অলিম্পিকে রিটার কল্যাণে আলোচিত বাংলাদেশ

অলিম্পিকে রিটার কল্যাণে আলোচিত বাংলাদেশ

572
SHARE

অলিম্পিকে কখনও কোনো পদক জিততে পারেনি বাংলাদেশ। তবে রিওর আসরে একটি সোনার পদকের সঙ্গে জড়িয়ে গেল বাংলাদেশের নামও। ভারসাম্যের অসামান্য নিদর্শন আর দুর্দান্ত শারীরিক কলাকৌশল দেখিয়ে জেতা রিদমিক জিমন্যাস্টিক্সের সোনার পদকটি বাংলাদেশেরও বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশি বাবা আর রুশ মার ঘরে জন্ম নেয়া মার্গারিতা মামুন।

মস্কোতে জন্ম নেয়া ২০ বছর বয়সী মামুন গেমসের পঞ্চদশ দিনে বাংলাদেশ সময় শনিবার গভীর রাতে ব্যক্তিগত অল-অ্যারাউন্ড ইভেন্টে সোনা জেতার পর সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘এই জয় দুই দেশের জন্য’।

মস্কোতে জন্ম নেয়া মামুনের বাবা মেরিন প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মামুন রাশিয়াতেই থিতু হয়েছেন। মা সাবেক রিদমিক জিমন্যাস্ট আন্নার কাছ থেকেই দীক্ষা পেয়েছেন তিনি।

রিদমিক জিমন্যাস্টিক্সে রাশিয়ায় বেশ কয়েক বছর ধরে আলোড়ন তোলা মামুন ‘দ্য বেঙ্গল টাইগার’ হিসেবে পরিচিত। তবে রিওতে শক্তি দিয়ে নয়, মামুন প্রতিপক্ষদের ঘায়েল করেন হুপ, বল, ক্লাব ও রিবন এই চারটি রুটিনে অনবদ্য ক্রীড়াশৈলী দেখিয়ে।

সোনা জিততে মামুন পেছনে ফেলেন ফেভারিট ও তিন বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্বদেশি ইয়ানা কুদ্রিয়াভৎসেভাকে। ফাইনালে প্রতিযোগিতার হুপ ও বলের রুটিন শেষে পয়েন্ট তালিকায় শীর্ষেই ছিলেন ইয়ানা। কিন্তু ক্লাব-পারফরম্যান্সের শেষ মুহূর্তে ভুল করে বসেন। ক্লাব উপরে ছুড়ে ফ্লোরে গড়িয়ে ধরতে পারনি। বাড়িয়ে থাকা হাতকে ফাঁকি দিয়ে তা পড়ে যায় ফ্লোরে। এতে অনেকটাই এগিয়ে যান মামুন।

সর্বমোট ৭৬.৪৮৩ স্কোর করে সেরা হন মামুন। শেষ পর্যন্ত ৭৫.৬০৮ স্কোর করে রুপা জেতেন ইয়ানা। ইউক্রেইনের গানা রিজাতদিনোভা পেয়েছেন ব্রোঞ্জ।

রাশিয়াকে এই ইভেন্টে টানা পঞ্চম সোনার পদক এনে দেওয়া মামুন বলেন “আজ আমার সোনার পদক জেতাটা খুবই অপ্রত্যাশিত। কারণ এর আগে অল অ্যারাউন্ডে ইয়ানা আমাকে হারিয়ে প্রতিবার জিতেছে। তাই আমি আজকে সোনার পদক জিতবো তা আসলেই ভাবিনি।

মামুন খুবই আনন্দিত যে তার জয় বাংলাদেশেও উদযাপিত হচ্ছে।

আমি এটা জেনে খুব খুশি যে বাংলাদেশের অনেক ভক্ত আমাকে সমর্থন করছে।

আমি বাংলায় ১ থেকে ১০ পর্যন্ত গুনতে পারি। যখন ছোটো ছিলাম, আমার বাবা আমাকে বাংলা শেখাতেন; কিন্তু আমি সব ভুলে গেছি।

