আবার ফিরে দেখার-রাবেয়া খাতুন

আবার ফিরে দেখার-রাবেয়া খাতুন

314
SHARE
Rabeya-Khatun

নদীর নাম মধুমতি। গ্রামের নাম পাওসার। নদীর গা ঘেঁষে গড়ে উঠেছে গ্রামটি। ঐ গ্রামে ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর নন্দিত কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের জন্ম। দিনটি ছিল শুক্রবার। পৌষ মাস।
রাবেয়া খাতুনের বাবা সরকারি চাকরি করতেন। বিশেষ দিনে তিনি ছুটি নিয়ে শ্বশুর বাড়িতে যেতেন দাওয়াত খেতে। এটা ছিল তখনকার দিনের সামাজিক রীতি।
বাবা শ্বশুর বাড়িতে বৃহস্পতিবার এলেন দাওয়াত খেতে। পরের দিন শুক্রবার জন্ম নিলেন রাবেয়া খাতুন। শ^শুর বাড়িতে বাবার আর দাওয়াত খাওয়া হলো না। ফিরে এলেন নিজের বাড়িতে। পথে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। ভাই উৎসুখ হয়ে জিজ্ঞেস করলেনÑ ভাই শ্বশুর বাড়িতে কেমন কাটল?
বাবা গম্ভীর হয়ে জবাব দিয়েছিলেনÑ ভালোই কাটল। আমাদের একটা মেয়ে হয়েছে। তখনকার দিনে ছোট মেয়েকে গেদি বলা হতো।
নানার বাড়ি আর দাদার বাড়ি মিলে কেটে যাচ্ছিল রাবেয়া খাতুনের শিশুকাল। মা ও মেয়েকে শহরে নেয়ার তোড়জোড় চলছিল। রাবেয়া খাতুনের দাদা ছিলেন কবিরাজ। তিনি প্রায়শই ভাবতেন এতটুকু বাচ্চা শহরে যাবে। শহরের পরিবেশে মানুষ হবে। তিনি কবিরাজি পদ্ধতিতে শিশু রাবেয়া খাতুনের যতœ নিলেন পাক্কা এক বছর।
শহরে বাবা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। সেখানেই শিশুকালটা অনেক ভালোই কাটছিল রাবেয়া খাতুনের। তাঁর বয়স ৬ কি ৭ বছর। হঠাৎ একদিন এক বড় ভাই তাকে রাস্তা থেকে ধরে বাড়ি নিয়ে গেলেন। মা গোসল করিয়ে নতুন পোশাক পরিয়ে দিলেন। রাবেয়া খাতুন স্কুলে যাবেন সে কারণে এত আয়োজন। পুরনো ঢাকার মালিটোলা গার্লস হাইস্কুলে বেবী ক্লাসে ভর্তি হলেন রাবেয়া খাতুন। তবে লেখাপড়ায় তার হাতে খড়ি মায়ের কাছ থেকে।
দিন ভালোই যাচ্ছিল। রাবেয়া খাতুন তখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। হঠাৎ একদিন পাড়ার সর্দারের কাছ থেকে রাবেয়া খাতুনের স্কুলে যাওয়া নিয়ে আপত্তি তোলা হলো।
বলাবাহুল্য ঢাকার বিভিন্ন এলাকা তখন সর্দারদের আইনে চলত। ঝগড়া বিবাদ মিটাতে সবাই এলাকার সর্দারের শরণাপন্ন হতো। মেয়েদের ক্ষেত্রে পর্দা প্রথা ছিল বেশ কড়াকড়ি। মহল্লার মসজিদেই ‘আচার-বিচার’ হতো। মৃতদেহের সৎকারও করা হতো মসজিদ কমিটির নেতৃত্বে। মসজিদেই বিবাহ পড়ানো হতো।
