Home এক্সক্লুসিভ আনন্দ আলোর জন্মদিনে আমার বিচ্ছিন্নপত্র

আনন্দ আলোর জন্মদিনে আমার বিচ্ছিন্নপত্র

SHARE
Tanvir-Tareq

তানভীর তারেক: কলকাতার প্রখর রোদের দুপুর বেলা। সল্টলেকের দিকে যাচ্ছি। বাসায় তার সাথে একবেলার সাক্ষাৎ। বিকেলেই একটা কাজে বের হয়ে যাবেন। তার আগে যেটুকু সময় পাওয়া যায়, সেটুকুই সাক্ষাৎ পাবো। পার্কস্ট্রীট থেকে ট্যাক্সি নিয়ে যাচ্ছি। পথ যেন শেষই হতে চায় না।

যার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি তিনি জয় গোস্বামী। তার সাথে আমার তৃতীয় সাক্ষাৎ। কিন্তু এবারেরটা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ সেইবার জয় দা’র সাথে ভ্রমণ নিয়ে একটি পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় লিখবো বলে কথা দিয়ে এসেছিলাম। রাস্তাতেই অধিকাংশ সময় চলে গেলে তো বিপদ! কথা বলার সময় আর বেশি পাবো না।

দীর্ঘ আড্ডা চলতে থাকলো। চা আর বিস্কিটের সাথে। দুপুরে খাবারের কোনো পরিকল্পনা নেই। কিন্তু আড্ডার ভেতরে আমি জয়দা’কে নস্টালজিয়ায় নিয়ে গেছি। সেই বিভ‚তিভ‚ষণের বাড়িতে গিয়ে কীভাবে আনন্দবাজারের এসাইনমেন্ট করলেন, সেই তরুণবেলায়। এইসব প্রশ্ন করে তাকে তার তরুণবেলার ভেতরেই রাখার চেষ্টা করছি।

জয় গোস্বামীকে দেখলাম বেতের সোফায় এবারে পা মুড়িয়ে বসলেন। আমি ভয়ে ভয়ে ঘড়ি দেখলাম। আর মাত্র ১ ঘণ্টা সময় আছে তার সাথে আড্ডা দেবার। অথচ আমার অনেক প্রশ্ন। অনেক কৌত‚হল তখনও বাকি। জয় গোস্বামী তখন বলছেন আনন্দবাজারের বাঘা সম্পাদক সাগরময় ঘোষ কেন তাকে কবিতা লেখা বাদ দিয়ে বিভ‚তিভ‚ষণের বাড়ি ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লিখতে দিলেন। ভাবছেন আর সেই সময়ে হারিয়ে যাচ্ছেন।

হঠাৎ করে নিজ থেকেই আমাকে উল্টো প্রশ্ন করে বসলেন, আচ্ছা বলোতো তানভীর; সাগরময় ঘোষ তখন আমাকে দিয়ে গদ্য লিখাবার চেষ্টা কেন করলো?

আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে কি বলবো। সাগরময় ঘোষের মনস্তত্ত¡ আমি এই নরাধম কীভাবে জানবো। এরপর এক কথা দু’কথা। তিনিই প্রশ্ন করলেন আমাকে, আবার তিনিই জবাব দিলেন। এরপর জয় গোস্বামী ফোন করে সন্ধ্যে বেলার একটি অনুষ্ঠান বাতিল করলেন।

নন্দনে একটি থিয়েটার দলের অনুষ্ঠান ছিল সেদিন।

জয় দা বললেন,‘ওখানে গিয়ে কি বলবো। আরো অনেক বলার লোক আছে। তার চেয়ে আরো একবেলা তোমার সাথে গল্প করি।’ আমি তো মহাখুশি!

সেই ইন্টারভিউ-এর বিস্তারিত লিখেছিলাম পাক্ষিক অনন্যার ঈদ সংখ্যায়।

সেই বোনাস বেলা পাবার পরে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা হলো জয় গোস্বামীর সাথে, তা হলো বিশ্বায়নের খোঁজ। আমরা অর্থনীতিতে পিছিয়ে থাকা সাহিত্যকর্মী বা শিল্পকর্মীরাই অনবরত বিশ্বায়নের ডালপালা খুঁজে বেড়াই। জয় দা বললেন, শুরুর দিকে আমারও খুব নিজের লেখার অনুবাদ করানোর একটা গভীর তাড়না থাকতো। এরপর দু একজনকে দিয়ে অনুবাদের কাজটিও করালো প্রকাশক। এরপরে দেখলাম একজন আমার কিছু কবিতা অনুবাদ করেছে। আমি আমার সেই অনূদিত ইংরেজি কবিতা আমারই এক পূর্ব প্রেমিকার মতো বান্ধবীকে পড়তে দিলাম।

আমি বললাম, ‘তারপর!’

