আগামী দিনে চলচ্চিত্রের গানই বেশী হবে : বাপ্পা মজুমদার

আগামী দিনে চলচ্চিত্রের গানই বেশী হবে : বাপ্পা মজুমদার

1074
SHARE
BAPPA-MOJUMDER-(67)

আনন্দ আলো: আপনি একজন সংগীত শিল্পী হঠাৎ একসঙ্গে দুটি নাটকে অভিনয় করলেন। এ ব্যাপারে কিছু বলুন।

বাপ্পা মজুমদার: সত্যি কথা বলতে, আমি নাটকে অভিনয় করতে চাইনি। দেশ টিভির আরিফ ভাই ও নাটকের পরিচালকের অনুরোধে মিষ্টার ৪২০ নাটকে অভিনয় করতে হয়েছে। এক্ষেত্রে আমার কোনো ইচ্ছা ছিল না। ‘মিডনাইট ব্ল্যাক কফি’ নাটকের ক্ষেত্রেও ঘটনা একই।

আনন্দ আলো: কেমন চরিত্রে অভিনয় করেছেন?

বাপ্পা মজুমদার: বৈবাহিক ঘটনার ব্যাপার-স্যাপারই হচ্ছে মিষ্টার ৪২০ নাটকের মূল বিষয়বস্তু। এই নাটকে আমি অধ্যাপক চরিত্রে অভিনয় করেছি। আর মিডনাইট বø্যাক কফি একক নাটকে আমাকে আততায়ীর চরিত্রে দেখা গেছে। নাটকে আমার উপস্থিতি অল্প সময়ের জন্য ছিল।

আনন্দ আলো: অভিনয় করে কেমন লেগেছে ?

বাপ্পা মজুমদার: আমি অভিনয় শিল্পী নই। অভিনয় নিয়ে আমার তেমন কোনো পরিকল্পনাও নেই। তাই অভিনয় আমার জন্য সত্যিই একটা ভীতিকর অভিজ্ঞতা ছিল। কেমন করেছি দর্শকরা তা ভালো বলতে পারবেন।

আনন্দ আলো: এর আগেও তো আপনাকে অভিনয়ে দেখা গিয়েছিল?

বাপ্পা মজুমদার: হ্যাঁ, তা-ও প্রায় এক যুগ আগে। নাটকের নাম মনে নাই। তবে এর পরিচালক ছিলেন আশরাফুল আলম।

আনন্দ আলো: আপনি গানের মানুষ গানের খবর বলুন?

বাপ্পা মজুমদার: কোরবানী ঈদে চার মিশ্র অ্যালবামে আমার গান ছিল। যাদের সুরে গান করেছি, তারা হলেন প্রিন্স মাহমুদ, সুমন কল্যান, রাজীব আহমেদ ও জয় শাহরিয়ার। এবার দুর্গাপূজায় আমার লোকগানের বেনানন্দ। অ্যালবামটি প্রকাশ পেতে যাচ্ছে।

আনন্দ আলো: ‘বেনানন্দ’ অ্যালবামটি সম্পর্কে বলুন?

বাপ্পা মজুমদার: ‘বেনানন্দ’ অ্যালবামটি বাপ্পা অ্যান্ড ফ্রেন্ডসের প্রথম আয়োজন। লালন সাঁই, হাসনরাজাসহ খ্যাতিমান বাউল-বৈষ্ণবের আটটি কালজয়ী গান নিয়ে সাজানো হয়েছে অ্যালবামটি। গানের তালিকায় রয়েছে  ‘খাচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘আগুন লাগাইয়া দিলো’, ‘বেনানন্দ’র মতো এক গুচ্ছ মাটির গান।

আনন্দ আলো: এই অ্যালবামের বিশেষত্ব কী?