মহল্লার মসজিদেই রাবেয়া খাতুনের বাবাকে ডাকা হলো। তাকে জোরাল ভাষায় বলা হলোÑ আপনার মেয়ে বড় হয়েছে। স্কুলে যায়। সদর রাস্তা দিয়ে চলে। পর্দা মানে না। মহল্লায় থাকতে হলে এসব চলবে না।
বাবা বাসায় এসে মাকে বললেনÑ কাল থেকে মেয়েকে আর স্কুলে পাঠাবে না।
মায়ের মন খারাপ। মেয়েকে ডেকে নিয়ে বললেন-কাল থেকে তোমাকে আর স্কুলে যেতে হবে না।
মেয়ের স্কুল যাওয়া নিয়ে এলাকার সর্দারের সিদ্ধান্তে বাবা-মা যারপর নাই ব্যথিত হয়ে উঠলেন। কিন্তু মেয়ে মহাখুশি। কী মজা। আর স্কুলে যেতে হবে না।
স্কুলে যাওয়া বন্ধ হলো রাবেয়া খাতুনের। অখÐ অবসর। মহল্লার সমবয়সীদের সঙ্গে কতক্ষণই বা খেলাধুলা করা যায়। অবশ্য খেলাধুলার ক্ষেত্রেও আছে বিধি নিষেধ। মেয়েদের ক্ষেত্রে দৌড়ঝাপ করা নিষিদ্ধ। গল্প, উপন্যাস পড়া শুরু করলেন রাবেয়া খাতুন।
আব্দুল মজিদ নামে তাঁর এক কাজিন ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন মুসলিম হলে থেকে অর্থনীতিতে পড়াশুনা করতেন। তিনিও প্রচুর গল্পের বই পড়তেন। সপ্তাহের প্রত্যেক শনিবার তিনি রাবেয়া খাতুনদের বাসায় আসতেন। রবিবারে হলে ফিরে যেতেন। আব্দুল মজিদ বাসায় এলেই বড়দের মধ্যে, বিশেষ করে মেয়েদের মধ্যে এক ধরনের ব্যস্ততা দেখা দিত। রাতের খাওয়া দাওয়াসহ প্রয়োজনীয় কাজ তাড়াতাড়ি সেরে নিয়ে বাসার মেয়েরা আব্দুল মজিদকে নিয়ে বসতেন তার মুখে গল্প শোনার জন্য। আব্দুল মজিদের মুখে শোনা এক একটি গল্পকে মনে হতো একেবারেই বাস্তব। সেজন্য বারণ থাকা সত্তে¡ও রাবেয়া খাতুন কখনও লুকিয়ে কখনও প্রকাশ্যে গল্পগুলো শুনতেন। কখনও সেক্সপিয়ার, কখনও রবিঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিভিন্ন উপন্যাসের গল্প শোনাতেন আব্দুল মজিদ। মন্ত্রমুগ্ধের মতো এই গল্পগুলো শুনতেন রাবেয়া খাতুন। সেই সময়কার স্মৃতি আউরিয়ে বললেনÑ যেহেতু স্কুলে যাওয়া হচ্ছে না। তাই কয়েক বছর মজিদ ভাইয়ের মুখে নানান গল্প শুনে শুনে বড় হলাম। পরবর্তীতে বড় হয়ে রবীন্দ্রনাথসহ যার লেখাই পড়েছি মনে হতো এই গল্প তো আমার জানা। তখন মজিদ ভাইয়ের কথা মনে পড়তো।
Rabeya-Khatun-1আমাদের পরিবারে আরো একজন আমাকে গল্প শোনাত। তিনি আমার বড় বোন নূরজাহান বেগম। তিনি হাত পা নেড়ে নেড়ে সুন্দর করে রূপকথার গল্প শোনাতেন। মনে হতো কিছুই মিথ্যে নয়। সবকিছুই চোখের সামনে ঘটছে। রাক্ষস খোক্কস দেখছি। তিনি শুধু গল্প নয়, চমৎকার কাপড়ের পুতুল বানাতে পারতেন। আমি সেই পুতুলগুলো দিয়ে ছোট ছোট গল্প বানাতাম। আপা আরো একটি কাজ করতেন। সুইসুতা দিয়ে চমৎকার দৃশ্য তৈরি করতেন। আমার ডাক্তার কাকা (বাবার ছোট ভাই) ছবি এঁকে দিতেন। আপা