। সৌন্দর্যতত্তে¡ পুষ্প এক অবধারিত উপাদান। পৃথিবীর এমন একজন কবিও পাওয়া যাবে না যিনি ফুল এবং ফুলের উপমা ব্যবহার করেননি। সারা মানব জাতির কাছে প্রত্যাহিক জীবন যাপন থেকে শুরু করে উৎসব পালা পার্বণে ফুল যেন এক নিত্য অনুসঙ্গ। ফুল ছাড়া জীবনই কল্পনা করা যায় না।

আমরা যে শিল্পের চাষই করি না কেন শেষ কথায় তা শিল্প ভুবনে একটি ফুল হয়েই ফুটে থাকে। তেমনি আরণ্যক ৪৫ বছরে সেই ফুলের চাষই করে এসেছে। যুক্ত হয়েছে তাতে মঙ্গল কামনা। সমাজের বৈষম্যের বিরুদ্ধে আরণ্যক ঘোষণা করেছে শ্রেণি সংগ্রামের অমোঘ বাণী। মানব কল্যাণের শেষ কথা শ্রেণিহীন শোষণহীন সমাজ নির্মাণে। অক্টোবর বিপ্লব পৃথিবীতে এনেছিল সাম্যবাদী সমাজের প্রতিশ্রæতি। তার শতবর্ষে আরণ্যক চাষ সাম্যবাদী ও যুদ্ধহীন সমাজ।

পুষ্পবনে নেইরে পুষ্প, এমন অভিশপ্ত পৃথিবী যেন না হয়। এই ধরিত্রী যেন বসন্ত সমাগমে ফুলের উৎসবে মেতে ওঠে। ক্ষুধা নির্বাসিত হোক, উদ্বাস্তুর নিঃসঙ্গ হাহাকার যেন না শুনি। দেশ খন্ড-বিখন্ড হওয়ার বদলে এই পৃথিবী হোক পুষ্পের, আনন্দের। এই সব মঙ্গল কামনা সামনে রেখে পৌঢ়ত্তে¡র যৌবনে আরণ্যকের উৎসব।

Aronnok২২ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৫টায় শিল্পকলা একাডেমির উন্মুক্ত চত্বরের নন্দনমঞ্চে আন্তর্জাতিক এ নাট্য উৎসবের উদ্বোধন করা হয়। শহীদ মুনীর চৌধুরীর সহধর্মিণী অভিনয় শিল্পী লিলি চৌধুরী উৎসবের উদ্বোধন করেন। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। ইরানের রাষ্ট্রদূত আব্বাস ভায়েজি দেহনাভি, নরওয়ের রাষ্ট্রদূত সিডসেল বিøকেন, আইটিআই-এর বিশ্ব সভাপতি রামেন্দু মজুমদার, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুস অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। উৎসবের ঘোষণা পাঠ করেন আরণ্যকের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মামুনুর রশীদ। সভাপতিত্ব করেন দলটির প্রধান সম্পাদক মান্নান হীরা।

সাওতালী নৃত্যের মাধ্যমে উৎসব উদ্বোধন পর্বের সূচনা হয়। প্রথম দিন আরণ্যক-এর বহুল আলোচিত নাটক ‘ইবলিশ’ মঞ্চস্থ হয়। এছাড়া ৭ দিনে আরণ্যকের ময়ূর সিংহাসন, রাঢ়াঙ, অরণ্য মঙ্গল, মূর্খ লোকের মূখ্যকথা, কলকাতার ঋত্বিক (বহরমপুর) নাট্যদলের আধারে সূর্য, নাট্যভূমির (আগরতলা) রাইমা শাইমা, শান্তিপুর সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর বৃষ্টি বৃষ্টি, আয়ন্দার (কলকাতা) অনুশোচনা, নিউ আলীপুরের (কলকাতা) সখারাম শীর্ষক নাটক মঞ্চস্থ হয়। এছাড়া নরওয়ে, সুইডেন, ইরান ও হংকং ৪টি নাট্যদল ইংরেজি ভাষায় নাটক মঞ্চস্থ করে। উৎসব উপলক্ষে একদিনের এক নাট্য কর্মশালা ও নাট্য আড্ডার আয়োজন করা হয়। পাশাপাশি ‘আরণ্যক দীপু স্মৃতি পদকও’ প্রদান করা হয়।

