আমাদের প্রিয় দুলাল কাকু!

আমাদের প্রিয় দুলাল কাকু!

439
SHARE
Fazlul-Alam

রেজানুর রহমান: হাসপাতালের সাদা বিছানায় তাকে দেখে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। আমার জীবনে দেখা অসম্ভব রকমের একটা হাসি খুশি সরল মানুষ তিনি। সর্বক্ষণ প্রাণবন্ত। অথচ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। হাসপাতালে খুব কম সময়ের জন্য ছিলাম। হাসপাতাল থেকে বেড়িয়ে শুধুই প্রার্থনা করেছি- সৃষ্টিকর্তা যেন তাকে সুস্থ করে দেন। তিনি যেন আমাদের মাঝে ফিরে আসেন। আবার যেন তার দরাজ গলায় হাসির শব্দ শুনতে পাই… ঐ তো আমাদের ছোটকাকু, দুলাল কাকু এগিয়ে আসছেন। হাসছেন মিটিমিটি চোখে- কেমন আছেন আপনি? ভালো? আমার গল্প ছাপবেন না আনন্দ আলোয়…

বলছিলাম ড. ফজলুল আলমের কথা। যিনি আমাদের প্রিয় দুলাল কাকু। চ্যানেল আইতেই দুলাল কাকুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। আমাদের অভিভাবক, প্রিয় মানুষ ফরিদুর রেজা সাগরের চাচা তিনি। দু’জনের মাঝে গভীর বন্ধুত্ব। মনে মনে ভাবতাম ইস আমারও যদি এমন একজন চাচা থাকতেন। চাচা মানে বাবাই তো!

চ্যানেল আইতে আসা যাওয়ার পথে দুলাল কাকুর সঙ্গে প্রায়শই দেখা হয়। টুকটাক কথাও হয়। এক সময় আমাদের মাঝে বন্ধুত্বও হলো কিছুটা। কিন্তু ‘আপনি’ সম্মোধনের পাহাড়টা ডিঙানো গেল না। একদিন দুলাল কাকুকে বললাম- আমি তো বয়সে আপনার থেকে ছোটো। তুমি করে বললে খুব খুশি হতাম।

প্রাণ খুলে হাসলেন তিনি। বললেন- অ্যাই আপনি এটা কি বলছেন? আপনি একটা পত্রিকার সম্পাদক। আপনাকে তুমি বলা যাবে না। এরপর সম্পর্কটা ‘আপনি’ পর্যায়েই থেকে গেল।

চ্যানেল আইতে ‘কড়া আলাপ’ নামে একটি অনুষ্ঠান করতেন দুলাল কাকু। আমি ছিলাম এই অনুষ্ঠানের নিয়মিত দর্শক। গভীর মনযোগ দিয়ে অনুষ্ঠানে তার কথা শুনতাম। তার জ্ঞানের পরিধি দেখে মুগ্ধ হতাম। এতোকিছু জানে মানুষটা! মূলত: ‘কড়া আলাপ’ দেখে দেখে আমি তার গুণমুগ্ধ ভক্ত হয়ে যাই।

আনন্দ আলোয় তার একাধিক ছোট গল্প ছাপা হয়েছে। মনে পড়ে একবার তার একটি গল্পের কিছু শব্দ নিয়ে আপত্তি তুলেছিলাম। নারীর শারীরিক বর্ণনা নিয়ে কিছু শব্দ ছিল সেই গল্পে। দুলাল কাকু তর্ক জুড়ে দিলেন- কেন শব্দগুলো ছাপানো যাবে না। আমি রীতিমতো ঘামতে শুরু করেছি। কারণ এই প্রথম তার সঙ্গে আমার মৃদু তর্ক হচ্ছে। তর্কে সেদিন আমি হেরে গেলাম। কিন্তু পরের দিন দুলাল কাকুই জিতিয়ে দিলেন আমাকে। বললেন- রেজানুর, আপনার কথাই ঠিক। আনন্দ আলো একটি পারিবারিক পত্রিকা। কাজেই এই পত্রিকায় শব্দের ব্যাপারেও আমাদের সতর্কতা প্রয়োজন।

সেদিন বুঝেছিলাম দুলাল কাকু লেখক হিসেবে কতটা মহৎ। সবচেয়ে বড় কথা তিনি যুক্তি বাদী খোলা মনের মানুষ। যুক্তির খেলায় আর কোনোদিন তার সঙ্গে যুক্ত হতে পারিনি। তবে তার সঙ্গে যুক্তি তর্কের দর্শক হবার সুযোগ হয়েছে। বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক আমীরুল ইসলাম ও আহমাদ মাযহারের সঙ্গে তিনি প্রায়শই যুক্তিতর্কে মেতে উঠতেন। নীরব দর্শক হয়ে দুলাল কাকুকে প্রতিদিন নতুন ভাবে আবিষ্কার করতাম। যেদিন জানতে পারলাম প্রিয় দুলাল কাকু আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামেরও একজন অকুতোভয় যোদ্ধা সেদিন তার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসে। একাত্তরে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে ইসলামাবাদের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই তিনি বিলেতে পালিয়ে যান। ইস্তফাপত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ঘোষণা দেয়ার অপরাধে ইয়াহিয়া সরকার তার স্থাবর-অস্থাবর সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে। তবুও আপস করেননি আমাদের দুলাল কাকু। দেশ মাতৃকার প্রতি গভীর ভালোবাসা আর মমত্ববোধ ছিল তার। জীবদ্দশায় সাহিত্যকর্মসহ সকল কর্মে সযত্নে সেটারই প্রকাশ রেখে গেছেন।

সম্প্রতি চ্যানেল আই-এর ছাদ বারান্দায় আনন্দ আলো সাহিত্য আড্ডার পক্ষ থেকে ফজলুল আলম স্মরণে এক স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছিল। বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক মনসুর মুসা, সাবেক সচিব মঞ্জুরুল করিম, বিশিষ্ট শিশুসাহিত্যিক রফিকুল হক দাদু ভাই, হাসান হাফিজ, আমীরুল ইসলাম, আহমাদ মাযহারসহ নবীন-প্রবীণ কবি সাহিত্যিকরা সভায় বক্তব্য রাখেন। সভায় ফজলুল আলম স্মরণে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশের প্রসৱাব করা হয়।

ব্যক্তিগত ভাবে আমি এখনও পুরোপুরি আত্মস্থ হতে পারিনি যে ফজলুল আলম অর্থাৎ আমাদের দুলাল কাকু আমাদের মাঝে নেই। কারণ আমি এখনও চ্যানেল আইতে ঢুকলে তার দরাজ গলায় সেই হাসির শব্দ শুনতে পাই। ঐ তো দুলাল কাকু হাসছেন। আহ! কী প্রাণবন্ত, মায়াময় সেই হাসি! আমরা যেন তাকে ভুলে না যাই।