সেই ছবিগুলো কাপড়ে সেলাই করে সেগুলো আরো স্পষ্ট, সুন্দর করতেন। পরে সেগুলো বাঁধাই হতো। সেকালে এইসব সেলাই বাঁধাই হয়ে বাইরের ঘরের দেয়ালে শোভা পেত। প্রকৃতির এই ছবিগুলো, এই হস্তশিল্পের ছবিগুলো আমাকে গল্প লেখায় সাহায্য করতো। মনে মনে ভাবতাম বড় হয়ে ‘আমি মজিদ ভাই ও নূরজাহানের মতো অন্য মানুষকে লিখে গল্প শোনাব। মজিদ ভাই একদিন বললেন, শুধু লিখে ঘরে ফেলে রাখলে চলবে না। লেখাগুলোকে সূর্যের আলো দেখানোর জন্য বাইরে পাঠাতে হবে।
ছোট গল্প কি, কাকে ছোট গল্প বলে তখনও আমার জানা নেই। আমার ধারণা ছিল লেখা ছোট হলেই সেটা ছোটগল্প। পড়ে পড়ে ছোট গল্পের কিছুটা আন্দাজ করতে পেরে গোটা দুই গল্প বিভিন্ন পত্রিকায় ডাকযোগে পাঠালাম। কিন্তু আমার শ্রম প্রতিবারেই ব্যর্থ হতো।
এই সময় একটা ঘটনা ঘটল। তখনকার দিনে কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ম্যাট্রিকের পরীক্ষার্থীদের জন্য প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা থাকতো। এ নিয়ে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাপা হতো। নারায়ণগঞ্জ থেকে এমন একটি বিজ্ঞাপন বের হলো। তারা নজরুল ইসলামের ওপর বিশেষ প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে সারাদেশে। মেধাবী ছেলে-মেয়েদের মধ্যে একজনকে পুরস্কার দেয়া হবে। আমার কি মনে হলো… আমিওতো অংশ নিতে পারি। কিন্তু মুশকিল হলো আমার নামে লেখা পাঠান চলবে না। কারণ বাড়ির লোকেরা এসব পছন্দ করে না। আমার নামে চিঠিপত্র এলে সেগুলো প্রথমে বাড়ির লোকজনের হাতে চলে যায়। তবুও লেখা পাঠালাম। ঐ প্রতিযোগিতায় সারাদেশে আমার পাঠানো লেখা বাংলাদেশে প্রথম হলো। নাম ঠিকানা ছাপা হলো আমাদের বাড়ির। লেখকের নামের জায়গায় আমার ছোট ভাইয়ের নাম ছাপা হয়। কারণ আমি তার নামেই লেখাটি পাঠিয়েছিলাম। উদ্যোক্তারা প্রাইজ নিতে আহŸান জানায়। ব্যাপারটা আমি আর আমার ছোট বোন সুফিয়াই জানি। কিন্তু এই ঘটনা আমাদেরকে অদ্ভুত বিপদে ফেলল। পুরস্কার কে আনবে? ভাইটি ছোট। আমার পক্ষে তো যাওয়া সম্ভব নয়। ভেবেছিলাম সবই ডাকযোগে হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল তার উল্টোটা। আমার তখনকার সব লেখা সুফিয়ার হস্তাক্ষরে যেতো। কারণ আমার হাতের লেখা এত বিশ্রি ছিল যে, তা কারও পক্ষে বোঝা মুশকিল ছিল। বোনদের সঙ্গে পরামর্শ করতে লাগলাম কি করবো এখন? পুরস্কার নেয়ার আনন্দ কি মাটি হবে? অন্যদিকে পুরস্কার আনার কোনো উপায় নাই। বুদ্ধি করে একটা চিঠি দিলাম উদ্যোক্তাদের। ছোট ভাইয়ের নামেই চিঠি লিখলামÑ আমি গাছ থেকে পড়ে আহত হয়েছি। নির্ধারিত তারিখে আমার পক্ষে পুরস্কার নিতে আসা সম্ভব নয়। পুরস্কারটি ডাকযোগে পাঠিয়ে দিন। কিন্তু এই চিঠির আর কোনো জবাব পেলাম না। জীবনের প্রথম পুরস্কার পরিহাসের মতো এলো এবং গেল।
