অন্য এক মিঠুর কথা -মুকিত মজুমদার বাবু

অন্য এক মিঠুর কথা -মুকিত মজুমদার বাবু

482
0
SHARE

প্রকৃতিকে দেখার চোখ সবার থাকে না। চোখ থাকে না বলেই প্রকৃতিকে তারা ভালোবাসতে পারে না, বুঝতে পারে না, হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারে না। প্রকৃতির সাথে আমাদের এই দূরত্ব সৃষ্টি প্রকৃতিকে বিপন্ন বিষণ্ন করে বয়ে যেতে সহায়তা করছে। দিন দিন বিবর্ণ হয়ে উঠছে প্রকৃতির বর্ণিল রূপ। কেউ নির্দ্বিধায় বন উজাড় করছে। কেউ সৃজন করছে সবুজের নতুন বলয়। কেউ পাখি শিকার করে পৈশাচিক উল্লাস করছে। আবার অভাবী ঘরের কেউ পাখি বাঁচাতে পরিবারকে রাখছে অনাহারে। কেউ নদী দূষণ করছে। আবার কেউ নদীকে বাঁচাতে গলা ফাটাচ্ছে তপ্তরোদে রাজপথে। ভালোর পাশে মন্দ থাকে। আলোর পাশে যেমন থাকে অন্ধকার।

হাতের পাঁচটা আঙুল সমান হয় না। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিও তাই। দেখার ভিন্নতা, অজ্ঞতা, অবহেলা, হেঁয়ালী, অসচেতনতা ইত্যাদি কারণেই প্রকৃতির স্নেহের আঁচলের ছায়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। অথচ প্রকৃতির ছায়ায়-মায়ায়-সুধায় বেঁচে আছি আমরা। ‘প্রকৃতি আমাদের লালন করছে কোটি কোটি বছর ধরে’ -এ কথা কেউ কেউ বোঝে, কেউ বোঝে না। কেউ প্রমাণ করে, কেউ ধারণ করে। কথায় সে কথা না বললেও কর্মে ঠিকই প্রকাশ পায়। খালিদ মাহমুদ মিঠুর কথাই ধরা যাক। সবাই জানে তিনি একজন গুণী পরিচালক, ভালো গল্পকার, দক্ষ চিত্রগ্রাহক, অসাধারণ ছবি আঁকেন, চিত্র সম্পাদনায়ও তিনি দক্ষ। কিন্তু অনেকের কাছেই মিঠুর প্রকৃতিপ্রেমী মনটার কথা অজানা। তার সাথে যারা কাজ করেছেন, তার সাথে যারা গভীরভাবে মিশেছেন তারা জানেন মিঠু কতটা প্রকৃতিপ্রেমী। সবুজের প্রতি তার কত মোহ। পশুপাখির প্রতি তার কত দরদ। পাহাড়-নদী-সাগরের প্রতি তার কত ভালোবাসা। তিনি ছবির শুটিং করার সময় মাথায় রেখেছেন প্রকৃতিকে। প্রাধান্য পেয়েছে গাছ, সাগর, পাহাড়, নদী, পশুপাখি। চলচ্চিত্র নির্মাণে সে সব চরিত্রগুলোকে প্রকৃতির মাঝে খেলা করতে ছেড়ে দিয়েছেন। প্রকৃতির শেখানো আচার-আচরণ তুলে ধরেছেন ক্যামেরার মাধ্যমে, তার মনের সবুজ চোখ দিয়ে। দর্শকদের চোখে ও মনে বুলিয়ে দিয়েছেন সবুজের স্নিগ্ধতা, ভালোবাসা, উদারতা, ধৈর্য, শিক্ষা।

