Home এক্সক্লুসিভ আগের মতো অভিনয় আর সম্ভব নয়-আফসানা মিমি

আগের মতো অভিনয় আর সম্ভব নয়-আফসানা মিমি

SHARE
Afsana-Mimi-3

আফসানা মিমি। এক নামেই যার অনেক পরিচয়। দূর্দান্ত এক অভিনয় শিল্পী, দক্ষ নির্মাতা ও সংগঠক। সম্প্রতি আনন্দ আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন বর্তমান সময়ের নানা ব্যস্ততার কথা। লিখেছেন সৈয়দ ইকবাল

আনন্দ আলো: বর্তমান সময়ের ব্যস্ততা সম্পর্কে বলবেন-

আফসানা মিমি: অভিনয়ের ব্যস্ততা এখন নেই বললেই চলে। আমার একাডেমিকে ঘিরে এখন যত ব্যস্ততা। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি আমি একাডেমিটা নিয়েই ব্যস্ত থাকি। উত্তরায় আমার বাংলাদেশ ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন একাডেমিতেই দিনরাত্রির সকল সময় যায়। খুব শিগগিরই আরো দুটি স্কুলের কাজে হাত দিচ্ছি। তা নিয়েও ব্যস্ততা আছে।

আনন্দ আলো: আপনাকে সর্বশেষ একটি বিজ্ঞাপনে পারফর্ম করতে দেখা গেছে। অভিনয়ে আপনাকে দেখা যায় না বললেই চলে। আপনি কী মনে করেননা আপনার ভক্তরা আপনাকে অভিনয়ে দেখতে চায়?

আফসানা মিমি: (কিছুটা হেসে) দেখতে চায় বৈকি। কিন্তু অভিনয়ের জন্য যে প্রিপারেশন, সময় এবং নিজেকে প্রস্তুত করা তার কোনোটাই আমার এখন নেই। বিজ্ঞাপনটিতে কাজ করেছিলাম এক প্রকার অনুরোধেই। তাছাড়া গল্প এবং কনসেপ্ট ভালো লেগেছিল তাই করা। অনেক সময় কোনো বন্ধু ডিরেক্টরের কথা রাখতে গিয়েও দেখা যায়- হুট-হাট করে অভিনয়টা করা হয়ে যায়। তবে অভিনয়ের জন্য মানসিকভাবে আমি প্রস্তুত নই। দু’একটি কাজ করাই যায়। কিন্তু আগের মতো অভিনয়ে নিয়মিত হওয়া এখন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পরিচালনা, নিজের লেখালেখি-একাডেমিসহ নানান ব্যস্ততায় আসলে অভিনয়টা করা হচ্ছে না।

আনন্দ আলো: অভিনয়টা মিস করেন না?

আফসানা মিমি: অবশ্যই করি। এই অভিনয় দিয়েই তো আমি আজকের আফসানা মিমি। সেই লাইট, ক্যামেরা অ্যাকশন বলা-অভিনয় শুরু করা অবশ্যই মিস করি। তবে পর্দার সামনের চাইতে পর্দার পেছনের দায়িত্ব অনেক। তাই তো আমি পেছনে থেকেই কাজ করছি। আমি যেহেতু  অভিনেত্রী তাই অভিনয়টাকে সবসময়ই মিস করি।

আনন্দ আলো: পরিচালক আফসানা মিমির কী খবর?

Afsana-Mimi-1আফসানা মিমি: কদিন আগে এটিএন বাংলায় ‘সাতটি তারার তিমির’ ধারাবাহিকটি শেষ হয়েছে। সেটা পরিচালনা নিয়ে ব্যস্ততা ছিল। তবে নতুন কিছু গল্প ভাবনায় আছে। সেগুলো নিয়ে হয়তো সামনে কাজ করব। তবে বর্তমানে নাটকের যে বাজেট এবং নাটক নির্মাণ যে সিস্টেমে এসে ঠেকেছে তা একজন নির্মাতার জন্য সত্যিই কষ্ট দায়ক।