মঞ্চের জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি

কয়েকজন যুবক। মহান মুক্তিযুদ্ধের আগুন তাদের বুকে। নাটকের মঞ্চে গণ মানুষের কথা বলার জন্য একত্রিত হলেন। আরণ্যক’ নামে একটি নাটকের দলের জন্ম হলো। নাটক শুধু বিনোদন নয়, শ্রেণি সংগ্রামের সুতীক্ষè হাতিয়ার, এই শ্লোগান বুকে ধারণ করে আরণ্যক কাটিয়ে দিল একটানা ৪৫ বছর। দলের প্রাণ পুরুষ, নাট্যজন মামুনুর রশীদের মুখোমুখি হয়েছিল আনন্দ আলো। কোনো ভারী প্রশ্ন নয়, সহজ প্রশ্নের সহজ জবাব দিয়েছেন নাট্যজন মামুনুর রশীদ। তাঁর সহজ সরল কথায় অজান্তে বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের একটা আয়না খুঁজে পেয়েছি আমরা।

আনন্দ আলো: আরণ্যক-এর শুরুর গল্পটা কেমন ছিল?

Mamunur-Rashidমামুনুর রশীদ: মহান মুক্তিযুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে ফিরে মঞ্চ নাটকের ভাবনাটা গুরুত্ব পায়। কলকাতায় দেখতাম নিয়মিত মঞ্চে নাটক হয়। প্রচুর দর্শক। নাটকের দল গড়ার অণুপ্রেরনা সেখান থেকে পাই।

আনন্দ আলো: আরণ্যক এই নামটি কে দিয়েছিল?

মামুনুর রশিদ: নামটি দিয়েছিল আব্দুল্লাহ আল মামুন। একদিন বাংলাদেশ টেলিভিশনে আমি আর আলী যাকের কথা বলছিলাম। নাটকের দল করার ব্যাপারেই কথা হচ্ছিল। কী নাম দেয়া যায়? এই নিয়ে কথা হচ্ছিল। মামুনই তখন আরণ্যক’ নামটা বললেন। নাগরিক আছে। আরণ্যক নাম দাও… ব্যস, নামটা আমাদের পছন্দ হয়ে গেল।

আনন্দ আলো: শুরুর দিকে সদস্য সংখ্যা কত ছিল?

মামুনুর রশীদ: ৬/৭ জন।

আনন্দ আলো: নামগুলো বলা যায়?

মামুনুর রশীদ: আলী যাকের, সুভাষ দত্ত, ড. ইনামুল হক, মজিব বিন হকও ছিলেন। আরও ছিলেন হ্যাঁ ভাই… খ্যাত নাজমুল হুসাইন… ও হ্যাঁ নাসির উদ্দিন বাচ্চুও আমাদের সঙ্গে ছিলেন। নৈপথ্যে কাজ করেছেন।

আনন্দ আলো: আরণ্যকের শ্লোগান কি?

মামুনুর রশীদ: নাটক শুধু বিনোদন নয় শ্রেণি সংগ্রামের সুতীক্ষè হাতিয়ার।

আনন্দ আলো: রাজনৈতিক মতাদর্শ?

মামুনুর রশীদ: মার্কসসীজম। সমাজতান্ত্রিক একটা সমাজ ব্যবস্থা গড়াই আমাদের স্বপ্ন। বৈষম্যহীন সমাজ, মানবিক রাষ্ট্র চাই। এটা মার্কসবাদ র্চ্চার মাধ্যমেই সম্ভব বলে আমরা মনে করি।

আনন্দ আলো: দলীয় কাঠামোটা কেমন?

মামুনুর রশীদ: একজন প্রধান সম্পাদক ও ৪ জন সম্পাদক মোট ৫ জন সম্পাদক মিলে দল পরিচালিত হয়।

আনন্দ আলো: দেশের বাইরে কোন কোন দেশে আরণ্যক নাটক মঞ্চস্থ করেছে?

মামুনুর রশীদ: দক্ষিণ কোরিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে আরণ্যক নাটক মঞ্চস্থ করেছে।

আনন্দ আলো: দলের ব্যয় বহুল নাটকের নাম কি?

মামুনুর রশীদ: গিনিপিগ। বহু আগে অনেক টাকা খরচ করে নাটকটি মঞ্চে আনা হয়।

আনন্দ আলো: কত টাকা?

মামুনুর রশীদ: তখনকার দিনে… ধরো, ৮৫ সালের কথা। লক্ষাধিক টাকা খরচ হয়েছিল।

আনন্দ আলো: ৪৫ বছর ধরে দলটি টিকে থাকার মূল মন্ত্র কী?