একজন চিত্রগ্রাহক হিসেবে ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও চ্যানেল আইয়ের সাথে মিঠুর অনেক দিনের যোগাযোগ। সেই সূত্র থেকে আমার সাথে পরিচয়, আলাপচারিতা, অনত্মরঙ্গতা। প্রকৃতিপ্রেমী মিঠুর সবুজ মনের খোঁজ পাই তারও পরে। একদিন অবাক করে দিয়ে বলেন আমার প্রকৃতিবিষয়ক শিক্ষামূলক প্রামাণ্য অনুষ্ঠান ‘প্রকৃতি ও জীবন’-এর নিয়মিত দর্শক-শ্রোতা তিনি। ব্যসত্ম থাকার কারণে যদি কোনো পর্ব না দেখতে পারতেন তাহলে আক্ষেপের অনত্ম ছিল না তার। ফোন করে আমাকে জানাতেন। দেখা-সাক্ষাৎ হতো মাঝে মধ্যে। একদিন কথায় কথায় তার পরিবারের কথা ওঠে। জানান, কোনো প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকতেই তার পরিবারের সবাই নিরামিষ ভোজী। এমনকি রাসত্মার বাস-রিকশায় চাপা পড়া অসুস্থ প্রাণীদের চিকিৎসায় তার সনত্মানেরা যথেষ্ট তৎপর। মনে মনে ভাবলাম, ঠিকই তো, পরিবারের কাছ থেকেই তো প্রাথমিক শিক্ষা পায় শিশুরা। মা-বাবার আচার-আচরণ, তাদের কর্মই শিশুদের সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। মিঠুর প্রকৃতিপ্রেমের ছায়ায় ছেলেমেয়েরাও যে প্রকৃতিপ্রেমী হবে এটাই স্বাভাবিক। এরাইতো রক্ষা করবে আমাদের আগামী দিনের পরিবেশ ও প্রকৃতি। গড়ে তুলবে সুন্দর প্রকৃতিতে সুস্থ জীবন।

অনেকদিন মিঠুর সাথে দেখা হয় না। দেশ-বিদেশ আর ব্যসত্মতার কারণে ফোনালাপও হয়নি। অফিসে ঢুকে চেয়ারে বসতেই মোবাইলে মিঠুর ফোন। কোনো ভনিতা না করে সরাসরি তিনি আমাকে প্রকৃতিবিষয়ক একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রসত্মাব দেন। তার আগ্রহ আমাকে অবিভূত করে। কারণ তাকে আমি জানি। তিনিও আমাকে জানেন। দুজনের জানাশোনা এক হলেই একটা ভালো কিছু করতে পারব আমরা। তবে প্রকৃতিবিষয়ক চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে গেলে অনেক ঝক্কি-ঝামেলার ব্যাপার আছে। সময়, স্থান, চরিত্র, প্রকৃতির সাথে একাত্মতা, রক্ষতা, বৈরিতা সবকিছু পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা যেমন ‘প্রকৃতি ও জীবন’ অনুষ্ঠানের জন্য দুর্গম কোনো জায়গায় গিয়ে পাখি, সাপ, ব্যাঙ, কিংবা বিলুপ্তপ্রায় প্রাণীর ছবি ধারণ করতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করি। চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও তেমনি বৈরী পরিবেশের মধ্যে কাজ করতে হবে। নির্মাণ ব্যয় ও সময় বেড়ে যাবে। বিষয়টি নিয়ে আমার সহকর্মীদের সাথে আলোচনা করি। কিছু দিন পর আবার ফোন এলো মিঠুর। তিনি প্রকৃতি নিয়ে চলচ্চিত্র বানাবেনই। আমি এই আশাবাদী মানুষটিকে হতাশ করতে পারলাম না। তবে সময় নিলাম। কথা দিলাম। গত ৫ মার্চ বিকালে মিঠুর হাতে তুলে দিলাম প্রকৃতিবিষয়ক প্রথম চলচ্চিত্রের পাণ্ডুলিপি ‘গাঙের মানুষ’। ছবির বাজেট দিল ৬ তারিখ বিকালে। ৭ তারিখ দুপুরবেলায় সব শেষ। ভালোবাসার মানুষদের এভাবে বিদায় দেয়া যায় না। কষ্ট হয়।  পাঁজর ভেঙে যায়।

লেখক: চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন