Home শীর্ষ কাহিনি প্রচ্ছদ মুখ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ-ডা: নুজহাত চৌধুরী

আমাদের মুক্তিযুদ্ধ-ডা: নুজহাত চৌধুরী

SHARE
Dr.-Nujhat

মহান মুক্তিযুদ্ধের উপর নির্মিত একটি কাহিনী চিত্র দেখছিলেন তিনি। সেই কাহিনী চিত্রে বারবার একজন বাবার কথা উঠে আসছিল। তিনি আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। কেঁদে ফেললেন। এক সময় চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, দুঃখিত আমি একটু আবেগ প্রবণ হয়ে গিয়েছিলাম। কেউ তার বাবার কথা বললে আমি এরকমই আবেগ ধরে রাখতে পারি না। আমার বাবার কথা মনে পড়ে… ডা: নুজহাত চৌধুরী। মহান একাত্তরে শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা: আলীম চৌধুরীর ছোট মেয়ে। পেশায় একজন চিকিৎসক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। বিটিভির ‘যা ছিল অন্ধকারে’ শীর্ষক প্রামাণ্য অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন তথা দেশের প্রতি মায়া ছড়িয়েছেন। আনন্দ আলোর স্বাধীনতা দিবস সংখ্যায় এবার প্রচ্ছদ মুখ হয়েছেন তিনি। চ্যানেল আই ভবনে আনন্দ আলো’র কার্যালয়ে এসেছিলেন। আনন্দ আলোর সম্পাদক রেজানুর রহমানের সঙ্গে মুখোমুখি এক আড্ডায় প্রাসঙ্গিক অনেক কথা বলেছেন। তারই চুম্বক অংশ প্রকাশ করা হলো।

বিটিভির ‘যা ছিল অন্ধকারে’ অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ তুলেই আমাদের আড্ডা শুরু হলো নুজহাতের সঙ্গে। একটু ভেবে নিয়ে বললেন, অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা শুনেই আমার খুব ভালো লাগে। সঙ্গে সঙ্গে এর সঙ্গে জড়িত হবার আগ্রহ প্রকাশ করি। হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট পুরোটা কিন্তু এখনও প্রকাশ হয়নি। ভারতের একটি পত্রিকায় ‘লিক’ হয়ে যাওয়া অংশ বিশেষ আমরা জেনেছি। এই কমিশন গঠনই হয়েছিল একটা অসৎ উদ্দেশে। ইস্টার্ন ফ্রন্টে ওদের অর্থাৎ পাকিস্তান বাহিনীর পরাজয়ের কারণ জানার জন্য এই কমিশন গঠন করা হয়েছিল। বাঙালি কেন এত বড় একটা যুদ্ধে গেল? বাঙালির বিরুদ্ধে শোষণ বঞ্চনার ইতিহাস জানার কোনো চেষ্টা কখনই তারা করেনি। বরং তারা বাঙালি নিধন যজ্ঞ শুরু করেছিল। বিটিভি যখন এই কমিশনকে ঘিরে একটা ডকুমেন্টারি নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তখন ইতিহাসের দায়বদ্ধতা থেকেই আমি অনুষ্ঠানটির সঙ্গে জড়িত হই। আমি মনে করি ‘যা ছিল অন্ধকারে’ বিটিভির একটি সাহসী উদ্যোগ। এর সঙ্গে জড়িত হতে পারা সৌভাগ্যের ব্যাপার।