মনে আছে, আমি যখন ‘বন্ধন’ বানিয়েছিলাম তখন প্রতি-পর্ব নাটকের জন্য নব্বই হাজার টাকা পেতাম। এখনো ধারাবাহিক বানানোর জন্য সেই নব্বই হাজার কিংবা তারচেয়েও কম বাজেটে কাজ করতে হয়- যা সত্যিই কষ্টসাধ্য। সব জিনিসের দাম বেড়েছে। আর্টিস্ট থেকে শুরু করে সবার রেমুনারেশন বেড়েছে। শুধু পরিচালক ও নাটকের দামটা বাড়েনি। তাই নাটক নির্মাণ সত্যিই অনেক কষ্টের কাজ এখন। আরো রয়েছে চ্যানেলের মার্কেটিং থেকে শুরু করে এজেন্সির আলাদা একটা দৌরাত্ম্য। সব মিলিয়ে আমরা যারা সত্যিকারের শিল্পের মানুষ এবং এই জায়গাটাকে বছরের পর বছর ধরে লালন করে আসছি তারা এখান থেকে সরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। এখন বোধকরি অন্য মানুষের সময়। আমাদের না। আমি সবার প্রতি সম্মান রেখেই বলছি- কোনো চ্যানেলেই সত্যিকারের নাটকের মানুষকে উপদেষ্টা কিংবা নীতি-নির্ধারক পর্যায়ে রাখা হয়না। কেনো সেটা জানি না। দু’ একটি চ্যানেল বাদে আর সবগুলোতে অন্য জগতের মানুষ কর্তৃত্ব করছে। যারা যুগের পর যুগ শিল্পচর্চা-নাট্যচর্চা কিংবা জায়গাটাকে লালন করে এসেছে তারা কিন্তু কেউ নেই নীতি নির্ধারক পর্যায়ে। এটা সত্যিই দুঃখজনক। আমাদের নাটকের যে অতীত-ঐতিহ্য- তা কিছু ফরম্যাটের কাছে হারিয়ে যাচ্ছে। জানি না এর শেষ কোথায়?

আনন্দ আলো: তাহলে আমাদের টেলিভিশন মিডিয়ার ভবিষ্যৎ কী?

আফসানা মিমি: দেখুন, এটা নিয়ে কথা বলতে হবে বিশদভাবে। আজকে আমাদের দেশে কতগুলো চ্যানেল? তারপরও কী পারছে দর্শকদের ধরে রাখতে? সারা পৃথিবীতে বিষয়ভিত্তিক চ্যানেল রয়েছে। আর আমাদের এখানে খবর-বিনোদন, গান- খেলা সবমিলিয়ে একেকটি চ্যানেল। মানছি সংবাদভিত্তিক চ্যানেল তাদের নির্দিষ্ট চরিত্র নিয়ে চলছে। কিন্তু প্রোগ্রামভিত্তিক চ্যানেলগুলোতে কেনো সংবাদসহ নানান অনুষ্ঠানের মিশ্র চ্যানেল থাকবে? কোনো চ্যানেলের নির্দিষ্ট চরিত্র কিংবা আইডেনটি নেই? লোগো উঠিয়ে দিলে কোনটা কোন চ্যানেল বুঝতে কষ্টই হবে।

বিজ্ঞাপন প্রচারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা নেই। কত মিনিটের অনুষ্ঠানে কত মিনিট বিজ্ঞাপন থাকবে সব চ্যানেল ঠিক করতে হবে। দর্শকদের কথা ভেবে অনুষ্ঠান বানাতে হবে। আমি এখানে স্পষ্ট করে একটা কথা বলি- আমরা অহরহই বলে থাকি যে, আমাদের দর্শক দেশের বাইরের চ্যানেল দেখছে। কিন্তু কথা হচ্ছে কেন দেখছে? আমরা দর্শকদের কী দেখাচ্ছি? আসলে আমরাই তাদেরকে বাধ্য করছি অন্যদেশের টিভি চ্যানেল দেখতে। আমার মতে, এখুনি যদি এই বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত না নেয়া হয় তাহলে বাংলাদেশের টিভি মিডিয়ার জন্য ভয়াবহ সময় অপেক্ষা করছে। সবাই সম্মিলিতভাবে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আনন্দ আলো: বর্তমানে বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার হওয়া বাংলায় ডাবিংকৃত বিদেশি সিরিয়াল নিয়ে বিভিন্ন সংগঠন আন্দোলন করছে। এই বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?

