Home আরোও বিভাগ আমার দেখা কান চলচ্চিত্র উৎসব -স্বপন আহমেদ

আমার দেখা কান চলচ্চিত্র উৎসব -স্বপন আহমেদ

SHARE

২০০৫ সালের  এপ্রিলে,  প্যারিসে তখন আমার রাতগুলো কাটছিল  নতুন ধারার চলচ্চিত্র বিপ্লবীদের সাথে আড্ডা দিয়ে। সারা পৃথিবী থেকে আসা তরুন-তরুণীরা চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করতে চান, ভেঙ্গে দিতে চান বাণিজ্যিক ছবির আবর্ত। আবার অনেকে মনে করছেন অর্থবহ ছবির দর্শক সৃষ্টি না হলে আমাদের কোন ভাবনাই সফল হবেনা। ওই আড্ডাগুলোতে মনে হতো, ভবিষ্যতের কয়েকজন শক্তিশালী চলচ্চিত্রকারের মধ্যে আমিও একজন। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পুরো পৃথিবীই পরিবর্তন করে ফেলবো। কোন এক আড্ডায় জেরেমি নামের এক বন্ধু জিজ্ঞাসা করেছিলো- আমি কান চলচ্চিত্র উৎসবে যাচ্ছি কি না। আমি তাকে বলেছিলাম-সম্ভাবনা কম। কারণ আমার কাছে কোনও টাকা পয়সা নাই যেহেতু ট্রেন ভাড়া, থাকা- খাওয়া মিলিয়ে প্রায় অনেক টাকা।

কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল যেতে চাই- কিন্তু গেলে আগামী দুই মাস কিভাবে চলব সেটা জানিনা। জেরেমি জানালো সে কান উৎসবে ইন্টার্ন হিসেবে যাচ্ছে। তাতে করে সব খরচ উৎসব কমিটি বহন করবে এবং বেশ কিছু টাকাও পাবে। আমি যেতে চাইলে সে ব্যবস্থা করবে। এক সপ্তাহের মধ্যে সব ব্যবস্থা হয়ে গেলো। আমি তখন প্যারিসে অবস্থিত উৎসব কমিটির অফিসে কাজ শুরু করলাম। বিভিন্ন দেশ থেকে  ইংরেজিতে আসা ইমেইল গুলোর জবাব দেয়াই আমার কাজ। এর আগে আমাদের নিয়ে কয়েকদিনের একটা ওয়ার্কশপও হয়েছিলো। উৎসবের দিন ঘনিয়ে এলো। আমরা সবাই কানে যাত্রা করবো। এর আগে জানানো হল, অফিসিয়াল সিলেকশনে থাকা চলচ্চিত্র এর সাথে সংশ্লিষ্ট প্রযোজক, পরিচালক, অভিনয় শিল্পীদের অভ্যর্থনা ও সহযোগিতা করাই হবে আমাদের কাজ। খুবই রোমাঞ্চিত ছিলাম। সুযোগ পেলাম বিশ্বের খ্যাতনামা অনেকের সাথে মেলামেশার।

এভাবে পরপর ৫ বছর চলল আমার কান যাত্রা। অনেকটা তীর্থযাত্রার মত। এরপর জীবনে পরিবর্তন এলো। সিনেমা বানালাম। তখন থেকে এখনো পর্যনত্ম অপেক্ষায় আছি, কবে আমার একটি সিনেমা কানে প্রতিযোগিতা করবে। এগারো বছর আগের চলচ্চিত্র বিপ্লব ভাবনা অনেক আগেই মন থেকে মুছে গিয়েছে। এখন চলচ্চিত্র নিয়ে কেউ আঁতেল গিরি করলে অনেক হাসি পায়। দেশের পত্র-পত্রিকায় প্রায়শই আনত্মর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব নিয়ে রিপোর্ট, প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। অনেকের রিপোর্টে তথ্যগত ভুল থাকে। কিন্তু সেই ভুল সংশোধনও করেন না। যেমন এবারও দেখলাম কান চলচ্চিত্র উৎসব নিয়েও কিছু পত্রিকায় তথ্যগত ভুল রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। ফেসবুক, ইন্টারনেটের এই আধুনিক যুগে তথ্য গোপন করার কোনো সুযোগ নাই। তাই আমি মনে করি শুধু কান ফেস্টিভ্যাল নয় বিশ্বের যে কোনো চলচ্চিত্র উৎসব অথবা মেলার ওপর জেনে বুঝে তথ্য প্রকাশ করা উচিৎ।

