অলিম্পিকে অংশ নেয়া আমার কাছে স্বপ্নের মতো

অলিম্পিকে অংশ নেয়া আমার কাছে স্বপ্নের মতো

576
SHARE

তার বাবা আফজাল হোসেন এক সময় সিএনজি চালক ছিলেন। তিনি নিজেও গলফ ক্লাবের বলবয় ছিলেন। অদম্য ইচ্ছা সাহস আর আত্মবিশ্বাসই তাকে বাংলাদেশের সেরা স্পোর্টস স্টার-এর মর্যাদা লাভ করার পথ তৈরী করে দিয়েছে। আমরা বলছি দেশের সেরা গলফার সিদ্দিকুর রহমানের কথা। বলবয় থেকে আজ তিনি পৃথিবীর সেরা ৬০ জন গলফ খেলোয়ারের মধ্যে ৫৬ তম স্থান করে নিয়েছেন। প্রথম  এশিয়ান ব্রুনাই ওপেন এবং হিরো ইন্ডিয়ান ওপেনে চ্যাম্পিয়ন হয়ে পুরো বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। এছাড়াও অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছেন ১০ বছরের ক্যারিয়ারে। এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পুরস্কার আর সম্মাননার চেয়ে সবচেয়ে বড় পুরস্কার পেলেন এবার অলিম্পিকে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জনের মধ্যদিয়ে।

সরাসরি অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে নতুন ইতিহাস গড়ে ফেললেন বাংলাদেশের কৃতি গলফার সিদ্দিকুর রহমান। দেশের প্রথম ক্রীড়াবিদ হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করলেন সরাসরি অলিম্পিকে খেলার। এত দিন আনৱর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির দেয়া ওয়াইল্ড কার্ডেই কেবল বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের এ মহাযজ্ঞে নিজেদের শামিল করতে পেরেছে বাংলাদেশের এ্যাথলেট। তাতে অলিম্পিকের যে মূল মন্ত্র অংশগ্রহণ- সেটি পূরণ হয়েছে ঠিকই কিন্তু লাল-সবুজের পতাকা বড় কোনো তারকা খেলোয়াড় মেলে ধরতে পারেননি। এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো ক্রীড়াবিদ পারফরম্যান্স দিয়ে নিজের জায়গা করে নিলেন এ বিশ্ব আসরে। সম্প্রতি প্রকাশিত অলিম্পিক (গলফ) র‌্যাংকিং-এ চুড়ানৱ তালিকায়ও নিজের অবস্থান ধরে রেখে এ যোগ্যতা অর্জন করলেন তিনি। সারা বিশ্ব থেকে রিও আসরে যে ৬০ গলফার অংশ নিতে যাচ্ছেন, সিদ্দিক তাদের মধ্যে ৫৬তম।

বিশ্ব গলফে অবশ্য আমেরিকানদের আধিপত্য বেশী। শীর্ষ ৫০ গলফারের তালিকা করলে দেখা যাবে আমেরিকানই আছেন ৩০ জন। অলিম্পিকে বেশি দেশের অংশগ্রহণ বাড়াতে তাই র‌্যাংকিং-এর প্রচলন করা হয়েছে।

সেই ১৯০০ সালে আধুনিক অলিম্পিকের দ্বিতীয় আসরে প্রথম ও শেষবারের মতো আয়োজিত হয়েছিল গলফ। এবার রিওতে সে গলফ ফিরছে এক শতাব্দীরও বেশি সময় পার করে। বাংলাদেশকে এ ইতিহাসেরই সাথী করছেন সিদ্দিকুর। এখনো পর্যনৱ অলিম্পিক পদক পায়নি এমন দেশগুলোর মধ্যে জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশই শীর্ষে। তার চেয়েও আক্ষেপের হলো অলিম্পিকের গত ৮টি আসরে এই বাংলাদেশের যে ৩২ জন এ্যাথলেট নাম লিখিয়েছেন তাদের কেউই নিজের যোগ্যতায় সে সুযোগ পাননি, প্রত্যেকেই গিয়েছেন বিশ্ব অলিম্পিকের ওয়াইল্ড কার্ড নামক সুবিধায়। এত দিন যে যোগ্যতা অর্জনই ছিল সোনার হরিণ পাওয়ার মতো ব্যাপার, সিদ্দিক সে অপ্রাপ্তিই পূরণ করলেন।

২০১০ সালে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে ধ্রুবতারার মতো আবির্ভাব সিদ্দিকের। গলফে তিনি আনৱর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছেছিলেন, ২০১০-এ ব্রুনাই ওপেন জয় করে। গত ৬ বছরে সিদ্দিক সেই উচ্চতা থেকে নামেননি একবারের জন্য। বরং নতুন নতুন অর্জনে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। ভারতে ২০১৩ সালে জেতেন নিজের দ্বিতীয় পেশাদার শিরোপা। এর মধ্যে গলফ বিশ্বকাপে তিনি বাংলাদেশকে নিয়ে গেছেন, ইউরেশিয়া কাপে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে করেছেন উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্স। সর্বশেষ ইউরোপিয়ান ট্যুর টুর্নামেন্ট মরিশাস ওপেনে শিরোপা থেকে নিঃশ্বাস দুরত্বে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যনৱ রানার্স-আপ হয়েছেন।