বাপ্পা মজুমদার: মাটির গানের আবেদন সব সময় ছিল এবং তা চিরকাল থাকবে। প্রাচ্য-পা াত্যের গান নিয়ে যতই মাতামাতি হোক এর আবেদন কখনও কমবে না। সে কারণেই এবার লোক গানের আয়োজন করেছি। একক বা ব্যান্ড নয়, এটি বাপ্পা অ্যান্ড ফ্রেন্ডস মিউজিক প্রজেক্ট অ্যালবাম। অ্যালবামের গানগুলো শ্রোতাদের ভালো লাগলেই এ প্রজেক্ট সার্থক হয়ে উঠবে।

আনন্দ আলো: এখন গান শুধু শোনার নয়, দেখার বিষয়ও। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য…

বাপ্পা মজুমদার: এই কথার সঙ্গে আমি একমত। অতীতে তো দেখার মাধ্যম বেশি ছিল না। শুধু ছিল শোনার মাধ্যম। রেডিও গান শুনেই সন্তুষ্ট থাকতে হতো। তারপর দেখার মাধ্যম এলো টেলিভিশন। যিনি গান গাইছেন তাকে তো দেখারও সুযোগ হলো। এখন মানুষ শুধু গান শুনে তৃপ্তি পায় না, যিনি গান গাইছেন তাকেও দেখতে চায়। কাজেই দেখার ব্যাপারটাও কম গুরুত্ব নয়।

আনন্দ আলো: সঙ্গীতাঙ্গনে এক সময় জুটি প্রথা বেশ জনপ্রিয় ছিল। এখনো কেউ কেউ জুটি বেঁধে গান করছেন। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

বাপ্পা মজুমদার: গানের জুটির সাফল্য ব্যর্থতা পুরোটাই শ্রোতাদের হাতে। তারা যে ভাবে তাদের মনকে ধারণ করেন, যে ভাবে গান নিয়ে ভাবেন তার ওপর সাফল্য নির্ভর করে। এজন্য গানের জুটি খুব একটা হয় না। তা ছাড়া যার সঙ্গে গান করছি তার সঙ্গে বন্ধন এবং চিন্তার মিলটাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় দু’জনের মধ্যে ইগো কাজ করে। তাই জুটি ভেঙে যায়। ফাহমিদা নবী- আপার সঙ্গে আমার একটা জুটি হয়েছে। মানুষ গ্রহণ করেছে বলেই এই জুটিটা হয়েছে। আমাদের দু’জনের মধ্যে কখনো কোনো ইগো কাজ করে না। তাই জুটি ভাঙার কোনো আশঙ্কাই নেই। যখন একটা ডুয়েট গান করা হয়, তখন মনে রাখতে হবে গানটা দু’জনেরই। ফাহমিদা আপা সঙ্গে কাজ করতে গেলে কখনো বিরক্ত বোধকরি না। আপার সঙ্গে রিল্যাকস মুডে গানের ব্যাপারে কাজ করা যায়।

আনন্দ আলো: গান সুর করা, গাওয়া, লেখা এবং উপস্থাপনাও করছেন। কোন কাজটি করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

বাপ্পা মজুমদার: গানের সুর করা কাজটি কিন্তু অনেক কঠিন। অনেকেই বছরে অনেকগুলো গানে সুর করেন। কিন্তু আমাদের একটা গানে সুর করতে কখনো কখনো এক বছর দু বছর লেগে গেছে। কেননা এটা অনেকটাই মুডের উপর নির্ভর করে। কাজটি কিন্তু চ্যালেঞ্জিং। আমি গানে সুর দিতেই বেশি আনন্দ পাই। গান করতে চাই। আর কিছু নয়। যদিও ‘গীতিময়’ নামের একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছি। সেটা সঙ্গীত বিষয়ক অনুষ্ঠান বলেই উপস্থাপক হতে আপত্তি করিনি।

আনন্দ আলো: আজকাল অনেক শিল্পীকে দেখা যায় সঙ্গীতাঙ্গনে এসেই সব কিছু জয় করতে চান। তাদের এই প্রবণতার ভবিষ্যৎ কী?