Afsana-Mimi-2আফসানা মিমি: দেখুন, বিটিভিতে একসময় বিভিন্ন দেশের বিদেশি সিরিয়াল দেখে আমরা বড় হয়েছি। এক সময় বিটিভি শুধু বিদেশি সিরিয়ালই নয়-বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দর্শকদের রুচির জায়গা তৈরি করেছে। মানুষের ড্রয়িং রুম কেমন হবে তা বিটিভির নাটক দেখে দর্শক শিখেছেন। তাই বিটিভিতেও বিদেশি সিরিয়াল প্রচার হয়েছিল- যা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে করা হয়নি। তা পৃথিবীর সুন্দর সুন্দর সিরিয়ালগুলো দর্শকদের জানার জন্য, দেখানোর জন্যই বিটিভি প্রচার করেছিল। আর বর্তমানে বিভিন্ন চ্যানেল যা করছে তা ব্যবসার জন্যই করছে। কারণ বর্তমানে টেলিভিশন মিডিয়ায় শিল্পের চেয়ে ব্যবসাটাকে বড় করে দেখা হয়। কোনটা করলে লাভ বেশি হবে তাই করে থাকে চ্যানেলগুলো। ফলে বিদেশি সিরিয়ালগুলো কিছু দর্শককে আকৃষ্ট করা এবং চ্যানেলগুলো তাদের ব্যবসার মুনাফার জন্য সিরিয়ালগুলো প্রচার করছে। আর বিটিভি যখন বিদেশি সিরিয়াল প্রচার করেছিল তা কিন্তু বাংলায় ডাবিং করে প্রচার করেনি। বর্তমানে একটি সিরিয়ালের দেখাদেখি অন্য সিরিয়ালগুলোও বাংলায় ডাবিং করে তা প্রচার করছে। আর এই সিরিয়ালগুলো দর্শকদের রুচির জায়গা কতটুকু তৈরি করতে পারছে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন যে, এসব সিরিয়াল দেখে আমাদের দেশের দর্শক বিদেশি চ্যানেল দেখা কমিয়ে দিয়েছেন। আমি বলব- এটা ভুল কথা। একটি দু’টি সিরিয়াল দিয়ে দেশের দর্শককে ভিনদেশি চ্যানেল দেখা থেকে বিরত করা সম্ভব নয়। আর আমি মুক্তবাজার অর্থনীতিতে দর্শককে আটকিয়ে রাখবো কেন? বরং প্রতিযোগিতার বাজারে আমি কোয়ালিটি অনুষ্ঠান দিয়ে দর্শকদের ধরে রাখব। তাই বলে আমার টাকা দিয়ে বিদেশি সিরিয়াল কিনে এনে নয়। আমরা আমাদের সমাজ- ঐতিহ্য-কৃষ্টি-কালচার- এবং গৌরবময় অতীত ইতিহাস নিয়ে অনুষ্ঠান বা ফিকশন বানাব। যা নতুন প্রজন্ম দেখে দেশ প্রেম তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আরও বেশী অনুপ্রাণিত হবে।

আনন্দ আলো: আপনি ‘রানওয়ে’ নামে একটি সিনেমা নির্মাণে হাত দিয়েছিলেন- তার কী খবর?

আফসানা মিমি: অনেক স্বপ্ন এবং ভালোলাগা নিয়ে সিনেমাটি নির্মাণে হাত দিয়েছিলাম। দুঃখের সঙ্গে বলতে হচ্ছে- এই সিনেমাটির অর্ধেক শুটিং শেষ করে তা এখন বাক্সবন্দী হয়ে পড়ে আছে। প্রযোজকের সঙ্গে নানান কারণে বনিবনা না হওয়ায় এখন আর ছবিটির শুটিং হচ্ছে না। আদৌ ছবিটির শুটিং আর হবে কি না সেটাও জানি না। তাই ছবিটি আলোর মুখ দেখবে কি না সেটাও বলতে পারছি না।

আনন্দ আলো: বর্তমানে টিভি নাটকের অবস্থা কেমন মনে হয়?

আফসানা মিমি: দেখুন, ভালো মন্দ প্রোডাকশন তো সবসময়ই ছিল- এখনো আছে। তবে বর্তমানে নাটক নির্মাণের প্রধান অন্তরায় বাজেট। বাজেটের কারণে চাইলেই একটি ভালো গল্প চিনৱা করা যায় না। যতদিন বিজ্ঞাপনকে গুরুত্ব দিয়ে দেশের টেলিভিশন মিডিয়া চলবে ততদিন আসলে আমাদের সমস্যার সমাধান হবে না। ক্যাবল অপারেটরদের কাছ থেকে দেশের টিভি চ্যানেলগুলোকে টাকা পেতে হবে। তবেই চ্যানেলগুলো দর্শকদের প্রাইরোটি দিয়ে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অনুষ্ঠান নির্মাণ করবে। যে কোয়ালিটিতে ফেল করবে সে ছিটকে পড়বে। কাজেই নিজের অসিৱত্ব টিকিয়ে রাখার জন্যই ভালো প্রোডাকশন নির্মাণ করতে বাধ্য হবে সকল চ্যানেলকে। কারণ অনুষ্ঠান ভালো না হলে- দর্শক তার টেলিভিশন অপারেটরদের কাছ থেকে নিবে না। বর্তমানে বেশকিছু ভালো মানের প্রোডাকশন এখনো নির্মাণ হচ্ছে। ভালো তরুণ কিছু নির্মাতা আছেন আমাদের। যারা নানান প্রতিকূলতায় কাজ করার চেষ্টা করছেন। যারা সত্যিকারের শিল্পটাকে লালন করেন। তাদের জন্য মসৃন পথ তৈরি করে দিতে হবে।