মামুনুর রশীদ: গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাই দলটিকে টিকিয়ে রেখেছে। পাশাপাশি আদর্শের প্রতি অবিচল থাকা।

আনন্দ আলো: আরণ্যকের সেই সময় আর এই সময়ের বিশ্লেষণ করুন।

মামুনুর রশীদ: একটা জায়গা তো হচ্ছে কমিটমেন্ট… সেই সময় যেমন কমিটমেন্ট রক্ষা করতাম এখনও আমরা সবাই তাই করি। দলের ভেতর গণতান্ত্রিক র্চ্চাটাই আমাদের মূল প্রেরণা। ভরসার জায়গা। তবে একটা পার্থক্য যে নাই তা নয়। তখনকার দিনে কেউ রিহার্সেল মিস করলে অথবা শো মিস করলে তাকে দল থেকে বের করে দেওয়া হতো। এখনতো সেটা পারি না। এখন সেই কঠোরতা রক্ষা করা যায় না। আরেকটা হচ্ছে তখনকার দিনে দলের ছেলে- মেয়েদের শুধুই মঞ্চের ক্ষেত্রে ব্যস্ততা ছিল। আর এখন তারা নানা কাজে জড়িত। তাই সময়ের প্রয়োজনে অতীতের সেই কঠোরতা থেকে সরে আসি। আমরা কিছুটা এডজাস্টমেন্টের দিকে গেলাম। এডজাস্টমেন্ট হচ্ছে… আর কাউকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে না। দল করছে অথচ দলে সময় দিতে পারছে না। নিস্ক্রিয় হয়ে গেছে। তাদেরকেও আমরা নিস্ক্রিয় সদস্য হিসেবেও যুক্ত রেখেছি। সময়কে তো অস্বীকার করা যাবে না। এই যে দলে এতদিন সে কাজ করলো, দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করলো… কাজেই তাকে তো আমরা ছাড়তে পারি না। যে ভাবে আছে সে ভাবেই থাকুক…

আনন্দ আলো: ৪৫ বছরে অনেক সুখকর স্মৃতি জমা হয়েছে। একটা স্মৃতির কথা জানতে চাই।

মামুনুর রশীদ: হাজার হাজার আনন্দ দায়ক স্মৃতির মধ্যে একটা স্মৃতি তুলে ধরা মুশকিল। হ্যাঁ, একটা শ্রেষ্ঠ আনন্দের কথা বলি। কঠোর শৃঙ্খলা ও অনুশীলনের পর আমরা যখন একটা নতুন নাটক মঞ্চে নামাই তখন যে কি আনন্দ হয় তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। গিনিপিগের কথাই ধরা যাক। লাইট সেট সমস্ত কিছু দিয়ে আমরা নাটকটির টেকনিক্যাল রিহার্সেল দিলাম। হঠাৎ ঢাকা শহরে কার্ফুর ঘোষণা এলো। তখন কোথায় যাই। কী করি?  কেউ থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে। অথচ তারা হলে যেতে পারছেনা। বাসায় যাবারও সুযোগ নাই। কান্নাকাটি অবস্থা! আমাদের দলের অন্যতম সদস্য নাজমা আনোয়ারের বাসা ছিল শান্তিনগরে। অনেকেই সেখানে গেল। তারপর একটা সময় পরিস্থিতি শান্ত হলো। আমরা নাটকটা মঞ্চে নামালাম। সেদিনের আনন্দ বোধকরি শ্রেষ্ঠ আনন্দই ছিল।

আনন্দ আলো: ৪৫ বছরে ঝুঁকিটা কেমন ছিল?