অলিম্পিক স্বপ্নে সিদ্দিকুরের পথচলা শুরু হয় গত বছর থেকে। গত এপ্রিলে প্রকাশিত প্রথম অলিম্পিক র‌্যাংকিং-এ তিনি ৫৭তম স্থান পান। ২০১৪ থেকে পারফরম্যান্স বিচার করে সেই র‌্যাংকিং করা হয়, এর পর থেকে পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে প্রতি সপ্তাহের রদবদলের মাধ্যমে চুড়ানৱ হয় সেই তালিকা, যেখানে সিদ্দিক ৫৬ নম্বরে এসে অলিম্পিকে সুযোগ পান। এ দুই বছরে সিদ্দিকের পারফরম্যান্সে উত্থান-পতন হয়েছে। এ বছরের গোড়ার দিকে তো তালিকা থেকে ছিটকে অনেক পিছিয়েও পড়েছিলেন। তার ফেরার আশাই ছিল না, যদি না গত মে মাসে ইউরোপিয়ান ট্যুরের আসরে তিনি রানার্স-আপ হতেন। এ পারফরম্যান্সই তাঁকে অলিম্পিক র‌্যাংকিং-এ আবার ফিরিয়েছে।

৫ জুলাই প্রকাশিত র‌্যাংকিং-এ তিনি ৫৩তম। এরপর থেকে রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা, অবশেষে চুড়ানৱ তালিকায়ও তিনি টিকে থাকলেন। বাংলাদেশের প্রথম ক্রীড়াবিদ হিসেবে যোগ্যতার মাধ্যমে জায়গা পেলেন তিনি অলিম্পিকে। এ অর্জনের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত তাঁর কণ্ঠ ‘এখন বাংলাদেশের মানুষই বিচার করবে, গলফ আমাদের কোথায় নিয়ে গেছে, গলফ কী দিতে পেরেছে। সারা বিশ্বে প্রায় ২০০টি দেশে গলফ খেলা হয়, সবার নিজস্ব পেশাদার টুর্নামেন্ট আছে, বিশ্বে মোট পেশাদার গলফারই ১০ লাখ। সেখান থেকে আমি অলিম্পিকে যাচ্ছি ৬০ জনের মধ্যে থেকে ।

Siddiqur-Rahman-1প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সরাসরি অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়ে সিদ্দিকুর রহমান আরো বলেন, এটা অবশ্যই ভালোলাগার। আর আনন্দের তো বটেই। এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়, প্রথম বাংলাদেশি গলফার হিসেবে সরাসরি অলিম্পিকে খেলতে যাচ্ছি। শুধু আমার জন্যই নয়, পুরো দেশের জন্যই এটি একটি আনন্দের খবর।

এ বছর মে মাসে মরিশাস ওপেনে দ্বিতীয় হওয়ার পরই আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তখনই মনে হয়েছিল আমি হয়তো সরাসরি অলিম্পিকে খেলার সুযোগ পাব। শেষ পর্যনৱ এই সুযোগ পেয়েছি বলে নিজের ভালোলাগার মাত্রাটা আরো বেড়ে গেছে।

আমার এখন একমাত্র লক্ষ্য নিজের সেরাটা খেলা। আমি যদি নিজের সেরাটা খেলতে পারি তাহলে সাফল্য পাওয়া সম্ভব। সেভাবেই নিজেকে তৈরি করছি আমি।

প্রস্তুতি ভালোই। হাতে যত দিন সময় আছে এই সময়ের মধ্যে নিজেকে যতটুকু সম্ভব আরো ভালোভাবে তৈরি করে নেওয়া। সেভাবেই আমি অনুশীলন করে যাচ্ছি।

আসলে বেশ কিছুদিন ধরেই আমি খেলার মধ্যে আছি। তা ছাড়া অনুশীলন তো চলছেই। সব মিলিয়ে আমি ভালোভাবেই তৈরি অলিম্পিকে খেলার জন্য।

এই মুহূর্তে আমার ফিটনেসের অবস্থা যথেষ্টই ভালো। কোমরের পুরোনো সেই চোট এখন অনেকটাই সেরে উঠেছে। আশা করছি অলিম্পিকের আগে বা অলিম্পিক চলাকালে এই চোট আমাকে খুব একটা ভোগাবে না।

অনেকেই বলেছেন গত দু’টি বছর আমার বড় কোনো সাফল্য নেই। গত মে মাসে মরিশাস ওপেনে অল্পের জন্য পারিনি তৃতীয় এশিয়ান ট্যুর শিরোপা জিততে। তবে অলিম্পিকে সরাসরি খেলতে পারাটা আমাদের জন্য বড় একটা অর্জন। সিদ্দিকুর প্রথম যখন অলিম্পিকে অংশ নেয়ার যোগ্যতার খবর পান তখনই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে জানিয়েছেন তার অগনিত ফেসবুক বন্ধুদের।

সিদ্দিকুর রহমান তার ফেসবুকে লিখেছেন, ২০১৬ রিও অলিম্পিকে খেলা নিশ্চিত করেছি। প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের হয়ে সরাসরি অলিম্পিকে প্রতিনিধিত্ব করব আমি। একজন খেলোয়াড় হিসেবে অলিম্পিকের মতো আসরে অংশ নিতে পারাটা আমার কাছে স্ব

প্নের মতো। আমি ৬০-এর মধ্যে ৫৬তম হয়েছি। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।

চলতি বছরের ৫ আগস্ট থেকে ব্রাজিলে শুরু হবে রিও অলিম্পিক। ১৫ দিনব্যাপী এই ক্রীড়াযজ্ঞের পর্দা নামবে ২১ আগস্ট। সবকিছু ঠিক থাকলে আমার লক্ষ্য ২ আগস্ট দেশ ছাড়ার।