এরপর আরেকটি ঘটনা ঘটল। ইতোমধ্যে বিভিন্ন পত্রিকায় আমার চারটি ছোট গল্প ছাপা হয়েছে। যুগের দাবি, বেগম, মাহেনও এবং একটি সরকারি পত্রিকায়।
আমাদের বাড়ির উঠোনে একদিন হঠাৎ পিয়ন এসে হাজির। আমার নাম ধরে ডাকছে। আমার নামে মানি অর্ডার আছে। বাড়ির সবাই অবাক। আমাকে কে টাকা পাঠাবে? আমি পিয়নের কাছে যেতেই একটা দশ টাকার নোট আমাকে ধরিয়ে দিল। জানলাম মাহেনও থেকে আমার লেখার সম্মানী পাঠানো হয়েছে।
আমার স্বপ্ন ছিল একটি ফাউন্টেন পেনের। বাবা, কাকা কেউ কথায় কান দেয়নি। বরং বিরক্তি প্রকাশ করেছে। দশ টাকা পেয়ে ভাবলাম কলম কিনব। কিন্তু হলো না। স্বপ্ন, স্বপ্নই রয়ে গেল।
ইতোমধ্যে আমরা বাসা বদল করেছি। পুরনো ঢাকার ভাড়াবাড়ি ছেড়ে শান্তিনগরে বাবা বাড়ি কিনেছেন।
সিদ্ধেশ^রী হাইস্কুলটি তখন একেবারে উঠে যাওয়ার মতো অবস্থা। কারণ শিক্ষার্থীরা বেশির ভাগই ছিল হিন্দু। দেশ ভাগের কারণে তারা চলে যাওয়ায় স্কুলটি বন্ধ হবার পথে…। এক ভদ্রলোক তখন স্কুলটি আবার চালানোর চেষ্টা করলেন। তার নাম মনে নেই। কিন্তু একথা মনে আছে তিনি এবং তার সঙ্গীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকা সংগ্রহ করছেন। এতদূরে কম টাকায় কোনো মহিলাকে শিক্ষক হিসেবে পাওয়া যাচ্ছিল না। তারা তখন কাছাকাছি পাড়ার মধ্যে (যেখান থেকে হেঁটে স্কুলে আসা যায়) শিক্ষক পাওয়া যায় এমন চেষ্টা চালাল। একদিন তারা আমাদের বাসায় এলো বাবার কাছে আমার ব্যাপারে কথা বলার জন্য। আমাকে চাইল শিক্ষয়িত্রী হিসেবে।
স্কুল আমাদের প্রায় বাসার কাছে। আমি তখন ম্যাট্রিক পাস করেছি। সুতরাং স্কুলে চাকরি হয়ে গেল। আমার মতো আরো কয়েকজনের চাকরি হলো। মাসিক বেতন ৩০ টাকা। তার ওপর মাঝে মাঝে বাড়তি ভাতাও থাকতো।
এই স্কুলে চাকরি নেবার পর কেমন একটা বিশ^াস এলো নিজের ওপর। স্কুলের হেড মিসট্রেস হয়ে এলেন জাহানারা ইমাম। তিনি আমার লেখা পড়তেন এবং আলাপ হতেই চমৎকার একটা সম্পর্ক গড়ে তুললেন আমার সঙ্গে। ইতোমধ্যে একদিন তাঁর সঙ্গে পুরনো ঢাকায় নাজিমউদ্দিন রোডে রেডিও স্টেশনে গেলাম। রেডিওতে গান বাজনা ছাড়া আর কিছু হয় এমন ধারণা ছিল না। সেই প্রথম জানলাম রেডিওতে গল্প পড়া হয়। একটা গল্প পড়লাম। পরিচয় হলো তখনকার ডাকসাইটে লেখক শামসুদ্দিন আবুল কালামের সঙ্গে। আমি গল্প পাঠ করলাম একটি। চেক পেলাম ২০ টাকার। চেকের কথা বইতে পড়েছি। সিনেমায় দেখেছি। সেটা যে কখনও আমি পাব ভাবিনি। চেক ভাঙ্গিয়ে প্রথমেই ৯ টাকা দিয়ে একটি কলম আর ১ টাকা দিয়ে কালি কিনলাম।
