আমার কাছে বর্তমানটাই সত্য-তারিক আনাম খান

আমার কাছে বর্তমানটাই সত্য-তারিক আনাম খান

648
SHARE
tariq-anam-khan

সৌম্য, শান্ত, ধীরস্থির প্রকৃতির একজন মানুষ তিনি। অভিনয়ে প্রথাগত নন। নিজের আলাদা একটি বৈশিষ্ট্য আছে। বলেন কম, শোনেন বেশি। সদা গম্ভীর একজন মানুষ, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রায় প্রতিটি অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছেন তার অভিনয় সৌকর্য ও  সাংগঠনিক তৎপরতায়। তার দীর্ঘ অভিনয় জীবনে মঞ্চের ফোকাসটা সবচেয়ে বেশি। গ্রুপ থিয়েটারের অন্যতম দল নাট্যকেন্দ্রের পুরোধা ব্যক্তিত্ব তিনি। শক্তিমান এই অভিনেতার নাম তারিক আনাম। সম্প্রতি আনন্দ আলোর সঙ্গে এক আড্ডায় বসেছিলেন তিনি। সেখানে উঠে এসেছে মঞ্চ, টেলিভিশন নাটক এবং সিনেমার বিভিন্ন প্রসঙ্গ। লিখেছেন জাকীর হাসান

আনন্দ আলো: আপনার প্রাত্যহিক জীবনের কথা জানতে চাই। কেমন চলছে বর্তমান সময়?

তারিক আনাম: সময়তো তার নিজস্ব গতিতে চলছে। আমরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চলছি। সকালে ঘুম থেকে উঠে প্রথম যে কাজটি করি তাহলো খবরের কাগজ পড়া, হালকা এক্সারসাইজ সেরে শুটিং-এর জন্য প্রস্তুত হওয়া। ফেসবুক, টুইটারে চোখ বুলানো। ভারতের এনএসডিতে পড়াকালীন আমার অনেক বন্ধু এখানে নিয়মিত যোগাযোগ করে। তাদের পাঠানো বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ, মজার কোনো বিষয় দেখি। তাতে আনন্দ হয়, সময়ও কাটে। সবকিছু মিলিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করছি। কিন্তু এর মধ্যে ছন্দপতনও হয় আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে। মাঝেমধ্যে আবার সবকিছু কেমন যেন উলট-পালট লাগে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে। বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক একটি দেশ। এখানকার মানুষ প্রকৃতিগতভাবে খুব নরম এবং মানুষ সৎ সুন্দর সত্যের পূজারী। এরই মাঝে কোনো গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী মহল আমাদের সংস্কৃতির সুন্দর পরিবেশ কলুষিত করার চেষ্টা করছে তাদের আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে। প্রায়ই রক্তপাত ঘটছে, তাজা প্রাণ চলে চাচ্ছে। এ নিয়ে নিজের মধ্যে কষ্ট বাড়ে, খারাপ লাগে।

আনন্দ আলো: টিভি নাটক, চলচ্চিত্র ও মঞ্চে সপ্তাহের সাতদিন ব্যস্ত সময় পার করছেন। বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ ও বেশি সময় দেন কোন কাজে?

tariq-anam-khan-wifeতারিক আনাম: যে মিডিয়ায় নিজের ভাবনাগুলোর প্রয়োগের সুযোগ আছে। সৃজনশীল কাজ করার স্কোপ আছে হোক সেটা টিভি নাটকে চলচ্চিত্রে অভিনয় করা বা মঞ্চ নাটকে নির্দেশনা, লেখা এসব কাজেই সময় দেই বেশি। আমি নিজে একজন প্রয়োগের মানুষতো তাই মঞ্চ নাটক, নির্দেশনা, লেখা ও অভিনয় নিয়ে আলাদা একটা দুর্বলতা কাজ করে। তবে চলচ্চিত্র ও টিভি নাটকও আমার পছন্দ।

আনন্দ আলো: একঘণ্টা না ধারাবাহিক কোন ধরনের নাটক করতে বেশি আগ্রহবোধ করেন?

তারিক আনাম: সিঙ্গেল নাটকে আমি বেশি অভিনয় করি এবং পছন্দ করি। কারণ একেকটা সিঙ্গেল নাটকের একেক ভাবনা, গল্প ও কাস্টিং এবং নতুন নতুন পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার আলাদা আনন্দ আছে। এজন্যই ধারাবাহিকের চেয়ে সিঙ্গেল নাটক ও টেলিফিল্মে বেশি দেখা যায় আমাকে।

আনন্দ আলো: এখনকার নাটকে অভিনয় করে তৃপ্ত হতে পারছেন কি?