এরপর সেই ইংরেজি অনুবাদে লেখা আমার কাব্য পড়ে সেই বান্ধবী আমায় সে কী গালাগাল !

তারপর থেকে আমি মহাবিরক্ত। অর্থাৎ ভাষান্তরে আসলে এভাবে অন্যের অনুবাদের আশ্রয় নিয়ে খুব বেশিদূর যাওয়া কিন্তু সম্ভব না। একেবারেই যে অসম্ভব সেটা বলছি না। কিন্তু অনেকক্ষেত্রেই মূল আবেদনটি নষ্ট হয়ে যায়। কবিতার ক্ষেত্রে এটা বেশি।’

এরপর নিজের কবিতার উদ্ধৃতি দিলেন তিনি Ñ

‘আপনার কেউ না আমি, দেখেছি বসতেন বারান্দায়

দেখেছি শীতের ভোরে রোদ্দুর আপনারই কাছে যায়’

এই যে আমার লেখা দুটো লাইন তোমাকে বললাম। এটা কীভাবে অনুবাদক লিখবে বলো। ও তো ভেতরের মূল অর্থই হয়তো বুঝবে না। বুঝলেও আমার মতো করে তো আর বুঝবে না।

প্রায় এরকমই প্রশ্ন করেছিলাম সুনীল দা’কেও। এক বিকেলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পারিজাত এপার্টমেন্টে বসে তার সাথেও বিচ্ছিন্ন কয়েকবেলা কাটানোর নির্জাস এখনও আমি ভুলতে পারি না।

সুনীল দা’কে বললাম, ‘আচ্ছা দাদা। সাধারণ পাঠককুলের ভেতরে আমরা তো প্রত্যাশায় ডুবে থাকি। আপনি বা হুমায়ূন আহমেদ কেন সাহিত্যে নোবেল পাবেন না। এটা আমার ব্যক্তিগত জিজ্ঞাসা। আপনি আপত্তি জানালে এই প্রশ্ন আমি ছাপবো না।

এক গাল হেসে বলেছিলেন, তানভীর তোমার অন্য সকল প্রশ্নের চেয়ে এই প্রশ্নটা খুবই শিশুসুলভ মনে হলেও এটিই কিন্তু সব থেকে ভারী প্রশ্ন।

দেখো, ওসব নোবেল-টোবেল অর্থনীতি, রাজনীতির আর বৈশ্বিক ক্ষমতাতন্ত্রের দাঁড়িপাল্লায় মেপে দেয়া হয়। বাংলা সাহিত্যে আপাতত সবচেয়ে ভালো লিখেও আর সম্ভব না নোবেল আনা। আর ওটার জন্য এত আকুলি করেই বা কি লাভ। আমরা বিদেশি পোশাক পরলেই তাকে যে সমীহ করার প্রবণতা শিখে ফেলেছি। সমস্যাটা সেখানেই তৈরি হয়েছে। এইটা থেকে বের হতে পারি না বলেই এতসব ঝামেলা।  আমি তো ব্যক্তিগত ভাবে দৃঢ়ভাবে মনে করি কবি শামসুর রাহমানের নোবেল পাওয়া উচিত ছিল। আমি এর আগেও কয়েক জায়গায় বলেছি এটা।

সুনীল দা আরো বললেন, ‘দেখবে কেউ বুকার পেয়ে গেলে উপমহাদেশে। পরের বইটা তার খুব বিকোচ্ছে। অথচ সবচেয়ে অখাদ্য লেখা দিয়ে প্রকাশক তখন ঐ বুকার পাওয়া লেখকের ঐ বইটি বের করার জন্য তড়িঘড়ি করে বসে। এটাই আমাদের অভ্যেসের সংস্কৃতি।

Shakib-joyaবিশ্বায়নের কথা লিখবো বলে ওপার বাংলার দুই কবিকে নিয়ে স্মৃতি হাতড়ে কি সব  লিখলাম। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পাক্ষিক আনন্দ আলো’র জন্মবার্ষিকী সংখ্যায় তাই এটা হোক আমার ‘বিচ্ছিন্নপত্র।’ আর সব লেখাতে কি উদ্দেশ্য বিধেয় থাকতেই হবে এমন তো কোনো মানে নেই!