আড্ডায় নুজহাত বারবার দেশের কথা বলছিলেন। প্রসঙ্গ ক্রমে তাকে প্রশ্নটা করেই ফেলিÑ আপনার কাছে দেশ কি? প্রশ্ন শুনে একটু যেন স্থির হলেন। কিছু একটা ভাবলেন। চোখ অশ্রæ সজল হয়ে উঠল। ধীর, শান্ত কণ্ঠে বললেনÑ দেশ হচ্ছে আমার কাছে আমার পরিচয়। কে আমি? আমার আইডেন্টি কি? আমার সত্তার সঙ্গে দেশকে কখনই আলাদা করতে পারি না। এজন্য দেশ নিয়ে কথা বলতে গেলেই আমি আবেগ প্রবণ হয়ে যাই। আমরা অনেকেই দেশকে হালকা ভাবে দেখি। হয়তো জ্যামে আটকে গেছি, অথবা হঠাৎ কোনো ঘটনায় বিব্রত হলাম কোনো কারণে ব্যক্তিগত ভাবে ক্ষুব্ধ হলাম, সঙ্গে সঙ্গে দেশকে খারাপ ভেবে বসি। না, এই দেশে কিছুই হবে নাÑ এমন মন্তব্যও করে ফেলি। হয়তো প্রবাসে গিয়ে সুন্দর বাড়ি-ঘর, রাস্তাঘাট দেখে চট করে দেশের সঙ্গে তুলনা করে দেশকেই খারাপ ভেবে ফেলি। এটা আমি পারি না। কেন পারি না? কারণ আমি জানি এটা আমার গরিব মা। এটা আমাদের দেশ। কিন্তু সে গরিব কেন? আমরাই তো তার জন্য কিছু করি নাই। কিছু না করে শুধুই বদনাম করি এবং শুধুই চাইÑ চাই মনোভাব… কি পেলাম? এ নিয়েই আমরা অনেকে ব্যস্ত থাকি। অথচ দেশ হলো মায়ের মতো… মাকে কি করে অবজ্ঞা করি আমরা? সব চেয়ে বড় কথা… আমার বাবা এই দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন…

বলেই কেঁদে ফেললেন নুজহাত। তার দু’চোখ জবা ফুলের মতো হলুদ হয়ে উঠেছে। মৃদু হেসে বললাম, আজ তাহলে আমাদের আড্ডার এই পর্যন্ত ইতি টানি… অন্যদিন না হয়…

প্রসঙ্গ টেনে নিলেন নুজহাত। চোখের পানি মুছতে মুছতে মৃদু হেসে বললেনÑ না, না আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। দেশের কথা উঠলেই বাবার কথা মনে পড়ে। তাই কান্না থামাতে পারি না। বলেই আবার দু’চোখ মুছলেন নুজহাত।

Dr.-Nujhat-1হঠাৎ তাকে প্রশ্ন করিÑ আপনার স্বপ্নের সঙ্গে কি দেশটার মিল পান? প্রশ্ন শুনে একটুও ভাবলেন না নুজহাত। সরাসরি বললেনÑ না, কোনো মিল পাই না। স্বপ্ন তো আসলে অনেক বড়। তাছাড়া একটা দেশ নিয়ে চাইবার সীমা নাই। তাই আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন… সবকিছুই সীমাহীন। এটা একটা ইউটোপিয়ান জগৎ। সবকিছুই বাস্তব হবে না তা আমিও বুঝি। কিন্তু আমি মনে করি সেই স্বপ্নটা দেখেই কিন্তু দেশের জন্য লাখ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন। আমি এও মনে করি শহীদদের স্বপ্নের কথাগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা অথবা বলার দায়িত্ব আমার, আমাদের। আমি আমার শুদ্ধতম আদর্শিক স্থান থেকে দেশকে দেখি। মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাসের স্পর্শ আছে এমন একটা প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে আমার দায়িত্ব সেই স্বপ্নের কথা বারবার মনে করিয়ে দেওয়া।

কথায় কথায় তরুণ প্রজন্মের কথা উঠে আসে। নুজহাতকে প্রশ্ন করিÑ ধরা যাক আপনার সামনে কয়েক হাজার তরুণ-তরুণী বসে আছে। তারা আপনার কথা শুনতে চায়। আপনি তাদেরকে কি বলবেন?