তারিক আনাম: এরকম তো প্রায় নাটকেই হয়, ইস আমার অভিনয় এরকম না হয়ে যদি ঐ রকম হতো। এখানে আরেকটু ভ্যারিয়েশন যদি আনা যেত। এই ধরনের অতৃপ্ততা তো নিজের মধ্যে আছেই। এটা যে শুধু টিভি নাটকে হয় তা নয় সিনেমা, মঞ্চ নাটকেও হয়।

আনন্দ আলো: কি দারুণ সময় কেটেছে আপনার আশির দশকে বিটিভির সৃজনশীল নাটকে অভিনয় করে। সেই সোনালী দিনগুলোর কথা কী মনে পড়ে?

তারিক আনাম: আমি আসলে অতীত মগ্ন মানুষ নই। স্মৃতি রোমন্থন করারও মানুষ নই। আমি মনে করি বর্তমান সময়টাই সত্য। আজকে আমি সুস্থ সবল একজন মানুষ, আগামীকাল আমি বেঁচে নাও থাকতে পারি। অতীত সুন্দর ছিল, ভালো ছিল কিন্তু অতীতমগ্ন হওয়ার পক্ষে আমি নই। অতীতে তো ভুলভ্রানিৱও ছিল। সেই ভুলভ্রানিৱ কাটিয়ে উঠে অতীতকে ভুলে ভবিষ্যৎ ভাবনাটা বুঝে সামনের পথচলাটাই বড় কথা।

আনন্দ আলো: ঐ সময় এবং এই সময়ের টিভি নাটকের তুলনামূলক বিশ্লেষণে আমরা এখন কোথায় আছি। নাটকের সার্বিক পরিস্থিতিইবা কেমন এখন?

তারিক আনাম: তখনকার সময়ের কথা যদি বলি তখন ভালো ছিল এই যে, স্ক্রীপটা নিয়ে নাট্যনির্দেশকরা অনেক আগে থেকে চিন্তাভাবনা করতেন। কমপক্ষে চারদিন নাটকের রিহার্সেল হতো। একটানা তিন ক্যামেরায় কাজ হতো, আর্টিষ্ট অংশগ্রহণ করতো। আমি এখন যদি এই একই ঢঙে নাটক নির্মাণ করি তাহলে দর্শক গ্রহণ নাও করতে পারে। বা দর্শক গ্রহণ করবে না বলেই আমার বিশ্বাস। সংস্কৃতিকে প্রতিটি মুহূর্তে সময়ের সঙ্গেই চলতে হয় এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস। জীবন পরিবর্তনশীল, মানুষের মন পরিবর্তনশীল, পরিবর্তনই আসলে পৃথিবীতে স্থায়ী হয়। ঐ সময় এবং এই সময়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণ যদি করি দেখা যাবে তখন সিরিয়াসনেসটা বেশি ছিল। হোমওয়ার্ক বেশি হতো। কোয়ালিটিও ছিল এবং ভালো কাজের যথেষ্ট সুযোগও ছিল। কোয়ালিটি কিন্তু আপেক্ষিক বিষয়।

আনন্দ আলো: প্রায়ই দর্শকের মুখে হতাশার কথা শোনা যায়, এই সময়ে নাটকের মান নেই, প্রাণ নেই এবং নাটকের গল্পও দুর্বল। এসব মেরামতের পথ কি নেই?

তারিক আনাম: আমাদের নাটক অতিরিক্ত ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। অতিরিক্ত মনোরঞ্জনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। মনোরঞ্জন, আনন্দ, বিনোদন দরকার আছে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য কিন্তু একমাত্র এই বিষয়গুলো নাটকের জন্য মুখ্য হতে পারে না।