যেমন জয় গোস্বামীর কথা শোনার পরই সাগরময় ঘোষের প্রতি কৌত‚হলটা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তার কথা কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে-

সাগরময় ঘোষ গত কয়েকদশক ধরে বাংলা সাহিত্যের লেখক বা সাহিত্যচাষীদের কাছে এক ভয়ংকর নাম। আমি সুচিত্রা ভট্টাচার্য’কে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম। তার স্মৃতিচারণা করতে। প্রথমেই বললেন, ‘ওরে বাবা সাগরদা’।

এই যে ‘ওরে বাবা’ শব্দটির ভেতরে অদ্ভুত এক শ্রদ্ধা থাকে সবার। অধিকাংশ কবি সাহিত্যিকদের ভেতরেই  তাই সাগরময় ঘোষ প্রসঙ্গে বলার আগে এই ধরনের ভয়ের অভিব্যক্তি গুণতে দেখেছি।

তাই একটুখানি বলে রাখি সাগরময় ঘোষ ৫০ দশকে খুব নিয়মিত লিখতেন গদ্য-গল্প। কিন্তু তার সম্পাদনার চাকরি হবার পর থেকেই তিনি পণ করলেন যে, নিজ সম্পাদনার কোনো কাগজে এক কলমও লিখবেন না। সেখানেও এক দারুণ ঘটনার স্মৃতিচারণা রয়েছে।

১৯৫৪ সালের কথা। রাষ্ট্রীয় কাজে সেবার রাজ্য সরকার পশ্চিমবঙ্গের ক’জন লেখককে একটি জায়গা পরিদর্শনের জন্য পাঠাবেন। আর লেখক বাছাইয়ের জন্য নাম চ‚ড়ান্ত করার দায়িত্ব দেয়া হলো তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সেই তারাশংকর সেবার প্রাথমিক নামের তালিকা থেকে সাগরময় ঘোষকেই বাদ দিয়েছিলেন। অথচ তার সম্পাদিত পত্রিকায় লেখক তারাশংকর নিয়মিত লেখেন। তারাশংকর বলেছিলেন ‘উনি আবার লেখক হলেন কবে?’

এই ঘটনাটির কথা একারণে উল্লেখ করলাম যে ঢাকা শহরে কোনো লেখক তার অলেখক সাহিত্য সম্পাদককে এভাবে বলতে পারবেন? আমাদের দেশে এ সময়ের প্রেক্ষাপটে কোনো সাহিত্য সম্পাদককে এভাবে সরাসরি বলার ক্ষমতা রাখেন কেউ? সেই সংস্কৃতিই হারিয়ে গ্যাছে। এখন যে যার মতো আত্মীকরণ করে লেখা ছাপা হচ্ছে। মূল মেধাবীদের জায়গা হচ্ছে না তাদের প্রকৃত প্লাটফর্মে!

যাইহোক; আমাদের দেশের গল্পে ফিরি। মূলত দুই বাংলার সাহিত্য ও চলচ্চিত্র চর্চার যে জোর প্রচেষ্টা চলছে এখন সে প্রসঙ্গে কথা বলা জরুরি। আমরা খুব চেষ্টা তদবীর করছি, চলচ্চিত্র বোদ্ধারা তো টকশোতে গলা ফাটিয়ে দেন। এই করতে হবে, সেই করতে হবে। নইলে হবে না। ইত্যাদি ইত্যাদি। কোথায় যেন কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না অথচ একটা তর্ক লেগে আছে।

