আমাদের বইমেলা

আমাদের বইমেলা

476
SHARE
Book-Taroka

রেজানুর রহমান: ঠাকুরগাঁওয়ের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে বইমেলায় এসেছেন একজন প্রবীণ শিক্ষক। ঢাকার মুগদাপৃাড়ায় তার মেয়ের বাসা। শরীর স্বাস্থ্য ভালো থাকলে তিনি বছরে একবার ঢাকায় আসেন এবং সেটা ফেব্রæয়ারি মাসে। এর পিছনে একটা কারণ আছে। ফেব্রæয়ারি মাস জুড়ে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একুশে বইমেলা শুরু হয়। এই মেলায় যোগ দিতে পারবেন বলেই প্রতিবছর ঢাকায় থাকার চেষ্টা করেন। তার নাম সিরাজুল ইসলাম বিএসসি। এবারও একুশে বইমেলায় এসেছিলেন। সঙ্গে ছিল তার স্কুল পড়ুয়া নাতনি। দোয়েল দ্বীপ চত্বরে তার সঙ্গে দেখা। রিকশাওয়ালার সঙ্গে ভাড়া নিয়ে তর্ক হচ্ছে। মতিঝিল বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে থেকে রিকশায় এসেছেন। রিকশাওয়ালার সঙ্গে ভাড়া ঠিক হয়েছিল ৪০ টাকা। এখন সে ৫০ টাকা চাইছে। সিরাজুল ইসলাম রিকশাওয়ালাকে যতই বলেন, অ্যাই মিয়া তুমিইতো ভাড়া চেয়েছে ৪০ টাকা। এখন ৫০ ছাইছ কেন? রিকশাওয়ালার একই কথা, আপনি ভুল শুনেছেন। আমি পঞ্চাশ চাইছি। সিরাজুল ইসলাম রীতিমতো ধাঁধার মধ্যে পড়ে গেছেন। পঞ্চাশ আর চল্লিশ এর উচ্চারণ কি একই রকম? না, না তা হবে কেন? কোথায় পঞ্চাশ আর কোথায় চল্লিশ? দশ টাকার পার্থক্য। টাকাটা ফ্যাক্টর নয়। মূল ফ্যাক্টর হলো বিশ^স্ততা। সিরাজুল ইসলামের স্পষ্ট মনে আছে তিনি ৪০ টাকা বলেছেন। অথচ রিকশাওয়ালা সেটাকে ৫০ বলে চালিয়ে দিতে চাইছে…।
শেষ পর্যন্ত ৫০ টাকাই দিতে হলো। রাগে ক্ষোভে সিরাজুল রীতিমতো ঘামতে শুরু করেছেন। দূর থেকে পরিস্থিতি দেখছিলাম। কাছে গিয়ে জানতে চাইলামÑ চাচা সমস্যা কি?
সিরাজুল ইসলাম অবাক চোখে তাকালেনÑ আপনাকে তো ঠিক…
নিজের পরিচয় দিলাম। সিরাজুল ইসলাম একটু যেন ভরসা পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে নিজের মনের ভেতরের জমানো ক্ষোভ আর রাগ ঝেড়ে ফেললেনÑ
এই যে আপনি সাংবাদিক! এইসব অনিয়মের কথা লিখতে পারেন না? আমি বললাম ৪০, ও বলে ৫০। ঠগবাজি করে ১০ টাকা নিয়ে গেল?
রিকশাওয়ালা চলে গেছে। ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় হলো। নাতনির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, ও কবিতা লেখে। মুক্তিযুদ্ধের ওপর ওর একটা ভালো কবিতা আছে। এবার মেলায় মুক্তিযুদ্ধের ওপর কি কি বই বেরিয়েছে আপনি জানেন?