এর আগে লিখতাম কালিতে কলম কালিতে চুবিয়ে চুবিয়ে। নতুন কলম পেয়ে আমার মনে খুব আনন্দ হলো। কিন্তু রেডিও অফিসে যাওয়াটা বাড়ির কেউ পছন্দ করলো না এবং বাড়ির লোকজন কলমকেও বিশেষ পছন্দ করল না। বোধহয় তাদের ধারণা ছিল কলম থাকবে এমএ, বিএ পড়া মানুষের পকেটে। কলম কিনে বাবার কাছে মৃদু বকুনিও খেলাম এবং সেদিন প্রচুর কেঁদেছিলাম। কলম কেনার আনন্দ কিছুটা ¤øান হয়ে গেল।
নতুন বিপদ এল আপার শ^শুর বাড়ি থেকে। বাবাকে একটি চিঠিতে জানান হলো, আপনার মেয়ের হাতের লেখা পরপুরুষে দেখিতেছে। ইহা উভয় পরিবারের জন্য অসম্মানের ব্যাপার…।
আবার নিষেধ। আজিজকে দিয়ে গোপনে লেখা পাঠাতে লাগলাম। তখন নওবাহার দিলরুবা আরো আরো পত্রিকা ঢাকা থেকে বেরুচ্ছে।
এই সময় আমার বিয়ে হয়ে যায়। স্বামী ফজলুল হক বিত্তবান কেউ না। একটি সিনেমা পত্রিকার মালিক এবং সম্পাদক। জীবনে এই পরিবর্তনটা যেন প্রয়োজন ছিল। আমি মনে মনে চাইতাম অসংখ্য বই এবং লেখার পরিবেশ, সময় সুবিধা। ফজলুল হক মাসে দুটা বই কিনতেন আর আমি পরিচিতজনদের কাছ থেকে ধার নিয়ে বই পড়তাম। ইতোমধ্যে আমার বোন সুফিয়ার হাতের লেখা নয়, আমার হাতের লেখায় বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প পাঠাচ্ছি।
সিনেমায় আমরা চারজন কর্মী ছিলাম। ফজলুল হক, কাইয়ুম চৌধুরী, জহির রায়হান এবং আমি। জহির, কাইয়ুম তখন ছাত্র। তবুও প্রত্যেক দিন তারা সিনেমা অফিসে আসতো। সিনেমার অফিসে এ সময় বিভিন্ন লেখক এবং গায়কদের আসর হতো। এই সময় ওবায়দুল হকের ‘দুঃখে যাদের জীবন গড়া’ ছবিটি রিলিজ পায়। ছবিটি ভালো হলেও বক্স অফিসে মার খেল।
আমাদের আসরে তরুণ লেখকরাই আসতো। এসময় জহির রায়হানের সঙ্গে ফজলুল হকের পরিচয় ঘন বন্ধুত্বে পরিণত হয়। তখনকার পত্রিকার অফিসগুলো পুরনো ঢাকাতেই ছিল। সেখানে ইত্তেহাদ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা বের হতো। তার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি আহসান হাবিব। তিনিও এই আসরের একজন হয়ে গেলেন। তখনকার নামি লেখক আ মু, আব্দুল হাই থাকতেন খুলনায়। তিনিও আমাদের আসরে মাঝে মাঝে আসতেন। সবাই মিলে জমজমাট আসর হতো। সৈয়দ শামসুল হক আমাদের পাড়ার কোথাও থাকতেন। তিনিও মাঝে মাঝে শরিক হতেন।