কারণটা হলো গণমাধ্যম। ৬৯ থেকে শুরু করে নব্বই দশক পর্যন্ত সুনীল-সমরেশ-শীর্ষেন্দুরা তাদের কলকাতার গণমাধ্যমে যতটা বাংলাদেশি লেখকদের নিয়ে চর্চা করেছে। এরপরে সেই চর্চার গল্প এখন আর পাওয়া যায় না। একই ভাবে দীর্ঘদিন আটকে ছিল চলচ্চিত্র প্রসঙ্গেও। যদিও গত ২ বছর ধরে জয়া আহসানের কিছু চলচ্চিত্রে সাফল্যের পর দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে। শাকিব খানকে নিয়ে হাল আমলে চর্চা করছে ওদের আনন্দবাজার।

আবারও  তাই বিশ্বায়নের গল্পেই ফিরি। আমরা আমাদের চলচ্চিত্রকে বিশ্বায়নের যে চেষ্টা চালাচ্ছি তা আদৌ সঠিক পথে কি-না সেটিই এখন দেখার বিষয়। একটি ছোট্ট উদাহরণ দিলে বিষয়টি সহজ হবে।

আমরা এখন যে সংকটের ভেতর দিয়ে চলচ্চিত্রের পথ অতিক্রম করছি। তা হলো মুক্তবাজার অর্থনীতির আগ্রাসন। এটাকে এখন আর ‘আগ্রাসন’ বলে ভয়ে বসে থাকার কোনো মানেই নেই। যেমন মানে হয় না, শুধু টিভির জন্য এখন নাটক নির্মাণ করার। কারণ এখন একটি নাটকের দর্শক বিশ্বজোড়া বাঙালি। যাই হোক ভারতের দিক থেকে আমরা যে সংকটে আছি তা হলো হিন্দি ছবির বড় প্রচার এবং পাশাপাশি হলিউডি মুভির বিশাল ক্যানভাস।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রের চেহারাটা কিন্তু আমাদের চেয়েও ভয়ঙ্কর। ওদের বাঙালি দর্শকেরা আরো সংকীর্ণ । ওদের বাংলাকে ঠেলছে হিন্দি, তেলেগু, তামিল, মালায়লাম, কন্নড় ইত্যাদি নানান ভাষার চলচ্চিত্র। কিন্তু এই ভৌগোলিক অবস্থান বা পরিস্থিতিকে তো বদলানো যাবে না।

তাই তারা বিশ্ববাজারে কলকাতার বাংলা চলচ্চিত্রকে আরো হাইপ বাড়ানোর জন্য তাদের কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আড়ম্বর জাঁকজমক করে তুলেছে। একটি বড় মাপের ফেস্টিভ্যাল মূলত গ্রাম দেশের সাপ্তাহিক হাটের মতো। যদিও কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এখনও বিশ্বসেরা ১৫ টি ফেস্টিভ্যালের ভেতরেও আসেনি। তবুও তাদের আয়োজন এবং উদ্যোগে সাফল্য ঊর্ধ্বমুখী। অথচ দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এখনও সেই মানের তো দূরের কথা, কাছাকাছি কোনো মানের চলচ্চিত্র উৎসব আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠা পায়নি। ‘আন্তর্জাতিক’ নামে যে চলচ্চিত্র উৎসব চলে তা নিয়ে নানান ভিন্নমত রয়েছে।

এই কথাটির উদ্রেক এই কারণেই করলাম। যে একটি ছোট দেশে চলচ্চিত্রকে বাণিজ্যিক ভাবে সফল শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য উৎসব আয়োজনটা খুবই জরুরি। তাতে বিশ্ববাজারে পিআর ভ্যাল্যু যেমন বাড়ে, পাশাপাশি সামগ্রিক চলচ্চিত্রের একটা দারুণ উৎকর্ষও সাধন হয়। আমরা কানাডার দিকে যদি তাকাই।

যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি দেশ হওয়া সত্তে¡ও কানাডা কিন্তু তাদের চলচ্চিত্র শিল্পে অনেকটাই পিছিয়ে। এর কারণটাও আমেরিকা। কারণ আমেরিকা ফিল্ম সোসাইটি সবসময় কানাডাকে তাদের বাড়তি বাজার হিসেবেই ব্যবহার করতে চায়। এর বেশি কিছু ভেবে তাদের সমীহ করে না।