কথায় কথায় আমরা বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানস্থ গেটে এসে দাঁড়িয়েছি। সিরাজুল ইসলাম দূর থেকে ভিতরের পরিবেশ দেখে উচ্ছ¡াস প্রকাশ করলেনÑ হ্যাঁ এবার মেলাটাকে মেলাই মনে হচ্ছে। অনেক রং, অনেক জায়গা, অনেক মানুষ, অনেক বই… খুউব সুন্দর। জানেন, আমি তখন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র। জহুরুল হক হলে থাকতাম। তখনকার দিনে বইমেলায় এতবড় ছিল না। শুধু বাংলা একাডেমিতে ছোট্ট জায়গায় বইমেলা হতো। তবে তখনকার দিনেও মানুষ দলবেঁধে বইমেলায় আসতেন। বিশ^বিদ্যালয় জীবন থেকে ঐ যে বইমেলায় আসা শুরু করেছি এখনো সেই নেশা ছাড়তে পারিনি।
এটাকে আপনি নেশা বলছেন?
সিরাজুল ইসলাম মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, এটা এক ধরনের নেশাই তো। আমাদের বইমেলা তো শুধু বইয়ের একটি মেলা নয়। মানুষে মানুষে মহামিলন মেলাও বলা চলে। মেলায় অনেকে আসেন প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা করবেন বলে। যেমন আমাদের একটি গ্রæপ আছে। গ্রæপের সদস্যরা কেউ থাকে রাজশাহীতে কেউ খুলনায়, পঞ্চগড়, সাতক্ষীরায়, বান্দরবানে… প্রতিবছর আমরা বইমেলায় একত্রিত হই। এবারও সেই পরিকল্পনা আছে…।
দুই.
ঢাকার মিরপুর থেকে প্রায় প্রতিদিনই বইমেলায় আসেন রাশেদ হুমায়ুন। একজন ব্যবসায়ী। বইমেলায় এসে শুধুই ঘুরে বেড়ান। কথা হলো তার সঙ্গে। প্রশ্ন করতেই উত্তর দিলেন এভাবেÑ বইমেলায় মূলত আসি বই দেখতে ও কিনতে। আপনি খেয়াল করেছেন কি না জানি না। আমি প্রতিদিনই একটা বিষয়ে খেয়াল করি প্রতিটি স্টলে থরে থরে বই সাজানো থাকে। এক একটার প্রচ্ছদ একেক একেক রকম। যেমন হাজার মানুষের মুখ হাজার রকমের। কারো সঙ্গে কারো মিল নেই। তেমনি এক বইয়ের প্রচ্ছদের সঙ্গে অন্য বইয়ের প্রচ্ছদের কোনো মিল নেই। অথচ সবাই মিলেমিশে আছে। আমি সব প্রচ্ছদেই মানুষের মুখ দেখি। আর ভাবি আমরা মানুষেরা যদি বইয়ের মতো এত সুন্দর সহাবস্থান তৈরি করতে পারতাম তাহলে পৃথিবীটা বোধকরি আরো সুন্দর হতো।
তাকে প্রশ্ন করলামÑ বইতো মানুষই লেখে। মানুষই বইয়ের স্টল সাজায়। বইয়ের পাশে বই রাখে। অথচ অনেক মানুষ অনেক মানুষকে নিজের পাশে রাখে না কেন?
রাশেদ হুমায়ুন কি যেন ভাবলেন। তারপর বললেনÑ আপনার এই প্রশ্নের জবাব দিতে হলে ভাবতে হবে। আবার দেখা হলে উত্তরটা বলব…।
তিন.
কলকাতা থেকে আমাদের একুশে বইমেলায় এসেছিলেন বিদেশের অনেক কবি, সাহিত্যিক। মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাদেরই কয়েকজন সুন্দর বাংলায় বক্তৃতা দিয়েছেন। চীনের ডং ইউ চেন আমাদের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওপর গবেষণা করেন। চীনা উচ্চারণে বাংলা বললেন সুন্দর করে। তার মন্তব্যÑ আপনাদের বইমেলা অনেক সুন্দর। পৃথিবীর আর কোথাও একমাস ধরে এমন বইয়ের মেলা হয় না। এই দিক থেকে একুশে বইমেলার অনেক বিশেষত্ব আছে। আমি দেশে ফিরে গিয়ে আপনাদের বইমেলার কথা সবাইকে জানাব।
ভারত থেকে এসেছিলেন চিন্ময় গুহ। একটি বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ান তিনি। প্রসঙ্গ তুলতেই বললেনÑ কলকাতায় আমরাও একটি বইমেলা করি। ঐ মেলার সঙ্গে একুশে বইমেলার অনেক পার্থক্য। শুধু একটি ভাষাকে কেন্দ্র করে এতবড় বইমেলা পৃথিবীর আর কোথাও হয় না। এজন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ।
চার.