সাধারণত লেখকের লেখা ভালো লাগলে তাদের দেখতে ইচ্ছে করে। আমিও এ ব্যাপারে উৎসাহী ছিলাম। বিশেষ করে আলাউদ্দিন আল আজাদ ও গাফফার চৌধুরীর লেখা ভালো লাগত। ওরাও তখন আমাদের এখানে আসতে শুরু করল এবং অন্তরঙ্গভাবে মিশে গেল আমাদের সঙ্গে। তখন এতগুলো লেখকের ভেতর একমাত্র মহিলা আমি। এবং প্রত্যেকের সঙ্গে আমার ছিল অন্তরঙ্গভাব। আমরা কে কেমন লেখছি কিংবা কে কোথায় লিখছি লেখাগুলো নিজেদের মধ্যে পড়া হতো এবং আলোচনা করা হতো।
আলাউদ্দিন আল আজাদকে নিয়ে আমার বেশ কৌত‚হল ছিল। সে এলো একদিন হঠাৎ। দেখলাম কালো, লম্বা অতি সাধারণ চেহারার একজন মানুষ। কিন্তু একঘর লেখকের মধ্যেও ভারী স্পষ্ট। আমার সঙ্গে তখনই পরিচয়। অথচ ও নির্দ্বিধায় সবার সামনে বলল, আমি কিন্তু অন্যদের মতো তোমাকে ভাবি বা আপা বলে ডাকতে পারবো না। আমি বললাম, তাহলে নাম ধরে ডাকবেন?
ও সামান্য হেসে বলল, না, নামটা আমিই পছন্দ করব এবং ডাকবোও। তোমাকে আমি ‘নায়িকা’ বলে সম্বোধন করবো।
ঘরের সবাই একদিকে আশ্চর্য অন্যদিকে খুশি হলো। সেই থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ও আমাকে এ নামেই ডাকতো। কোনো সংকোচ বা দ্বিধা কখনো দেখিনি। আমাদের সবার সম্পর্ক খুব সহজ ছিল। কে ছেলে কে মেয়ে হিসাব না করে আমরা সবাইকে লেখক মনে করে মেলামেশা করতাম।
একদিন আমাদের বাসায় আলাউদ্দিন আল আজাদ ও শামসুল হক দুপুরে খেয়ে আড্ডায় এসেছে। আড্ডা চলছে। আজাদ একটি গল্প শুনিয়ে বলল, দ্যাখো আমি এই মাত্র যে গল্পটা শোনালাম সেটা কিন্তু একদম সত্যি। আমার কৈশোর বেলার এক বন্ধু হঠাৎ মারা যায়। গ্রামের লোক তাকে যথাযথ নিয়মে কবর দেয়। ঠিক তার কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখে পড়ে কবরের মাটি নড়ছে। আমরা হৈচৈ করে মাটি সরাতে লেগে গেলাম এবং চরম বিস্ময়ে চোখের ওপর দেখলাম কাফন পরা অবস্থায় আমার বন্ধুটি কাদা মাটিসহ উঠে দাঁড়িয়েছে। আমরা গ্রামের লোকেরা ভ‚ত ভ‚ত বলে চেঁচালেও তরুণরা তাকে মেনে নিল এবং পরে জানা গেল গ্রামের ডাক্তার তার মৃত্যু বুঝতে পারেনি।
এই কথা বলে সে আমার এবং হকের দিকে তাকিয়ে বলল, তোমরা দুজনেই কিন্তু লেখক। দেখো আবার আমার গল্প নকল করে বসো না। আমি তখন চরম বিস্ময়ে ভাবছি একজনের লেখা অন্যজন নকল করে কীভাবে? কিন্তু পরবর্তী সময় দেখেছি আজাদের কথাটি একেবারে মিথ্যে নয়। লেখককে দেখার ইচ্ছে সব সময় এক হতো না। কল্পনায় যাকে যা ভাবতাম বাস্তবে তাকে মনে হতো অন্যরকম। কিন্তু একটা ব্যাপার খুব ভালো লাগত তখনকার লেখকরা সবাই প্রায় সপ্রতিভ এবং আন্তরিক ছিল।