এখন কানাডার পৌনে ৩ কোটি জনসংখ্যার ভেতরে শতকরা ৪০ ভাগ ইংরেজভাষী-ব্রিটিশ, শতকরা ২৭ ভাগ ফরাসিভাষী, শতকরা ২০ ভাগ ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে আগত বাকি যে অল্পসংখ্য অধিবাসী তারা এশিয়া-আফ্রিকার।

এই মিশ্র প্রজাতির দেশে একটি চলচ্চিত্র শিল্প প্রতিষ্ঠা সবচেয়ে কঠিন।  অথচ কানাডা তাদের চলচ্চিত্রের বাজারে পিছিয়ে নেই। কারণ টরন্টো ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল। যা বিশ্ব সেরা ফেস্টিভ্যালের ভেতরে ৪র্থ। বিশ্ব বাজারে প্রতিষ্ঠা পেতে তাই একটি দেশের উন্নত ফেস্টিভ্যালের প্রয়োজন অনেক। এখানে অনেকেই ভাবতে পারেন কোথায় কানাডা আর কোথায় আমার বাংলাদেশ। দুটি দেশের ভৌগোলিক আয়তন ও অর্থনৈতিক অবস্থান থেকে তো আমরা অনেক পিছিয়ে। কিন্তু সঠিক উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনা হলে, এটি কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়।

চলচ্চিত্র নিয়ে এরকম তত্ত¡তালাশ হয়তো অনেকেই করেন। কিন্তু আমরা নিজেদের উন্নাসিকতা দূর করে একটি সঠিক মানের চলচ্চিত্র মেলার আয়োজন করলে খুব দ্রæতই চলচ্চিত্র শিল্পটাকে একটি সমৃদ্ধের জায়গায় পৌঁছে নিয়ে যেতে পারবো।

অতি সম্প্রতি অপর্ণা সেন বললেন,‘ এখন আর হলসংখ্যা চলচ্চিত্রের জন্য বিজনেস ফ্যাক্ট না।’ এই কথার কিন্তু অনেক গভীর অর্থ আছে। আমরা কান নিলো চিলে’ বলেই হতাশ বনে যাচ্ছি। জাজ মাল্টিমিডিয়া সব একাই খেয়ে ফেলল ইত্যাদি বলে নিজেরা খুব চোর ধরেছি চোর ধরেছি এরকম একটি সার্থকতা খুঁজছি। অথচ নানান প্রপাকান্ডায় যে হাঁ হুঁতাশ করছি- ¯্রফে না জেনে বুঝেই। কারণ চলচ্চিত্র চ্যারিটির জন্যও যেমন নয়, তেমনি এটাকে আলু পিঁয়াজের দরবারি করলেও এ থেকে ব্যবসা আসবে না। সঠিক পরিকল্পনা করেই এ থেকে লাভের টাকা ঘরে আনতে হবে।

গেল বছর অপর্ণা সেন ছাড়াও আরো দুজন নারীর ইন্টারভিউ নিতে গিয়ে দুটি বিষয়ে আরো নিশ্চিত হলাম। তা হলো, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির আধুনিকায়ন এবং এই বিশ্বায়নের এই উন্মুক্ত নীতির প্রতি অজ্ঞ থেকে মেধাবী প্রবাসী ফিল্ম মেকারদের সাপোর্ট না দেয়ায় আমরা আরো পিছিয়ে যাচ্ছি। দুই মেধাবী চলচ্চিত্রকার অনেকটাই নিরস বদনে ফিরে গেছেন।

একজন রুবাইয়াত হোসেন- যিনি জয়া বচ্চন, রাহুল বোসকে নিয়ে দুটি ছবি নির্মাণ করলেন। পড়াশোনা করেছেন আমেরিকান ফিল্ম ইন্সটিটিউটে। কিন্তু বৈশ্বিক ভাবনায় আমাদের তথাকথিত ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ম্যাচিউরড হয়নি বলে রুবাইয়াত নিজেই আক্ষেপের সুরে বললেন, যদি এইরকম অসহযোগিতার পরিবেশই হয়, তবে আমেরিকায় বসেই সেখানকার প্রডাকশনের ব্যানারে ছবি বানানো।