PM_7_01.02এবার বইমেলার এক শিশু দর্শনার্থীর কথা বলি। বইমেলায় এক শিশু প্রহরে বাবার হাত ধরে বইমেলায় এসেছিল। চটপটে স্বভাবের এই শিশু। মেলায় ঢুকেই বাবাকে জিজ্ঞেস, বাবা এটা আমাদের বইমেলা?
বাবা বললেনÑ হ্যাঁ আমাদের বইমেলা।
ছেলের প্রশ্নÑ এই মেলায় কি কি আছে?
বাবার উত্তরÑ অনেক বই আছে, অনেক…
ছেলের প্রশ্নÑ আর কি কি আছে?
বাবার উত্তরÑ আরো অনেক কিছু আছে। এসো আমরা বই মেলাটা হেঁটে হেঁটে দেখি…।
পাঁচ.
প্রিয় পাঠক, আসুন আমরাও একবার এবারের একুশে বইমেলা থেকে চক্কর দিয়ে আসি। একুশে বইমেলা এবারও বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল এলাকা জুড়ে দুই ভাগে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পহেলা ফেব্রæয়ারি উৎসবমুখর পরিবেশে আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বইমেলার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। মেলার প্রথম দিন থেকেই ৪ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী সাহিত্য সম্মেলনেরও শুভ উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্ত ৬ গুণী কবি লেখকের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
অন্যান্যবারের চেয়ে এবার বইমেলায় পরিবেশ অনেক ভালো। মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশেই মূলত মেলার বিস্তৃত কার্যক্রম চলছে। বইয়ের সৃজনশীল প্রকাশনীসমূহের স্টল ও প্যাভিলিয়ন মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশেই রয়েছে। বাংলা একাডেমির নিজস্ব আঙিনায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার স্টল স্থান পেয়েছে। যারা মেলায় মূলত বই কেনার জন্য আসতে চান তাদের জন্য মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের অংশটি জরুরি। এবার মেলার প্রতিটি স্টল বেশ সাজানো গোছানো পরিবেশ পেয়েছে। এক স্টল থেকে অন্য স্টলের মাঝখানে বেশ দূরত্ব থাকায় ক্রেতা পাঠক স্টলে স্টলে ঘুরে ঘুরে দেখে শুনে বই কেনার সুযোগ পাচ্ছেন।
বইমেলার অন্যতম আকর্ষণ নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান। এটি এবার একাডেমি প্রাঙ্গণে নজরুল মঞ্চে হচ্ছে না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে নির্ধারিত মঞ্চ সাজানো হয়েছে এজন্য। সেখানেই প্রতিদিন বইমেলায় আসা নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হচ্ছে।
আমরা যে যাই বলি না কেন বই হলো সবার ভালো বন্ধু। কাজেই সবার উচিত ভালো বই কেনা, ভালো বই পড়া। যারা ব্যক্তিগত পাঠাগার গঠন করতে চান তাদের জন্য হতে পারে এই বইমেলা উত্তম জায়গা। দূরে যেতে হবে না। বইয়ের রাজ্য থেকেই বই খুঁজে নেয়া যাবে। উপহার হিসেবেও যারা বই দিতে পছন্দ করেন তাদের জন্যও বইমেলা হতে পারে নির্ভরযোগ্য জায়গা। বইয়ের রাজ্য থেকে পছন্দের লেখকের বই কিনে রাখুন পছন্দের মানুষদের জন্য।