সমালোচনা সাহিত্য বর্তমানে তো উঠেই গেছে বলতে গেলে। কিন্তু আমাদের সময় সাহিত্য সমালোচনা ছিল অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও প্রবল। প্রত্যেকটি সমালোচনা হতো কঠোরভাবে। অতি পরিচিতজনকেও কেউ ছেড়ে কথা বলতেন না। সিনেমা অফিসে সাধারণত সাহিত্যের আসর হতো সন্ধ্যায়। এর মধ্যে জহির রায়হান, কাইয়ুম চৌধুরী মাঝে মাঝে আমাদের সঙ্গে খেতো। হঠাৎ হয়তো দেখা যেতো টুপটাপ বৃষ্টির মধ্যে রুমালে বেধে একহালি ডিম নিয়ে হাজির গাফফার চৌধুরী। রান্না হয়তো তখন হয়ে গেছে। অসংকোচে তিনি বলতেন, কাজ বাড়াতে এলাম। আবার রান্না হোক। এবার ভাত নয়, খিচুরি রান্না হতো। সবাই মিলে খাওয়া দাওয়া করা হতো হৈ চৈ করে।
দিন ভালোই কাটছিল। কিন্তু সিনেমা পত্রিকা একদিন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। কারণ বোধহয় বিজ্ঞাপনের ঘাটতি এবং নতুন পাঠক তৈরি না হওয়া। পরিস্থিতি বুঝে জাহানারা ইমাম আপা একদিন আমাকে বললেন, পত্রিকায় কাজ করবে?
Rabeya-Khatun-2এটা ছিল আমার স্বপ্ন। আমিতো এক কথায় রাজি। তখন আমার বিয়ে হয়নি। জাহানারা আপা এলেন এ ব্যাপারে বাবা, কাকার সঙ্গে কথা বলার জন্য। বাবার বয়সি দুজন পুরুষের সঙ্গে অকাট্য সব যুক্তি দাঁড় করালেন। বাবা কাকা রাজি হলেন। শান্তিনগর থেকে ওয়াইজঘাট। কম দূরের পথ নয়। পাকিস্তান হবার পর রিকশা পথে নেমেছে। ঘোড়ার গাড়ি দিন দিন কমছে। সরকারি বাস তখন তুলনামূলকভাবে খুবই কম। তাও আবার শান্তিনগরে কোনো স্টপেজ নেই। হেঁটে এসে পুরনো পল্টন থেকে বাসে উঠতে হয়।
জাহানারা ইমাম বললেন, আমরা রিকশায় যাব। বাবা বললেন, আমার মেয়ে ঢাকার পথঘাট সবই চিনে কিন্তু তাকে একা কখনো ছাড়িনি। জাহানারা ইমাম হেসে বললেন, আমি জানি সেই জন্য ঠিক করেছি স্কুলের পর পত্রিকার অফিসে যাব তারপর রিকশায় বাড়ি ফিরব। এই পথটুকু জাহানারা ইমাম আমার সঙ্গে আসতেন। এরপর যেতেন আজিমপুরা নিজেদের ফ্লাটে। এমনি করে কিছুদিন পর আমি চেনা রিকশাওয়ালা ঠিক করে মাসিক হিসেবে ভাড়া নির্ধারিত করে ঐ পথটুকু একাই ফিরতাম।
জাহানারা আপার অনেকখানি সময় বাঁচতো তাতে। তখন তার ছেলে রুমি খুবই ছোট। মায়ের জন্য তার খুব জেদ ছিল। যেতেই জড়িয়ে ধরতো।
পত্রিকার নাম মাসিক খাওয়াতিন। খাতুন মানে ভদ্রমহিলা। আর খাওয়াতিন মানে ভদ্রমহিলাগণ। সেজন্য পত্রিকার নাম খাওয়াতিন। এই পত্রিকাটি দু’মাস ভালোই চলল। তারপর দেখা দিল বিজ্ঞাপনের সমস্যা। এই পত্রিকাটিও বন্ধ হয়ে গেল। এরপরই আমার বিয়ে হয়। আমি সিনেমা পত্রিকায় যোগ দেই। সেই পত্রিকাও একদিন বন্ধ হয়ে যায়।