হলিউডের মেইনস্ট্রীম বাজারের অন্যতম প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন বাঙালি মেয়ে আনুশে আনাদিল। তিনিও মনে প্রাণে চান বাংলাদেশের হয়ে একটি আন্তর্জাতিক কাজ করতে। কিন্তু সংকট ঐ একটিই। এরকম দুটি উদাহরণ নয়। একটি গোটা প্রজন্মের একাধিক মেধাবী তরুণ এখন ওয়াল্ট ডিজনী, টুয়েন্টি সেঞ্চুরি ফক্সের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। বাংলাদেশি নাফিস বিন জাফর তার অন্যতম উদাহরণ। প্রয়োজন শুধু সঠিক ব্যবস্থাপনার। তাদেরকে কাজে লাগানো।

শেষ করি নায়করাজ রাজ্জাকের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে। তিনি এক আড্ডায় বলেছিলেন, ‘শোনো তানভীর স্বপ্ন যদি দেখ-ই সবচেয়ে বড় স্বপ্নটাই দেখবা। ছোট খাটো স্বপ্ন হলো দুস্বপ্নের মতো।’

বাকিটা বিজ্ঞ পাঠকেরা বুঝে নেবেন।

Tanvir-Tareq-1লেখাটি শুরু করেছিলাম জয় গোস্বামীর বাড়ি যাবার গল্প দিয়ে। শেষ করি আমাদের বিজ্ঞ শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারকে দিয়ে। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্যারের সাথে বিচ্ছিন্ন আলাপ হয় আমার। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কার্যক্রম নিয়ে আমার একটি টকশোতে আলাপ করেছিলাম। প্রশ্ন করেছিলাম, সত্যিকার অর্থেই আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মে আমাদের ভাষার চর্চা বা বাংলা ভাষার শিল্পীদের স্থানের উৎকর্ষের জন্য কতটুকু কাজ হচ্ছে?’

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বললেন ‘আমি আশাবাদী। তবে তোমার এই প্রশ্নের উত্তর একটি টকশোতে দেয়া সম্ভব নয়।’ আমাদের দেশে এখনও সরাসরি পেঙ্গুইন বা হার্পার কলিন্সসহ বিশ্বমানের বুক পাবলিশারদের কাছ থেকে সরাসরি চুক্তিবদ্ধ হয়ে বই লিখছেন একমাত্র তসলিমা নাসরিন। তিনিই একমাত্র নিয়মিত। তাকে আমরা কতটুকু এখন বাংলাদেশি বলতে পারি, সেটা বিশাল মাপের প্রশ্ন।

দেশীয় চলচ্চিত্রের সাথে এখন অব্দি বিশ্বমানের কোনো বিপণন কোম্পানির চুক্তি হয়নি। গানের বাজারেও ওয়ার্নার মিউজিক,ই এম আই বা সনি থেকে গান প্রকাশের প্রাথমিক কাজটি শুরু হয়েছে মাত্র।

তবুও আমরা আশাবাদী। কারণ সারাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাঙালির বিশাল অংশ আজ ম্যাচিউরড। স্বাধীনতা উত্তর সময়কালে বিভিন্ন কাজে দেশের বাইরে গিয়ে থেকেছেন যারা। পেতেছেন প্রবাসে সংসার। তাদের সন্তানাদি আজ বাংলাদেশি পরিচয়েই বড় বড় অবস্থানে। তাদেরকে বাংলাদেশ লালন করে আদর করে বুকে টেনে এদেশের এক মুঠো মাটি তার হাতের মুঠোয় দিয়ে বলতে হবে ,

‘তুমি এই মাটির উন্নত শিল্পসার। এই মাটিকে , এই জাতিস্মরকে সমৃদ্ধ করার দায়িত্ব তোমার।’

এই কাজটুকু করা খুব জরুরি। আফসোসের কথা হলো আমেরিকা প্রবাসী বাংলাদেশি নাফিস বিন জাফর তৃতীয়বারের মতো অস্কার পেয়ে দেশে এলেও তাকে শুধু বিভিন্ন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির লেকচার দিয়ে আবার আমেরিকাতে চলে যেতে হয়। বাকিসব কথাগুলোও প্রশ্নের খাতায় রইলো। সমাধানের দায়িত্ব যাদের তাদের প্রতি একরাশ প্রত্যাশার বাষ্প দিয়ে গেলাম। শিল্প সমৃদ্ধির বৃষ্টিতে ভিজবো বলে!

লেখক : উপস্থাপক, সংগীত পরিচালক ও সংবাদকর্মী