বাপ্পা মজুমদার: এই প্রবণতার ভবিষ্যৎ খুবই অন্ধকার। গান সাধনার বিষয়। এখানে হুট করে সব কিছু জয় করা যায় না। চর্চা ছাড়া গান হয় না। হয়তো চমক দেখিয়ে এক বা দুই সিজন টিকে থাকা সম্ভব। কিন্তু চর্চা আর সাধনা না থাকলে সেই চমক টেকসই হয় না।

আনন্দ আলো: অনেক সময় দেখা যায় আপনার গানগুলো স্টেজে বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যে কেউ গাইছে। যেখানে সুর নয় তাল ঠিক থাকছে না। এ ব্যাপারে আপনার কী মন্তব্য?

বাপ্পা মজুমদার: যারা আমার গান গাইছে তাদের কাছে আহবান থাকবে তারা যেন ব্যাপারটায় সচেতন থাকে। কারণ যে কোনো জিনিস জেনে করাটা অনেক ভালো। যে কেউ আমার গান করুক বা যার গানই করুক না কেন সেটা যদি সঠিকভাবে গেয়ে থাকে তাহলে তার গ্রহণযোগ্যতাটা বাড়বে। শ্রোতারা তাকে গ্রহণ করবে।

আনন্দ আলো: বর্তমানে আমাদের গানের অবস্থা কেমন?

বাপ্পা মজুমদার: এখন অডিও বাজারের অবস্থা ভালো নয়। মানুষ অ্যালবাম কিনে গান শোনে না। শিল্পীদের অবস্থাও তাই ভালো নয়, এই পরিস্তিতিতেও ভালোগান হচ্ছে। হয়তো সংখ্যায় খুব কম।

আনন্দ আলো: সঙ্গীতাঙ্গনে অনেক নতুন মিউজিশিয়ান এসেছেন। কিন্তু তারা তেমন একটা আলোচনায় আসতে পারছেন না কেন?

বাপ্পা মজুমদার: তাদের দুর্ভাগ্য যে তারা এমন একটা সময়ে কাজ করছে যখন অডিও বাজারের অবস্থা ভালো নয়। আগে দেখা যেত শ্রোতারা নতুন অ্যালবাম কেনার অপেক্ষা করতো। অ্যালবাম বের হলেই কিনে ফেলতো। এখন অনলাইনে গান শোনে। অনলাইনে ফোক গান শুনছে কি শুনছে না বোঝার উপায় নেই। তবে নি য়ই এই অবস্থা চিরকাল থাকবে না।

আনন্দ আলো: ডিজিটালি অ্যালবাম রিলিজের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে অডিও সিডির বাজার। এ প্রসঙ্গে আপনার অভিমত?

বাপ্পা মজুমদার: অডিও সিডির বাজার হারিয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটা চরম দুঃখজনক। অডিও অ্যালবাম একজন শিল্পীর অনেক বড় একটা সম্পদ। আর অডিও বাজার নষ্ট হওয়াতে শিল্পীরাও ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। কারণ একজন শ্রোতা যখন একটা সিডি কিনে গান শুনতেন সেখান থেকে শিল্পীরাও আর্থিকভাবে লাভবান হতেন। এখনতো অ্যালবাম প্রকাশের সাথে সাথেই সেটা ইন্টারনেটে ফ্রিতে পাওয়া যায়। আর আমরা হয়তো এখন ফ্রি ডাউনলোডেই অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে অনলাইনে যদি বৈধভাবে গান দেওয়া হয় সেটাও একভাবে না একভাবে কেউ ফ্রিতে ডাউনলোড করার ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। এখন প্রয়োজন সঠিক মনিটরিং ব্যবস্থার। নয়তো ডিজিটালি গান করতেও শিল্পীদের কোনো লাভ হবে না।

আনন্দ আলো: গায়ক হিসেবে কম্পোজার বাপ্পা আর কম্পোজার হিসেবে গায়ক বাপ্পার সমালোচনা করুন?