হক তখন একটি মেয়েদের পত্রিকা বের করার সংকল্প নেয়। কাগজের নাম অঙ্গনা। মাসিক। আমি জহির রায়হান এবং কাইয়ুম চৌধুরী পত্রিকাটি বের করতাম এবং কাইয়ুম, জহির কাগজটি সম্পর্কে যথেষ্ট চিন্তা ভাবনা করতো। সব মহিলা পত্রিকার মতো এই অঙ্গনায় শুধু মহিলাদের লেখা নয়, ছেলেদের লেখাও ছাপা হতো। এবং পত্রিকাটি চেহারা ছুরতে ও বিষয় বৈচিত্র্যে বেশ সাড়া ফেলেছিল। কিন্তু ঐ পর্যন্তই। দুটি সংখ্যা বের হয়ে অঙ্গনা বন্ধ হয়ে গেল। তখন আবার সিনেমা পত্রিকা বের হতে লাগল। সেই সময় বাজারে চিত্রালী বেরিয়েছে। আরো কয়েকটি সিনে ম্যাগাজিন বেরুলো। আয়ু সংক্ষিপ্ত হলেও একের পর বেরুতেই লাগল। তখনও পত্রিকার পাঠকগোষ্ঠী গড়ে ওঠেনি। সবাই পশ্চিমের পত্রিকাগুলোর জন্য আগ্রহী ছিল। লেখকরাও একসময় বলল, আমাদের কিছু হবে না। কিন্তু অপর দল হাত মুঠি করে বলল, অলবৎ হবে। আমাদের কিছু ভালো লেখা চাই।
সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ এবং শওকত ওসমান সেই সময় খুবই নামকরা। নতুনরা বলল, এই শূন্যস্থান পূর্ণ করার দায়িত্ব আমাদের। ভালো প্রকাশক পেতে হবে। লেখক ও পাঠকও তৈরি করতে হবে। কয়েক বছর পর দেখা গেল পশ্চিমের পাঠকের চোখ আমাদের দিকেও পড়েছে। কয়েকজন নতুন প্রকাশক সেসব ব্যাপারে খুব আগ্রহী। একসময় দেখা গেল আমাদের সত্যি একটি পাঠক দল তৈরি হয়ে গেছে।
বাজারে ধীরে ধীরে বইয়ের চাহিদা ও বিক্রি বাড়ল। পাঠকরা এদেশের লেখক-লেখিকার লেখা সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠল।
বিদেশি লেখকদের মধ্যে কে কার প্রিয় এসব নিয়ে আলোচনা হতো। আমার প্রিয় লেখক ছিল আর্নেস্ট হেমিং ওয়ে। দ্য ওল্ডম্যান ইন দ্য সি আমার তখনকার সবচেয়ে প্রিয় বই ছিল। তখন নিজেদের লেখা নিয়ে খুবই ব্যস্ত ছিলাম। প্রত্যেকের সঙ্গে এ ব্যাপারে প্রতিযোগিতা ছিল কাজের। কিন্তু ব্যক্তি আক্রোশ কিংবা হিংসা এখনকার মতো তীব্র, তীক্ষè ছিল না।
এই সময়কার ঈদ সংখ্যাগুলোর কথা বলতে হয়। প্রত্যেকে চেষ্টা করতো ভালো কাগজ করার এবং একসময় দেখা গেল প্রতিটি ঈদ সংখ্যায় বিশেষ কয়েকজন লেখক ৪/৫টি করে উপন্যাস লিখছেন। কয়েক বছর এটা ছিল। এ নিয়ে আহসান হাবিব একদিন বলেছিলেনÑ তোমরা একি শুরু করলে? এত আত্মঘাতির মতো। এক ঈদে ৪/৫টি করে উপন্যাস লিখলে লেখার মান কি ঠিক থাকবে? পরবর্তী সময়ে এই প্রবণতা অনেকটা কমে এসেছিল।
এমনি করে আমরা দিনে দিনে এগিয়ে গেছি। কিন্তু কালের ডাকে অনেকে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। এটা আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। এই ক্ষতি পূরণ হতে সময় লাগবে। আমরা সেই সময়ের অপেক্ষা করছি।