পৃথিবীর বড় বড় কমেডি নাটকের কথা যদি বলি তাহলে দেখা যাবে ঐ নাটকগুলোতে শুধু হাসি আনন্দ বিনোদনই ছিল না। নাটকের মাধ্যমে সমাজের অসঙ্গতিকে বিদ্রূপ করা হয়েছে। এই ভাবেই কিন্তু চলচ্চিত্র ও নাটক সমাজে একটি ভূমিকা রেখেছে। আসলে সমাজের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো সংঙ্কৃতি টিকতে পারে না। এবার আমাদের নাটকের কথায় আসি, আমাদের নাটকের মূল গল্প এবং গল্পের কনসেপ্ট কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অসাধারণ সমসাময়িক জীবন সেই সব গল্পে আছে, হাসি আনন্দ বেদনার ইতিহাস আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এই ভাবনার জন্য যে জায়গাটা দেয়া দরকার তৈরির ক্ষেত্রে বা তৈরির আগে আমরা ঠিক করতে পারছি না কিছু কারণে। তার মধ্যে বাজেট সমস্যা আছে। ব্যস্ততা আছে, সময় একটা ব্যাপার, সঠিক জায়গায় সঠিক লোকের অভাব ইত্যাদি নানান কারণ আছে। তবে আমি মনে করি আমাদের নাট্যাঙ্গনে প্রচুর মেধাবী মানুষ আছেন। আমাদের কালজয়ী সমৃদ্ধ সাহিত্য আছে। এতকিছু থাকার পরও কিন্তু আমাদের নাটকের মান পড়ে গেছে। এখন এই অবস্থার পরিবর্তন বা মেরামত করা জরুরি।

একটি বিষয় বলি, আমি বা আমরা নাটক করে অর্থ নিচ্ছি এটা আমার পেশা। পেশাধারীদের দায়িত্ববোধ থাকা জরুরি। এই দায়িত্ববোধ অনেকের নেই। নাটকের সঙ্গে যারা জড়িত মানে লেখক, নির্দেশক, অভিনয় শিল্পী তাদের জেনেবুঝে কাজ করা উচিত কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে না জেনে, না বুঝে এবং তৈরি না হয়ে কাজ করছে। এই যে না জানা এবং বোঝা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করে কিন্তু সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও হাতে কলমে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নিষ্ঠা থাকতে হবে, ইচ্ছা থাকতে হবে। বর্তমান নাটকের মান নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে সেটা এ কারণেই। আমাদের এখন তৈরি হতে হবে। সঠিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

বিটিভির একসময়কার সৃজনশীল নাটকের কথা বলছিলেন, তখন যারা নাটকে কাজ করেছেন তারা মঞ্চ থেকে উঠে আসা। তারা তৈরি হয়ে বিটিভির নাটকে কাজ শুরু করেন। যেহেতু কাজ শেখার ইনস্টিটিউট ছিল না তাই মঞ্চই ছিল কাজ শেখার এবং চর্চার জায়গা। এখন কেউ দেখেছে, কেউ বুঝেছে, কেউ করেছে, কেউ বলেছে লব্ধজ্ঞান থেকে কাজ হচ্ছে। জেনে কাজ করা হচ্ছে না। মঞ্চ নাটক বা আগেরকার বিটিভির নাটক কেন এত সৃজনশীল ছিল। নাটক তৈরি করার আগে রিহার্সেল ও প্রস্তুত হতে এক থেকে দেড় মাস লাগতো। আমাদের নাটকের প্রাণপুরুষ সেলিম আল দ্বীন একটি নাটক লিখতে প্রচুর সময় নিতেন। তিনি পড়তেন, ভাবতেন, গবেষণা করতেন, তারপর নাটক লিখে দিতেন। এই ভাবে ভাবনার সময় দেয়া, চর্চা করা এটা না হলে তো নাটকের অবস্থা পরিবর্তন হবে না। আসলে শিল্পের পথ আসলে বন্দুর। সহজ লভ্য হলে মুশকিল। আমরা সহজলভ্য করে মুশকিলে পড়েছি। দেশে চ্যানেল হয়েছে প্রচুর। মাসে প্রচুর নাটক লাগে। এই সুযোগে বিভিন্ন মার্কেটিং কোম্পানি নাটক কেনাবেচা শুরু করে দিয়েছে। অনেকের ধারণা চ্যানেলগুলোর টাইম ভারানোর জন্য নাটকের মান পড়ে গেছে।

আনন্দ আলো: আপনি বেশ কিছু ভালো সিনেমায় অভিনয় করেছেন। হুমায়ূন আহমেদের ঘেটুপুত্র কমলায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসিত হয়েছেন। তারপর একটু একটু করে সিনেমা থেকে দূরে সরে গেলেন। সেটা কি ব্যস্ততা না অনাগ্রের কারণে?