বাপ্পা মজুমদার: কম্পোজার হিসেবে বলব, গায়ক বাপ্পাকে আরও অনেক বেশি চর্চা করতে হবে। আর গায়ক হিসেবে বলব, কম্পোজার বাপ্পার আরও অনেক বেশি গান শোনা দরকার।

আনন্দ আলো: শিল্পী হিসেবে আপনার কোনো অতৃপ্তি আছে কী?

বাপ্পা মজুমদার: অনেক অতৃপ্তি। তার মধ্যে একটা নিজেকে যতখানি পরিণত করা দরকার, ততটা পারিনি।

আনন্দ আলো: মঞ্চ, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র কোন মাধ্যমে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?

বাপ্পা মজুমদার: সব মাধ্যমেই কাজ করতে ভালো লাগে, তবে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি মঞ্চে। কারণ পুরো পরিবেশটাই ভালো লাগে। শ্রোতাদের গান শোনার আগ্রহ, আনন্দ প্রকাশের ভঙ্গি, আমার সঙ্গে গলা মেলানো একটা ভীষণ নেশা কাজ করে।

আনন্দ আলো: আপনি গান গেয়ে মানুষকে বিনোদিত করেন। আপনার বিনোদন কী?

বাপ্পা মজুমদার: বিনোদন আসলে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। আমি বিনোদিত হই যখন মানুষ আমাকে ভালোবাসে, আমার গান শোনে। মানুষের ভালোবাসার চেয়ে বড় বিনোদন আমার কাছে নেই।

আনন্দ আলো: অবসর সময় কী ভাবে কাটান?

বাপ্পা মজুমদার: অবসর তেমন একটা পাই না। কাজ করতে করতে যখন একটু ক্লান্ত লাগে তখন কম্পিউটারে বসে গেমস খেলি।

আনন্দ আলো: আগে তো খেলনা হেলিকপ্টার ওড়াতেন, এখন?

বাপ্পা মজুমদার: আরে ওটাতো বহুদিনের পুরনো অভ্যাস। ওটা ছাড়া তো মনে হয় বাঁচতেই পারব না। আমার কালেকশনে অনেক হেলিকপ্টার আছে। হেলিকপ্টারের সঙ্গে আমার চিন্তারাও যেন ডানা মেলে।

আনন্দ আলো: সঙ্গীতের আগামী দিনগুলো নিয়ে জানতে চাই?

বাপ্পা মজুমদার: আগামী দিনে চলচ্চিত্রের গান বেশি হবে। তবে আমি একটা প্রবণতা দেখেছি, দেশের বাইরে থেকে সংগীত করিয়ে আনা। এটা আমি সমর্থন করি না। দেশের ছবি, দেশের মূলধন, দেশের দর্শক, তাহলে কেন বিদেশ থেকে সংগীত করিয়ে আনা।

আনন্দ আলো:  এটা প্রতিরোধ করা কী সম্ভব?

বাপ্পা মজুমদার: আমাদের সংগীতের সবাইকে এক হতে হবে। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ঐক্য আছে কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, গানের ক্ষেত্রে ঐক্যটা দেখিনা। সরকারকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে, সুষ্পষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে। নবীন-প্রবীনদের নিয়ে দেশের স্বার্থে এক হয়ে কাজ করতে হবে।

আনন্দ আলো: নতুনদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন?

বাপ্পা মজুমদার: নতুনদের প্রতি আমার পরামর্শ নিয়মিত চর্চা করতে হবে। সাধনা করতে হবে। বড়দেরকে সম্মান করতে হবে। যে কোনো গানই করেন না কেন তা কিন্তু দরদ দিয়ে, মনোযোগ সহকারে করতে হবে। তবে লক্ষ্যে পৌছানো সম্ভব।