মামুনুর রশীদ: অনেক ঝুঁকি। বলে বোঝানো যাবে না। অর্থনৈতিক সংকট ছিল। দল চালানোর মতো অর্থ নাই। তবুও নতুন নাটক নামাতে হবে। ধার দেনা করে অর্থ জোগাড় করতে হতো। এর চেয়েও বড় ঝুঁকি হলোÑ দলের কার্যক্রম চলছে, নতুন নাটকের রিহার্সেল শুরু হয়েছে। কাস্টিংও চ‚ড়ান্ত। হঠাৎ দেখা যেত নির্ভরযোগ্য পারফরমার অনুপস্থিত। শোনা গেল সে আর নাটকে সময় দিতে পারবে না। তখন মাথার ওপর রীতিমত ‘বাজ’ পড়তো। নতুন করে আর্টিস্টকে তৈরি করার ব্যাপারটা খুবই কষ্টের মনে হতো। এর চেয়েও বড় ঝুঁকি ছিল রিহার্সেলের জায়গা নিয়ে। মহড়ার জায়গা নাই। নাটকের সেট রাখার জায়গা পেতাম না। নতুন নাটকের শো করার পর সেট কোথায় রাখব এটা নিয়ে দুশ্চিন্তা হতো। কতবার যে সেট হারিয়ে গেছে। অযতœ অবহেলায় বৃষ্টিতে ভিজে গেছে তার ইয়ত্তা নাই। এমনও হয়েছে যে, বছরে একাধিকবার আমাদের দলের মহড়ার জায়গা বদলাতে হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে অনেকদিন মহড়ার জন্য একটা বিচ্ছিন্ন জায়গা পেয়েছিলাম। সেটা ছিল আমাদের দলের জন্য একটা স্বস্তিকর সময়। আরও ঝুঁকি ছিল। আমরা যারা নাটক নিয়েই জীবন শুরু করলাম তাদের মাঝে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ালÑ আমরা খাব কি? কীভাবে সংসার চলবে? থিয়েটার করে তো কিছু পেতাম না। ডকুমেন্টারি বানাতাম। ডকুমেন্টারি ফিল্মে কাজ করতাম। কিন্তু সংসার চালানোর জন্য এটা নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ইতোমধ্যে সংসারে ছেলে- মেয়েরা বড় হয়ে গেছে। বাসা ভাড়া দিতে পারিনি বলে একবার একটা বাসা থেকে উচ্ছেদও হয়েছিলাম। বাধ্য হয়ে ভায়রার বাড়িতে এসে উঠলাম। তবে হ্যাঁ দেশে বেসরকারি পর্যায়ের নাটক নির্মাণের উদ্যোগ শুরু হবার পর মনে হলো হ্যাঁ, এবার বোধকরি অভিনয়কে নির্ভর করা যাবে। প্যাকেজ নাটক আমাকে একটা স্বস্তির জায়গা এনে দেয়।

আনন্দ আলো: ৪৫ বছরে আরণ্যকের অর্জনটা কি?

মামুনুর রশীদ: (একটু ভেবে নিয়ে) অর্জন… দর্শক…। আরণ্যক বোধকরি এই ৪৫ বছরে দেশের সাংস্কৃতিক বিকাশ ও অগ্রযাত্রায় একটা ভূমিকা রাখতে পেরেছে। মঞ্চ নাটকের দর্শক সৃষ্টি করতে পেরেছে। এই যে আরণ্যকের নাট্য উৎসব হচ্ছে। দলে দলে মানুষ আসছেন মঞ্চ নাটক দেখার জন্য এটাতো একটা বড় অর্জন বলে আমি মনে করি। পাশাপাশি দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আরণ্যক পাশে থেকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পেরেছে এটাও তো বড় অর্জন। সবচেয়ে বড় কথা আমরা একটানা ৪৫ বছর দেশের কল্যাণে মঞ্চ নাটক নিয়েই আছি এটাইবা কম কীসে? এক জায়গায় দাঁড়িয়ে এত বছর সত্যের পক্ষে লড়াই করা অনেক কষ্টের। তবুও টিকে আছি। এজন্য মঞ্চ নাটকের দর্শককে ধন্যবাদ।

আনন্দ আলো: একটা সময় টেলিভিশনকে মঞ্চ নাটকের প্রতিদ্ব›দ্বী ভাবা হলো। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে মঞ্চ নাটকের প্রতিদ্ব›দ্বী ভাবা হচ্ছে। এজন্য মঞ্চে দর্শক কমেছে বলে অনেকে মনে করছেন। আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।

মামুনুর রশীদ: আমি এই কথার সঙ্গে মোটেই একমত নই। কোনো কালেই টেলিভিশন মঞ্চের প্রতিদ্ব›দ্বী ছিল না। বর্তমান সময়ের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও মঞ্চের প্রতিদ্ব›দ্বী নয়। তবে এটা সত্য আমরা মঞ্চ নাটকের দর্শক বাড়াতে পারিনি। ২ কোটি লোক অধ্যুষিত ঢাকা শহরে মঞ্চে নাটক দেখতে আসে কতজন?

এজন্য ক্যাম্পেইন প্রয়োজন। মঞ্চ নাটকের ব্যাপারে পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। রাশিয়ায় সাড়ে ৪ হাজার নাটকের দল আছে। প্রতিটি দল রাষ্ট্রীয় ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা পায়। আমাদের দেশে সংস্কৃতি ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের বাজেট সর্বনি¤œ। এটা দুঃখজনক।