এবার একটি আনন্দের কথা বলি। একজন চলচ্চিত্র কর্মী হিসেবে আমি মনে করি বর্তমান বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য একটি শুভ বছর। একই সাথে এই বছরটিকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রে একটি জাগরনের বছর হিসেবে গুরত্ব দিবে এই দেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস। এর কারন এবার বাংলাদেশের একটি ছবির আনত্মর্জাতিক প্রিমিয়ার হচ্ছে কান চলচ্চিত্র উৎসবের বানিজ্যিক শাখায়। বাংলাদেশের অগ্রগন্য চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থা ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এর নতুন ছবি তৌকীর আহমেদের ‘অজ্ঞাতনামা’র আনত্মর্জাতিক প্রিমিয়ার হচ্ছে কান চলচ্চিত্র উৎসবের মার্সে দ্যু ফিল্ম নামের বানিজ্যিক শাখায়। এটি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য একটি অনন্য ঘটনা। অজ্ঞাতনামার আনত্মর্জাতিক প্রিমিয়ারে বিভিন দেশের চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান, প্রযোজক, পরিবেশক, চলচ্চিত্র সমালোচক সাংবাদিক সহ আমন্ত্রিত অতিথি বর্গ উপস্থিত থাকবেন। তারা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সম্পর্কে অবহিত হবেন। একথা ভাবতেই ভালো লাগছে। ভাবতে আরও ভালো লাগছে যে, অজ্ঞাতনামার প্রযোজক ফরিদুর রেজা সাগর, ইবনে হাসান খান কান চলচ্চিত্র উৎসব কমিটির পক্ষ থেকে উৎসবে যোগদানের জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন। তাঁদের দু’জনকেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্র কর্মীদের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাই।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি- মার্সে দ্যু ফিল্ম শাখায় যে কোনও প্রযোজক চাইলে তার ছবির বাণিজ্যিক প্রদর্শনী করতে পারেন। তবে আগে থেকে একটি ফি দিয়ে সদস্য হতে হবে। প্রদর্শনী ফি দিতে হবে, পাবলিকেশন্স, প্রচারণা ও প্রিন্টিং ফি দিতে হবে আলাদা ভাবে, এরপর প্যালেস দু ফেস্টিভ্যালে প্রদর্শনী করতে চাইলে অবশ্যই ছবির ডিসিপি পাঠাতে হবে। কারণ তাদের পছন্দ হলেই কেবলমাত্র মুল ভবনে প্রদর্শনী হবে এবং উৎসবে আমন্ত্রিত অতিথিরা শুধুমাত্র তা দেখার সুযোগ পাবেন। তবে উৎসবের মুল ভবন ছাড়া শহরের কয়েকটি সিনেমা হল ও হোটেলে মার্সে দ্যু ফিল্ম এর এফিলিয়েটেড আছে, এসব স্থানে ছবি দেখাতে হলে ছবি আগে পাঠাতে হয় না শুধু মাত্র হল ভাড়া দিলেই ছবি দেখানো যায়।

তৌকীর আহমেদ পরিচালিত ইমপ্রেস টেলিফিল্ম এর ছবি অজ্ঞাতনামা’র ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হবে কান চলচ্চিত্র উৎসবের মুল ভবন প্যালেস দু ফেস্টিভ্যালে।

গর্ব হচ্ছে এই কারনে যে, কান চলচ্চিত্র উৎসবের একটি শাখায় এবার বাংলাদেশ সম্মানের সাথেই আছে। এই তো শুরু। এভাবেই আমরা একদিন উৎসবের মূল শাখায় ঢুকে যাবো এই কথাটা এবার অনেক সাহস করে বলতে পারছি। জয় হোক বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের।

 

একটি মানবিক বার্তা আছে অজ্ঞাতনামায়

-ফরিদুর রেজা সাগর, ব্যবস্থাপনা পরিচালক

ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও চ্যানেল আই

SAGOR-SIR-অজ্ঞাতনামা সিনেমার গল্পটিতে আছে জীবন ভালোবাসা এবং মানবিকতার এক মমস্পর্শী কাহিনী। গল্পটি দর্শকের হৃদয়কে ছুঁয়ে যাবে। সংস্কৃতি, বিনোদন, ধর্ম এবং ভাষা আমাদের জীবনের মানবিক ব্রত। এই বার্তাটি সারা বিশ্বের মানুষের কাছে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড তার ছবির মাধ্যমে পৌঁছে দিতে চায়।

অজ্ঞাতনামা (অর্থাৎ নামহীন) সিনেমাটি একটি বাংলাদেশী পরিবারের জীবন সংগ্রাম এবং বেঁচে থাকার লড়াই, সংগ্রামী জীবনের জয়ী হওয়ার গল্প বলা হয়েছে। এতে আছে মানবিক বিশ্বাস, অবৈধ মানব পাচার, আমলাদের লাল ফিতার দৌরাত্ব, পারিবারিক হতাশা গ্রস্থ মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং আশা। তারপরও এখানে আছে বিশ্বমানবতা ও ভাতৃত্বের একটি সুন্দর, সাবলিল গ্রহণযোগ্য বার্তা।

ছবির শেষ দৃশ্যে দেখা যাবে একজন বাবা অজ্ঞাতনামা একজন মানুষের মৃতদেহ বহন করে নিয়ে যাচ্ছে যথাযত মর্যাদায় নিজ বাড়িতে। সে জানেও না কোথায় তার ঘর কোথায় তার বাড়ি। কিন্তু সে যে মানুষ এটাই তার বড় পরিচয়। বিশ্বমানবতায় এই বার্তাটি বাবা তার দৌহিত্রের জন্য রেখে যান।