তারিক আনাম: ব্যস্ততা নয়। আমি চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে বা নির্মাণে যুক্ত হতে প্রবল আগ্রহী। একজন অভিনয় শিল্পীর জীবনের অনেকটা পথ পাড়ি দেয়ার পর চলচ্চিত্রে অভিনয় করার অ্যাচিভমেন্টটাই থাকে। আমি মঞ্চে দীর্ঘ সময় কাজ করেছি। সেখানে ভালো কাজ না করলে বিসৱৃতির মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে কিন্তু চলচ্চিত্রে ভালোমন্দ কাজটা থেকে যায় হারিয়ে যায় না। কিন্তু আমাদের চলচ্চিত্রটা কেমন করে যেন বোম্বে মাদ্রাজী ও তামিল ছবির অনুকরণে সমাজ বিচ্ছিন্ন গল্প দিয়ে তৈরি হচ্ছে। এতে অহেতুক মারামারি ও অনাবশ্যক বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে। এতে করে যদি বাণিজ্যিক প্রত্যাশা পূরণ হতো তাহলে কারো আপত্তি ছিল না। তাই বলছি অন্যাবশ্যক মারামারি, যৌন সুড়সুড়ি সমাজ বিচ্ছিন্ন গল্পের ছবিতে অভিনয় করতে আমার কোনো আগ্রহ নেই। তাই প্রথাগত ও তথাকথিত এই চলচ্চিত্র থেকে দূরে আছি। তবে এক সময় আমি চেষ্টা করেছিলাম নিয়মিত চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে। নাটকেও কিন্তু আমার এ রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় কিছু নির্মাতার ক্ষেত্রে।

আনন্দ আলো: আপনি কি ধরনের চলচ্চিত্রের স্বপ্ন দেখেন?

তারিক আনাম: চলচ্চিত্র হচ্ছে বড় পরিসরের মাধ্যম। এখানে অনাবশ্যক ও আরোপিত বিষয় না এনে অভিনেতা অভিনেত্রীর পেছনে রঙিন বোমা ফাটিয়ে অহেতুক সিনেমা নির্মাণের পক্ষে আমি নই। আমরা চাই সুস্থ স্বাভাবিক সুন্দর ছবি। স্বাধীনতার পূর্বে এবং পরে অসাধারণ ছবি নির্মিত হয়েছে। তখনতো তথ্য প্রযুক্তিসহ নানান সুযোগ সুবিধা ছিল, তখন পারলে এখন কেন আমরা পারছি না। রূপবান, জরিনা সুন্দরী, বেদের মেয়ে জোসনা যদি সুপারহিট হয়, এখন কেন হচ্ছে না। আমরা আমাদের নিজস্বতা নিয়ে কেন এগুচ্ছি না। যে গল্পগুলো দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। পাশাপাশি আমাদের সিনেমা হলের সার্বিক উন্নয়ন প্রয়োজন। একের পর এক সিনেমা হল বন্ধ হয়ে সুপার মার্কেট হচ্ছে। হোক মার্কেট কিন্তু সেখানে যেন একটি সিনেপ্লেক্স করা হয়।

tariq-anam-khan-acting-stilমানুষের এখন বিনোদন প্রয়োজন বিশেষ করে তরুণদের জন্য। আজকে দেশে যে অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলো ঘটছে তার পেছনে রয়েছে। তরুণদের অলস জীবন যাপন। কথায় বলে অলস মস্তিষ্ক শয়তানের আড্ডা। স্বাভাবিক কাজ করার পর যদি বিনোদন করার জায়গা থাকতো তাহলে অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলো ঘটতো না। তাছাড়া আমাদের সাংস্কৃতিক রুচি পরিবর্তিত হয়েছে। বিভিন্ন সময় নানা ধরনের আরোপিত সাংস্কৃতিক পরিবেশ আমাদের এই ক্ষতিটা করেছে।

আনন্দ আলো: বর্তমান সময়ের মঞ্চ নাটকের কথা বলুন? নব্বইয়ের দশকে একঝাঁক তরুণকে নিয়ে গড়েছিলেন নাট্যকেন্দ্র। যারা আজ নাট্যাঙ্গনে তারকা। কি অসাধারণ গতি ছিল নাট্যকেন্দ্রের। তারপর যেন গতিটা থেমে গেল। ব্যাখ্যা নিশ্চয় আছে আপনার কাছে?