আমার দ্বৈত নাগরিকত্ব ছিল, তাই আমি জুনিয়র হিসেবে একটি প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলাম। এরপর আমি রাশিয়ায় অনুশীলন করেছি। রাশিয়ার প্রতিনিধিত্ব করে রিও অলিম্পিকে রিদমিক জিমন্যাস্টিকসে একক অল-অ্যারাউন্ড ইভেন্টে স্বর্ণ জিতেছি। শুধু তাই নয় রিদমিক জিমন্যাস্টিক্সের দলগত অল-অ্যারাউন্ড ইভেন্টেও সেরা হয়েছে রাশিয়ার মেয়েরা। এই নিয়ে টানা পাঁচ অলিম্পিকে রিদমিক জিমন্যাস্টিক্সের ‘ডাবল’ জিতলো রুশ কন্যারা।

অলিম্পিকে স্বর্ন জেতার পর মার্গারিটা মামুন বাংলাদেশে আসার কথা জানিয়েছেন। একটি সূত্র জানায়, ‘সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মাগারিটার পিতা আব্দুল্লাহ আল মামুন বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনে যোগাযোগ করেছিলেন মেয়েকে বাংলাদেশের হয়ে অংশগ্রহণ করানোর জন্য, কিন্তু তখনকার প্রশাসন এব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেনি।’

মার্গারিটার বাবা আবদুল্লাহ আল মামুন রাজশাহীর দুর্গাপুরের সনৱান। মা আনা রাশিয়ার সাবেক জিমন্যাস্ট। আশির দশকে আবদুল্লাহ আল মামুন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়াশোনা করতে গিয়ে সেখানেই বিয়ে করে স্থায়ী হন। মার্গারিটার জন্ম মস্কোতেই। জন্মভূমি রাশিয়া হলেও, রিটা স্বর্ণ জেতার পর সাফল্যটা উৎসর্গ করেছেন বাংলাদেশ-রাশিয়া দুই দেশকেই, বলেছেন ‘আমার এই জয় দুই দেশের জন্যই।’

২০০৯ সালে ১৩ বছর বয়সী রিটাকে নিয়ে ঢাকায় জিমন্যাস্টিকস ফেডারেশনে এসেছিলেন বাবা আবদুল্লাহ আল মামুন। চেয়েছিলেন মেয়ে যাতে বাংলাদেশের হয়ে বিভিন্ন ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারেন। কিন্তু ফেডারেশনের সেই সময়কার নির্বাহী কমিটি সুযোগটা করে দিতে পারেনি।

২০১৩ সালে কিয়েভে বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে ও কাজানে গ্রীষ্মকালীন ইউনিভার্সিয়াদে অল-অ্যারাউন্ড চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথম সবার নজর কাড়েন মার্গারিটা। মা-বাবা যাকে ডাকেন রিটা নামে। ওই সময়ই রাশিয়ার ক্রীড়াঙ্গনে তাকে নিয়ে শুরু হয় হৈচৈ। রুশ ম্যাগাজিন ইউরো স্পোর্তে তাকে নিয়ে করা হয়েছিল প্রচ্ছদ প্রতিবেদন। স্থানীয় গণমাধ্যম তার নাম দেয় ‘বাংলার বাঘিনী’। ২০১৫ সালে বাকুতে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে জেতেন স্বর্ণ, অল-অ্যারাউন্ডে রুপা। বার্লিনে ২০১৩ সালের গ্রাঁ প্রিতে, পরের বছর অস্ট্রিয়ার ইনসব্রাকে এবং গত বছর চেক প্রজাতন্ত্রের ব্রনোতেও অল-অ্যারাউন্ডে স্বর্ণ জিতেছিলেন রিটা। রিওতে যখন স্বর্ণ জিতলেন, টেলিভিশন ধারাভাষ্যকারও মার্গারিটার নামের সঙ্গে ‘বেঙ্গল টাইগার’ শব্দটি উচ্চারণ করছিলেন বারবার।