মৃদু হেসে ডা: নুজহাত বললেন, এরকম সৌভাগ্য আমার মাঝে মাঝেই হয়। আমি বিভিন্ন ‘প্ল্যাটফর্মে’ কাজ করি। বিশেষ করে গণজাগরণ মঞ্চে কাজ করার পর থেকে তরুণদের সঙ্গেই আমার বেশি ওঠা বসা। নির্মূল কমিটি থেকেও যখন বিভিন্ন জায়গায় যাই তখন তরুণদের সামনেই কথা বলি। কোনো বিশেষ কারণে হয়তো তরুণদের সঙ্গেই আমার ভালো আত্মীক যোগাযোগ হয়। আমি তাদেরকে সব সময় যা বলি তা হলো যে… ওরা যেন ভালো কিছু করতে অনেক স্বপ্ন দেখার সাহস পায়। নিজেদের সামর্থ্যে অনেক উঁচুতে উড়বে। নিজেদেরকে বিকশিত করবে। কিন্তু সবাই যেন একটা কথা মনে রাখে আকাশে উড়ার সময় ওরা যে মাটির ওপর দাঁড়িয়েছিল সেটাই হলো দেশ। এই মাটির ওপর ভর দিয়েই আকাশে উড়েছে। কাজেই এই মাটিকে যেন কখনই ভুলে না যায়।

তরুণরাই ভবিষ্যতে দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী হবে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক হবে। ওরা বিদেশে যাবে… ওরা মাইক্রোসফট এর মতো কোম্পানীর হয়তো মালিক হবে। কিন্তু ওরা যেন কলমের প্রতিটি আঁচড় দেওয়ার সময় মনে রাখে প্রতিটি বাঙালির এক একটি রক্তকনিকা দায়বদ্ধ একটি রক্ত ঋণে, তাহলোÑ মহান ৭১। সে যে দেশেই থাকুক, যতবড়ই হোক সে যেন প্রতিটি ক্ষণে ৭১’ এর এই ঋণের কথা ভেবেই কাজ করে। অন্যকেও যেন একই চেতনায় উদ্বুব্ধ করে।

আমরা এবার প্রসঙ্গ পাল্টাই। টেলিভিশন অনুষ্ঠান, বিনোদন ভাবনা, পরিবার ও বন্ধু প্রসঙ্গে কথা তুলতেই ডা: নুজহাত বলেন, সত্যিকথা বলতে কি… টেলিভিশনে আমি মূলত খবরই দেখি। অন্য অনুষ্ঠান দেখার সময় পাই না। দেশের পরিবেশ পরিস্থিতি জানার জন্য খবর দেখি। দিনে চাকরি করি। রাতে চেম্বারে বসি রোগী দেখার জন্য। তাছাড়া সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাÐে ব্যস্ত থাকতে হয়। সেজন্য ইচ্ছে থাকা সত্তে¡ও টেলিভিশনের অন্য অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ হয় না। তবে এটা আমি স্বীকার করি টেলিভিশন অনুষ্ঠান এখন দেশের প্রতিটি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের একটা অংশ হয়ে উঠেছে। টেলিভিশনে আমি ভালো শিশুতোষ অনুষ্ঠান চাই। যা খুব হৃদয়গ্রাহী ভাবে আমার ছেলের বয়সীদের কাছে মহান ৭১ কে পৌঁছে দিবে। মহান ৭১ সালের যুদ্ধদিনে প্রতিটি দেশ প্রেমিক মানুষের জীবন সংগ্রাম নিয়ে অনেক হৃদয়গ্রাহী অনুষ্ঠান হতে পারে। টেলিভিশনই পারে এ ধরনের অনুষ্ঠান শিশু-কিশোর ও তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে।