তারিক আনাম: কারণ তো অবশ্যই আছে। মঞ্চ নাটক এখনো আবেগ, ফ্যাশন ও ভালোবাসার তাগিদ থেকে হচ্ছে। ভালোবাসার ঘর বাঁধলেও কিন্তু একটা পর্যায় ঘর লাগে ঘরের ছাদ দরকার, খাওয়া লাগে, কাপড় লাগে। স্বামী ও স্ত্রীর উপার্জনের মধ্যে দিয়ে এসব মিটে। কিন্তু যখন এসব না মিটে তখন ঘটমটি লাগে। আমরা যখন নাট্যকেন্দ্র শুরু করি তখন একঝাঁক তরুণদের নিয়ে কাজ করেছিলাম। এখন পর্যন্ত তরুণরাই আমাদের দলের মূল শক্তি। এ তরুণরা যখন ঘর সংসার শুরু করলেন তখন তাদের ব্যস্ততা বেড়ে গেল। তাদের পক্ষে আর সম্ভব হলো না নাট্যকেন্দ্রে সময় দেয়া। ১১ অক্টোবর নাট্যকেন্দ্রের ২৬ বছর পূর্ণ হলো।

মঞ্চ নাটককে এগিয়ে নেয়ার জন্য সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা জরুরি। এতে সময় একটা ফ্যাক্টর। নাট্যকেন্দ্রে যারা কাজ করেন তারা সবাই তো একটি জায়গায় বসবাস করেন না। একেক সদস্য একেক জায়গায় থাকেন- কেউ উত্তরায়, কেউ ধানমন্ডি, কেউ মতিঝিল। সব জায়গা থেকে এসে বিকেলে একত্রিত হওয়া সবার জন্য কঠিন ব্যাপার। আগে মঞ্চ নাটক হতো বেইলি রোড কেন্দ্রিক। এখানে আসার কল পাওয়ার একঘণ্টার মধ্যে সবাই হাজির হতেন, এখন কি সেটা সম্ভব। উত্তরা থেকে শিল্পকলায় আসতে দিনের অর্ধেক সময় চলে যায়। তাহলে একজন নাট্যকর্মী নিজের কাজ করবে কখন, নাটকের কাজ করবে কখন? একই কথা মঞ্চ নাটকের দর্শকদের বেলায় প্রযোজ্য। এত গেল একটি কারণ। গত ২০/২২ বছরে ঢাকা শহরের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। সামাজিক অবকাঠামোরও পরিবর্তন হয়েছে। মানুষের সুবিধার কথা ভেবে সময়ের অসুবিধার কথা ভেবে শুধু সেগুন বাগিচায় শিল্পকলা নয়, গুলশান, মতিঝিল, উত্তরা, মিরপুর, ধানমন্ডিতে নাট্যমঞ্চ নির্মাণ করা উচিত। এই ধরনের সুযোগ সুবিধা পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে। কলকাতার বাইরেও এই ধরনের প্রচুর মঞ্চ রয়েছে- যেগুলো সরকারিভাবে করা হয়েছে। মঞ্চ নাটক দেখতে কিন্তু সবাই আগ্রহী কিন্তু সময়ের অভাবে, জ্যাম ঢেলে কেউ একমাত্র সেগুন বাগিচায় আসতে চায় না। বর্তমান ঢাকা শহরে আধুনিক দেশি-বিদেশী প্রচুর রেস্টুরেন্ট। বাসা থেকে বের হলেই চোখে পড়বে রেস্টুরেন্ট। মার্কেটের কোনায় আশেপাশে হরেকরকম রেস্টুরেন্ট। এখন এসব রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়া বিনোদনের অংশ হয়ে গেছে। মোটকথা আমাদের সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন জরুরি।

এছাড়া মঞ্চ নাটকের প্রধান সমস্যা হচ্ছে আর্থিক সমস্যা। কষ্ট করে এসে শো করার পর কোনো সদস্যের হাতে আমরা গাড়ি ভাড়াও তুলে দিতে পারি না। একটি শো করার যে খরচ সেটা টিকিট বিক্রি করে আসে না। নিজেদের গাটের পয়সা খরচ করে শো করতে হয়, তাহলে গতিটা আসবে কোথা থেকে। আমরা তবুও কলশো করে সুভ্যেনির বের করে পুষিয়ে নেই কিন্তু ছোট দল, নতুন দলগুলোতে এইভাবে শো করতে পারছে না। এইভাবে কিন্তু উচ্চমার্গের প্রযোজনা করা সম্ভব নয়। বাস্তবে উচ্চমার্গের প্রযোজনা খুবই কম হচ্ছে।