Dr.-Nujhat-2আমাদের অনেকগুলো টেলিভিশন চ্যানেল। প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক টিভি নাটক প্রচার হয়। টিভি নাটক নিয়ে আপনার মন্তব্য শুনতে চাই? প্রশ্ন শুনে নুজহাত বললেন, ‘এখনও ছোটবেলার সেই স্মৃতি মনে পড়ে। মা আমাদেরকে রাশিয়ান কালচারাল সেন্টারে নিয়ে যেতেন। সেখানে মাঝে মাঝে আমরা বিদেশি সিনেমা দেখতাম। এখান থেকেও আমার একটা বোধের সৃষ্টি হয়। আমি  জানি না এখনকার প্রজন্ম কতটা বই পড়ে। আমরা কিন্তু ছোটবেলায় খুব বই পড়তাম। এখনও সেই অভ্যাস রয়েছে। এখন তো বইয়ের পাশাপাশি অনেক মাধ্যম সোচ্চার। টেলিভিশন, সিনেমার পাশাপাশি ভার্সুয়াল জগতে সহজে ঢোকা যায়। কত যে মাধ্যম আছে নিজেকে বিকশিত করার। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হয় আমাদের ছেলে-মেয়েরা একটু বিভ্রান্ত। ওদেরকে বুঝাতে হবে। টেলিভিশন এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে না। একটা সহজ উদাহরণ দেই। আমাদের মাতৃভাষার ব্যবহার নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। ভাষার বিকৃতি হচ্ছে অনেক জায়গায়। কিন্তু দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা এখন থেকে তাদের প্রতিটি অনুষ্ঠানে উপস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রমিত বাংলাকে গুরুত্ব দিবে তাহলে আজ না হোক কাল একটা পরিবর্তন আসবেই।

প্রসঙ্গ ক্রমে একটা কথা বলি। প্রায় প্রতিদিনই তরুণদের কোনো না কোনো অনুষ্ঠানে আমি কথা বলার সুযোগ পাই। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলন ও স্বাধীনতার ইতিহাস সম্পর্কে অনেকেই ভালো করে জানে না। অনেকে অবলীলায় নিজের অযোগ্যতা প্রকাশ করে বলেÑ আপু, আমাদেরকে এসব কথা আগে কেউ বলেনি। পোস্ট গ্রাজুয়েটদের অনেক অনুষ্ঠানেও আমাকে কথা বলতে হয়। যখন দেখি তাদেরও অনেকে স্বাধীনতার ইতিহাস সম্পর্কে ভালো ভাবে জানে না তখন বিস্মিত হই। এদের অনেকেই সন্তানের বাবা হয়েছেন। চিন্তা করুন একবার, বাবা দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই জানে না। তাহলে তার সন্তানতো স্বাধীনতার ইতিহাস সম্পর্কে আরও অজ্ঞ হয়ে উঠবে। তাহলে ভবিষ্যতে এরা দেশের জন্য কি ভ‚মিকা পালন করবে… বলতে বলতে হঠাৎ যেন অস্থির হয়ে উঠলেন ডা: নুজহাত।

আড্ডার প্রায় শেষ পর্যায়ে নুজহাতকে প্রশ্ন করলামÑ বাবার কথা মনে পড়ে…?

এবার একটুও সময় নিলেন না নুজহাত। সরাসরি বললেন, বাবাকে মনে পড়ে। বাবাকে দেখেছি কিন্তু তার কোনো স্মৃতি আমার মনে নাই। কিন্তু সারাক্ষণই অনুভব করি বাবা আমার পাশেই আছেন। আমার সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছেন। আড্ডা দিচ্ছেন। বাবাকে অসম্ভব রকমের ভালোবাসি… বাবা আমার বাবা…

প্রিয় পাঠক, আড্ডার এ পর্যায়ে নুজহাতের চোখ দিয়ে অনর্গল অশ্রæ ঝরছিল। দেখলাম, একবারও তিনি চোখ মুছলেন না। কেঁদেই চলেছেন। কেঁদে কেঁদে কথা বলছিলেন। যার সারমর্ম অনেকটা এরকমÑ আমার বাবার মতো আরও অনেকে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভ‚মির জন্য জীবন দিয়েছেন। আমি চাই দেশটা সুন্দর হোক। আসুন সকলে দেশকে ভালোবেসে যার-যার দায়িত্ব পালন করি। দেশ মানেই তো মা… মাকে ভালোবাসি…